আরেকটি নিষিদ্ধ প্রেমের গপ্পো - অধ্যায় ১
আরেকটি নিষিদ্ধ প্রেমের গপ্পো
রিও
আজ মায়ের ছুটির শেষে বিদায়ের পালা!
আমি কলকাতা বিমান বন্দরের বাইরে দাঁড়িয়ে দেখতে থাকলাম মাকে। মা পিছন ফিরে হেঁটে চলেছে কলকাতা বিমান বন্দরের ভিতরের দিকে মুম্বইতে যাবার ফ্লাইটের উদ্দেশ্যে ।
মায়ের একপাশের হাতটা শক্ত করে ধরে রয়েছেন ভাস্কর আঙ্কেল। আজ আমার মা ,আমাকে ছেড়ে মুম্বাইতে ফিরে যাচ্ছেন নিজের কর্মস্থলে যোগদেবার জন্যে ।
মা ভাস্কর আঙ্কেলের হাত ধরে,পিছন ফিরে হাঁটতে হাঁটতে ,একটি বারের জন্যে ঘাড় ঘোরালো আমার দিকে চেয়ে।
আমি দূর থেকে দেখতে পেলাম মায়ের চোখটা তখনো লাল হয়ে জলে ভিজে রয়েছে ।
মায়ের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আমি আমার একটা হাত আলতো করেই তুলে রইলাম । আমার তুলে থাকা হাত স্থির ছিল , নড়ছিলো না বটে , তবে কাঁপছিলো ।
মা মুখ ফেরালো আমার দিক থেকে।
নিজের কান্না ভেজা চোখদুখানা লুকিয়ে ফেলার জন্যেই বোধয়, হবে হয়তো !
পিছন ফিরে হাঁটতে থাকা মায়ের চেহারাটা আস্তে আস্তে আবছা হয়ে লোকজনের ভিড়ের মাঝে মিলিয়ে যেতে থাকলো। আমি তবুও ঘাড় উঁচু করেই মাকে খুঁজতে থাকলাম লোকজনের ভিড়ের মাঝে ,
মাকে হারাতে চাইলাম না কিছুতেই।
মাকে যতক্ষণ দেখা যায় প্রাণ ভরে দুচোখ দিয়ে !
মায়ের চেহারাটা ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে যেতে থাকলো আমার চোখের সামনে থেকে । আমার চোখও যে ভেজা।
মা কে বিদায় জানিয়ে বিমান বন্দরের বাইরে দাঁড়িয়ে রইলাম চুপ করে।
ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে আসতে থাকলো হাত পা । মাথাটা ঝিম ঝিম করতে থাকলো।
ফ্ল্যাটে ফিরতে মন চাইলো না কিছুতেই।
মাকে ছাড়া ফ্ল্যাটটা যেন বড্ডো ফাঁকা ,ম্যাড়মেড়ে ।
ফ্ল্যাটে ফেরার কথা ভাবলেই গা-টা যেন কাঁটা দিয়ে উঠল।
বিমান বন্দরের এক পাশের কোনায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চোখের সামনে ভেসে উঠলো ,স্মৃতিমাখা দিনগুলোর কিছু মুহূর্ত গুলোর কথা।
(১)ক—প্রথম দিনের লুকোচুরি খেলা।
সেই দিনটা ছিল আমার কাছে বিশেষ একটি দিন। বিমান বন্দরের সামনে দাঁড়িয়ে মায়ের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলাম কিছুক্ষন । থমথমে মেঘলা আকাশ।
আর মন টাও তারচেয়েও বেশ কিছুটা বিষণ্ণ । কলেজে সেদিন আর যাওয়া হয়ে উঠলো না । দুপুরের দিকে রাস্তাঘাট ও প্রায় ফাঁকা বললেই চলে।
বামহাতের কব্জিতে ডিজিটাল ঘড়িটার দিকে চোখ চলে যাচ্ছিল বারে বারে।স্মার্ট ওয়াচের ডিজিটাল সংখ্যাগুলো বদলাচ্ছিলো বটে , কিন্তু সময় যেন এগোতেই চাইছিলো না । আর কতক্ষণ?
অপেক্ষা করতে করতেই বুকের ভেতর জমে থাকা আবেগগুলো ধীরে ধীরে ভারী হয়ে উঠছিলো।
দু’বছর পর মাকে সামনে থেকে দেখব,এই ভাবনাটাই আমাকে অস্থির করে তুলেছিল। সেই বিগত দু’বছর ধরে ,মাকে শুধু শুনেছিলাম ফোনে, আর দেখেছিলাম ভিডিও কলে।
দু’বছর পর মা মুম্বাই থেকে কলকাতায় ফেরার কথাছিলো সেই বিশেষ দিনটিতেই।
ঠিক তখনই রানওয়ে থেকে ভেসে এল একটা প্লেনের ল্যান্ডিং টাচডাউনের শব্দ। মনে হলো, আর একটু অপেক্ষা করতে হবে। মা হয়তো এসে যাবে আর কিছুক্ষণের মধ্যেই।
আমার চোখের সামনে ভেসে উঠলো বাবা ও মায়ের সাথে স্মৃতি মাখা দিনগুলোর কথা,
বাবা মার সাথে একদম ছোট্ট বেলায় আমিও মুম্বাইতে থাকতাম। বাবা ও মা দুজনেই কর্পোরেট প্রফেশনাল। দুজনেরই ব্যাস্ত জীবন ।
মা ,বাবার কর্মব্যস্ততার কারনে আমার বয়স যখন ছয় কি সাত বছর ,মা আমাকে মুম্বাই থেকে কলকাতায় দাদু-দিদুনের কাছে নিয়ে এসে রেখে দেয়।
মা আমাকে কলকাতার কলেজে ভর্তি করে দাদু দিদুনের কাছে রেখে মুম্বাইতে ফিরে যায়।
মা অবশ্য মাঝে মধ্যেই আমার সাথে দেখা করতে কলকাতায় আসতো। অফিসের ছুটি নিয়ে মা, বাবা কলকাতায় আমাকে দেখতে আসতো।
আবার দাদু -দিদুনের সাথে আমি মুম্বাইতে, কলেজের ছুটি কাটাতে যেতাম ।
অবশ্য সেই সময়ে , শেষ দুই -তিন বছর যাবৎ , বাবা খুব একটা কলকাতায় আসতো না। হাতের গোনা কয়েকবার ছাড়া।
মা অবশ্য আমার সাথে ফোনে তারপর ভিডিও কলে প্রতিমুহূর্তে আমার আপডেট নিয়ে যেতো।
আমি ক্লাস ওয়ান থেকে দাদু দিদুনের কাছে থেকে কলকাতায় পড়াশোনা করে এই ভাবেই বড় হয়ে উঠেছিলাম ।
ধীরে ধীরে আমি কৈশোর থেকে সদ্য যৌবনে পা দেয়া অষ্টাদশ বর্ষীয় একজন যুবক , কলেজে ভর্তি হয়েছি সবে।
অবশ্য ততদিনে আমার দাদু শেষ তিন বছর হলো পরলোকগমন করেছিলেন । তখন মা মুম্বাই থেকে দাদুর শেষ কাজটুকু করতে ছুটে এসেছিল কলকাতায়। আর দিদুনের পাশে দাঁড়াতে।
তারপর মা আবার মুম্বাইতেই ফিরে যায় ,আর ফ্ল্যাটে কেবল দিদুন আর আমিই থাকতাম।
এক মনে এসব স্মৃতিচারণই করছিলাম ।আমি সামনে তাকালাম।
আকাশী নীল রঙের পরিপাটি চুড়িদার পরা এক মাঝবয়সি, লম্বাটে,ফর্সা ,মাঝারি গড়নের একজন মহিলা হঠাৎ ছুটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল।
আমি কিছু বলার আগেই মা আমাকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। এয়ারপোর্টের কোলাহলের মাঝখানে মায়ের চোখে জল।
প্রায় দু’বছর পরে মা মুম্বাই থেকে কলকাতায় ফিরেছিল সেই বিশেষ দিনটিতেই ।
মা আমাকে জড়িয়ে ধরে রইলো কিছুক্ষন । আমি নড়ছিলাম না । আমি হাত দুটো ঝুলিয়ে রাখলাম শরীরের দু’পাশে। মায়ের কান্নাটা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠলো। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে।
আমার বুকের কাছে মায়ের কপাল ঠেকে রইলো বেশ কিছুক্ষন ।
যে গন্ধটা আমার অনুভব হলো তা, মায়ের বডি পারফিউমের সাথে শরীরের ক্লান্তির মিশ্র গন্ধ।
আর সেসব ছাপিয়ে মায়ের সেই মাতৃত্বের মমতা মাখানো আমার সেই অতি পরিচিত সুবাস টাই যেন আলাদা করে পেলাম মায়ের শরীর থেকে ।
আর সেটা দীর্ঘ দু -বছর পর!
আমি যেহেতু সবে কিশোর থেকে যৌবনে পা দিয়েছি, তাই নিজের উচ্চতা সম্পর্কে বাড়তি কৌতূহল কাজ করতো।
মা অবশ্য খাটো নন। তবু সেদিন, মা আমাকে জড়িয়ে ধরতে গিয়ে আমার পাঁচ ফুট দশ ইঞ্চির শরীরের সঙ্গে লেগে থাকা মায়ের মাথাটা এসে ঠেকল আমার চিবুকের নিচে।
অনুমান করেছিলাম পাঁচফুট ছয় ইঞ্চি লম্বাটে গড়নের মায়ের চেয়ে ইঞ্চি চারেক লম্বা হয়ে গিয়েছি ততদিনে।
আমি চোখ নামিয়ে রাখলাম। চারপাশে মানুষ ব্যস্ততা নিয়ে হাঁটছে যে যার গন্তব্যে যাবার জন্য।কেউ তাকাচ্ছিলো ও না। কারও কিছু যায় আসে না।
দু’বছর পর মাকে এভাবে দেখছি, মনের ভিতরে যে উচ্ছ্বাস ছিল, অভিমানে যেন স্তদ্ধ করে ফেলেছিলো আমাকে ।
চোখ ভিজে আসছিলো আমারও। না কাঁদলাম না। দমিয়ে রাখলাম নিজের বুকচাপা কান্নাটাকে। পুরুষ মানুষ যে । কাঁদলো মনটা ,চোখটাও ভিজে গিয়েছিলো বটে , তবে জল গড়ালো না।
মা নিজে থেকেই আমাকে ছেড়ে দিলো ।সাথে সাথে মায়ের অশ্রু মিশ্রিত চোখের মনি ঘুরছে আমার মুখাবয়বের দিকে। চোখ মুছতে মুছতে হাসতে চেষ্টা করলো মা।
আর বলল ,
— টম...,"খুব বড় হয়ে গেছিস.....বল । "
আমি কিছু বললাম না । শুধু একবার মাথা নাড়লাম।
মায়ের কিনে দেয়া নতুন রয়্যাল এনফিল্ড হিমালয়ান ফোর ফিফটি বাইক টার সামনে এসে আমি মা কে শুধু বললাম ,
— "নাও, হেলমেট পরে নাও।"
মা হাসিমুখে আমার দিকে তাকালো ,
— "টম, তোর পছন্দ হয়েছে তো বাইকটা?"
মা একটু থামলো ,আমার উত্তরের অপেক্ষায়...
মায়ের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো আমার ভেতরে তখন না মানসিকতা ছিল , না ইচ্ছে। আমি কিছু বললাম না। শুধু বাইকটা স্টার্ট দিলাম ।
এয়ারপোর্ট থেকে আমরা বাড়ির দিকে রওনা দিলাম ।মার সাথে ছিল একটা ছোট লাগেজ ব্যাগ।
আমি বাইক চালাতে শুরু করলাম। মা একপাশে পা জড়ো করে বাইকের পেছনের সিটে বসেছিল । ভ্যাপসা গরমে জামাটা খানিকটা ভিজে গিয়েছিলো। তার সাথে মনটাও।
মা কে নিয়ে মধ্য-কলকাতার ফ্ল্যাটের দিকে যেতে যেতে ভিতরে আমার টি-শার্টটা ঘামে গায়ে লেপ্টে গিয়েছিলো তাই বুকের জামার বোতাম খুলেই ফেলেছিলাম । যদিও ভিতরে টি শার্ট ছিল । বুকটা যেন ছটফট করছিলো।
রাস্তা-ঘাট প্রায় জনশূন্য।
যশোর রোডএ তবু ট্রাফিক সিগন্যালের সামনে লাল আলো। ব্রেক কষে দাঁড়াতেই হলো ।
পেছনের সিটে বসে থাকা মানুষটার সঙ্গে আমার নীরবতাটা হঠাৎ ভেঙে মা কে বলে ফেলেছিলাম,
—"তুমি কেন আসলে আমাকে...কিভাবে নিজের গর্ভে ধারণ করেছিলে ?"
একটু থেমে,
— "কেন এই পৃথিবীতে নিয়ে এসেছিলে আমাকে?"
কথাটা মায়ের দিকে আচমকা ছুড়ে দিতেই , নিজেই থমকে গিয়েছিলাম । এই প্রশ্নটা করাটা কি ঠিক হল আমার ?
না ! মোটেই না ! তবুও মুখ থেকে কথাটা ঢিল হয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল সেদিন, মায়ের স্বচ্ছ কাঁচের হৃদয়ের উদ্দেশ্যে !
মা বোধয় ঘাবড়ে গিয়েছিলো । এক মুহূর্তের জন্য।
ট্রাফিক সিগনালে আটকা পরে , তারপর কিছুক্ষণ নীরব ছিলাম আমরা দুজনেই। ।
আমি বাইকের লুকিং গ্লাসটা সামান্য টিল্ড করলাম। পিছনের সিটে বসে থাকা মাকে একপলক দেখার চেষ্টা করলাম। হেলমেটের কাঁচের ভেতর মা চোখ শক্ত করে টিপে বন্ধ করে রেখেছে ।
জোর করে মুখ টিপে রয়েছে । মার দু চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছে। মুখে কোনো উত্তর নেই। চোয়াল খানিকটা শক্ত।
সিগন্যাল সবুজ হতেই, আমি বাইক স্টার্ট দিলাম ।
কিন্তু মায়ের এই নীরবতা আমার কৌতুহলকে পিপাসিত করেই রাখলো।
আর নিজেকে বললাম, এখনই নয় ! অন্য কোনো সময়ে !
আমার ও মায়ের মধ্যে দ্বিতীয় কোনো বাক্য বিনিময় আর হলো না সেই সময়ে । সোজা বাইক চালিয়ে উল্টোডাঙা,চিংড়িঘাটা,ইএম বাইপাস ধরে,সায়েন্স সিটি,রুবি,মুকুন্দপুর হয়ে এপার্টমেন্ট এর গেটের সামনে এসে দাঁড়ালাম।
মাকে নিয়ে ফ্ল্যাটে ঢুকলাম।
ফ্ল্যাটে ঢুকতেই দিদুন দরজা খুলে দিল।
মা ভেতরে পা দিতেই দিদুন মার মুখটা ভালো করে দেখে নিল।
দিদুন মা কে জড়িয়ে ধরলো। মা কিছুটা ঝুকে পড়লো দিদুনের ঘাড়ের দিকে।
মা দিদুন কে জড়িয়ে ধরে দিদুনের ঘাড়ে মাথা রাখলো।
ওদের দুজনের চোখেই জল।
তারপর মা দিদুন কে জিজ্ঞেস করল ,
— "মা তোমার শরীরটা আগের চেয়ে কেমন একটু ভেঙে গেছে যেন!"
আর দিদুন মা কে বললো ,
— "আমি এখন একটু ভালো আছি! তুই কলকাতায় আসবি বলেই হয়তো ,এতো ভালো লাগছে।"
একটু পরেই মা, মাথা নিচু করে দিদুনকে প্রণাম করলো।
তারপর দিদুন মার মাথাটা তুলে বললো,
— "শরীরটা কেমন আছে রে অনা?
এই গরমে এতটা জার্নি করে এসেছিস !
তোর শরীর ভালো আছে তো ?"
মা দিদুনকে জড়িয়ে ধরলো,
— "আছি মা। এখন একটু ভালোই আছি।
টম কে আর তোমাকে অনেকদিন পর দেখতে পেয়ে মনটা আনন্দে ভরে গেল আজ আমার মা।"
দিদুন কিছুক্ষণ মায়ের পিঠে হাত বুলিয়ে দিল।
তারপর চোখের জল মুছে,
— "হ্যাপি বার্থডে, বার্থডে গার্ল আমার।" নরম সুরে মাকে বললো দিদুন।
মা এক টুকরো মিষ্টি হেসে
—"ওফফ মা! আর বার্থডে গার্ল বোলো না।
রীতিমতো ওমেন হয়ে গেছি!"
দিদুন হেসে উঠল।
—"মায়ের কাছে সন্তানরা সবসময় ছোটই থাকে রে।"
দিদুনের ইশারায় পাশের ঘর থেকে মায়ের জন্য আনা কেকটা বারান্দার ডাইনিং টেবিলের উপরে রাখলাম ।
কেকের গায়ে লেখা,
Happy Birthday Anamika
আর ঠিক মাঝখানে জ্বলছে 42 লেখা দু’টো মোমবাতি।
মা কেকটা দেখেই হেসে উঠল। চোখে আনন্দের জল।
মায়ের উপস্থিতিতেই যেন দক্ষিণ কলকাতার অ্যাপার্টমেন্টের তিনতলার, সাতশো পঞ্চাশ বর্গফুটের আমার দিদুন প্রভা মিত্রের ফ্ল্যাটটা হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
আর ঠিক একই সাথে মায়ের গায়ের মিষ্টি সুবাস টাও যেন ছড়িয়ে পড়লো ,গোটা বারান্দায়।
মাতৃত্বের সেই পুরনো গন্ধের সঙ্গে মিশে আছে অভিমানের একটা তিক্ত নির্যাস। যেন বহুদিনের পরিচিত কিছুর ভেতর নতুন একটা স্বাদ ঢুকে পড়েছে।
সেই গন্ধটাই আমার হৃদয়ের পাঁচিলের গায়ে আস্তে করে আঁচড় কাটল।
টেবিলের উপর কেকটা রাখা। মোমবাতির আলো মায়ের মুখে নড়ছে। মা মোমবাতির শিখার দিকে তাকিয়ে রয়েছে । ফুঁ দেওয়ার আগে হঠাৎ থেমে গেল মা ।
মা খুব হালকা করে ফুঁ দিলো । একটা মোমবাতি নিভে গেল , আরেকটা কয়েক সেকেন্ড জ্বলে থাকল । তারপর নিজে থেকেই নিভে গেল ।
আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম আমার রুমের দরজার পাশে। মা আর দিদুন কেকের পাশাপাশি ।
আমার হাত দুটো জিন্স প্যান্টের পকেটের ভেতরে।
আমি মাথাটা নিচু করে ভাবলাম এই মুহূর্তে ,
আমি যদি এখন “হ্যাপি বার্থডে” বলি মা কে -তাহলে সব ঠিক হয়ে যাবে কি? দুই বছর, প্রশ্ন, রাগ-সব মুছে যাবে কি ?
মা খুশিতে ফুঁ দিয়ে মোমবাতি নিভিয়ে কেক কাটল। তারপর কেকটা হাতে করে আমার দিকে এগিয়ে এল।
মুখের কাছে ধরে ,
— “বুবু ; আমাকে কি বার্থডে উইশ করবি না?”
আমার চোখের সামনে ভেসে উঠলো ছুরিতে কাটা কেকের কয়েকটা লেয়ার।
না-মায়ের হাত থেকে কেকটা খাবার ইচ্ছে হলো না আমার । তাই আস্তে করে মুখটা কেক থেকে সরিয়ে নিয়ে ,মার হাত থেকে কেকটা কেড়ে নিয়ে আমার পার্সোনাল ঘরে চলে এলাম ।
দরজাটা বন্ধ করে দিলাম ভিতর থেকে।
মা বারান্দায় দাঁড়িয়ে কিছুটা হতাশা নিয়ে নির্বিকার ভাবেই আমাকে দেখছিলো বোধয়।
মা কে দুবছর পর নিজের চোখের সামনে থেকে দেখার, প্রতীক্ষার অবসান হয়েছিল অনেকটা এই রকম ভাবেই।
আমি দরজা বন্ধ করে একা ঘরে বসে ভাবছি ।
শেষ দুটো বছর,
মার কি এতই নিজেকে নিয়ে ব্যাস্ততা ছিল যে , মা আমার সাথে একটি বারের জন্যেও দেখা করতে কলকাতায় আসতে পারছিলো না।
শুধু ফোন, আর ভিডিও কল !
এদিকে আগামী কাল কলেজে যাবার উদ্দীপনা কাজও করছিলো। প্রথম প্রথম শুরুর দিকে কলেজে যাবার উৎসাহ অনেক বেশি। তাই হয়তো।
এমন সময় বারান্দা থেকে দিদুনের গলার আওয়াজ পেলাম। আমি দরজা খুলে বাইরের বারান্দায় বেরোলাম। মা বারান্দায় নেই। বোধয় ফ্রেশ হতে ওয়াশরুমে ঢুকেছে। ।
দিদুন আমাকে কাছে পেয়েই অভিযোগবাণী ঝরাতে লাগলো —
"কি রে টম , এতদিন পর তোর মা আজ বাড়িতে এলো। ভালো করে কথা বলছিস না কেন তোর মায়ের সাথে? আমার মেয়েটা কষ্ট পাবে না?"
দিদুনের উপর আমার মাথাটাও খানিকটা গরম হয়ে গিয়েছিলো সেই সময়।
—"আমার ভালো লাগছে না কিছু। আমাকে একটু একা থাকতে দাও প্লিজ।"
খানিকটা বিরক্ত হয়েই বললাম দিদুনকে !
দিদুন থামলো না। আমার পিছনেই লেগে থাকলো।
— "তোর জন্যেই তো তোর মা মুম্বাই থেকে কলকাতায় এলো। তোকে সামনে থেকে দেখবে বলে। কথা বলবে বলে ! "
আমিও থেমে ছিলাম না দিদুনের উপর।
— "তাহলে আমার কি করার আছে এবার ?"
চোখ ফিরিয়ে দেখলাম মা বাথরুমের দরজা খুলে বেরোচ্ছে। দিদুন চোখ টিপে ইশারা করে আমাকে থেমে যেতে বললো।
মা বাথরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে আমাকে , কেমন একটা ক্লান্ত সুরে বলল ,
— "বুবু , তুই বারান্দার সোফায় বোস। তোর সাথে একটু গল্প করি। আমি আসছি। "
এই বলতে বলতে মা দিদুনের ঘরের দিকে গেল। মার চোখে মুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। আমি সোফায় বসলাম না। বারান্দায় থাকা টিভি টা অন করলাম। ক্রিকেট খেলা হচ্ছিলো সেদিন ।
মা দিদুনের ঘর থেকে চুল আঁচড়ে নাইটি পরে বারান্দার সোফায় বসলো দিদুনের পাশে।
সাথে সাথে মা আমাকে বলল ,
— "বুবু , কি রে দূরে দাঁড়িয়ে থাকবি ? আমার কাছে এসে একটু বসবি না ?"
মায়ের গলার শব্দে ছিল ক্লান্তি আর নমনীয়তা!
আমি মা কে বারান্দার এক কোনায় দাঁড়িয়ে বললাম,
—"আমি খেলা দেখছি। এখানেই ঠিক আছি।"
মা আর কিছু বললো না আমাকে। মা আর দিদুন সোফায় বসে নিজেদের মধ্যে কথা বলছে।
দিদুন মা কে জিজ্ঞেস করল ,
—"অনা খাবি কিছু?"
মা দিদুনের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল —
"না , খেয়ে এসেছি। খিদে নেই মা।"
মা মাথাটা দিদুনের বুকের উপর রাখলো। দিদুন মায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল।
আমি খেলা দেখছিলাম ঠিকই। কিন্তু আড়ি পেতে মা ,দিদুনের কথোপকথন শোনার চেষ্টাটাই বেশি করছিলাম ।
আর দু -বছর পর মা কে আড়ালে আবদারে আড়িপেতে দেখতে থাকলাম। আর পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে মা কে পর্যবেক্ষণ করে চললাম।
মা ,আর দিদুন ওরা নিজেদের মধ্যে কথা বলে চলেছে।
আমি ওদের কথা শুনছি আর দূর থেকে নিবিড় ভাবে দেখছি মা কে ,
মায়ের চেহারাটা লম্বাটে ভরাট হলেও মোটা নয়। বেশ উজ্জ্বল স্বর্ণালী হলদেটে গায়ের রং। ফেসওয়াশ দিয়ে মা মুখটা ধুয়ে আসাতে কিছুটা ফ্রেশ দেখাচ্ছিল মা কে।
লাইটের আলো মায়ের মুখের উপর সোনালী আভা যেন পিছল খেয়ে মুখের উপর দ্যুতি ছড়াচ্ছে।
মায়ের মুখের গড়ন ওভাল শেপ, খানিকটা পানপাতার মতো। দূরে দাঁড়িয়ে দেখলাম মার মুখের একপাশে লাইটের আলোয় গালের একপাশটা আরো কতকটা উজ্জ্বল লাগছে।
সাথে মাথার থেকে গাল ঘেষে নেমে আসা কয়েকটা চুলের গোছা মায়ের ফর্সা গালকে আড়াল করে ঢেকে রেখেছে । চুল কিছুটা খোলা। যেটা পিঠের দিকে নেমে এসেছে, আর বাকি চুলগুলো খোপার কাছে একটা কালো ক্লিপে আটকানো।
মায়ের চুলগুলো কালো তবে কিছুটা বেগুনি আভা রয়েছে মায়ের চুলে। মা বোধয় চুলে বারগান্ডি কালার ব্যবহার করে।
চোখে পড়লো সেই অগোছালো পরিপাটির মধ্যে একরকম ক্লান্ত শান্তি। আর কপালের মধ্যেখানে ছোট্ট একটা সবুজ টিপ।
মা ,দিদুনকে বলতে শুনলাম ,
— " মা ,টম অনেক বড় হয়ে গেলো দেখতে দেখতে। তুমি না থাকলে আমি টম কে মানুষ করতে পারতাম না।
মুম্বাইতে টম কে কার কাছে ফেলে চাকরি করতাম বলোতো ?"
মায়ের কথা শুনে দিদুনকে বলতে শুনলাম ,
— "সেই ছোট্ট টম কে তুই আমার কাছে দিয়ে গেলি কলকাতায় । টমের তখন বয়স ছয় বছর ছিল।
তারপর সেই থেকে তো টম আমার হাতেই মানুষ। তুই মাঝে মধ্যে আসতিস কলকাতায় , টম কে দেখতে। তবে সে আর কত টুকু।"
আমি লক্ষ্য করলাম ,
মার নাক টা বেশ সুচলো। নাকের পাটার সামনে ছোট্ট নোসপিন টি লাইটের আলোতে মার নাকের ডগাটার ঠিক সামনে ,বিন্দুহয়ে আলোর ঝলক মারছে। টানা টানা চোখ। গাঢ় কালো চোখের মনি। আর কালো চোখের পাতা। চোখের পাতা গুলো ফুলের রেনুর মতো , মাস্কারা লাগিয়ে রেখেছে যেন! দিদুনের সাথে মা কথা বলতে গিয়ে মার গালে একটু টোল ও পরেছে। আর ঠোঁটের পাপড়ি দুটো গোলাপি রঙের । ভুরু দুটো অর্ধ চন্দ্রের মতো বাঁকা। ঠিক যেন কোনো শিল্পীর তুলির আঁচড় দিয়ে চাবুক এঁকেছে। কপাল বেয়ে গালের কাছে একঝাঁক চুল ফ্যানের হওয়ায় মার গালের উপর আছড়ে পড়েছিল।
দুই আঙ্গুল দিয়ে মা চুলগুলো সরাচ্ছিলো বারে বারে। আর কানের কাছে গিয়ে গুঁজে দিচ্ছিল। মায়ের কানে দেখলাম ছোট্ট স্বর্ণালী টপ। কানের লতির সাথে নিবিড় ভাবে লেগে রয়েছে।
দিদুনের সাথে কথা বলার ফাঁকে ফাঁকে মায়ের চোখের মণি অস্থিরভাবে আমার দিকে ঘোরাফেরা করতে থাকলো। ।
মা তো আড়ি পেতে আমাকেও দেখছে.... না মাপছে ?
কি ভাবছে মা? আমিও ভেবে চললাম।
মা আর আমার মধ্যে নিঃশব্দ দৃষ্টি বিনিময় হতে থাকলো।
দিদুন-মা কে বলছে শুনলাম ,
— "তা প্রায় দু -বছর পর কলকাতায় এলি। অফিস থেকে কত দিনের ছুটি নিয়ে এসেছিস অনা।"
মা-দিদুন কে বলল ,
— "আপাতত বেশ কিছুদিন কলকাতায় থাকবো মা।
ছুটিতে এসে টম আর তোমার সাথে সময় কাটাবো কিছুদিন । তারপর মুম্বাইতে গিয়ে অফিস জয়েন করবো। কিছুদিন ওয়ার্ক ফর্ম হোম পেয়েছি অফিস থেকে ।"
আমার নজর এড়ালো না মার কালো হরিণী চোখের কোণে হালকা বলি রেখা, গালও কিছুটা ভারী ,ঠোঁটের পাশেও কিছুটা ভাঁজ। মাঝ বয়সের ছাপ রয়েছে চোখে মুখে ।
কিন্তু এই ভাঁজগুলো ক্লান্তির না, বরং জীবনের গল্পে ভরা। বহু হাসি, বহু কান্না, বহু অভিজ্ঞতা,সবকিছু মিশে গেছে মার ওই মুখের গভীরে।
মায়ের হাফহাতা নাইটি টার হাতার জায়গাটা বেশ আঁটোসাঁটো । ফর্সা বাহুর উপরের দিকে হাতার জায়গাটা অনেকটাই উপরে উঠে রয়েছে। আর জায়গাটা বেশ ফুলেও রয়েছে।
মায়ের হাত ও বাহু সমেত জায়গাটা বেশ চকচকে ,নির্লোম। নিয়ম মাফিক ওয়াক্সিং করার জন্যেই হবে হয়তো।
মার দীর্ঘকায় চওড়া গলায় তিনটি ভাঁজ।
তার ঠিক দু’পাশ দিয়ে নেমে এসেছে পাতলা সোনালি রঙের গলার লম্বা চেইনটা । চেইনটা বেশ লম্বাটে।
লম্বা চেইন বুকের দিকে নামতে নামতে হঠাৎ যেন খানিকটা ঊর্ধ্বমুখী হয়ে থমকে গেছে। আর বুকের উঁচু উপত্যাকার উপর গিয়ে পড়েছে। শেষে ঝুলছে একটা গোল চাকতির মতো লকেট।
চেইনটা আর লকেট,দুটোই সোনালি, লাইটের আলোয় ঝকঝক করছিল যেন।
মার বুকের জায়গাটাও বেশ কিছুটা উঁচু হয়ে নাইটির সাথে চেপে রয়েছে।পাতলা সুতির আঁটোসাঁটো নাইটির উপর উপচে ফুলেওঠা মার সুউচ্চ ,নিটোল , উন্নত স্তনের দিকে আমার চোখ আকৃষ্ট হয়ে থমকে
গেল। নাইটিটা বুকের দিকে কিছুটা টানটান হয়ে নামানো। নাইটির ঠিক মাঝখানে মার সুউচ্চ স্তনের স্তনবিভাজিকার খাঁজ বেশ খানিকটা স্পষ্ট। যদিও পাতলা আঁটোসাঁটো নাইটির ভিতরে ব্রেসিয়ারের রিব গুলো অস্পষ্ট ভাবে ভেসে উঠেছিল।
আমার চোখ কিছুক্ষনের জন্য পলক ফেলতে ভুলে গেলো। আমি লুকিয়ে লুকিয়ে ফ্যালফ্যাল করে মা কে শুধু আড়ালে আবদারে দেখছি। কিন্তু এটাতো আমার সেই চেনা মা। আমার মায়ের প্রতি অভিমান তো ছিলই কিন্তু মা যেন আজ আমার কাছে বহুদিনের চেনা অথচ নতুন এক দৃষ্টিতে দেখা মা। সুদীর্ঘ দুবছরের মায়ের কোমল নিবিড় শরীরের স্পর্শ থেকে বঞ্চিত ও অভিমান মিশ্রিত এক মায়াজালে আমি নিজেই নিজেকে আবদ্ধ করে ফেললাম যেন ।
মায়ের মোলায়েম হাতের কব্জিতে সরু সোনালি চেনের একটা ব্রেসলেট চোখে পড়লো। আর বাম হাতের অনামিকা আঙুলে মুক্তা বসানো সোনার একটি আংটি।
মা হাঁটুমুড়ে সোফায় বসেছিল ঠিকই কিন্তু মার উজ্জ্বল পায়ের পাতা সমেত পায়ের বেশ কিছুটা জায়গা দেখা যাচ্ছিল। লাইটের আলোর ঝলকানিতে মার অর্ধ নগ্ন পায়ের উপর পরাতে মার পায়ের পাতার জায়গাটা ওয়াক্সিংয়ের কারণে চকচক করছে ।
সেদিন ঘরের ভিতরে মা কে নিয়ে ঢুকতেই লক্ষ্য করলাম মা আমার কাঁধের কিছুটা নিচে নেমে গেল। পাঁচ ফুট পাঁচ হবে হয়তো মা ! মার জুতোয় হিল ছিল বলে পাঁচ ফুট ছয় মনে হয়েছিল আমার!
তবে ,সমুদ্র শাস্ত্রের বিচারে মা পদ্মীনি না শঙ্খিনী নারী হবে সে আমার জানা নেই ,
কিন্তু এই সাধারণ মেক আপ হীন ধীর শান্ত অগোছালো মাঝবয়সী মা যে আমার চোখে অনেক বেশি রূপসী। আমি তা এতদিন কেন টের পাইনি ,সেই ভাবনাটাই আমাকে ভাবিয়ে তুলেছিল সেদিন ।
মা দিদুন কে বলছে শুনলাম ,
— "ভেবেছিলাম বুবু এই বছর ইঞ্জিনিয়ারিং এ ভালো র্যাঙ্ক পাবে। কিন্তু হলো না। ওকে নিয়েই আমার যত চিন্তা। "
দিদুন মা কে আক্ষেপের সুরে কথা গুলো বলতে থাকলো,
— "কিন্তু , এতদিন সংসার করার পর কি যে হলো শেখরের । কেন যে বদলে গেল শেখর। সবই আমাদের পোড়া কপাল মা । তারউপর তোর বাবাও আজ আমাদের মধ্যে নেই।"
মা দিদুনের কোলে মাথা রেখে বলতে থাকলো,
— "দ্যাখো মা , শেখরের সাথে আমি সংসার টা করতেই চেয়েছিলাম ভালোভাবেই। ওর সব আবদার মেনে নিয়েছিলাম মুখ বুজেই। কিন্তু ও যে বদলে যাবে তা আমি ভাবতেই পারিনি।
আমাকে ফেলেরেখে ও আমেরিকায় গেছিলো ওর ক্যারিয়ার আর গার্লফ্রেন্ড এর জন্যেই। এখন আমি সব বুঝতে পারি মা।"
কথা বলতে বলতে মার চোখ ভিজে যেতে লাগলো।
মা দিদুন কে কাঁপা কাঁপা গলায় বলতে থাকলো,
—"ওর চিরকাল বড্ডো উচ্চআখাঙ্খা ছিল মা। উঁচুতে ওঠার। অনেক উঁচুতে।
আমার আর টম এর চেয়েও ওর কাছে যখন ওর ক্যারিয়ার আর গার্লফ্রেন্ডই বড় ,তাই আমিও নিজেকেই সরিয়ে ফেললাম ওর জীবন থেকে।"
মা আস্তে আস্তে মাথাটা তুললো ,আর দিদুনকে বললো,
— "মা ,বুবু কেন আমার কাছে আসছে না ?"
দিদুন হেসে মা কে বলতে শুনলাম,
— "টমের কাছে এতদিন ওর দিদুনই যে ছিল আসল মা।"
আমার চোখে ভেসে উঠলো পুরোনো দিনের আবছা স্মৃতি। সেই ছয় বছর বয়স থেকেই দিদুনের কাছেই মানুষ হয়েছিলাম আমি ।
সেই ছোট্ট বেলায় মা যখন মুম্বাই থেকে অফিস ছুটি নিয়ে, আমার কাছে আসতো ,মা যে ঘরে ঢুকতো ,মার শরীরের গন্ধের সুবাস যেন ছড়িয়ে যেত ঘরটার চারপাশে।
ছোট বেলায় মা কে অনেক অনেক মিস করতাম। ছুটির দিনে মা দুপুরে বাড়িতে এলে , চুপি চুপি মা আর দিদুন বারান্দায় কথা বলতো নিজেদের মধ্যে ।
কারণ আমি দুপুরে ঘুম থেকে যেন উঠে না যাই। কিন্তু আমি দুপুরে ঘুমের মধ্যেও মায়ের আসার গন্ধের সুবাস অনুভব করতাম। মায়ের ধীর চলাফেরার শব্দ টের পেতাম ,কথা বলার গুঞ্জনের অনুভূতি পেতাম তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থাতেই।
মা আসার আনন্দে আমার ঘুম ভেঙে যেত। মায়ের শরীরের সেই চেনা গন্ধটা ছড়িয়ে যেতো ঘরের প্রতিটি কোনায়।
আমার তখন পনেরো কি ষোলো বছর বয়স হবে। একদিন হঠাৎ দিদুনের মুখে শুনলাম ,বাবা আর আমেরিকা থেকে ইন্ডিয়াতে ফিরবে না।
বাবা ও মায়ের মধ্যে ডিভোর্স হয়ে যায় । বাবা সেই সময়ে থেকেই আমেরিকায় থাকতো।ডিভোর্সের পর বাবার সাথে আমার নিয়ম মাফিক যোগাযোগ বজায় ছিল । কিন্তু খুব কম !
অবশ্য মা খুব একটা স্বচ্ছন্দ বোধ করতো না যে , আমি বাবার সাথে যোগাযোগ বজায় রাখি। সেটা মা আমাকে মুখফুটে না বললেও ,আমি বুঝতে পারতাম।
দাদু দিদুনের ফ্ল্যাটটা খুব বড় নয়। দুটো বেডরুম । দাদুর পরলোক গমনের পর একটায় আমি থাকতাম,অন্যটায় দিদুন।
সময়টা ধীর ছিল তখন । তবুও সাথে ছিল পড়াশোনা ,বন্ধু-বান্ধব,খেলাধুলা ,আড্ডা আর কিছু ব্যাস্ততা। আর এরই মাঝে ছিল একরাশ একাকীত্বতা।
ক্রমশ...