২টি ছাদ ও কয়েকটি বিকেল... - অধ্যায় ৮
পর্ব ৮
ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি জেলের ভেতরে ঢোকেনি। উঁচু দেয়াল আর কাঁটাতারের ঘেরাটোপের কারণে সূর্যের আলো এখানে পৌঁছাতে দেরি হয়। বাইরে হয়তো শহর ধীরে ধীরে জেগে উঠছে—মানুষ ঘুম থেকে উঠছে, রাস্তায় রিকশা নামছে, দোকানের শাটার ওপরে উঠছে, কোনো এক চায়ের দোকানে কেটলি চাপানো হয়েছে, আর সেই ফুটন্ত পানির সঙ্গে মিশে উঠছে আদা আর চায়ের পাতা। কিন্তু জেলের ভেতরে সকালটা শুরু হয় একেবারেই অন্যরকমভাবে—এখানে দিনের শুরুটা মানুষের ইচ্ছায় নয়, নিয়মে বাঁধা।
হঠাৎ করেই লোহার দরজায় লাঠি দিয়ে ঠকঠক করে আঘাত করল একজন গার্ড। শব্দটা ধাতব দেয়ালে প্রতিধ্বনির মতো ছড়িয়ে পড়ল, যেন পুরো কারাগারের ভেতর ঘুরে বেড়াচ্ছে।
“উঠো! উঠো! সবাই উঠো!”
সেই শব্দেই বাপ্পির ঘুম ভাঙল। তবে সত্যি বলতে গেলে, তার ঘুম আসলে খুব গভীর ছিল না। সারারাত সে আধোঘুমে কাটিয়েছে। মাঝরাতে কয়েকবার ঘুম ভেঙে গেছে। কখনো মনে হয়েছে কেউ যেন তার নাম ধরে ডাকছে। কখনো মনে হয়েছে সে আবার সেই রাতটায় ফিরে গেছে—অন্ধকার গলি, উত্তেজিত কণ্ঠস্বর, ধস্তাধস্তি, আর এক মুহূর্তের মধ্যে সবকিছু বদলে যাওয়া। চোখ খুলতেই সে কয়েক সেকেন্ড বুঝতেই পারল না সে কোথায়। মাথার ভেতর যেন একটা কুয়াশা। তারপর ধীরে ধীরে বাস্তবটা ফিরে এল—সে জেলের ভেতরে।
মেঝেতে পাতলা একটা কম্বলের ওপর শুয়ে ছিল সে। উঠে বসতেই ঠান্ডা সিমেন্টের স্পর্শ তার শরীরের ভেতর দিয়ে একধরনের শীতলতা ছড়িয়ে দিল। এই ঠান্ডাটা শুধু শরীরে নয়, যেন মনেও এসে লাগছে। সেলের ভেতরে আরও চারজন বন্দি আছে। কেউ উঠে বসছে, কেউ হাত পা টানছে, কেউ ঘুমজড়ানো চোখে চারদিকে তাকাচ্ছে। জেলের সকালটা যেন ধীরে ধীরে একটা যন্ত্রের মতো চালু হচ্ছে।
এক কোণায় বসে থাকা একটা বুড়ো মানুষ চুপচাপ বাপ্পির দিকে তাকিয়ে ছিল। লোকটার চুল প্রায় পুরো সাদা, চোখে অদ্ভুত শান্ত একটা দৃষ্টি। সেই দৃষ্টিটা এমন, যেন সে জীবনে অনেক কিছু দেখে ফেলেছে—এতটাই যে আর অবাক হওয়ার কিছু নেই।
বাপ্পি মাথা নিচু করে বসে রইল। তার মনে হচ্ছিল সে যেন নিজের শরীরের ভেতরেও পুরোপুরি নেই। যেন দূর থেকে নিজেকে দেখছে—একটা ছেলে, যার চারপাশে এখন লোহার শিক আর পুরু দেয়াল ছাড়া আর কিছু নেই। সেলের বাইরে দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় গার্ড আবার বলল, “তারাতারি কর। নাস্তার সময়।”
লোকজন ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াতে লাগল। বাপ্পিও দাঁড়াল, কিন্তু তার পা যেন ভারী হয়ে আছে। সে কখনো ভাবেনি তার জীবন একদিন এখানে এসে দাঁড়াবে। একসময় যে গলিগুলোতে সে হাঁটত, যেসব মানুষের সঙ্গে প্রতিদিন দেখা হতো—সবকিছু যেন অন্য একটা পৃথিবীর অংশ হয়ে গেছে। কিছুক্ষণ পর সেই বুড়ো মানুষটা ধীরে ধীরে এসে তার পাশে বসে পড়ল।- “নতুন?”
বাপ্পি একটু তাকাল। তারপর খুব ছোট করে বলল, “হুম।”
লোকটা মাথা নাড়ল। তার গলায় কোনো বিস্ময় নেই, যেন এটা খুব স্বাভাবিক একটা প্রশ্ন।- “প্রথম কয়দিন এমনই লাগে। মনে হবে পৃথিবী শেষ হয়ে গেছে। পরে দেখবি মানুষ সবকিছুর সাথেই মানিয়ে নিতে পারে।”
বাপ্পি চুপ করে রইল। লোকটা আবার বলল, “কিসের কেস?”
বাপ্পি এবার চোখ তুলে তাকাল। তার চোখে ক্লান্তি আর অদ্ভুত এক শূন্যতা।- “খুন।”
লোকটা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর খুব সাধারণ গলায় বলল, “এখানে অর্ধেক মানুষ খুনের কেসেই আছে।”
বাপ্পি ধীরে বলল, “আমি করি নাই।”
বুড়ো মানুষটা হালকা হাসল। সেই হাসিটা ঠান্ডা নয়—বরং ক্লান্ত।- “এই কথাটাই এখানে সবাই বলে।”
বাপ্পি আর কিছু বলল না। সে মাথা নিচু করে বসে রইল। তার মনে হচ্ছিল—এই পৃথিবীতে এখন কেউ তার কথা বিশ্বাস করবে না। তার মাথার ভেতর আবার সেই রাতটার ছবি ভেসে উঠল। শামসুরের চিৎকার। হট্টগোল। রক্ত। তার বুকের ভেতরটা শক্ত হয়ে গেল। বাপ্পি চোখ বন্ধ করে বসে রইল। তার মাথার ভেতর সেই রাতটার দৃশ্য যেন আবার ধীরে ধীরে জীবন্ত হয়ে উঠছিল। অন্ধকার গলি, উত্তেজিত গলার শব্দ, ধাক্কাধাক্কি, আর তারপর এক মুহূর্ত—যে মুহূর্তটা তার পুরো জীবন বদলে দিয়েছে। শামসুরের সেই শেষ চিৎকারটা যেন এখনও কোথাও বাতাসে ভাসছে।
সে হঠাৎ চোখ খুলে ফেলল। বুকের ভেতরটা অস্বস্তিতে শক্ত হয়ে আছে। মনে হচ্ছে যেন শ্বাসটা ঠিকমতো নিতে পারছে না। জেলের উঠোনে তখন বন্দিদের সারি করে দাঁড় করানো হয়েছে। একজন গার্ড বড় অ্যালুমিনিয়ামের পাত্র থেকে প্লাস্টিকের বাটিতে করে পাতলা ডাল ঢালছে। আরেকজন শুকনো রুটির মতো কিছু একটা দিচ্ছে।
বাপ্পি বাটিটা হাতে নিয়ে এক পাশে দাঁড়াল। খাবারটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তার পেট খালি, কিন্তু তবু খেতে ইচ্ছে করছে না। গলায় যেন একটা শক্ত পাথর আটকে আছে। তার মাথায় তখন একটাই চিন্তা ঘুরছে। রহিম চাচা। লোকটা কি ভালো আছে? গত কয়েকদিনে আদালতে কী হয়েছে, কে কী বলেছে—সবকিছু ঠিকমতো সে জানে না। জেলের ভেতরে খবর পৌঁছায় দেরিতে, আর পৌঁছালেও সেটা পুরোটা নয়।
তার মনে পড়ে যায় সেই ছোট্ট দোকানটার কথা। বিকেলের দিকে দোকানের সামনে কয়েকটা কাঠের বেঞ্চ থাকত। চায়ের কাপে ধোঁয়া উঠত। কেউ রাজনীতি নিয়ে তর্ক করত, কেউ ক্রিকেট নিয়ে চিৎকার করত। আর রহিম চাচা সবসময় একটা শান্ত হাসি নিয়ে চা ঢালতেন।
বাপ্পি ছোটবেলায় কতবার সেখানে দাঁড়িয়ে থেকেছে। পকেটে টাকা নেই, তবু চায়ের গন্ধে টেনে নিয়ে যেত তাকে। রহিম চাচা তখন বলতেন— “এই যে বাপ্পি, দাঁড়িয়ে আছিস কেন? আয়।”
তারপর তাকে এক কাপ চা আর একটা বিস্কুট এগিয়ে দিতেন।
বাপ্পি লজ্জা পেয়ে বলত, “চাচা, টাকা নাই।”
রহিম চাচা হেসে বলতেন, “টাকা দিয়ে কি সবকিছু হয় নাকি?”
সেই মানুষটার কথা ভাবতেই বাপ্পির বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন মোচড় দিয়ে উঠল। ঠিক তখনই একজন গার্ড এসে তার সামনে দাঁড়াল।
- “বাপ্পি!”
সে মাথা তুলল।
- “তোকে কেউ দেখতে এসেছে।”
বাপ্পির ভ্রু কুঁচকে গেল। কেউ তাকে দেখতে এসেছে? কে আসবে?
তার জীবনে এখন এমন কেউ নেই যে জেলের দরজা পেরিয়ে তার সঙ্গে দেখা করতে আসবে। কিছুক্ষণ পরে তাকে একটা ছোট্ট ঘরের দিকে নিয়ে যাওয়া হল। ঘরটা খুব সাধারণ। মাঝখানে একটা পুরোনো টেবিল, দুই পাশে দুইটা লোহার চেয়ার। জানালায় মোটা লোহার গ্রিল। দরজার পাশে একজন গার্ড দাঁড়িয়ে আছে।
বাপ্পি ভেতরে ঢুকতেই থমকে গেল। টেবিলের ওপারে বসে আছে শিউলি। কয়েক সেকেন্ড সে কিছুই বলতে পারল না। যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না। শিউলি ধীরে উঠে দাঁড়াল। তার চোখে ক্লান্তি, কিন্তু সেই পরিচিত দৃঢ়তা এখনও আছে। “বসো,” সে নরম গলায় বলল।
বাপ্পি ধীরে ধীরে এসে চেয়ারে বসে পড়ল। তার মুখে দাড়ি উঠেছে, চোখের নিচে ক্লান্তির দাগ। কয়েকদিনের মধ্যেই যেন সে অনেকটা বদলে গেছে। কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ করে রইল। এই নীরবতার মধ্যে যেন অনেক কথা লুকিয়ে আছে। অবশেষে বাপ্পি নিজেই প্রথম কথা বলল- “রহিম চাচা কেমন আছে?”
প্রশ্নটা এত হঠাৎ এল যে শিউলি একটু থমকে গেল। সে ভেবেছিল বাপ্পি হয়তো নিজের কথা জিজ্ঞেস করবে—মামলার কথা, আদালতের কথা, ভবিষ্যতের কথা। কিন্তু সে প্রথমেই অন্য একজন মানুষের খবর জানতে চাইল। শিউলি ধীরে বলল, “ভালো আছে।”
বাপ্পি যেন একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। তার কাঁধটা একটু ঢিলে হয়ে গেল।
“ওনার কিছু হয় নাই তো?”
“না,” শিউলি মাথা নাড়ল। কিছুক্ষণ আবার নীরবতা। তারপর বাপ্পি নিচু গলায় বলল, “ওনার খেয়াল রাখবেন।”
এই কথাটা শুনে শিউলির বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল। এই ছেলে নিজের জীবন নিয়ে এমন একটা অন্ধকার জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, তবু তার চিন্তা অন্য একজন মানুষকে নিয়ে।
শিউলি ধীরে বলল, - “তোমার কথা বলো।”
বাপ্পি একটু হাসল। সেই হাসিটা খুব ক্লান্ত। “আমার কথা?” সে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর মাথা নিচু করল- “আমার কথা বলার কি আছে?”
শিউলি কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে বলল,- “আমি জানি তুমি শামসুরকে মারোনি।”
বাপ্পি এবার তার দিকে তাকাল। তার চোখে অবিশ্বাস আর ক্লান্তি একসাথে- “জানলে কি হবে?”
সে ধীরে বলল- “সত্যি সবসময় জেতে না।” শিউলি একটু সামনে ঝুঁকল। তার গলাটা নরম হয়ে এল- “আদালতে রহিম চাচা… সব সত্যি বলেননি।”
বাপ্পির ভ্রু কুঁচকে গেল- “মানে?”
শিউলি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকল। যেন কথাগুলো বলার আগে নিজের মনকে প্রস্তুত করছে। “তুমি জানো, সেই রাতে উনি সব দেখেছিলেন।” বাপ্পি ধীরে মাথা নাড়ল। “কিন্তু আদালতে তিনি পুরোটা বলেননি।”
বাপ্পির বুকের ভেতরটা আবার শক্ত হয়ে উঠল,- “কেন?”
শিউলি নিচু গলায় বলল,- “কারণ উনি ভয় পেয়েছেন… তাদের প্রথম সন্তান হতে যাচ্ছে। কয়েক মাসের মধ্যে।”
সে একটু থামল।- “কেউ তাকে হুমকি দিয়েছে। বলেছে যদি তিনি সত্যিটা বলেন… তাহলে তার পরিবারের ক্ষতি হবে।”
ঘরের ভেতর নীরবতা নেমে এল। বাপ্পি কয়েক সেকেন্ড কিছু বলল না। তার চোখ ধীরে ধীরে নিচে নেমে গেল। শিউলি ভেবেছিল সে হয়তো রাগ করবে। হয়তো কষ্ট পাবে। কিন্তু বাপ্পি শুধু খুব আস্তে করে মাথা নাড়ল।তার গলাটা শান্ত।- “ঠিকই করছে।”
শিউলি অবাক হয়ে তাকাল।- “কি?”
বাপ্পি ধীরে বলল,- “একটা বাচ্চার জীবনের চেয়ে বড় কিছু না।” তার চোখে তখন অদ্ভুত এক ক্লান্ত শান্তি।“আমি চাই না আমার জন্য আর কারো ক্ষতি হোক।”
শিউলির বুকের ভেতরটা হঠাৎ ভারী হয়ে গেল। এই পৃথিবীতে সত্যি আর ন্যায় সবসময় এক জায়গায় দাঁড়ায় না। ঠিক তখনই দরজার পাশে দাঁড়ানো গার্ড বলল,- “সময় শেষ।”
শিউলি ধীরে উঠে দাঁড়াল। যাওয়ার আগে সে একবার বাপ্পির দিকে তাকাল। তার চোখে অদ্ভুত দৃঢ়তা।- “আমি চেষ্টা করব,” সে ধীরে বলল।
বাপ্পি কিছু বলল না। শুধু চুপচাপ বসে রইল। কিন্তু তার চোখে প্রথমবারের মতো খুব ক্ষীণ একটা আলো জ্বলে উঠেছিল—যেন অন্ধকারের ভেতরেও কোথাও একটা ছোট সম্ভাবনা এখনও বেঁচে আছে।
সাইফের জীবনের বেশিরভাগ সকালই ছিল খুব নিয়মমাফিক। অনেকটা যন্ত্রের মতো। বহু বছর ধরে সে নিজের জীবনকে এমন একটা ছকে বেঁধে ফেলেছিল যেখানে অনিশ্চয়তার খুব বেশি জায়গা নেই। সকাল সাতটার অ্যালার্ম বাজত, সে উঠে বসত, জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরের আকাশটা একবার দেখত। তারপর ধীরে ধীরে রান্নাঘরে গিয়ে নিজের জন্য কফি বানাত। কফির ধোঁয়া উঠতে উঠতে সে খবরের কাগজের শিরোনামগুলো চোখ বুলিয়ে নিত। এরপর গোসল, অফিসের পোশাক, গাড়ির চাবি—সবকিছু যেন এক নির্দিষ্ট তাল মেনে চলত।
এই নিয়মটা সে নিজেই তৈরি করেছিল। কারণ সে জানত, নিয়ম মানুষকে নিরাপদ রাখে। নিয়ন্ত্রণ মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। জীবনের সবকিছু যদি হিসেবমতো চলে, তাহলে অন্তত অপ্রত্যাশিত আঘাতগুলো কিছুটা দূরে রাখা যায়।
কিন্তু আজকের সকালটা সেই পরিচিত ছকের মধ্যে পড়ছে না। বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা সাইফ কফির কাপটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ ধরে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। কফি ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু সে সেটা খেয়ালই করছে না। তার চোখ সামনে ছড়িয়ে থাকা শহরের দিকে, কিন্তু তার মন কোথাও অন্য জায়গায় আটকে আছে।
তার মাথার ভেতর বারবার একটা মুখ ভেসে উঠছে।
শিউলি।
সে নিজেও অবাক হয়ে ভাবছে—এই মেয়েটা ঠিক কখন তার চিন্তার ভেতরে এতটা জায়গা করে নিল? সে তো এমন মানুষ না যে সহজে কাউকে নিজের ভেতরে ঢুকতে দেয়। বহু বছর ধরে সে নিজের ভেতরের দরজাগুলো বন্ধ করে রেখেছে।
প্রথম দিন আদালতে শিউলিকে দেখার কথা মনে পড়তেই তার ঠোঁটে হালকা একটা হাসি ফুটে উঠল। সে দিনটা খুব সাধারণ একটা দিনই হওয়ার কথা ছিল। একটা মামলা, কয়েকটা নথি, কয়েকজন মানুষ—এর বেশি কিছু না। কিন্তু সেই করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটাকে দেখেই সে বুঝেছিল, এই মানুষটা একটু আলাদা। শিউলির চোখে একটা অদ্ভুত স্বচ্ছতা ছিল। যেন সে কোনো কিছু লুকানোর চেষ্টা করে না। তার কথা বলার ভঙ্গিও অন্যরকম—সোজাসাপ্টা, কোনো ঘুরপথ নেই।
সেই দিনই প্রথম সে বলেছিল, “আপনি খুব অদ্ভুত মানুষ।”
কথাটা শুনে সাইফ হেসেছিল ঠিকই, কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে অবাক হয়েছিল। কারণ মানুষ সাধারণত তাকে নিয়ে এমন মন্তব্য করে না। বেশিরভাগ মানুষ তাকে ভদ্র, সংযত, দায়িত্বশীল—এইসব শব্দে বর্ণনা করে। কেউ তাকে “অদ্ভুত” বলে না।
সে তখন জিজ্ঞেস করেছিল, “কেন?”
শিউলি একটু ভ্রু কুঁচকে তাকিয়েছিল, যেন বিষয়টা তার কাছে খুব স্পষ্ট। “আপনার বিয়ে ঠিক হয়েছে নীলার সাথে। অথচ আপনি নিজেই তাদের একা থাকতে দেন।”
সেই মুহূর্তে সাইফ কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল। তারপর হালকা হাসি দিয়ে বলেছিল, “মানুষকে সুখী হতে সাহায্য করা খারাপ নাকি?”
শিউলি তখন কিছুক্ষণ চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে ছিল। সেই দৃষ্টিটা আজও সাইফের মনে আছে। সেখানে কোনো বিদ্রুপ ছিল না, কোনো তর্কও না—শুধু একটা শান্ত প্রশ্ন।
“কিন্তু নিজের সুখ?”
সেই প্রশ্নটা যেন তার ভেতরের কোথাও গিয়ে আটকে গেছে। আজ বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে সে বুঝতে পারছে, সেই একটাই প্রশ্ন তাকে গত কয়েকদিন ধরে তাড়া করে বেড়াচ্ছে।
আরিবার মৃত্যুর পর সাইফ নিজের চারপাশে একটা অদৃশ্য দেয়াল তুলে ফেলেছিল। সেটা কেউ দেখতে পেত না, কিন্তু সে নিজে খুব ভালো করেই জানত সেই দেয়াল আছে। সেই দেয়ালের ভেতরে ছিল কাজ, দায়িত্ব, শৃঙ্খলা—সবকিছু নিয়ন্ত্রিত। ভালোবাসা, আবেগ, অপ্রত্যাশিত আনন্দ—এসব যেন সেই দেয়ালের বাইরে রেখে দিয়েছিল সে।
কারণ সে ভয় পেয়েছিল। কাউকে হারানোর যন্ত্রণা সে একবার দেখেছে। আরেকবার সেই পথ দিয়ে হাঁটার সাহস তার ছিল না। কিন্তু শিউলির সঙ্গে কথা বলার সময় সেই দেয়ালটা কোথাও যেন একটু কেঁপে উঠেছিল। মেয়েটার মধ্যে এমন কিছু ছিল যা তাকে অস্বস্তিতেও ফেলত, আবার একই সঙ্গে অদ্ভুতভাবে শান্তও করত। কখনো সে রাগ করে কথা বলে, কখনো হঠাৎ করেই খুব নরম হয়ে যায়। কখনো সরাসরি চোখে চোখ রেখে কথা বলে, আবার কখনো কোনো কিছু না বলেই অনেক কিছু বুঝিয়ে দেয়।
সাইফ বুঝতে পারছে—এই অনুভূতিটা তাকে ভয়ও দেখাচ্ছে। কারণ সে জানে, যদি সে সত্যিই আবার হৃদয়ের দরজা খুলে দেয়, তাহলে সেটা তাকে কোথায় নিয়ে যাবে সে জানে না। ঠিক তখনই ড্রয়িংরুম থেকে তার বাবার কণ্ঠ ভেসে এল।
রাশেদ রহমান সোফায় বসে পত্রিকা পড়ছেন। তার চোখে চশমা, মুখে সেই চিরচেনা কঠোরতা। এই মানুষটা সাইফের জীবনে সবসময় একটা দৃঢ় উপস্থিতি। শৃঙ্খলা, দায়িত্ব, সিদ্ধান্ত—এই তিনটা জিনিস তিনি সবসময় গুরুত্ব দিয়েছেন। সাইফ ভেতরে ঢুকে সোফায় বসল। ঘরের ভেতর কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তার মা রান্নাঘর থেকে এসে দাঁড়ালেন। তার চোখে কৌতূহল আর হালকা উদ্বেগ।
অবশেষে সাইফ খুব শান্ত গলায় বলল, “নীলার সাথে বিয়েটা আমি করতে পারব না।”
কথাটা যেন ঘরের বাতাসকে থামিয়ে দিল। মা বিস্মিত চোখে তাকিয়ে রইলেন। বাবা ধীরে ধীরে পত্রিকাটা ভাঁজ করলেন। “কেন?”
সাইফ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। যেন নিজের ভেতরের কথাগুলো ঠিকভাবে সাজিয়ে নিতে চাইছে। তারপর ধীরে বলল, “কারণ সে অন্য কাউকে ভালোবাসে।”
রাশেদ রহমানের চোখ একটু সংকুচিত হল। তার গলায় কঠোরতা নেমে এল। “এটা তোর ভাবার বিষয় না।”
সাইফ এবার মাথা তুলে বাবার দিকে তাকাল। তার গলাটা শান্ত, কিন্তু দৃঢ়। “এটা আমার জীবন।”
এই কথাটা বলার সময় তার মাথার ভেতর আবার সেই কণ্ঠটা ভেসে উঠল— “নিজের সুখ?”
বহু বছর ধরে সে নিজের সুখ নিয়ে ভাবেনি। মনে করেছিল, মানুষ দায়িত্ব নিয়েই বাঁচে। পরিবার, কাজ, সমাজ—এইসবই যথেষ্ট। কিন্তু এখন সে বুঝতে পারছে, মানুষের হৃদয় এত সহজ না। কিছু অনুভূতি আছে যেগুলোকে অস্বীকার করা যায় না। শিউলির মুখটা আবার তার চোখের সামনে ভেসে উঠল। আদালতের করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকা সেই মেয়েটা। চোখে দৃঢ়তা, কথায় সরলতা, আর কোথাও গভীরে লুকিয়ে থাকা একটা কোমলতা।
সাইফ হঠাৎ বুঝতে পারল—অনেক বছর পরে তার ভেতরে আবার কিছু নড়ে উঠছে। হয়তো এটা ভালোবাসা নয়। হয়তো শুধু একটা সম্ভাবনা। কিন্তু এতদিন পরে সেই সম্ভাবনাটাও তার কাছে খুব বড় কিছু মনে হচ্ছে। সে জানালার বাইরে তাকাল। শহরটা এখন পুরোপুরি জেগে গেছে। রাস্তায় গাড়ি চলছে, মানুষ কাজের দিকে যাচ্ছে, দোকানের সামনে ভিড় বাড়ছে। জীবন থেমে থাকে না। আর সাইফের নিজের জীবনের ভেতরেও যেন একটা নতুন সকাল শুরু হতে যাচ্ছে। একটা সকাল, যেখানে তাকে প্রথমবারের মতো সত্যি সত্যি নিজের হৃদয়ের দিকে তাকাতে হবে।
(চলবে...)