২টি ছাদ ও কয়েকটি বিকেল... - অধ্যায় ১৮
পর্ব ১৭
শীত এখনো পুরোপুরি নামে নাই, তবুও সন্ধ্যার পর বাতাসে একটা কাঁচা ঠান্ডা এসে জমতে শুরু করেছে। এই ঠান্ডা শরীরের আগে মনে লাগে—মানুষকে অকারণে চুপ করিয়ে দেয়, পুরোনো কথা মনে করিয়ে দেয়, আর একা থাকলে বুকের ভেতর অদ্ভুত শূন্যতা তৈরি করে। সাইফ বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল, হাতে ধরা এক কাপ চা, যেটা অনেক আগেই ঠান্ডা হয়ে গেছে। সে খেয়ালই করেনি। নিচের রাস্তায় মানুষের ভিড়, পাশের ফুচকার দোকান থেকে ভেসে আসা টক-মসলার গন্ধ, কলেজপড়ুয়া ছেলেমেয়েদের হালকা হাসির শব্দ—সবকিছু খুব সাধারণ, খুব জীবন্ত। কিন্তু এই জীবন্ত পৃথিবীর মাঝেও সাইফের ভেতরে যেন একটা বন্ধ ঘর পড়ে আছে, যেখানে বাতাস ঢোকে না। তার মাথার মধ্যে বারবার সেই চিঠির লাইনগুলো ফিরে আসে। “ভালোবাসা কারও জায়গা ভরার জন্য না…” কথাটা এমনভাবে আটকে গেছে যেন কেউ ভেতর থেকে ধীরে ধীরে পেরেক ঠুকছে। সে নিচে তাকিয়ে দেখে, রাস্তার একপাশে একটা বাচ্চা মেয়েকে তার বাবা হাত ধরে রাস্তা পার করাচ্ছে। দৃশ্যটা এত সাধারণ যে কষ্ট লাগে। কারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ব্যথা পায় তখনই, যখন খুব সাধারণ কিছু জিনিস তার কাছে অসম্ভব মনে হয়। ভেতরের ঘর থেকে হঠাৎ শিউলির হাসির শব্দ ভেসে এল। খুব ছোট্ট, নরম একটা হাসি। কিন্তু সেই হাসির ভেতরে এখন সাইফ এমন একটা উষ্ণতা খুঁজে পায়, যেটা তাকে একই সাথে শান্তও করে, আবার অপরাধবোধেও ভরিয়ে দেয়।
সে ঘুরে তাকাল। শিউলি ফোনে কথা বলছে, সম্ভবত কোনো আত্মীয়ের সাথে। তার ডান হাতটা অজান্তেই তলপেটের ওপর রাখা। এখনও খুব বেশি বোঝা যায় না, কিন্তু সাইফ এখন প্রায়ই সেই জায়গাটার দিকে তাকিয়ে থাকে। তার মনে হয়, ওই ছোট্ট অদৃশ্য জায়গাটার ভেতর শুধু একটা শিশু না—তার ভবিষ্যৎ, তার ভয়, তার বাঁচার নতুন কারণ সবকিছু একসাথে ধীরে ধীরে আকার নিচ্ছে। কয়েক সপ্তাহ আগেও সে এতটা অনুভব করত না। তখন সবকিছু শুধু দায়িত্বের মতো লাগত। এখন কখনো কখনো গভীর রাতে ঘুম ভেঙে গেলে সে হাত বাড়িয়ে শিউলির পেটের ওপর হাত রাখে, তারপর নিজেই ভয় পেয়ে যায়। কারণ সেই মুহূর্তে সে বুঝতে পারে—সে হারানোর ভয় পাচ্ছে। আবার। শিউলি এখন আগের মতো চুপচাপ না। সে মাঝেমধ্যে হঠাৎ করে বাচ্চার নাম নিয়ে কথা বলে, কোন রঙের জামা ভালো লাগবে সেটা নিয়ে হাসে, এমনকি একদিন বলেছিল—“যদি মেয়ে হয়, ওর চুলে ছোট্ট ক্লিপ লাগাবো।” সাইফ তখন হেসেছিল, কিন্তু তার বুকের ভেতর কোথাও একটা ব্যথা উঠেছিল। কারণ এই মেয়েটা ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শিখে গেছে, আর সে এখনো অতীতের ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে আছে। শিউলি মাঝে মাঝে সেটা বুঝতেও পারে। তাই সে ইচ্ছে করেই আরও বেশি স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে। যেন স্বাভাবিকতার অভিনয় করতে করতে একসময় সত্যিই সব স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
কিন্তু রাতের অন্ধকার মানুষকে মিথ্যা বলতে দেয় না। দিনের বেলা যত সহজ অভিনয় করা যায়, গভীর রাতে সব মুখোশ আলগা হয়ে আসে। শিউলি অনেক রাতেই টের পায়, সাইফ ঘুমাচ্ছে না। সে পাশ ফিরে ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকে, মাঝে মাঝে খুব ধীরে শ্বাস নেয়। যেন কোনো শব্দ তাকে ভেতর থেকে তাড়া করছে। “ঘুমাও নাই?” শিউলি এক রাতে জিজ্ঞেস করেছিল। সাইফ একটু চমকে উঠেছিল, যেন হাতেনাতে ধরা পড়ে গেছে। তারপর খুব স্বাভাবিক গলায় বলেছিল—“না… এমনি।” এই “এমনি” কথাটার ভেতরেই সমস্যা। কারণ শিউলি এখন বুঝতে শিখেছে, মানুষ যখন “এমনি” বলে, তখন ভেতরে অনেক কিছু থাকে। অনেক না বলা ভয়, অনেক লুকানো স্মৃতি। সেই রাতে শিউলি আর কিছু বলেনি। কিন্তু তার ভেতরে একটা ধীরে জমতে থাকা ঠান্ডা অনুভূতি জন্ম নেয়। সে অনুভব করে—সাইফ তার সাথে আছে ঠিকই, কিন্তু পুরোপুরি না। যেন তার একটা অংশ সবসময় কোথাও ফিরে যায়, এমন এক জায়গায় যেখানে শিউলির কোনো প্রবেশাধিকার নেই।
এক রাতে পানি খেতে উঠে শিউলি দেখল, ড্রয়িংরুমের আলো বন্ধ। শুধু ফোনের নীলচে আলো অন্ধকারের মধ্যে একটা মুখকে আলাদা করে রেখেছে। সাইফ সোফায় বসে আছে। তার কাঁধ একটু ঝুঁকে আছে, মুখে এমন এক ধরনের নিঃসঙ্গতা যা মানুষ কাউকে দেখাতে চায় না। শিউলি দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে রইল। স্ক্রিনে একটা ছবি। আরিবা। ছবিতে আরিবা হাসছে—চোখে সেই পুরোনো উজ্জ্বলতা, যেটা মৃত মানুষের ছবিতে আরও বেশি জীবন্ত লাগে। সাইফ ছবিটার দিকে তাকিয়ে আছে এমনভাবে, যেন সে সত্যিই কারও সাথে কথা বলার চেষ্টা করছে। শিউলির বুকের ভেতর ধীরে ধীরে ঠান্ডা কিছু জমতে শুরু করল। হিংসা না। রাগও না। বরং একধরনের অসহায়তা। কারণ সে বুঝতে পারল, মৃত মানুষের সাথে প্রতিযোগিতা করা যায় না। যারা নেই, তারা অনেক সময় যারা আছে তাদের থেকেও বেশি জায়গা দখল করে রাখে। শিউলি কোনো শব্দ না করে ফিরে গেল। কিন্তু বিছানায় শুয়ে তার মনে হচ্ছিল, সে যেন নিজের জীবনেই ধীরে ধীরে অতিথি হয়ে যাচ্ছে।
পরদিন সকালে সে কিছুই জিজ্ঞেস করল না। বরং আরও বেশি স্বাভাবিক হয়ে উঠল। সাইফের জন্য চা বানাল, শার্ট আয়রন করে রাখল, নাস্তার প্লেটে ডিমটা সুন্দর করে সাজিয়ে দিল। কিন্তু এই যত্নের ভেতরে একটা ক্লান্তি ঢুকে গেছে। যেন সে প্রতিদিন নিজেকে মনে করিয়ে দিচ্ছে—“আমি বর্তমান। আমি বাস্তব। আমি এখনো এখানে আছি।” মানুষ যখন কাউকে হারানোর ভয় পায়, তখন সে অদ্ভুতভাবে আরও যত্নশীল হয়ে যায়। যেন ভালোবাসা দিয়ে ভাঙা জায়গাগুলো আটকানো যায়। সাইফ মাঝে মাঝে সেটা টের পায়। তাই তার অপরাধবোধ আরও বাড়ে। সে কখনো কখনো শিউলির দিকে তাকিয়ে ভাবে—এই মেয়েটা এত সহজভাবে তাকে ভালোবাসতে পারছে কীভাবে? আর সে কেন এত জটিল? কেন তার ভেতরে এখনও একটা মৃত মানুষের স্মৃতি বেঁচে আছে, এত স্পষ্টভাবে? এই প্রশ্নগুলো তাকে ধীরে ধীরে ক্লান্ত করে দিচ্ছিল।
আদিরার বদলটা হঠাৎ করে হয়নি। মানুষ আসলে একদিনে বদলায় না—ধীরে ধীরে বদলায়, নিজের অজান্তে, নিজের ভেতরের কোনো অন্ধকার বা শূন্য জায়গাকে লুকাতে লুকাতে বদলায়। প্রথমদিকে সে নিজেও বুঝতে পারেনি ঠিক কী হচ্ছে তার সঙ্গে। সাইফকে মেসেজ করা তার কাছে খুব স্বাভাবিক একটা ব্যাপার ছিল। “খেয়েছেন?” “আজ খুব বৃষ্টি…” “আপু এই গানটা অনেক শুনত…” এই ধরনের ছোট ছোট কথা। কিন্তু সমস্যা হলো—কিছু অনুভূতি খুব সাধারণ অভ্যাসের ভেতর জন্ম নেয়। এত নরমভাবে জন্ম নেয় যে মানুষ বুঝতেই পারে না, কখন সেটা মনের এক কোণ থেকে পুরো হৃদয়ের ভেতরে ছড়িয়ে পড়ে। আদিরার ক্ষেত্রেও ঠিক সেটাই হয়েছিল। সে প্রথমে শুধু কথা বলতে চাইত। তারপর অপেক্ষা করতে শুরু করল। সাইফ রিপ্লাই দিতে দেরি করলে তার খারাপ লাগত। রাতে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকত। “Last seen” দেখে বুকের ভেতর অদ্ভুত চাপা কষ্ট হতো। তারপর আবার নিজেকেই বকত—“এটা ভুল… এটা শুধু আপুর স্মৃতি…” কিন্তু অনুভূতি কখনো যুক্তির কথা শোনে না। বিশেষ করে সেই অনুভূতি যদি দীর্ঘদিনের নীরবতা থেকে জন্ম নেয়।
সেদিন বিকেলে যখন সাইফ ওদের বাসার সামনে দাঁড়াল, আদিরা পর্দার আড়াল থেকেই তাকে দেখে ফেলেছিল। সে প্রায় পাঁচ মিনিট দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে ছিল, নিজের শ্বাস ঠিক করার চেষ্টা করছিল। তার বুকের ভেতর তখন এত জোরে ধকধক করছিল যে মনে হচ্ছিল দরজার ওপাশ থেকেও শোনা যাবে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে তিনবার চুল ঠিক করেছে। লিপবাম লাগিয়ে আবার মুছে ফেলেছে। কারণ সে নিজেই ভয় পাচ্ছিল—সে কি সাজছে? কার জন্য? নিজের মৃত বোনের ভালোবাসার মানুষের সামনে দাঁড়ানোর আগে কেন তার হাত কাঁপছে? দরজা খোলার মুহূর্তে সে জোর করে স্বাভাবিক একটা হাসি আনল মুখে। “আপনি আসবেন, জানতাম,” বলার সময় তার গলার ভেতর শুকনো কাঁটার মতো কিছু আটকে ছিল। সাইফ হয়তো খেয়াল করেনি, কিন্তু আদিরা লক্ষ্য করেছিল—সে ভেতরে ঢোকার আগে একবার থেমে দেয়ালে টাঙানো আরিবার ছবিটার দিকে তাকিয়েছে। সেই এক সেকেন্ডের দৃষ্টিতে এত পুরোনো ভালোবাসা ছিল যে আদিরার বুক হঠাৎ টনটন করে উঠেছিল। কারণ সে বুঝল—সে যতই চেষ্টা করুক, এই মানুষটার ভেতরে এখনও আরিবা বেঁচে আছে। এবং সেই বেঁচে থাকা স্মৃতির মাঝখানে জায়গা বানাতে চাওয়াটা কতটা নিষ্ঠুর, সেটা বুঝেও সে নিজেকে থামাতে পারছে না।
ঘরের ভেতরটা আগের মতোই ছিল, কিন্তু তবুও যেন কিছু বদলে গেছে। বাতাসে পুরোনো পারফিউমের গন্ধের সঙ্গে এখন আরেকটা গন্ধ মিশে আছে—অপেক্ষার গন্ধ। সোফার পাশে রাখা ফুলদানিতে শুকিয়ে যাওয়া ফুল। দেয়ালে আরিবার হাসিমাখা ছবি। সেই হাসি আজও পুরো ঘরটাকে দখল করে আছে। সাইফ বসে পড়তেই আদিরা রান্নাঘরে চলে গেল চা বানাতে। কিন্তু চা বানানোর সময়ও তার হাত স্থির ছিল না। কাপ তুলতে গিয়ে একবার পড়ে যাচ্ছিল প্রায়। চামচের শব্দে সে নিজেই চমকে উঠছিল। তার মনে হচ্ছিল—আজ কিছু একটা বদলে যাবে। যদিও সে জানত না কী। চা নিয়ে ফিরে আসার সময় সে নিজের হাঁটার শব্দ পর্যন্ত শুনতে পাচ্ছিল। কাপটা সাইফের হাতে দিতে গিয়ে তার আঙুল ছুঁয়ে গেল। খুব সাধারণ একটা স্পর্শ। কয়েক সেকেন্ডেরও কম সময়। কিন্তু সেই মুহূর্তে আদিরার মনে হলো, কেউ যেন তার বুকের ভেতর জমে থাকা গোপন কথাগুলো হঠাৎ ছুঁয়ে ফেলেছে। সে ইচ্ছে করেই হাত সরাতে দেরি করেছিল কি না—এই প্রশ্নের উত্তর সে নিজেও জানত না। শুধু জানত, সেই এক সেকেন্ড তার পুরো শরীর কাঁপিয়ে দিয়েছিল। আর সাইফ? সে হয়তো খেয়ালই করেনি। অথবা খেয়াল করেও নিজের ভেতরে চেপে ফেলেছে। কারণ কিছু মানুষ সত্যি দেখেও না দেখার অভিনয় করে—নিজেদের বাঁচানোর জন্য।
“আপু আপনাকে খুব ভালোবাসত,” আদিরা যখন কথাটা বলল, তখন তার চোখ সাইফের মুখে ছিল না। সে কাপের ধোঁয়ার দিকে তাকিয়ে ছিল। যেন সরাসরি তাকালে নিজের ভেতরের সত্যিটা ধরা পড়ে যাবে। সাইফ চুপ করে ছিল। সেই চুপ থাকার ভেতরে এত ভার ছিল যে ঘরের বাতাস আরও ধীর হয়ে গেল। আদিরা আস্তে বলল, “আমি ছোট ছিলাম… কিন্তু বুঝতাম।” তার মাথার ভেতর তখন একটার পর একটা পুরোনো দৃশ্য ঘুরছিল। আরিবা বারান্দায় দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছে। হঠাৎ লজ্জা পেয়ে হাসছে। ডায়েরির ভেতর শুকনো ফুল লুকিয়ে রাখছে। আর সে—ছোট্ট আদিরা—দূর থেকে সব দেখছে। তখন সে বুঝত না ভালোবাসা কী। শুধু বুঝত, সাইফ নামের একটা মানুষ তার আপুকে অন্যরকম করে দেয়। কিন্তু আজ এত বছর পর সেই একই মানুষকে সামনে বসে থাকতে দেখে তার নিজের বুকেও সেই অদ্ভুত পরিবর্তন হচ্ছে। এটা কি বিশ্বাসঘাতকতা? নাকি একাকিত্ব? নাকি মানুষ আসলে ভালোবাসার গন্ধ চিনে ফেললে নিজেও অজান্তে তার দিকে হাঁটতে শুরু করে? “কখনো কখনো মনে হয়…” সে থেমে গেল। কারণ পরের কথাটা বলা মানে নিজের ভেতরের দরজা খুলে দেওয়া। “আপনার জায়গাটা খালি রয়ে গেছে।” কথাটা বের হওয়ার পরই তার বুক ধক করে উঠল। যেন সে নিজের কাছেই ধরা পড়ে গেছে। সাইফ ভ্রু কুঁচকে তাকাল। “মানে?” তার প্রশ্নটা খুব সাধারণ ছিল। কিন্তু আদিরার মনে হলো, এই একটা “মানে” শব্দের ভেতরেই বিচার লুকিয়ে আছে। তাই সে হেসে বলল, “কিছু না।” অথচ সেই “কিছু না”-এর ভেতরেই সবকিছু ছিল।
সেদিন রাতে আদিরা ঘুমাতে পারেনি। পুরো বাসা নিস্তব্ধ হয়ে যাওয়ার পরও সে টেবিল ল্যাম্প জ্বালিয়ে বসে ছিল। সামনে পুরোনো অ্যালবাম খোলা। ছবিগুলোর ওপর ধুলো জমে গেছে। কিন্তু একটা ছবিতে এসে তার হাত থেমে গেল। আরিবা আর সাইফ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। দুজনেই হাসছে। সেই হাসিতে ভবিষ্যৎ ছিল। পরিকল্পনা ছিল। বেঁচে থাকার নিশ্চিন্ত বিশ্বাস ছিল। আদিরা ছবিটার ওপর আঙুল বুলাতে লাগল। খুব ধীরে। যেন ছুঁলেই ছবির ভেতরের মানুষগুলো নড়ে উঠবে। তার বুকের ভেতর তখন অদ্ভুত এক অপরাধবোধ জমছে। কারণ সে জানে—এই জায়গাটার দিকে তাকানো তার উচিত না। মৃত মানুষের স্মৃতির ওপর দাঁড়িয়ে নিজের অনুভূতি তৈরি করা নিষ্ঠুর। তবুও সে পারছে না। মানুষ সবসময় নৈতিকতার ভেতরে বাঁচে না। কিছু অনুভূতি এত গভীর হয় যে মানুষ নিজেকেই ঘৃণা করতে করতে সেটা অনুভব করে যায়। আদিরা খুব আস্তে বলল, “ও জায়গাটা তো তোমার ছিল আপু…” কথাটা বলেই তার চোখ জ্বালা করে উঠল। তারপর আরও নিচু গলায় বলল, “কিন্তু তুমি তো নাই…” এই “নাই” শব্দটার ভেতর এত শূন্যতা ছিল যে সে নিজেই কেঁপে উঠল। কারণ এই প্রথম সে নিজের মনের গোপন কথাটাকে শব্দ দিল। আর শব্দে চলে এলে অনুভূতিগুলো আর পুরোপুরি নিরাপদ থাকে না।
এরপর থেকেই তার বদলটা স্পষ্ট হতে শুরু করল। খুব সূক্ষ্মভাবে। এত সূক্ষ্ম যে বাইরে থেকে কেউ বুঝবে না, কিন্তু ভেতরে ভেতরে সব বদলে যাচ্ছে। সে এখন সাইফের পছন্দের রং পরে। আগে যেসব গান শুনত না, এখন সেগুলো চালায় শুধু কারণ আরিবা শুনত। রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে চা বানানোর সময় মনে রাখে—চিনি কম। সাইফ আসবে শুনলেই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে যায়। আবার নিজেকেই বোঝায়—“আমি শুধু ঠিকঠাক থাকতে চাই।” কিন্তু সে জানে, এটা শুধু ঠিকঠাক থাকার চেষ্টা না। এটা নজরে পড়ার চেষ্টা। একদিন সে শিউলির সামনে খুব স্বাভাবিক গলায় বলে ফেলল, “আপু বলত, সাইফ ভাই চায়ে চিনি কম খায়।” মুহূর্তটা খুব ছোট ছিল। কিন্তু সেই ছোট মুহূর্তের ভেতরে একটা ধারালো অস্বস্তি লুকিয়ে ছিল। শিউলি থেমে গেল। কারণ সে সত্যিই জানত না এই ছোট্ট তথ্যটা। অথচ অন্য একটা মেয়ে জানে। এমন একটা মেয়ে, যার সঙ্গে সাইফের অতীত জড়িয়ে আছে। সাইফ একটু অপ্রস্তুত হয়ে হেসে বলল, “অনেক পুরোনো কথা মনে রাখছো দেখতেছি।” আদিরা তার দিকে তাকিয়ে বলল, “সবাই তো ভুলে যায় না।” কথাটা খুব আস্তে বলা হয়েছিল। কিন্তু সেটা যেন সরাসরি গিয়ে শিউলির বুকের ভেতর বসে গেল।
শিউলি সেই রাতেই প্রথমবার আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে অন্যভাবে দেখল। তার শরীর বদলাচ্ছে। চোখের নিচে হালকা ক্লান্তি। ঘুম কম হচ্ছে। পেটের ভেতরে একটা নতুন জীবন ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে। কিন্তু সেই নতুন জীবনের মাঝেও তার মনে হচ্ছে—সে কি এখনও কারও অতীতের সঙ্গে যুদ্ধ করছে? সে কি এমন একটা জায়গা ধরে রাখতে চাইছে, যেটা কখনো পুরোপুরি তার ছিল না? আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে তার মনে হলো, মানুষের সবচেয়ে বড় ভয় হারানো না—বরং কখনো পুরোপুরি পাওয়া না। সাইফ তাকে ছুঁয়ে থাকে, তার পাশে ঘুমায়, তার সন্তানের বাবা হতে চলেছে। তবুও কোথাও একটা দূরত্ব রয়ে গেছে। আর আজ সেই দূরত্বের ওপাশে সে আরেকজন মেয়ের ছায়া দেখতে পাচ্ছে। আদিরা। যে কিছু বলেনি, কিন্তু যার চোখে অদ্ভুত এক নীরব দাবি জমে উঠছে। শিউলির বুকের ভেতর ঠান্ডা একটা ভয় নামল। কারণ সে হঠাৎ বুঝল—ভালোবাসার সবচেয়ে ভয়ংকর প্রতিদ্বন্দ্বী সবসময় অন্য কোনো সম্পর্ক না। কখনো কখনো সেটা হয় স্মৃতি। আর স্মৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা অসম্ভব প্রায়।
সেই রাত গভীর হলে সাইফ ঘুমিয়ে পড়েছিল। তার শ্বাস ধীর। মুখে ক্লান্তি। শিউলি অনেকক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। মানুষ ঘুমিয়ে গেলে খুব অসহায় লাগে। তখন তারা কোনো মুখোশ পরে না। কোনো অভিনয় থাকে না। শুধু সত্যিটা থেকে যায়। শিউলির মনে হচ্ছিল—এই মানুষটা এখনও কোথাও হারিয়ে আছে। হয়তো তার পাশে শুয়ে থেকেও পুরোপুরি এখানে নেই। সে খুব আস্তে ফিসফিস করে বলল, “তুমি কি এখনও ওকেই ভালোবাসো?” প্রশ্নটা এত নিচু গলায় বলা হয়েছিল যে বাতাসও হয়তো পুরো শুনতে পায়নি। সাইফ নড়ল না। ঘুমের ভান করল কি না, বোঝা গেল না। কিন্তু উত্তরও দিল না। আর সেই না-দেওয়া উত্তরটাই শিউলির বুকের ভেতর আরও ভারী হয়ে বসে রইল। কারণ কখনো কখনো নীরবতাই সবচেয়ে স্পষ্ট উত্তর।
বিকেলের আলোটা সেদিন শহরের গায়ে খুব ধীরে ধীরে মরছিল। কাঁচের বিল্ডিংগুলোর জানালায় শেষ রোদের কমলা রঙ এমনভাবে আটকে ছিল, যেন দিনের শরীর থেকে কেউ একটু একটু করে উষ্ণতা খুলে নিচ্ছে। অফিসের লিফট থেকে বের হওয়ার সময় রাফির মনে হচ্ছিল, সে যেন একটা বড় অ্যাকুয়ারিয়ামের ভেতর হাঁটছে—চারপাশে মানুষ আছে, শব্দ আছে, কিন্তু সবকিছু কেমন পানির নিচের মতো দূরের আর বিকৃত। তার হাতে ফাইল ছিল, কাঁধে ব্যাগ, মুখে সেই বহুদিনের অভ্যাস করা স্বাভাবিক ভাব। কিন্তু ভেতরে সে ক্লান্ত। শুধু ক্লান্ত না—ভাঙা। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সে ঠিকমতো ঘুমাতে পারছে না। রাতের অন্ধকারে কখনো হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায়, তখন মনে হয় কেউ তার বুকের ওপর বসে আছে। পাশে নীলা ঘুমিয়ে থাকে, শুভ্র মায়ের গা জড়িয়ে শুয়ে থাকে, আর সেই দৃশ্য দেখে তার ভেতরে আরও বেশি ভয় জমে। কারণ মানুষ যখন কিছু হারানোর মতো জিনিস পায়, তখনই সে সত্যিকার অর্থে ভয় পাওয়া শুরু করে। আগে তার হারানোর কিছু ছিল না—একটা ব্যর্থ জীবন, বেকার দিন, সস্তা সিগারেটের ধোঁয়া আর কিছু নষ্ট রাত। এখন আছে একটা পরিবার। একটা ছোট্ট ছেলে, যে তাকে “আব্বু” বলে ডাকলে তার বুকের ভেতর নরম কিছু গলে যায়। আর সেই কারণেই রকির প্রতিটা ফোনকল এখন তার কাছে শুধু হুমকি না—মৃত্যুর মতো।
অফিসের ভেতরে বসেও সে শান্তি পায় না। ফোনটা সাইলেন্টে রাখলেও বারবার স্ক্রিনের দিকে তাকায়। কোনো অচেনা নম্বর দেখলেই বুক ধক করে ওঠে। সহকর্মীরা যখন পাশের ডেস্কে বসে হাসে, ক্রিকেট নিয়ে তর্ক করে, কিংবা নতুন সিনেমার কথা বলে, রাফি তখন মাঝে মাঝে জোর করে হেসে ওঠে। কিন্তু নিজের হাসিটা তার কাছে অদ্ভুত লাগে। যেন সেটা তার মুখে লাগানো অন্য কারও মুখোশ। একদিন মিটিং চলার সময় ফোনটা কেঁপে উঠেছিল। স্ক্রিনে শুধু একটা নম্বর। নাম নেই। কিন্তু সে বুঝেছিল। তার হাত ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল সঙ্গে সঙ্গে। ম্যানেজার তখন প্রজেক্টরের সামনে দাঁড়িয়ে বলছিলেন, “ব্যাংকের ভেতরের তথ্য বাইরে যাওয়া মানে শুধু চাকরি শেষ না… ক্যারিয়ার শেষ।” “শেষ” শব্দটা কানে যেতেই তার মাথার ভেতর রকির কণ্ঠ ভেসে উঠেছিল—“তোর বউ জানলে কেমন নেয়?” সেই মুহূর্তে তার মনে হয়েছিল, অফিসের সবাই যেন তার দিকে তাকিয়ে আছে। সবাই জানে। সবাই বুঝে ফেলেছে। অথচ বাস্তবে কেউ কিছুই জানত না। মানুষ অনেক সময় নিজের অপরাধবোধের ভেতর এমনভাবে ডুবে যায়, যে পৃথিবীর প্রতিটা নির্দোষ চোখকেও বিচারকের চোখ মনে হয়।
সেদিন অফিস থেকে বের হওয়ার সময় আকাশে আলো কমে আসছিল। ফুটপাথে লোকজনের ভিড়, রিকশার ঘণ্টি, বাসের কালো ধোঁয়া, ভাজা বাদামের গন্ধ—সবকিছু আগের মতোই ছিল। তবুও রাফির মনে হচ্ছিল, আজ শহরটা তাকে অন্যভাবে দেখছে। সে দু-তিনবার পেছনে তাকাল। কেউ কি অনুসরণ করছে? একটা সাদা মাইক্রোবাস রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল, একজন লোক ফোনে কথা বলছিল, আরেকজন সিগারেট ধরাচ্ছিল। সব সাধারণ। তবুও তার বুকের ভেতর অস্বস্তিটা কমল না। ঠিক তখনই সে লোকটাকে দেখল। কালো শার্ট। মুখে হালকা দাড়ি। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে আছে। প্রথমে চিনতে পারেনি। বরং পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিল। তারপর লোকটা বলল, “কেমন আছো?” কণ্ঠটা শুনেই রাফির পায়ের নিচে যেন মাটি একটু সরে গেল। বাপ্পি। অনেক বছর পর। কিন্তু এই মানুষটা আগের সেই বাপ্পি না। আগে তার চোখে আগুন ছিল, রাগ ছিল, একধরনের বেপরোয়া ক্ষুধা ছিল। এখন চোখদুটো শান্ত। ভয়ংকর শান্ত। যেন অনেক কান্না, অনেক রক্ত, অনেক রাত পেরিয়ে মানুষটা এমন এক জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে আর চিৎকার করার শক্তিও নেই। আর ঠিক সেই কারণেই তাকে আরও বিপজ্জনক লাগছিল। কারণ রাগী মানুষকে বোঝা যায়। কিন্তু যে মানুষ চুপচাপ সিদ্ধান্ত নেয়, তাকে বোঝা যায় না।
বাপ্পি খুব সাধারণ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে ছিল। যেন বহুদিন পর কোনো পুরোনো বন্ধুর সাথে দেখা হয়েছে। কিন্তু তার চোখের ভেতরে এমন কিছু ছিল, যেটা রাফিকে স্থির থাকতে দিচ্ছিল না। “তোমার সাথে একটু কথা ছিল,” সে বলল। রাফি চারপাশে তাকাল। অফিসের গ্লাস ডোর। নিরাপত্তারক্ষী। সহকর্মীরা কেউ বের হচ্ছে কি না। তার গলা শুকিয়ে গিয়েছিল। “এখানে?” সে জিজ্ঞেস করল। বাপ্পি মাথা নেড়ে শুধু বলল, “চলো।” কোনো তাড়া নেই। কোনো নাটকীয়তা নেই। এই স্বাভাবিকতাই আরও ভয়ংকর। কারণ ভয় সবসময় চিৎকার করে আসে না, কখনো কখনো খুব শান্ত গলায় বলে—“চলো।” দুজন হাঁটতে শুরু করল। রাস্তার শব্দ তাদের চারপাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছিল। একসময় একটা পুরনো চায়ের দোকানের সামনে এসে থামল তারা। টিনের চাল। ভাঙা বেঞ্চ। দেয়ালে পুরনো পোস্টারের ছেঁড়া অংশ। একটা ফ্যান ঘুরছে, কিন্তু বাতাসের চেয়ে শব্দ বেশি করছে। দোকানের ভেতরে চায়ের সঙ্গে দুধ পোড়ার গন্ধ মিশে আছে। সেই গন্ধটা রাফির কাছে অদ্ভুতভাবে পরিচিত লাগল। যেন বহুদিন আগের কোনো নষ্ট সন্ধ্যা ফিরে এসেছে।
দুজন মুখোমুখি বসল। দোকানদার চা দিয়ে গেল। ধোঁয়া উঠছিল কাপ থেকে। কিন্তু কেউ হাত দিল না। কিছুক্ষণ শুধু শব্দ ছিল—রেডিওতে পুরনো গান, দূরে বাসের হর্ন, ফ্যানের কর্কশ ঘর্ষণ। তারপর বাপ্পি খুব আস্তে বলল, “রকিরে নামাইতে হইবো।” কথাটা এত শান্তভাবে বলা হয়েছিল যে প্রথম কয়েক সেকেন্ড রাফি বুঝতেই পারেনি। তারপর হঠাৎ তার বুকের ভেতর কিছু শক্ত হয়ে গেল। “আমি পারুম না,” সে সঙ্গে সঙ্গে বলে ফেলল। এত দ্রুত উত্তর দেওয়া আসলে সাহস না—ভয়। যে মানুষ ভেতরে ভেতরে ভয় পায়, সে প্রশ্ন শেষ হওয়ার আগেই না বলে দেয়। বাপ্পি তাকিয়ে রইল তার দিকে। চোখ সরাল না। “শুনে তো নাও,” সে বলল। রাফি এবার নিচু গলায় বলল, “আমি আর ওইসবের মধ্যে নাই।” তার কণ্ঠে রাগ ছিল না। বরং ক্লান্তি। এমন ক্লান্তি, যেটা বহুদিন ধরে নিজেকে স্বাভাবিক প্রমাণ করতে করতে আসে। বাপ্পি ধীরে মাথা নাড়ল। তারপর বলল, “কিন্তু ও এখনো তোর মধ্যে আছে।” কথাটা এসে সোজা বসল রাফির বুকের ওপর। কারণ সে জানে—এটা মিথ্যে না।
কিছু অতীত মানুষকে ছেড়ে যায় না। মানুষ শুধু শার্ট পাল্টায়, ঠিকানা বদলায়, চাকরি পায়, সংসার করে—কিন্তু অতীত ভেতরে কোথাও বসে থাকে। মাঝে মাঝে নিঃশ্বাস নেয়। মাঝে মাঝে শুধু নাম ধরে ডাকে। বাপ্পি সামনে একটু ঝুঁকল। তার চোখে ক্লান্তি ছিল, কিন্তু সেই ক্লান্তির ভেতর একটা স্থির সিদ্ধান্তও ছিল। “ও ব্যাংকের ভেতরে ঢুকতে চায়,” সে বলল। “তোরে ব্যবহার করবো। তারপর শেষ হইলে ফালাইয়া দিবো।” রাফির বুক কেঁপে উঠল। কারণ সে রকিকে চেনে। খুব কাছ থেকে চেনে। রকি কখনো কাউকে বন্ধু ভাবে না। শুধু দরকারি মানুষ ভাবে। দরকার শেষ, মানুষ শেষ। “পুলিশের হাতে ধরাইতে হইবো,” বাপ্পি বলল। “আমার কাছে কিছু তথ্য আছে। কিন্তু ব্যাংকের ভেতরের জিনিস লাগবো।” ব্যাংক। ম্যানেজমেন্ট। চাকরি। এই তিনটা শব্দ একসাথে এসে রাফির মাথার ভেতর এমনভাবে ঘুরতে লাগল, যেন কেউ হাতুড়ি মারছে। সে কল্পনা করল—ম্যানেজারের রুম। ফাইল। প্রশ্ন। “আপনি আগে এসবের সাথে জড়িত ছিলেন?” সে কল্পনা করল সহকর্মীদের চোখ। ফিসফাস। দূরত্ব। তারপর নীলার মুখ। শুভ্রের কলেজ। মানুষের কথা। “ওই লোকটা নাকি…” তার বুকের ভেতর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল ধীরে ধীরে।
চায়ের দোকানের ভেতর তখন অদ্ভুত এক ভারী নীরবতা ঝুলে ছিল। উপরের পুরনো ফ্যানটা ঘুরছিল ঠিকই, কিন্তু বাতাসের চেয়ে শব্দই বেশি দিচ্ছিল—ঘড়ঘড়, ঘড়ঘড়—যেন কোনো ক্লান্ত যন্ত্র শেষ শক্তিটুকু দিয়ে টিকে আছে। রাস্তার পাশ দিয়ে গাড়ি যাচ্ছে, রিকশার ঘণ্টা বাজছে, দূরে কোথাও একটা বাচ্চা কাঁদছে, কিন্তু এই সব শব্দ যেন দোকানের ভেতরে ঢুকতে পারছিল না। এখানে সময় অন্যরকম হয়ে গেছে। ধীর। ভারী। আটকে থাকা। রাফি কাপের দিকে তাকিয়ে ছিল। চায়ের ওপরে পাতলা সর জমেছে। এতক্ষণে ধোঁয়াও নেই। ঠিক তার জীবনের মতো—একসময় গরম ছিল, চলছিল, এখন শুধু জমে থাকা একটা স্তর। “যদি কিছু হয়?” সে খুব আস্তে জিজ্ঞেস করল। গলার স্বর এমন ছিল যেন শব্দটা মুখ থেকে বের হওয়ার আগেই ভেঙে যাচ্ছে। এই “কিছু” শব্দটার ভেতরে অনেকগুলো ভয় একসাথে জড়ানো ছিল। চাকরি চলে যাওয়া। ব্যাংকের ম্যানেজমেন্টের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের অতীতের ব্যাখ্যা দিতে না পারা। সহকর্মীদের চোখে বদলে যাওয়া দৃষ্টি। নীলার মুখে সেই নীরব হতাশা দেখা। শুভ্র বড় হয়ে একদিন শুনছে—তার বাবা “ওইসব” করত। একটা ছোট্ট পরিবার, যেটা সে এত কষ্ট করে গড়েছে, সেটা ভেঙে ধুলো হয়ে যাওয়া। সে কল্পনা করল—বাসার দরজার সামনে দুজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। নিচু গলায় প্রতিবেশীরা কথা বলছে। কেউ বলছে, “লোকটা নাকি ক্রিমিনালদের সাথে জড়িত আছিল…” তার বুকের ভেতর ধীরে ধীরে ঠান্ডা ভয় জমে উঠল।
বাপ্পি সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না। সে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল। সেই চুপ থাকার ভেতরেও অদ্ভুত ক্লান্তি ছিল। তারপর খুব শান্ত গলায় বলল, “হবেই।” একটা মাত্র শব্দ। কিন্তু সেই শব্দের ভেতরে এমন নির্মম সত্যি ছিল যে রাফির মনে হলো কেউ তার বুকের মাঝখানে পাথর বসিয়ে দিয়েছে। বাপ্পি এবার জানালার বাইরে তাকাল। রাস্তার আলো জ্বলেছে। ধুলো উড়ছে। কয়েকটা কুকুর রাস্তার পাশে ঘুরছে। শহর নিজের মতো চলেই যাচ্ছে। যেন কারও ভয়, কারও ভেঙে পড়া, কারও অতীত—এসবের কোনো দাম নেই। “কিন্তু না করলে আরও খারাপ হবে,” বাপ্পি বলল। তার চোখের নিচে কালি। মুখে বয়সের চেয়ে বেশি ক্লান্তি। এই ক্লান্তি শুধু জেল খাটার না। মানুষ মরে যেতে দেখার ক্লান্তি। ভুল মানুষকে বিশ্বাস করার ক্লান্তি। নিজের জীবনকে বারবার নোংরা অন্ধকারে ডুবে যেতে দেখার ক্লান্তি। “রকি আগে পাড়ার মাস্তানি করত,” সে ধীরে বলল। “এখন টাকার গন্ধ পাইছে। ব্যাংকের ভেতর ঢুকতে পারলে আর থামবো না।” রাফির বুক ধক করে উঠল। কারণ সে জানে—রকি যখন কোনো কিছু চায়, তখন সেটা শুধু “চাওয়া” থাকে না। সেটা আস্তে আস্তে মানুষের ঘাড়ে বসে যায়। নিঃশ্বাসের ভেতর ঢুকে পড়ে। ঘুমের মধ্যে ঢুকে পড়ে।
রাফি মাথা নিচু করে বসে রইল। তার মনে হচ্ছিল সে অসম্ভব ক্লান্ত। এমন ক্লান্তি, যেটা ঘুমিয়ে কাটে না। সে মনে করার চেষ্টা করল—শেষ কবে সে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছে? শেষ কবে রাতে ঘুমানোর আগে বুকের ভেতর ভয় ছিল না? হয়তো শুভ্র জন্মানোর আগে। হয়তো চাকরি পাওয়ার আগের কোনো সন্ধ্যায়, যখন জীবন এত জটিল হয়নি। একসময় তার স্বপ্ন খুব ছোট ছিল। সত্যি খুব ছোট। একটা স্থায়ী চাকরি। মাস শেষে নিয়মিত বেতন। নীলাকে নিয়ে ছোট্ট একটা ফ্ল্যাটে থাকা। শুক্রবারে বাজার করা। শুভ্রকে কলেজে নামিয়ে দিয়ে অফিসে যাওয়া। রাতে ফিরে দরজা খুলতেই রান্নার গন্ধ পাওয়া। এত সাধারণ, এত ছোট একটা জীবন। অথচ সেই জীবনটাকেই এখন তার কাছে অসম্ভব দূরের মনে হচ্ছে। মানুষ ভাবে বড় স্বপ্ন ভাঙলে কষ্ট বেশি হয়। আসলে সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয় ছোট স্বপ্ন ভাঙলে। কারণ মানুষ বিশ্বাস করে—অন্তত এতটুকু তো পাওয়ার কথা ছিল। রাফির চোখের সামনে হঠাৎ একটা দৃশ্য ভেসে উঠল। শুভ্র ডাইনিং টেবিলে বসে আঁকছে। নীলা রান্নাঘর থেকে বলছে, “খাবার ঠান্ডা হইতেছে।” আর সে হাসতে হাসতে বলছে, “আসতেছি।” এই দৃশ্যটা এত সাধারণ, এত ছোট—তবুও সে বুঝল, সে এই সাধারণ জিনিসটাকেই হারানোর ভয় পাচ্ছে সবচেয়ে বেশি।
বাপ্পি অনেকক্ষণ চুপ করে ছিল। তারপর খুব আস্তে বলল, “তুই জানোস, জেল থেকে বাইর হওয়ার পর মমতা আপা আমারে কী বলছিল?” রাফি তাকাল না। তার মাথা এখনও নিচু। “বলছিল—আর রক্ত না।” বাপ্পি হালকা হাসল। কিন্তু সেই হাসিতে কোনো আনন্দ ছিল না। সেটা এমন হাসি, যেটা মানুষ কাঁদতে কাঁদতে ক্লান্ত হয়ে গেলে মুখে আসে। “আমি চেষ্টা করছিলাম,” সে বলল। “সত্যি।” কিছুক্ষণ সে বাইরে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব ধীরে বলল, “কিন্তু কিছু মানুষ বাঁচে অন্য মানুষরে শেষ করতে করতে। রকি ওই রকম।” কথাটা বলার সময় তার চোখে ভয় ছিল না। বরং নিশ্চিত একটা ক্লান্ত সত্যি ছিল। যেন সে অনেক আগেই মেনে নিয়েছে—কিছু মানুষকে বদলানো যায় না। রাফির গলা শুকিয়ে গেল। সে বুঝতে পারছিল না কী করবে। ভয় একদিকে টানছে। অপরাধবোধ অন্যদিকে। আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে তার পরিবার। তার মনে হচ্ছিল—সে যেন দুই দিক থেকে টানা একটা দড়ি, যেটা যে কোনো সময় ছিঁড়ে যাবে। সে জানে, রকিকে যদি এখন থামানো না যায়, তাহলে একদিন সেই আগুন তার নিজের ঘরেও পৌঁছাবে। শুভ্রের ঘুমন্ত মুখের কাছে। নীলার শান্ত চোখের ভেতরে। তাদের ছোট্ট নিরাপদ ডাইনিং টেবিলের ওপর। হয়তো কোনোদিন রাতের বেলা দরজায় কড়া নাড়বে পুলিশ। হয়তো কোনোদিন শুভ্র কলেজে গিয়ে শুনবে—“তোর বাবা খারাপ লোক আছিল।” এই কল্পনাগুলো এত স্পষ্ট হয়ে উঠল যে তার বুক ব্যথা করতে শুরু করল।
সে হঠাৎ মনে করতে লাগল সেই সময়টার কথা, যখন সে প্রথম রকির সঙ্গে জড়িয়েছিল। বেকারত্ব মানুষকে শুধু দরিদ্র করে না, ভেতর থেকেও খেয়ে ফেলে। প্রতিটা ইন্টারভিউ থেকে ফিরে এসে সে নিজেকে আয়নায় দেখতে পারত না। নীলার বাবার চোখের ভেতরে হতাশা দেখত। আত্মীয়দের কথা শুনত—“ছেলেটা কিছু করতে পারতেছে না?” সেই সময় রকি তার সামনে একটা “সহজ রাস্তা” খুলে দিয়েছিল। “একটু নে, মাথা হালকা হইবো।” প্রথমদিন রাফি না বলেছিল। দ্বিতীয়দিনও। কিন্তু তৃতীয়দিন? মানুষ সবসময় খারাপ হতে চায় না। কখনো কখনো শুধু একটু শান্তি চায়। আর সেই শান্তির দরজা দিয়েই অন্ধকার ঢুকে পড়ে। সে মনে করতে পারল—রাতের গলি। সিগারেটের ধোঁয়া। রকির ধীর হাসি। মাথার ভেতরের চাপ কয়েক ঘণ্টার জন্য হালকা হয়ে যাওয়া। তারপর ধীরে ধীরে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানো। সে কাঁপতে লাগল। কারণ এতদিন পর সে বুঝছে—রকি শুধু তাকে নেশা দেয়নি। তাকে নিজের ভেতর দুর্বল করে ফেলেছিল। যেন দরকার পড়লে ব্যবহার করতে পারে।
বাপ্পি উঠে দাঁড়াল ধীরে। চায়ের কাপ তখন পুরো ঠান্ডা। দোকানের টেবিলে ছোট ছোট পানির দাগ। “ভাবো,” সে বলল। “কিন্তু বেশি দেরি কইরো না।” তার গলার ভেতর কোনো চাপ ছিল না। বরং অদ্ভুত শান্তি। এই শান্তিটাই ভয়ঙ্কর। কারণ বাপ্পি এমনভাবে কথা বলছে যেন সে আগেই বুঝে গেছে—রাফি শেষ পর্যন্ত এই লড়াই থেকে পালাতে পারবে না। বাপ্পি টাকা মিটিয়ে বাইরে বের হয়ে গেল। রাস্তার আলো তার মুখে পড়ে আবার সরে গেল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সে ভিড়ের মধ্যে মিশে গেল। যেন ছিলই না কখনো। কিন্তু তার কথাগুলো রয়ে গেল। “রকিরে নামাইতে হইবো।” শব্দগুলো দোকানের টিনের চালের নিচে আটকে রইল। রাফির মনে হচ্ছিল, সে একা না। তার পাশে এখন ভয় বসে আছে। অপরাধবোধ বসে আছে। আর একটা অদৃশ্য সময়সীমা বসে আছে।
সে ধীরে ফোন বের করল। স্ক্রিন জ্বলে উঠল। নীলার মেসেজ—“কখন আসবা?” খুব ছোট্ট একটা প্রশ্ন। কিন্তু এই ছোট্ট প্রশ্নের ভেতরেই তার পুরো জীবন দাঁড়িয়ে আছে। এই একটা মেসেজের ভেতরে বাসার গন্ধ আছে। শুভ্রের হাসি আছে। রাতের খাবারের টেবিল আছে। নীলার অপেক্ষা আছে। সে অনেকক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখ ঝাপসা হয়ে আসছিল। সে কল্পনা করল—নীলা এখন হয়তো রান্নাঘরে। ভাত নামাচ্ছে। মাঝে মাঝে দরজার দিকে তাকাচ্ছে। শুভ্র হয়তো খেলতে খেলতে জিজ্ঞেস করছে, “আব্বু আইবো কবে?” এই ছোট ছোট দৃশ্যগুলোই তাকে ভেঙে দিচ্ছিল। কারণ সে জানে—সে শুধু নিজের জন্য ভয় পাচ্ছে না। সে ভয় পাচ্ছে তাদের জন্য। মানুষ যখন একা থাকে, তখন ধ্বংস হওয়া সহজ। কিন্তু পরিবার থাকলে ভয় অনেক গভীর হয়। কারণ তখন নিজের পতনের সঙ্গে অন্যদেরও ডুবিয়ে দেওয়ার ভয় থাকে।
দূরে আজানের শব্দ ভেসে এলো। সন্ধ্যার বাতাসে ধুলো উড়ল। দোকানের সামনে একটা রিকশা থামল আবার চলে গেল। জীবন থামেনি। কিন্তু রাফির মনে হচ্ছিল—তার ভেতরে কিছু থেমে গেছে। সে হঠাৎ বুঝতে পারল, মানুষের জীবন সবসময় বড় বড় সিদ্ধান্তে বদলায় না। কখনো কখনো একটা ফোনকল, একটা পুরনো নাম, একটা চায়ের দোকান—এসবই মানুষকে আবার সেই অন্ধকারের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়, যেখান থেকে সে ভেবেছিল অনেক দূরে চলে এসেছে। সে চোখ বন্ধ করল। আর চোখ বন্ধ করতেই একটার পর একটা মুখ ভেসে উঠল। নীলার মুখ। শুভ্রের ঘুমন্ত মুখ। বাপ্পির ক্লান্ত চোখ। আর রকির ধীর হাসি। সে বুঝল—এটা শুধু পুলিশে খবর দেওয়ার ব্যাপার না। এটা তার অতীতের সঙ্গে শেষবারের মতো মুখোমুখি হওয়ার সময়। আর সে ভয় পাচ্ছে। অসম্ভব ভয় পাচ্ছে। কারণ মানুষ যতই পালাক, কিছু লড়াই শেষ পর্যন্ত তার দরজায় এসে দাঁড়ায়। আর তখন আর লুকানোর জায়গা থাকে না।
(চলবে...)