চারুলতা (উপন্যাস) (সম্পূর্ণ) - অধ্যায় ৪৩
চারুলতা
লেখক - কামসম্রাট
পর্ব - ৪১
সন্ধ্যায় বাবার পাশে বসে আছি। চারু বাবার সেবা ছাড়া তার কাছে আসে না। সে বাবাকে এই অবস্থায় দেখতে পারে না যে! চোখ দুটো তার কেঁদে কেঁদে ফুলে উঠেছে! বাবার গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোনোও প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ইশারায় কথা বলে। আমায় হাত নেড়ে ডাকছিল কিছুক্ষণ আগে। আমি তার পাশে বসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলাম। তার দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে বালিশ ভিজিয়ে দিচ্ছে।
- ব্যাটা.....!!
গলাটা কেউ জোরে চেপে ধরলে গলার ভেতর থেকে যেমন একটা খসখসে আওয়াজ বেরিয়ে আসে, সেইরকমই শোনালো বাবার গলাটা আজ।
- বলো বাবা, এই তো তোমার পাশেই বসে আছি। জল খাবে?
- নিশীথ....আমি.....ওদের....!!!
কথা আটকে যাচ্ছে বাবার, তবুও চেষ্টা করে যাচ্ছে আমাকে কিছু বলার। আমার চোখ দুটো ভিজে এলো বাবাকে এভাবে দেখে। কি ছিল, আর আজ কি হল!
- তুমি ঘুমোও বাবা, কষ্ট হবে কথা বললে...!
- আমি....ওদের.....কথা....শুনে ....ফেলেছি......তোর.....তোর..... বউয়ের....!
বাবার চোখদুটো যন্ত্রনায় ছটফট করছে। আমার হাত দুটো ধরে বাবা চারুর ব্যাপারে কিছু জানিয়ে দিয়ে যেতে চাইছে আমায়! কিন্তু কি! বাবা নিশীথের কথা বললো....কি বলতে চাইছে বাবা?
- চারুর...কি বাবা?
- তোর..... বউয়ের....খুব.....বিপদ....!!!!
চারুর বিপদ! বাবার চোখ বেয়ে অঝোরে জল গড়িয়ে পড়ছে।
- কি বিপদ বাবা? তুমি বলতে পারবে? ও বাবা!
বাবার পাশের ঘরই লতার। বোধহয় লতা আর নিশীথের কোনো গোপন কথা বাবা শুনে ফেলেছে এইজন্যই। বাবা কিছুক্ষণ আমার দিকে চেয়ে রইল। ইশারায় জল দিতে বললো। জল খেয়ে বাবা আমার কাঁধে হাত রেখে অনেক কষ্টে আরও কয়েকটা শব্দ উচ্চারণ করতে পারলো,
- জানিনা.....! আমায়.... কথা ....দে.....তুই....!
দম শেষ হয়ে যাচ্ছে বাবার, গলায় তীব্র ব্যাথায় কথা আটকে গেল।
- হ্যাঁ বাবা, বলো পুরোটা....যা বলবে তাই করবো আমি....!!!
- কথা.....দে......তুই.....রক্ষা........ করবি ......চারুকে......!
আমি বাবাকে জড়িয়ে ধরলাম।
- করবো বাবা..... শেষ নিঃশ্বাস অবধি ওকে রক্ষা করে যাবো বাবা....!!!
বাবা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে একটু হেসে বললো....এটাই বাবার শেষ কথা......!
- তোরা........সুখি..........হ........!!!!!!!!!
বাবা চোখ বন্ধ করলো। তার হাতটা আমার মাথা থেকে বিছানায় পড়ে গেল, দেহটা শিথিল হয়ে পড়লো।
- ও বাবা.....!!!!!!!!!
বাবা আর চোখ মেলে তাকালো না। চারু আমার চিৎকারে ঘরে এসে বাবার পায়ের কাছে আছড়ে পড়ে কাঁদতে লাগলো। আমার বুক ফেটে আর্তনাদ বেরিয়ে এলো.... এতদিনের চাপা কান্নাটা আজ প্রকাশ হয়ে পড়লো!
- বাবা......আমরা তোমাকে নিয়ে যাবো বাবা.....চোখ খোলো.... এখানে তোমায় কেউ দেখবে না গো......তুমি চলে গেলে আমাদের ছেড়ে.....ও বাবা......আমায় এখন থেকে কে বকবে গো....কে শাসন করবে......এই দ্যাখো আমি বসে আছি..... একবার ব্যাটা বলে ডাকো বাবা.....একবার ব্যাটা বলে ডাকো......…....ও....বাবা.......!!!!!!!!!!!!!!
যাওয়ার সময় বাবা আমাদের দুজনকে সুখী হওয়ার আশীর্বাদ করে গেলো আর চোখ বন্ধ করলো হাসিমুখে। মাথার উপরে যে বটবৃক্ষটা এতদিন অসংখ্য দুর্যোগ থেকে আমাদের রক্ষা করে আসছিল, আজ তা মাটিতে মিশে গেল! এই নিষ্ঠুর জগতে আমি আর চারু এখন একলা দাঁড়িয়ে আছি। চারুকে বুকে জড়িয়ে ধরলাম।
বাবার শোকে কিছুদিন অচৈতন্যের মতো কাটলো আমাদের দুজনের। হৃদয় থেকে একটা অংশ বিচ্ছিন্ন করে দিলে যেমন অবস্থা হয়, তেমনি অনুভব করলাম।
একদিন সকালে বারান্দায় বসে আছি। রিনু আর মিনুর দিকে তাকিয়ে তাদের খড় খাওয়া দেখছি। চারু গেছে নদীতে স্নান করতে। লতা তার ঘরে দুজন খদ্দের ডেকে রতি ক্রিয়ায় মেতে উঠেছে। তাদের শীৎকারে চারপাশ পূর্ণ। বাবার মৃত্যুতে লতা একবারের জন্যও এদিকে আসেনি, এমনকি শেষবারের জন্য বাবার মুখ দর্শনও করেনি। কারণ তখন তার ঘরে খদ্দের এসেছিল। নিশীথ এখন বাড়িতে নেই।
কত কি ভাবছিলাম বসে বসে। তার মধ্যে প্রধান চিন্তাটা হলো বাবার শেষদিনের কথাটা নিয়ে...'তোর বউয়ের খুব বিপদ!'....কি বিপদ! লতা আর নিশীথ আমার চারুর কি ক্ষতি করতে চায়?
এইসব ভাবছিলাম, এমনসময় চারু ছুটে এলো বাইরে থেকে। আমি তাকে উঠে গিয়ে জড়িয়ে ধরলাম।
- কি হয়েছে চারু?
মা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো আমার বুকে।
- ওরা....ওরা সবাই জেনে গেছে গো....জেনে গেছে!!!
- কে জেনে গেছে? কি জেনে গেছে?
- আমাদের সম্পর্কের কথা গো.....সারা গাঁয়ের লোক জেনে গেছে....ওরা আসছে....!!!!!!
আমার ভেতরটা কেঁপে উঠলো এই খবরটা শুনে। তাহলে শেষ পর্যন্ত লতা আর নিশীথ সবাইকে জানিয়েই ফেললো? ওরা আমাদের কারোকেই বাঁচতে দিতে চায় না আর? একটার পর একটা আঘাত? বাবা কি তবে চারুর এই বিপদের কথাই বলছিলো?
- আর কতো.....আর কতো বলতে পারো....?
নিজের অদৃষ্টকে মনে মনে প্রশ্ন করলাম। এমনসময় লতার ঘর থেকে তার খিলখিলিয়ে হেসে ওঠার আওয়াজ ভেসে এলো,
- কি রে দাদা....মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক বানাবি, তো বুক ফুলিয়ে সবার কাছেই বানা না....ওভাবে লুকিয়ে চুরিয়ে কেন? সেইজন্যেই আমি সবাইকে জানাবার বন্দোবস্ত করেছিলাম। আমি তোদের ভালো চাই রে! ভেবেছিলাম তোরা সমাজে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে স্বীকৃতি পা....!
খদ্দেরের সঙ্গে সঙ্গমে লিপ্ত থেকেই এই কথাগুলো সে বললো। তার কথার আর তেমন মূল্য নেই আমার কাছে। আমরা এমনিতেই চলে যাবো এখান থেকে। আমি আর চারু প্রস্তুতি নেওয়াও শুরু করে দিয়েছি। ভেবেছিলাম গাঁয়ের লোকের কাছে এটা অজানাই থাক্। সম্পর্ক যত পবিত্রই হোক না কেন, সমাজের ধারার প্রতিকূলে গেলেই তার বিরূদ্ধে সবাই এগিয়ে আসবে। আজ লতার জন্য সত্যিই তারা এগিয়ে এলো... পাঁচিলের দরজায় টোকা মারলো অনেকগুলো হাত.... একসঙ্গে!
- চারু, ঘরে ঢোকো.... আমি ছাড়া অন্য কেউ ডাকলে দরজা খুলবে না। মনে থাকে যেন। যাও....যাও যাও যাও যাও...!
পাঁচিলের দরজাটা খুললাম আর খুলতেই কমপক্ষে ৫০ জন আমাদের উঠোনে এসে জড়ো হয়ে আমাকে ঘিরে ধরলো। এই গাঁয়ের মোড়ল সহ বাড়ির পুরুষেরা এসেছে, তাদের স্ত্রীরা আসেনি। সবার চোখ লাল হয়ে আছে রাগে। যে মোড়ল, তার গলা....আগে ফাটলো....!
- চয়ন!!!!!!
আমি ভদ্রতা রেখেই গলা নামিয়ে কথা বলতে লাগলাম।
- বলুন।
- এই গাঁয়ে এসব চলবে না। এই গাঁয়ে আরও পাঁচটা পরিবার থাকে। তোমাদের নোংরামি দেখে বাকিরা এই শিক্ষাই পাবে।
আমি যথেষ্ট সংযত থাকতে শিখে গেছি। এটাও জানি এদের সঙ্গে তর্ক শুরু করলে আমার মাথা দিয়ে রক্ত ঝরাতে এদের কয়েক সেকেন্ড সময় লাগবে। তাই কথাবার্তার মাধ্যমে ওদের বোঝালাম ওরাই ঠিক, আমরা ভুল। যখন কেউ আক্রমণ করে, ভুল করেও তাদের বিরুদ্ধে কথা বলা মূর্খামি। আমাদের অহংকার এই মূর্খামিই আমাদের দিয়ে করিয়ে থাকে অনেকবার। কিন্তু যদি ওদেরকে এটা বোঝানো যায় যে ওরা ঠিক, তবে পরিস্থিতি এক ধাক্কায় স্বাভাবিক হয়ে যায় আর এক্ষেত্রেও আমার বুদ্ধির জোরে এই পরিস্থিতি আমি স্বাভাবিক করে তুললাম।
- আপনারাই ঠিক। আর সত্যি বলতে আমার মায়েরও দোষ নেই। দোষটা আমারই। কিছু বদ ছেলের সঙ্গে পড়ে আমার এই চরিত্র হয়েছে। আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আর আপনাদের এই আশ্বাস দিচ্ছি আমি পরশু এই গাঁ ছেড়ে চলে যাবো মাকে নিয়ে। আপনারা সকলে নিশ্চিন্তে থাকবেন এবার।
এই ৫০ জনের হুড়মুড়িয়ে আক্রমণ ও আগমন এক নিমেষেই অর্থহীন করে ফেললাম। তারা এসেছিল কথার আঘাত বা তার বেশি প্রয়োজন হলে লাঠির আঘাত প্রয়োগ করবে আমাদের দুজনের ওপর, কিন্তু কথার প্যাঁচে তাদের কোনোকিছুই আর প্রয়োগ করতে দিলাম না। বাধ্য করলাম লাঠি ফেলে বাড়ি ফিরে যেতে। এমনকি আমার কথায় মোড়লের মন কিছুটা গললো। যাওয়ার সময় মোড়ল বলে গেল,
- চয়ন, তুমি স্কু/লের শিক্ষক। কতো গর্ব হতো তোমাকে নিয়ে বলো তো। তুমিই এই কাজ...? ছিঃ ছিঃ ছিঃ ছিঃ। শুধরে যাওয়ার চেষ্টা কোরো...! আর কি বলবো। আর পরশু কিন্তু তোমাদের চলে যেতে হবে। এটা মাথায় রেখো।
এতজন এসেছিলো রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে, আর গেল শান্ত মুখে। সত্যি, ভেবেচিন্তে কথা বললে বুঝি জীবনের অনেক সমস্যা এমনিতেই সমাধান হয়ে যায়। আমি যে কথাগুলো ওদের বললাম তা ওরা চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করে নিল। আমি ওদের কিভাবে বোঝাতাম যে,
- আমি বদ সঙ্গে পড়িনি, আমি আমার মায়ের প্রেমে পড়েছি!
আমি আর চারু যে একে অপরের প্রেমে পড়েছি, এই কথা সম্পূর্ণ এড়িয়ে গিয়ে বুঝতে পারলাম ঠিক কাজই করেছি।
এমনসময় লতা বেরিয়ে এলো উঠোনে, পেছনে পেছনে খদ্দেরটাও এলো। খদ্দেরটা বেরিয়ে যেতেই লতা অবাক হয়ে আমার দিকে চাইলো। সে ভেবেছিলো এই গাঁয়ের কাছে আমার আর চারুর সম্মানকে মাটিতে মিশিয়ে দেবে। কিন্তু কিছুই মেশাতে পারলো না দেখে গা জ্বালানো কথা দিয়ে আমাকে আঘাত করার বৃথা চেষ্টা করে গেল।
- বাব্বা...মায়ের স্বামী যে বেশ বড়ো হয়ে গেছে! কি সুন্দর করে কথা বলে....!
- হ্যাঁ, নয়তো চারুকে ভালোবাসলাম কি জন্য যদি রক্ষাই না করতে পারি!
- চারু....? মা থেকে চারু...? প্রেম উপচে পড়ছে....! আহা গো! আমি এই সুখ রাখি কোথায়!
- হ্যাঁ। মা নয় সে, সে আমার চারু....!
- কবে যাচ্ছিস তোরা?
- পরশু...!
- ওহ্। তোরা বিদায় হলে আমার ব্যবসাটা বাড়াবো।
- বেশ।
বলে হেসে ঘরে ঢুকে গেলাম। পেছনে তাকিয়ে একবার দেখলাম লতা আমার দিকে চেয়ে হাসছে।
(ক্রমশ.....)