চারুলতা (উপন্যাস) (সম্পূর্ণ) - অধ্যায় ৪০
চারুলতা
লেখক - কামসম্রাট
পর্ব - ৩৮
এই সমুদ্র ও অরণ্যের মাঝে অনেকগুলো দিন আমাদের কেটে গেল। মা বাড়ি যেতে চাইছে, কিন্তু আমার মন চাইছে না আর ফিরে যেতে। সকালে সমুদ্রে দুজনে রতি ক্রিয়ায় মেতে উঠি। তারপর জঙ্গলেই কাটে বাকি দিনটা। আবার বিকেলে সূর্যাস্তের সময় সৈকতে এসে পাশাপাশি মা আর আমি বসে পশ্চিমাকাশে ঢলে যাওয়ার সূর্যের দিকে চেয়ে বসে থাকি, গল্প করি।
পরিস্কার আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ উঠেছে আজ। সেদিন রাতে মাকে আদর করার পর তার চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলাম। সমুদ্রের গর্জন এই গভীর রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে দিয়ে যাচ্ছে। ভাবলাম মাকে নিয়ে এই জ্যোৎস্নালোকিত সমুদ্রতটে একটু বেড়িয়ে আসি। এই অভিজ্ঞতা জীবনে বার বার হয় না।
- চারু...চলো একটু ঘুরে আসি।
- এখন? এই মাঝরাতে?
- তোমার ভয় করছে চারু?
- হুমম।
- ভয় কি.... তোমার স্বামী আছে তো!
আজ রাত ৯ টা নাগাদ ভাটা শুরু হয়েছে। আবার ভোর ৫ টায় জোয়ার আসবে। মাঝের এই সময়টায় জল তীর থেকে অনেক দূরে গড়িয়ে চলে গেছে। তীর দিয়ে আমরা মা ছেলে নগ্ন শরীরে হেঁটে চলেছি চাঁদের রূপোলী জ্যোৎস্নায় ভরা বিন্দির এই সমুদ্র সৈকতে! কি অপরূপ এই দৃশ্য, তা বুঝি শব্দে প্রকাশ করা যায় না! এই নির্জন রাতের নিস্তব্ধতা খান খান করে সমুদ্রের ঢেউয়ের গর্জন এই অন্ধকারে মনের অবচেতনেই এক বিভীষিকার সঞ্চার করে দিয়ে যাচ্ছে! চাঁদের আলোয় মায়ের নগ্ন নধর শরীরটা দেখে বেশ মায়াবী লাগছিল। এমন কোনো দেশ রয়েছে যেখানে আমরা এইভাবে উলঙ্গ শরীরে মুক্তভাবে এই গভীর রাতে সমুদ্র সৈকতে হেঁটে বেড়াতে পারি? বোধহয় নেই!
- তুমি আমায় বাড়ি নিয়ে চলো, লতা কেমন আছে, তোমার বাবা কেমন আছে, কে জানে! ওরা কি ভাববে বলোতো?
আমাদের ছোটো ছোটো সাধারণ কথা কিছুসময় কত বড়ো বড়ো বার্তা নিয়ে আসে, আমরা কি তা সবসময় বুঝি? মায়ের এই সামান্য একটা কথা যে ভবিষ্যতের এক অঘটিত কষ্টদায়ক ঘটনার ইঙ্গিত দিচ্ছে আমাদের, তা যদি সেদিন বুঝতাম !
- ফিরবো চারু...আমরা পরের সপ্তাহেই ফিরে যাবো গোবাদায়।
মা আমাকে জড়িয়ে ধরলো আনন্দে।
- আচ্ছা চারু....আমরা কখন সংসার শুরু করবো, কিছু ভেবেছো?
- সংসার করছি তো!
- না, এমনটা নয়, এমনভাবে নয়, সমাজে স্বামী-স্ত্রীরূপে বাস করবো আমরা। আমাদের সন্তান আসতে চলেছে। তার জন্ম ওই গোবাদায় হোক, তা আমি চাই না।
- কিন্তু সবাইকে ছেড়ে আমরা যাবো কিভাবে তুমি বলো?
- সবাইকে ছেড়ে যাবো না চারু। লতা তো স্বামীর ঘরেই থাকবে। আর আমরা বাবাকে আমাদের সঙ্গে নিয়ে চলে যাবো গোবাদা ছেড়ে অন্য কোথাও। যেখানে আমরা যে মা ছেলে, এই পরিচয় কেউ জানবে না। সেখানে তোমায় নিয়ে আমি আমার ঘর বাঁধবো। এইভাবে লুকিয়ে লুকিয়ে আমি বাঁচতে চাই না। আমি যে কোনো অপরাধ করিনি চারু.... শুধু তোমায় ভালবেসেছি!
- আচ্ছা। কিন্তু কোথায় যাবে?
- উত্তরে নদীর তীরে একটা ছোটো গ্রাম আছে, নাম বনছায়াপুর, ওখানেই চলে যাবো। আমি অনেক আগে থেকেই সব ঠিক করে রেখেছি। ওখানে একটা বাড়ি ও কাজের ব্যবস্থাও হয়ে গেছে। তোমাকে আর বাবাকে নিয়ে এবার চলে যাবো গোবাদা ছেড়ে।
- তুমি এত কিছু ভেবে রেখেছো....আমায় বলো নি যে আগে?
- এই তো বললাম। বাড়িতে যেরকম ভিড়, তাতে এসব কথা তোমায় কখন বলি বলো! যেটুকু সময় পায়, তোমাকে আদর করতেই তা পার হয়ে যায়....! দুটো মনের কথা বলার অবকাশ কোথায়!
- ওখানে আমরা কোথায় থাকবো?
এবার মায়ের প্রশ্ন শুরু হলো। মেয়েরা কোনো স্বপ্ন দেখা একবার শুরু করলে, তা আরো ভালো করে দেখতে চায়। আমার কাছে নতুন ঘর বাঁধার কথা জানার পর থেকেই তার ছোট্ট হৃদয় প্রশ্ন ছুড়তে শুরু করে দিলো অবিরাম। বউয়েরা এমনই! আমি মাকে আমার সাথে জড়িয়ে ধরে হেঁটে চললাম এই জ্যোৎস্নালোকিত নির্জন সমুদ্র সৈকতে আর মায়ের গলার আওয়াজ ভেসে যেতে লাগলো দূরে....সমুদ্রের ঢেউয়ের উপর দিয়ে...!
ভাবলাম বিন্দি থেকে যাওয়ার আগে পাহাড় থেকে ঘুরে আসবো দুজনে।
খুব সকালে বেরিয়ে পড়লাম আমরা। সমুদ্র, তার তীরেই পাহাড়ের সারি, আর এই পাহাড়ের পাদদেশেই জঙ্গল। জঙ্গল কেটে উপরের দিকে যত উঠছি, জঙ্গলের ঘনত্ব তত কমে আসতে লাগলো। প্রায় ২ ঘন্টা একটানা ওঠার পর জঙ্গল শেষ হয়ে পাহাড়ের চূড়া দেখা গেল। কিন্তু মা আর চলতে পারছে না। এতটা চড়াইয়ে মা হাঁপিয়ে উঠেছে। পাহাড়টা খাড়া নয়, অনেকটাই তির্যক। তাই আমার উঠতে একদমই কষ্ট হচ্ছিল না। কিন্তু মা পারছে না আর। তাকে কোলে নিয়ে এবার পাহাড়ে ওঠা শুরু করলাম। মা ভয়ে আমার গলা জড়িয়ে ধরে রেখেছে। আমি তার গায়ের ঘ্রাণ নিতে নিতে উপরে উঠতে লাগলাম।
কিছুদূর উঠে দেখলাম এখানে আর ওঠা যাবে না, এই জায়গায় পাথর কিছুটা ভেঙে গিয়ে বড়ো খাদের সৃষ্টি হয়েছে আর সেই খাদের ওপারে চূড়ায় ওঠার রাস্তা। সুতরাং যাত্রা এখানেই শেষ করে মা কে কোল থেকে নামালাম। তারপর দুজনে পাশাপাশি বসে দূরের আকাশ প্রান্তে তাকিয়ে রইলাম।
- দেখছো চারু....এই উচ্চতা থেকে সমুদ্রটাকে পরিস্কার দেখা যাচ্ছে।
- কত জল! যতদূর চোখ যায়, শুধু জল....! আচ্ছা আমরা কবে যাবো?
- আর দুটো দিন কাটিয়েই আমরা চলে যাবো...!
- না, ওই বনছায়াপুরে?
মা আমার সঙ্গে নতুন সংসার শুরু করার জন্য এতো খুশি...এতো তাড়া তার! আমি তাকে জড়িয়ে ধরলাম আমার বুকে।
- বাড়ি ফিরে যাই, লতা যাক শশুরবাড়ি, তারপরেই আমরা চলে যাবো।
- তোমার বাবাকে সঙ্গে নেবো...উনিও শেষ বয়সটা আমাদের সঙ্গেই কাটাবেন!
মাকে যতই দেখছি, ততই মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছি। কিছু মাস আগে পর্যন্ত যে ছিল তার স্বামী, আজ সে হল তার শ্বশুরমশাই। আর মা তা খুব স্বচ্ছন্দেই মানিয়ে নিয়েছে।
- চারু, তুমি বললে কন্যা সন্তান চাও.... কিন্তু যদি পুত্র হয়?
- হবে! তুমি যা দেবে, আমি তাতেই খুশি গো!
- আমি কিন্তু মাত্র একটিই সন্তান নেবো!
- কেন? তুমি যে বলেছিলে দুটো সন্তান?
কতদিন আগে মিলনের সময় আমার মুখ দিয়ে এই কথা বেরিয়ে গিয়েছিল, মা সেটা এখনো মনে রেখে দিয়েছে!
- তোমার দুটো চায়?
- না। তুমি যেমন বলবে।
- আমি একজনকেই চাই।
- কেন?
চোখ গোল গোল করে আমার পানে কৌতুহলী হয়ে তাকালো মা। তার এমন মুখ দেখে আদর করতেই ইচ্ছে হয়।
- কারণ বেশি নিলে তোমার কষ্ট হবে চারু!
মায়ের চোখদুটো জলে ভরে এলো। তার প্রতি স্বামীর এতখানি যত্ন দেখে তার মনে আনন্দের সুর ভেসে উঠলো।
- তুমি....তুমি আমাকে এখনও মা-ই মনে করো?
- তুমি যে আমার মা চারু, মনে করার কথা আসছেই না। কিন্তু তোমায় আমি স্ত্রী রূপে দেখি!
- কিন্তু আমি চাই...!
- তুমি চাও?
- আমি চাই তুমি আমাকে মা রূপে দেখো না।
- তবে?
- আমি তোমার স্ত্রী। শুধু এইভাবেই স্ত্রী রূপেই আমি বাকি জীবনটা কাটাতে চায় তোমার সঙ্গে!
এক ঝাঁক পাখি ডাকতে ডাকতে চলে যাচ্ছে আমাদের থেকে কিছুটা দূরেই। দূরের সমুদ্র, নীচের জঙ্গল, দুপাশের পাহাড়ের সারি, এই পাখির ঝাঁক ও মায়ের এই কথা শুনে মন আমার উতলা হয়ে উঠলো। মা শুধু আমাকে স্বামী রূপেই চায়! আমরা যে মা-ছেলে, এই সম্পর্ক মা আর মনে রাখতে চায় না! আহা। এত সুখ আমি যে জীবনে কোনোদিন পাবো....এই নির্জন প্রকৃতির মধ্যে না এসে পড়লে বোধহয় তা থেকে আমি বঞ্চিত-ই থেকে যেতাম।
দূরের ওই দিগন্তের দিকে চেয়ে আমি প্রাণ ভরে এই সুখ রস পান করলাম। একইসঙ্গে মনে হল এতো যে সুখ আমি পেলাম, এর পেছনেই কোনো দুঃখ সে বয়ে আনছে না তো! এই যে চারুলতাকে আমি এতো খুশি দেখতে পাচ্ছি, চারুলতার এই খুশি জীবন সৈকতে পরমুহূর্তেই হারিয়ে যাবে না তো! আমি যে চারুলতার জন্যেই ভয়ে ভয়ে বেঁচে আছি। যদি তার কোনো ক্ষতি হয়, আমি যে আর বাঁচবো না!
অদৃষ্ট আমাদের গোপনে কি খেলা খেলে চলেছে তা আমাদের জানা সম্ভব নয়.... পরমুহূর্তে কি ঘটবে, এই মুহূর্তে আমরা কেউ তা জানি না! বিন্দি থেকে বাড়ি ফিরে গিয়ে আমাদের জন্য কি অপেক্ষা করছে, তা আমরা জানতাম না!
(ক্রমশ.....)