চারুলতা (উপন্যাস) (সম্পূর্ণ) - অধ্যায় ৪৫
চারুলতা
লেখক - কামসম্রাট
পর্ব - ৪৩
ভোরে ঘুমটা ভেঙে গেল। তাকিয়ে দেখি আকাশ ঘন কালো মেঘে আচ্ছন্ন। বৃষ্টি শুরু হবে নাকি! বাতাস বেশ জোরে বইছে! বৃষ্টি নামার আগেই আমাদের বেরোতে হবে।
আমি ধড়মড়িয়ে উঠে বসলাম। নিশীথ ঘুমোচ্ছে ওপাশে ফিরে। দরজা খুলে বাইরে এলাম। লতার ঘরের দরজা বন্ধ, তার মানে এখনও চারু ওঠেনি। একেই মেঘের এই অবস্থা, তার ওপর আবার চারু ঘুমোচ্ছে! বোধহয় কাল সারারাত মেয়ের সঙ্গে গল্প করে কাটিয়েছে। ওকে আর কি দোষ দেবো। এতদিন পরে মেয়েকে আবার ফিরে পেল! ভাবলাম ও একটু ঘুমোক, আমি সব বাগিয়ে নিই, তারপর ওকে ডাকবো। বেচারির সারাদিন তো পরিশ্রম কম যায় না!
আমি মুখ ধুয়ে চা বসালাম উনুনে। ব্যাগ হয়েছে মোট দুটো। বেশিরভাগই ফেলে যাচ্ছি। শুধু আমাদের দুজনের পোশাক, চারুর অলংকার, হাঁড়ি, কড়াই, ব্যস্ এই কটাই। রিনু আর মিনুকে রেখে যাচ্ছি, লতাই ওদের দেখভাল করবে। ওরা আজ গোয়ালেই থাক্। মেঘের যা অবস্থা, বের করা উচিৎ নয়।
এবার চারুকে ডাকা দরকার নয়তো অনেক দেরি হয়ে যাবে।
- চারু..... চারু....ওঠো দেরি হয়ে যাচ্ছে!
না, কোনো সাড়া পেলাম না। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন সে। দরজায় হাত ছোঁয়ালাম। দরজা ভেজানোই ছিল। আমি ভেতরে ঢুকে দেখি লতা রতনকে নিয়ে ঘুমোচ্ছে, চারু নেই!
- লতা, এই লতা....এই.....লতা.....তোর মা কোথায়?
লতা ঘুম জড়ানো গলায় চোখ না খুলেই বলে উঠলো,
- শেষ রাতে জ্যোৎস্না মাসির বাড়ি থেকে লোক এসেছিল, বললো মাসির শরীর খুব খারাপ, মাকে নিয়ে গেল সঙ্গে!
- মানে? তোর মা আমাকে না বলেই চলে গেল এভাবে?
- আমি জানিনা, তুই আমায় ঘুমোতে দিবি?
আমি বাইরে বেরিয়ে এলাম। জ্যোৎস্না মাসির শরীর খারাপ! হয়তো চারু আমি ঘুমোচ্ছি দেখে আর জাগায়নি আমাকে। আমাকে না বলেই নিজের দিদির শরীর খারাপের কথা শুনে হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে গেছে। কিন্তু এখন আমি কি করবো? আজ যে যেতে হবে! সব ব্যবস্থা করে রাখা হয়েছে! কি করা যায় এখন?
- মাসি....দরজা খোলো!!!
জ্যোৎস্না মাসি হাসিমুখে দরজা খুলে দাঁড়ালেন। আর আমি বিস্মিত হয়ে তার দিকে চেয়ে রইলাম। মাসিকে দেখে কোনো দিক থেকে মনে হচ্ছে না যে মাসির শরীর অসুস্থ। তবে! কি ঘটছে এসব!
- চারু....মানে মা এসেছে তোমার বাড়ি?
মাসি আকাশ থেকে পড়ল।
- না চয়ন। কেন বল দেখি?
- তোমার শরীর খারাপ নয়?
- আমার কেন শরীর খারাপ হতে যাবে?
- তুমি লোক পাঠাওনি আমাদের বাড়িতে?
- আমি লোক পাঠাবো....কেন?
আমার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যেতে লাগলো! তবে? চারু কোথায় গেল? আমার চারু....আমার চারু.... কোথায় তুমি? লতা বললো মাসির বাড়ি থেকে লোক এসে চারুকে নিয়ে গেছে....তবে ওই লোকগুলো কারা? ওরা চারুকে কোথায় নিয়ে গেছে? কি ঘটেছিল আজ শেষ রাতে? কি ঘটেছিল চারুর সঙ্গে? আমি কোথায় খুঁজবো তাকে এখন?
- চারু....!!!!!
যখন মাসি বাড়ি থেকে গোবাদায় ফিরলাম তখন দুপুর হয়ে গেছে। চারু এখন কোথায় কেমন অবস্থায় রয়েছে...আমি কিচ্ছু জানি না! গাঁয়ের মোড়লের সঙ্গে দেখা হলো রাস্তায়।
- কি চয়ন, আজ যে চলে যাবে বলেছিলে?
- আমার মাকে খুঁজে পাচ্ছিনা জেঠু....সে নিখোঁজ....আমায় সাহায্য করুন দয়া করে....আমার যে.... আমার যে আর কেউ নেই!!!!
আমি কেঁদে ফেললাম তার কাছে। তিনি কাছে এগিয়ে এসে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
- কখন হলো?
- আজ শেষ রাতে...! লতা বললো কিছু লোক এসে মাসির শরীর খারাপের কথা বলে তাকে নিয়ে গেছে! আমি এখন কি করবো?
- দাঁড়াও দাঁড়াও....উতলা হইয়ো না। দেখি আমি কি করতে পারি। তুমি বাড়ি যাও। আমি বিকেলের মধ্যে তোমাদের বাড়ি যাচ্ছি।
- আমার মা...!!!
- কান্না থামাও চয়ন। যদি কোনো বিপদে সে পড়ে থাকে, তোমায় শক্ত থাকতে হবে। তুমি যাও। কিছু খেয়ে নাও। মুখ চোখ দেখে মনে হচ্ছে সকাল থেকে পেটে কিছু দাওনি।
বাড়ি ফিরে এলাম। বেঁচে থাকতে হলে যে খেতে হয়, সেকথা আমি ভুলেই গিয়েছিলাম। আমার প্রাণ যে আজ আমার কাছে নেই, এই স্থূল শরীরকে বাঁচাবার আর কি প্রয়োজন?
- লতা!!!!
লতা বেরিয়ে এলো ঘর থেকে বারান্দায়।
- মাসির শরীর এখন কেমন রে?
- মাসি....মাসি কোনো লোক পাঠায়নি লতা....ওরা অন্য কোনো দলের লোক, চারুকে তুলে নিয়ে গেছে ওরা....চারু নিখোঁজ!!
- কি বলছিস তুই? মাসি কেমন আছে?
- মাসি সম্পূর্ণ সুস্থ!
- সুস্থ? তবে মা যায়নি ওখানে?
- ওটাই তো বলছি....চারু নিখোঁজ....তোর কি এই কথা কানে ঢুকছে না?
- এ বাবা....! মা গো....তুমি কোথায় গেলে?
- কান্না থামা তুই...! নিশীথ কোথায়?
- ও একবার বনদুলি গেছে চাষের কাজে। কিন্তু মা... মা কোথায়?
- এখন আমি কি করবো লতা? কোথায় খুঁজবো চারুকে বলতে পারিস? কেন কাল তোর কাছে ওকে ছেড়েছিলাম....! আমার কাছে থাকলে ও আজ আমাদের মধ্যেই থাকতো রে....লতা...!!
আমি ভেঙে পড়লাম, লতাও কেঁদে চললো। কিন্তু এখন ভেঙে পড়লে চলবে না। চারুর সঙ্গে এখন কি ঘটছে, কে জানে! না না না না.... আমি এভাবে বসে থাকতে পারবো না! এই দুনিয়ায় যেখানেই সে থাকুক.... খুঁজে আমি বের করবোই!
- আমি আসছি চারু....!!!
বাড়ি থেকে বেরোতে যাবো, গাঁয়ের মোড়ল জেঠু দুজন লোক নিয়ে এসে হাজির। আমি আর লতা তাদের দিকে চেয়ে রইলাম ভেজা চোখে।
- চয়ন, একটু বাইরে এসো!
আমি চারুর খবরের আশায় তার কাছে ছুটে গেলাম। লতাও আসছিল, কিন্তু সে একজন মেয়ে, চারুর খবর শুনে চিন্তা করবে ভেবে তাকে আসতে মানা করলাম। কিন্তু লতা নাছোড়বান্দা, সেও শুনতে চায়। শেষে মোড়ল জেঠুই মানা করলো।
- লতা, থাক্ মা, তোমায় পরে জানাবো....আমরা তোমার দাদার সাথে একটু কথা বলে নিই আগে।
আমি তাদের সঙ্গে বাড়ির বাইরে গেলাম। কিছুদূর গিয়ে একটা ফাঁকা মাঠের মধ্যিখানে গিয়ে সবাই দাঁড়ালাম। তারপর জেঠু শুরু করলেন তার কথা। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত শোনা হয়ে গেলে আমার চারপাশ ওই কালো মেঘে ঢাকা আকাশটার মতোই অন্ধকার হয়ে এলো। তিনি যেটা বললেন, তা যদি সত্যি হয়, তবে আমার চারুর ভয়ঙ্কর বিপদ!
- কি করবো আমি এখন জেঠু?
- তুমি কিচ্ছু করবে না...। যা করার আমরা করবো। তবে শেষে তোমাকে প্রয়োজন হবে, তার আগে অবধি আমরাই যথেষ্ট। যা বললাম, যেভাবে বললাম, সেভাবেই করা চায়...একটু অন্যথা হলেই চারুকে হারিয়ে ফেলতে হবে তোমাকে চিরদিনের জন্য! মনে রেখো কথাটা! যখন আসতে বলা হয়েছে, চলে আসবে। আমরা যাচ্ছি!
তারা চলে গেল। আমাকে তারা অতল কুয়োই ফেলে দিয়ে গেল। আমায় ওকে বাঁচাতেই হবে! এটা চারুর জীবনের প্রশ্ন...আমাদের ভবিষ্যতের প্রশ্ন....আমার ভালোবাসার প্রশ্ন!!!
বাড়িতে ঢুকতেই লতা এসে আমায় জড়িয়ে ধরলো কাঁদতে কাঁদতে।
- কি বললো দাদা, মা কোথায়?
আমি তার মাথায় হাত বুলিয়ে বললাম,
- এখনও তারা খুঁজে পায়নি। তবে চিন্তা নেই, ওরা খুঁজছে। সঠিক সময়ে জানাবে বলেছে।
- কিন্তু ওই লোকগুলো কারা? ওরা কি কিছুই জানতে পারেনি ওই লোকগুলোর ব্যাপারে?
- না, ওরা এই গাঁয়ের নয়। কেউ দেখেনি ওদের এর আগে এখানে!
- আমি কি নিশীথকে ডেকে পাঠাবো কারোকে দিয়ে?
- না থাক, ও যা কাজ করছে করতে দে, আমি আমার কাজ করি!
একটু আনমনেই বলে উঠলাম,
- নিশীথকে ওর কাজে এগিয়ে যেতে দে। আমিও দেখি আমি কতদূর এগোতে পারি!
- ও তো চাষের কাজে গেছে, দেখাশোনা করতে, ও তো আর চাষ করছে না নিজে। ওর চাপ তেমন নেই , ওকে ডেকে নিই বরং। যদি কিছু সাহায্য করতে পারে আমাদের!
- না বললাম তো তোকে।
- আচ্ছা!
- আচ্ছা লতা....ঠিক কখন ওই লোকগুলো এসেছিল রে?
- মানে...? মানে ঠিক বুঝলাম না!
- মানে জানতে চাইছি যে, তুই যে তখন বললি ওরা শেষ রাতে এসেছিল, ওটাই বলছি, ঠিক কখন এসেছিলো?
- আমি ঘুমোচ্ছিলাম, অত কি খেয়াল করেছি আমি!
- তাও ঠিক। ঠিক আছে। তুই যা। বরং একটু চা বানা। মাথাটা ধরে আছে। বোধহয় চা খেলে ঠিক হয়ে যাবে!
- কেন হঠাৎ এই প্রশ্ন করলি?
- কোনটা বলতো?
- ওই... ওই লোকগুলো কখন এসেছিল, ওটা জানতে চাইলি কেন?
- এমনি।
- ওহ্। তোর কি মনে হয়, মোড়লের লোক খুঁজে পাবে মাকে?
- মনে হয় না। যতটা বুঝলাম, ওরা কিছুই জানেনা। কেন বলতো?
- না, মায়ের জন্য খুব চিন্তা হচ্ছে রে!
- হ্যাঁ, সেটা তো আমি জানিই। তবে একটা কথা মনে হচ্ছে, কি জানিস?
- কি দাদা?
- চারুকে আর খুঁজে পাবো না রে। ওকে আমরা হারিয়ে ফেলেছি মনে হয় চিরদিনের জন্য!
এই কথায় লতা আমার দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে রইল। তারপর কি ভেবে চলে গেল চা করতে।
আমি নিজের ঘরে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে দিলাম ভেতর থেকে। বিছানায় শুয়ে ভাবতে লাগলাম এবার কি কি করতে হবে। অনেক কিছু ভেবে নিতে হবে এখন আমায় আর কিছুক্ষণের মধ্যেই। অনেক জাল ছাড়িয়ে নতুন কৌশল অবলম্বন করে তারপর বেরোতে হবে মাঝ রাতে। আজ রাতে অনেক কিছু ঘটতে চলেছে। তাই এখন একটু ঘুমিয়ে নেওয়া প্রয়োজন!
বাইরে তাকিয়ে দেখি বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে মুষলধারায়। সন্ধ্যা নামলো বলে...।
(ক্রমশ.....)