বাংলা গল্প- লালপট্টি - অধ্যায় ১
লালপট্টি
=======
"আগস্টের সকাল, দিনের বেলা গরম হলেও সকালটা সেরকম গরম হয় না, তবে ঠান্ডাও বলা যায় না।"
টুকুন সকাল সকাল বাইক নিয়ে বেরিয়েছে বন্ধুদের সাথে। সবাই কলেজের বন্ধু—কারো হাতে হারলে ডেভিডসনের গর্জন, কেউ চালাচ্ছে হোন্ডার সুইফ্ট, কেউ রয়েল এনফিল্ডের থাম্বস্টার্টার নিয়ে গর্বিত, আবার কারো সুজুকির ইঞ্জিনে মসৃণ গতির ছন্দ। টুকুনের পছন্দ? রয়েল এনফিল্ড—ক্লাসিক ডিজাইন, গভীর গর্জন, রাস্তার রাজা। তার বাইক ছুটছে বড় রাস্তা দিয়ে, বাতাসে উড়ছে তার হেলমেটের স্ট্র্যাপ।
তাদের গন্তব্য ছিল সিঙ্গুর, কলকাতা থেকে প্রায় চল্লিশ কিলোমিটার দূরের সেই প্রাকৃতিক অ্যাডভেঞ্চার স্পট, যেখানে সবুজের সমারোহ আর কাঁচা রাস্তায় বাইক চালানোর মজাই আলাদা। বন্ধুরা দল বেঁধে এগিয়ে চলেছে— কেউ স্টান্ট করার চেষ্টা করছে, কেউ গতি বাড়িয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। টুকুনের মনে হচ্ছিল, মুক্তির এই অনুভূতি, বন্ধুত্বের বন্ধন আর বাইকের নেশায় ভরপুর এই সকালটাই তো জীবনের আসল স্বাদ।
সিঙ্গুর, হুগলি জেলার এই প্রসিদ্ধ স্থানটি কলকাতা থেকে উত্তর-পশ্চিমে প্রায় চল্লিশ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। শিল্প, কৃষি আর রাজনৈতিক ইতিহাসের জটিল বুনটে গড়ে উঠেছে এর বিশেষ পরিচয়। অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের জন্য সিঙ্গুরের গ্রামীণ রাস্তাগুলো স্বর্গসমান—কাঁচা পথ, সবুজ ক্ষেত আর নদীর ধারের নির্জনতা মুক্তির স্বাদ এনে দেয়। কলকাতার এত কাছেই এমন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য খুঁজে পাওয়া সত্যিই দুর্লভ।
একসময় এই অঞ্চল ছিল কৃষিপ্রধান, যেখানে ধান, পাট, চা আর আলুর চাষ হতো। পাট শিল্প একদিন বাংলার অর্থনীতির মেরুদণ্ড ছিল, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে তার গুরুত্ব কমেছে। শহরের এত কাছেই এখনো সিঙ্গুরের কিছু অংশ যেন সময়ের সাথে তাল মেলাতে পারেনি—দারিদ্র্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সুবিধার অভাব এখানকার নিত্যসঙ্গী। * অধ্যুষিত এই এলাকায় . জনসংখ্যাও কম নয়, যা এখানকার সামাজিক-রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতিকে আরও জটিল করে তোলে।
যাইহোক, সবুজে ঘেরা গ্রামের সরু রাস্তায় বাইকের গতি কমিয়ে এনেছিল টুকুন, তবু ভোরের আবছা আলোয় দেখতে পায়নি সেই মাঝবয়সী লোকটাকে—যে কাঁধে মাছের হাড়ি নিয়ে হঠাৎই রাস্তা পার হচ্ছিল। ধাক্কাটা লাগতেই মাটির হাড়িটা উল্টে গেল, ঝনঝন শব্দে ছিটকে পড়ল নর্দমায়। কয়েক মুহূর্তের জন্য সবাই যেন জমে গেল।
"আল্লাহ, মাছগুলো...!"
লোকটার গলার স্বর যেন আকাশ থেকে ভেঙে পড়া বজ্রের মতো কেঁপে উঠল। সে হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল নর্দমার দিকে—তার চোখ দুটো যেন অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া প্রদীপের শিখা, জ্বলছে বিস্ময়ে, ক্ষোভে, আর এক অবিশ্বাস্য বেদনায়। ঠোঁট কাঁপছে, কিন্তু কথা বেরোচ্ছে না, যেন গলায় আটকে গেছে সমস্ত অভিমান।
টুকুনের গলা শুকিয়ে গেল—মুখে রুক্ষ তৃষ্ণা, হৃদয়ে এক অজানা ভার। পেছন থেকে বন্ধুরা এসে ঘিরে দাঁড়াল, তাদের বাইকের ইঞ্জিনের আওয়াজও যেন থেমে গেছে এই মুহূর্তের নিস্তব্ধতায়।
নর্দমার কালো জলে ভেসে যাচ্ছিল রুই-কাতলার ছোট ছোট পোনাগুলো—সোনালি আঁশগুলো যেন মৃত্যুর আগে শেষবারের মতো ঝলমল করে উঠল জলের উপর। কয়েকটা মাছ লাফাচ্ছে, প্রাণপণে, কিন্তু স্রোত তাদের টেনে নিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারের দিকে। এগুলো নিশ্চয়ই পুকুরে ছাড়ার জন্য আনা হয়েছিল—একটি কৃষকের স্বপ্ন, যার দাম টাকায় মাপা যায় না।
লোকটার পরণে ময়লা লুঙ্গি, কাঁধে জীর্ণ গামছা—তার রং মাটিতে মিশে যাওয়া ধূসর। হাঁটু পর্যন্ত ধুলোয় ভরা, ঘামে ভেজা শরীরে মাখা হয়েছে রাস্তার গরম ধুলো। তার হাতের তালু খসখসে, নখের কোণে মাটির দাগ—একজন মানুষের পরিশ্রমের ছাপ। এই মাছগুলোই হয়তো তার সপ্তাহের আশা, পরিবারের পেটের ভাত, কিংবা ছেলেমেয়ের বইয়ের খরচ।
টুকুনের চোখে ভেসে উঠল এক অদৃশ্য ছবি—একটি বাড়ি, ক্ষুধার্ত শিশুরা, অপেক্ষায় থাকা এক স্ত্রী। এই মাছগুলো শুধু মাছ নয়, এগুলো ছিল এক জীবনের টুকরো। আর এখন সেগুলো ভেসে যাচ্ছে নর্দমার কালো জলে—যেন ভাগ্যের হাসি।
"দাদা, আমি... আমরা খুব সোরি..." টুকুনের কণ্ঠে আটকে গেল। বন্ধুরা তড়িঘড়ি বাইক পার্ক করে এগিয়ে এল। কেউ নর্দমার পাশে ঝুঁকে দেখতে লাগল, কেউ লোকটার কাঁধে হাত দিল। কিন্তু ক্ষতি তো হয়ে গেছে।
"এসব মাছ কিনতে কত টাকা লাগে? আমরা দিয়ে দেবো," একজন বন্ধু জিজ্ঞেস করল। লোকটা মাথা ঝাঁকালো, "টাকার কথা না, বাবু... আজকে সকালেই পুকুরে ছাড়তে হবে, এখন আবার বাজার থেকে আনতে গেলে..." তার কণ্ঠে ছিল এক ধরনের অসহায়ত্ব।
টুকুনের মনে পড়ল, এই গ্রামেই হয়তো কৃষকদের জীবন এমনই—সময়ের সাথে প্রতিযোগিতা। একটা ছোট ভুলেই সারা দিনের পরিকল্পনা ভেস্তে যেতে পারে। বাইকের হেলমেট হাতে নিয়ে সে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকল, ভোরের রোদ যেন এবার তার মুখে জ্বালা ধরাচ্ছিল।
"চলো, আমি আপনাকে বাজারে নিয়ে যাই," শেষপর্যন্ত টুকুন প্রস্তাব করল। লোকটা প্রথমে আপত্তি করলেও, বন্ধুরা জিদ ধরে তাকে বাইকে তুলে নিল। রাস্তার ধারে পড়ে থাকা খালি হাড়িটা কুড়িয়ে নেওয়া হলো। টুকুন বন্ধুদের অ্যাডভেঞ্চার যাতে নষ্ট না হয় তাই বলল, "তোরা কন্টিনিউ কর, আমি একা লোকটাকে সাহায্য করতে পারবো, আর যতই হোক, আমার জন্য লোকটার ক্ষতি হলো।"
বন্ধুরা কিছুক্ষণ ইতস্তত করল। "তুই একা পারবি?" রাহুল জিজ্ঞেস করল, তার রয়েল এনফিল্ডের হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে ধরে। টুকুন মাথা নাড়ল, "হ্যাঁ, আমার জন্যই তো সমস্যা হলো। তোরা এগিয়ে যা, ট্রিপ করে বাড়ি ফিরে যা, আমি ঠিক বাড়ি ফিরে যাবো একা।"
বন্ধুরা একে একে বাইক স্টার্ট করল। হার্লে ডেভিডসনের গর্জন, হোন্ডার মসৃণ আওয়াজ—সবাই এগিয়ে চলল তাদের গন্তব্যের দিকে। টুকুন একলা দাঁড়িয়ে রইল সেই গ্রাম্য রাস্তায়, পেছনে মাঝবয়সী কৃষকটি তার বাইকের পিছনে বসে।
"নামটা জানা হয়নি আপনার," টুকুন বলল বাইক চালু করতে চালু করতে।
"ইসমাইল... ইসমাইল কাদের," লোকটা বলল। তার কণ্ঠে এখনও একটা কষ্ট লেগেছিল।
বাইক ছুটল গ্রামের সরু পথ ধরে। ইসমাইল পেছন থেকে বলতে লাগলেন, "এই মাছগুলো পাঁচ কিলো... সকাল সকাল কিনে এনেছিলাম বাজার থেকে। এখন আবার..."
টুকুনের গলা শুকিয়ে এল। সে জানত, এই গ্রামে একজন কৃষকের জন্য পাঁচ কিলো মাছ মানে হয়তো সপ্তাহের রেশন, কিংবা বাচ্চাদের কলেজের ফি।
হাটে পৌঁছে দেখা গেল মাছের দাম আজ আকাশছোঁয়া। "কী রে, আজকাল তো মাছের দাম চাঁদে!" এক বিক্রেতা হেসে বলল। ইসমাইল মাছের দাম শুনে কষ্ট করে বললেন, "আধা কিলোই নিই, মালিক। বাকিটা পরে..."
কিন্তু টুকুনের মন সায় দিল না। সে মোবাইল বের করে নিকটবর্তী এটিএম খুঁজতে লাগল। "একটু অপেক্ষা করুন," বলল সে।
ইসমাইল অবাক হয়ে দেখলেন, এই শহুরে ছেলেটা কীভাবে তার জন্য এত কিছু করছে। "তুমি তো বড় ভালো মানুষ বাবু," তিনি বললেন, তার চোখে একটু ভেজা ভাব।
টুকুন ফিরে এসে পুরো পাঁচ কিলো মাছই কিনে দিল। ইসমাইলের হাতে অক্সিজেন ভরা মাছের চারার ব্যাগটা দিতে গিয়ে সে বলল, "ব্যাস, হয়ে গেছে, এবার চলুন যাওয়া যাক, আপনার বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসি।"
ইসমাইল ইতস্তত করে বললেন, "শুকরিয়া, বাবু... আপনি যা করলেন... ইনশাল্লাহ..আপনি খুব ভালো মানুষ। আমি হেঁটেই চলে যেতে পারবো!"
টুকুন ভালো পরিবারের ছেলে। ওর বাবা নামকরা ডাক্তার, মা কলেজের অধ্যাপিকা। ছোটবেলা থেকেই মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ, সহমর্মিতার শিক্ষা পেয়েছে। সে জোর দিয়ে বলল, "ইসমাইল চাচা, আপনি হেঁটে গেলে অনেক সময় লাগবে। আমার বাইকে চড়ে যাওয়া যাক—আমি আপনাকে দ্রুত পৌঁছে দেব!"
ইসমাইলের চোখে জল এসে গেল। এই শহুরে ছেলেটির আচরণে সে অভ্যস্ত নয়। সাধারণত এখানে শহর থেকে আসা তরুণরা গ্রামের মানুষকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেই অভ্যস্ত। কিন্তু টুকুনের ব্যবহারে একটা অন্যরকম মমতা খুঁজে পেল সে।
"আচ্ছা বাবু, যদি খুব ঝামেলা না হয়..." বলতে বলতে ইসমাইল টুকুনের বাইকের পিছনে সওয়ার হলেন।
টুকুন বাইক চালু করল। এবার তাদের গন্তব্য—ইসমাইলের বাড়ি, যে বাড়ির কথা টুকুন কল্পনায় দেখেছিল। ক্ষুধার্ত শিশু, অপেক্ষমান স্ত্রী, আর একটি কৃষক পরিবারের সংগ্রামী জীবন। রাস্তার ধারে ধারে সবুজ ক্ষেত, মাঝে মাঝে পুকুর—যেখানে হয়তো ইসমাইলের কষ্টার্জিত মাছগুলো ছাড়ার কথা ছিল।
বাইক এগিয়ে চলল। ইসমাইল পেছন থেকে পথ দেখিয়ে বললেন, "বাবু, ওই গলি দিয়ে যেতে হবে..."
টুকুন মাথা নেড়ে বলল, "নিশ্চয়ই চাচা, এই সরু রাস্তাটা?"
শুরু হলো গ্রামের কাঁচা পথ—এবড়ো-খেবড়ো, কিন্তু চারিদিকে শুধু সবুজের সমারোহ। বাইক ধীরে ধীরে এগোচ্ছে, কখনো ডালপালা এড়িয়ে, কখনো গর্ত পেরিয়ে। এই রাস্তায় গাড়ি চলবে না, এখানে তো শুধু ভ্যান রিকশা আর গরুর গাড়িরই চলাচল। মাঝে মাঝে পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে গ্রামের মানুষ—কেউ মাথায় কলসি নিয়ে, কেউ বা হাতে কাস্তে ধরে ক্ষেতের দিকে।
ইসমাইল আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বললেন, "ওই দেখুন বাবু, ওই আমগাছটা পেরোলেই আমার বাড়ি।"
টুকুনের চোখে পড়ল—একটা পুরনো আমগাছ, তার নিচে দু-তিনটা মাটির ঘর। বাড়ির সামনে একটা ছোট উঠোন আর তার পাশেই একটা পুকুর।
বাইকটা আমগাছের ছায়ায় থামতেই ইসমাইল নেমে পড়লেন, মাছের ব্যাগটা হাতে নিয়ে। টুকুনও বাইক থেকে নামল, হেলমেট খুলে রাখল।
এমন সময় ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন ইসমাইলের স্ত্রী—গ্রাম্য সরলতায় ভরা, শ্যামলা রঙের শরীরে যেন সোনালি রোদ্দুরের আভা। ছিপছিপে গড়ন, নারীসুলভ কোমলতা মাখা; না বেশি রোগা, না মোটাসোটা—যেন প্রকৃতি নিজেই ঠিক করে রেখেছে নারীর সৌন্দর্যের পরিমাপ। গায়ে সাদা সুতির শাড়ি, মাথায় আঁচলের নিচে আধো-ঢাকা চুলের গুচ্ছ। হাতের সবুজ চুড়িগুলো ঠন ঠন শব্দে যেন বলছে গ্রামবাংলার গল্প। বয়স কচিৎ তিরিশ পার—শহুরে আলো-হাওয়ায় থাকলে হয়তো ফ্যাশন পত্রিকার মডেলদের মতো চমকাতেন। কিন্তু গ্রামের মাটি-জলে গড়া এই রূপটাই যেন বেশি প্রাণবন্ত, বেশি সত্যি। অচেনা শহুরে যুবকটিকে দেখে তাঁর চোখে ভেসে উঠল এক অদম্য কৌতূহল—লাজুক, তবু উৎসুক।
ইসমাইল বললেন, "আমিনা, এঁই শহর থেকে আসছেন, আমার জন্য মাছ কিনে দিয়েছেন... বড় ভালো মানুষ।"
মহিলাটি দুই হাত জোড় করে বললেন, "আসসালামু আলাইকুম, বাবু। দোয়া করবেন আমাদের জন্য।"
টুকুন একটু লজ্জা পেয়ে বলল, "নমস্কার, খালা। আমি তো কিছুই করিনি..."
ইসমাইল মাছের ব্যাগটা স্ত্রীর হাতে দিলেন, "এগুলো এখনই পুকুরে ছেড়ে দিও, নাহলে মরে যাবে।"
টুকুন দেখল, বাড়ির পাশেই একটা ছোট পুকুর—জলে কয়েকটা মাছের পোনা ইতিমধ্যেই লাফাচ্ছে।
"চাচা, আমি এখন যাই তাহলে," টুকুন বলল।
ইসমাইল জোর দিয়ে বললেন, "না বাবু, একটু চা খেয়ে যাবেন! আমার স্ত্রী খুব ভালো চা বানায়!"
টুকুন ইতস্তত করছিল, কিন্তু ইসমাইলের আন্তরিকতায় না বলতে পারল না। "আচ্ছা চাচা, এক কাপ চা খেয়েই যাবো তখন," বলতে বলতে সে আমগাছের নিচে পাটি পেতে বসে পড়ল।
টুকুন আমগাছের ছায়ায় বসে গরম গরম চা খেতে লাগল। ইসমাইল চাচা আর তার স্ত্রী আমিনা বেগমের সাথে কথা বলতে বলতে তার ভালোই লাগছিলো। আমিনা বেগম পুরো ঘটনা শুনে বারবার টুকুনকে ধন্যবাদ জানালেন, "আল্লাহ আপনাকে ভালো রাখুক বাবু। আপনার মতো ভালো মানুষ আজকাল আর কোই।"
টুকুন লজ্জা পেয়ে বলল, "আপনি এত ধন্যবাদ দিচ্ছেন কেন খালা? আমি তো সামান্য একটা সাহায্য করেছি মাত্র।"
ইসমাইল চাচা একটু হেসে বললেন, "বাবু, তোমার কাছে সামান্য মনে হলেও আমাদের জন্য এটা অনেক বড় ব্যাপার।"
টুকুন তাদের জীবন সম্পর্কে জানতে চাইল। ইসমাইল একটু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "বাবা, আল্লাহর ইচ্ছায় জীবন চলে যাচ্ছে। আমাদের কোনো সন্তান হয়নি, তাই এই ছোট্ট পরিবার নিয়েই আছি। গ্রামের পুকুর থেকে মাছ ধরে, কখনো গ্রামের হাটে বিক্রি করে, কখনো বাড়ি বাড়ি দিয়ে কোনো মতে সংসার চালাই।"
আমিনা বেগম চোখ মুছতে মুছতে যোগ দিলেন, "গত বছর ইসমাইলের জ্বর হয়েছিল, তখন তো একেবারে হাড্ডিসার অবস্থা হয়েছিল আমাদের। আল্লাহ মেহেরবানি করে আবার সামলে দিয়েছেন।"
টুকুনের চোখে জল চলে এল। সে কলকাতার বিলাসবহুল জীবনের কথা ভাবল, যেখানে তার বাবা-মা তাকে সব সুবিধা দিয়ে রেখেছেন। এই সাধারণ মানুষের সংগ্রামী জীবন তাকে গভীরভাবে নাড়া দিল।
"চাচা, আপনাদের জন্য আমি কিছু করতে পারি?" টুকুন আন্তরিকভাবে জিজ্ঞেস করল।
ইসমাইল মাথা নাড়িয়ে বললেন, "না বাবু, তুমি আজ যা করেছ, তাই-ই যথেষ্ট। তোমার মতো ভালো মানুষ পেয়ে আমরা সত্যিই ধন্য।"
টুকুন কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল, "শহরের এত কাছেই এমন সুন্দর গ্রাম আছে, আমি তো জানতামই না! গ্রামটার নাম কী চাচা?"
ইসমাইল হাসিমুখে উত্তর দিলেন, "এটা আমাদের ছোট্ট গ্রাম - লালপট্টি। কলকাতার এত কাছেই, তবু শহরের কোলাহল থেকে একেবারে আলাদা।"
টুকুন মুগ্ধ দৃষ্টিতে চারিদিক দেখতে লাগল, "লালপট্টি... নামটাই তো কী সুন্দর! সত্যিই যেন সব চিন্তা থেকে মুক্ত এই জায়গা।"
আমিনা বেগম মৃদু হেসে বললেন, "গ্রামের নাম শুনেই তো আপনার মুখে হাসি ফুটেছে বাবু। এখানে মূলত মুচি, মেথর আর জেলেদের বাস। লোকসংখ্যা কম, সবাই সবাইকে চেনে। আমরা নিচুজাত হলেও কাউকে দূরে রাখি না।"
ইসমাইল গর্বিত কণ্ঠে যোগ দিলেন, "হ্যাঁ বাবু, আমাদের লালপট্টিতে মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ নেই। তুমি ভালো মানুষ বলেই আমাদের গ্রামে এলে, এত সাহায্য করলে।" একটু অভিমান করে বললেন, "বাঙালিরা তো সাধারণত আসেই না... আমাদের ধর্মের কেউ আসে না, সবাই আমাদের ছোট মনে করে!"
টুকুনের মনে পড়ল কলকাতার বিভক্ত সমাজের কথা। আবেগজড়িত কণ্ঠে সে বলল, "চাচা, তোমার গ্রামটা খুব সুন্দর, আমার খুব ভালো লেগেছে, আর তুমি তো খুব ভালো মানুষ।" বলে সে ইসমাইলকে জড়িয়ে ধরে বলল, "আমার মায়েরও নিশ্চয়ই এই গ্রামটা খুব ভালো লাগবে।"
টুকুন জড়িয়ে ধরাতে ইসমাইলের চোখে অশ্রু জমে এল। তিনি টুকুনের কাঁধে হাত রেখে বললেন, "বাবু, তুমি আজ আমাদের হৃদয় জয় করে নিলে। তোমার মতো শিক্ষিত শহুরে ছেলে আমাদের গ্রামে এলে, আমাদের বাড়িতে চা খেলে... এটা আমাদের জন্য বড় সম্মানের কথা। ইন্শাল্লাহ"
আমিনা বেগম খুশিতে কেঁপে উঠলেন, "আল্লাহ তোমাকে অনেক বড় মানুষ করুক বাবু! তুমি আমাদের ছোট গ্রামের মাটিতে পা দিয়েছ, এটাই আমাদের ভাগ্য।"
টুকুন আবেগ আটকে বলল, "চাচা, খালা... আপনারা তো আমার পরিবারের মত।"
আমিনা বেগম মায়ের স্নেহভরা কণ্ঠে বললেন, "বাবু, সময় পেলে আম্মাকে নিয়ে আসবেন, আমাদের ওকাদ মতো যত্ন নেব।"
ইসমাইল চাচা খিলখিল করে হেসে উঠলেন, "হ্যাঁ রে বাবু! তোমার মাকে আমাদের এই ছোট্ট কুঁড়েঘরে একবার খাওয়াতে পারলে আমাদের জীবন ধন্য হবে। আর আমাদের লালপট্টির হাটবাজারে সবাই খুশি হবে। এখানে তো যেই আসে, সবারই মেহমান। জাত-পাত দেখি না আমরা।"
টুকুন নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল। লালপট্টির শেষ আলোয় আমিনা খালার শাড়ির আঁচল আর ইসমাইল চাচার ক্লান্ত চোখের জল মনের গভীরে অমোঘ দাগ কেটে গেল। বাইকের চাবি ঘুরাতে গিয়ে হঠাৎ থেমে গেল—যেন সময়টাই এক পলক জমে থাকল। মানিব্যাগ থেকে কয়েকটা কুঁচকানো নোট বের করে আমিনা বেগমের দিকে এগিয়ে দিল, "খালা, এদিকে একটু আসো তো..."
আমিনা দুই হাত পিছু হটে গেলেন, "না বাবু, এটা আমরা নিতে পারবো না... তুমি তো আমাদের অন্ধকারে আলো দিয়েছ..."
টুকুর গলায় জেদের টান, "নাও খালা, এটা তোমারই প্রাপ্য।" টাকাগুলো আমিনার শক্ত হাতের তালুতে গুঁজে দিতে গিয়ে লক্ষ করল—তেল-মাটি-মাখা সেই আঙুলগুলো কত যেন কাঁপছে। "নতুন জামা-কাপড় কিনো... " বলতে বলতে তার নিজের মন যেন ভারী হয়ে এল।
ইসমাইল চাচা মুখটা ঘুরিয়ে নিলেন। তাঁর গলার স্বর ভেঙে এল, "বাবু... তুমি আমাদের..." বাকিটুকু আর বেরোয় না। শুধু ঝিলিক দিয়ে পড়ল এক ফোঁটা জল, ধুলো মাখা জমিনে মিলিয়ে গেল।
টুকুন তড়িঘড়ি বাইকে চড়ে বসল। পেছন থেকে আসা কৃতজ্ঞতার বাণীগুলোকে যেন শুনতে না পায়—তাড়াতাড়ি, খুব তাড়াতাড়ি দূরে সরে যেতে হবে। "আবার আসবো চাচা, কথা দিলাম!" গলা বাড়িয়ে বলেই গ্যাস টান দিল। বাইকের ইঞ্জিনের শব্দে ডুবে গেল গ্রামের শেষ বিদায়ের মুহূর্তগুলো।
পিছন থেকে ইসমাইল আর আমিনার কণ্ঠ ভেসে আসছিল, "আল্লাহ তোমাকে ভালো রাখুক বাবু!"
গ্রামের শেষ বাড়িটা পেরোনোর পর টুকুন একবার পিছন ফিরে তাকাল। দূর থেকে ইসমাইল চাচা আর আমিনা বেগম দাঁড়িয়ে আছেন, হাত নাড়িয়ে বিদায় জানাচ্ছেন। লালপট্টির মাটির রাস্তা, আমগাছের ছায়া, আর সেই সাধারণ মানুষের ভালোবাসা - সবকিছুই এখন তার জীবনের অমূল্য সম্পদ।
- চলবে