ছাইচাপা আগুন ।।কামদেব - অধ্যায় ১১১
।।১১১।।
সকাল থেকে চা ছাড়া কিছু খায়নি মনসিজ।মা বলেছে উপোস করে থাকতে হবে বিয়ে না হওয়া অবধি।এলিনা বৌদিকে কিছু একটা দেবার ইচ্ছে হয়।তার জন্য অনেক করছে বৌদি।মেয়েরা যার ভাল তার খুব ভাল আবার যার খারাপ তার সব্বোনাশ করতেও পিছপা হয় না।বৌদির উপর জমে থাকা অভিমান বাষ্পের মত উবে গেছে।বঙ্কাটা এল না এখনো ওর টোপর আনার কথা।পাচটায় গাড়ী আসবে,ঘড়ির দিকে তাকালো--তিনটে বাজতে চলেছে। মনে হচ্ছে কে এল।উকি দিয়ে দেখল গোবেদা।ধুতি পাঞ্জাবী পরে একেবারে সেজে গুজে এসেছে।পাঞ্জাবীর নীচে ভুড়ি উচিয়ে। মনসিজ বেরোলো না বড্ড বেশী বকে গোবেদা।ছেলে এসেছে যখন মামাও আসবে।
হিমানীদেবী গোবিন্দকে ঘরে নিয়ে বসিয়ে জিজ্ঞেস করল,কিরে তুই একা দাদা আসেনি?
--আমাকেই বলছিল যাবার দরকার নেই।বললেই হল মনুর বিয়ে আমি যাব না।
--দাদা আসবে না?
--কাডে সবার নাম দিয়েছো বাবার নাম দাওনি বাবা খচে গেছে।
--এসব মনুর কাণ্ড।কি দরকার ছিল আমার নাম দেবার।হিমানিদেবীর মুখে দুশ্চিন্তার ছায়া।
তার কথায় এমন প্রতিক্রিয়া হবে গোবিন্দ ভাবেনি,পিসির জন্য খারাপ লাগে।পিসিকে সান্ত্বনা দেবার জন্য বলল,আসলে জান পিসি
বাবার ধান্দা ছিল আন্নাকে মনুর সঙ্গে গছাবে।
--আন্না কে?
--বড়মাসীর মেয়ে।
--চুপ কর বড়দের সম্পর্কে যত বাজে কথা।
--বাজে কথা নয় আমি নিজের কানে শুনেছি।বাবাকে ধাতাচ্ছিল মা,একটা কাজের মুরোদ ণেই খালি বড় বড় কথা।আমি দিদিকে কথা দিয়েছিলাম এখন মুখ দেখাবার জো থাকলো না।আমার মতে আন্নার সঙ্গে বিয়ে না হয়ে ভালই হয়েছে।
--মনুর ভাগ্যটাই খারাপ।
--আমি বলব ভাগ্য ভাল।মনু কত উচু পাস দেখতে কত সুন্দর ওর সঙ্গে আন্নাকে মানায়?
মনসিজ ঢুকে জিজ্ঞেস করল,কার সঙ্গে মানাবার কথা বলছো?
--সে আমার পিসির সঙ্গে প্রাইভেট কথা হচ্ছে।
গোবেদার এই বিজ্ঞ বিজ্ঞ ভাবটায় মজা পায় মনসিজ।জিজ্ঞেস করল,বাড়ীর সব ভালো?
--চল তোর সঙ্গে কথা আছে।গোবিন্দ মনুর ঘরে এসে বসল।
--মামা আসবে না?
--ছাড় ত মামার কথা।গদ্গদ ভাবে গোবিন্দ বলল, বিয়ের জল না পড়তেই তোকে কিন্তু হেবভি দেখতে হয়েছে।
মনসিজ মুচকি হেসে বলল,তুমি এবার একটা বিয়ে করো।
--ভাবছি এবার বিয়ে করব।
--ঐ ভুত নেমেছে?
--চাদমণির কথা বলছিস?শালা ছোটোলোকের জাত একদিন গেছি শালা ঠ্যাঙা নিয়ে তেড়ে এল।জানিস মাসের পর মাস ওকে কত টাকা দিয়েচি?
--তাড়া করল কেন?মনসিজ হাসি সামলায়।
--হারাধন চক্কোত্তির টাকা খেয়েছে।ভালই হয়েছে ওদের সঙ্গে কি আমাদের মানায়?হ্যারে মনু মেয়েটা দেখতে কেমন?অবশ্য মেয়েদের রূপের চাইতে ফিগারটাই আসল।
মনসিজের এসব কথা ভাল লাগছে না।
ডোরবেল বাজতে মনে হয় বঙ্কা টোপর নিয়ে এল।কিছুক্ষন পর হাতে টোপর নিয়ে এলিনা বৌদি ঢুকলো, পিছনে কল্পনা।দারুণ সেজেছে বৌদি একেবারে কনে বৌয়ের মত।
--কিরে তুই বসে আছিস।কল্পনা তুই আণ্টির কাছ থেকে চন্দন কাঠ নিয়ে আয়।
গোবিন্দ পিসির ঘরে চলে গেল।কল্পনা চন্দন ঘষতে শুরু করে।বৌদি নিজের নাকছাবি খুলে কল্পনাকে দিয়ে বলল,এটা দিয়ে ফোটা দিবি।
মন্তু ধুতি পাঞ্জাবী পরেছে।ঐ টুকু ছেলে ধুতি পাঞ্জাবীতে বেশ লাগছে মন্তু ঢুকে বলল,মা তোমাকে দিদা ডাকছে।বৌদি ছেলেকে নিয়ে চলে গেল মায়ের ঘরে।কল্পনা চন্দন ঘষতে ঘষতে বলল,এরপর শিউলি রুক্সানা একে একে সবার বিয়ে হয়ে যাবে।
হঠাৎ এ প্রসঙ্গ কেন মনসিজ বোঝার চেষ্টা করে।কল্পনা বলতে থাকে,বঙ্কাটা পাস করে বসে আছে এখনো কিছু করতে পারল না।
--বঙ্কার আইটি তুমি এলিনাবৌদিকে বলেছো?
--ওইভাবে বলিনি।আসতে আসতে বলছিলাম বঙ্কাটা বেকার বসে আছে। সোজা হয়ে বোসো।
মনসিজের চিবুক ধরে কপালে নাকছাবির ছাপ দিয়ে চন্দনের টিপ দিতে থাকে।কি সুন্দর চুল ছিল তোমার এত ছোট করে কেটেছো কেন?
সে অনেক কথা কল্পনাকে বলা যাবে না,ঠাট্টা করবে মনসিজ বলল,আবার হয়ে যাবে।
এলিনা বৌদি ছুটে এসে বলল,কিরে তোদের হয়েছে?গাড়ী এসে গেছে মনে হয়।
--এই হয়ে এল।কল্পনা বলল।
মনসিজ ঘড়ি দেখল পৌনে পাঁচটা।
--কিরে মন ধুতি পরতে পারবি তো?
--গোবেদাকে ডাকো তো।
গোবিন্দ এসে মনসিজকে ধুতি পরাতে থাকে।
এলিনা ফোন করে,কি হল আমরা স্টার্ট করছি...বেরিয়ে পড়েছো...শোনো একটা গাড়ীতে মেয়েদের বসাবে আর দুটোতে বাকীরা...মেয়ে মা সব...আচ্ছা রাখছি।হিমানীদেবীকে বলল,আণ্টি আমরা আসছি?
সুভদ্রাকে নিয়ে হিমানীদেবী বারান্দায় গিয়ে দাড়ালেন।পবন সাজগোজ করছে সেও যাবে বরযাত্রী।সাহেব একটা জামা দিয়েছে।
নীচে অনেকে এসেছে।হিমানীদেবী ঝুকে দেখলেন।স্বামীর কথা মনে পড়ল।ছবিটা বাংলোয় রয়েছে।দুদিনের জন্য আসছে তাই আনা হয়নি।মনসিজ মায়ের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল।গোবিন্দও পিসির পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে।একে একে সবাই নীচে নেমে গেল।ফাকা বাড়ী সুভদ্রাকে যেতে বলেছিল রাজী হয়নি।একটা ছোট গাড়ী ফুল দিয়ে সাজানো তার পিছনে একটা বড় গাড়ী।মনু ছোট গাড়ীতে উঠল,গোবে উঠেতে গেছিল উঠতে দিল না।মনুর সঙ্গে ঐ বউটা বাচ্চা নিয়ে উঠল।গাড়ী ছেড়ে দিল হিমানীদেবী মনে মনে বললেন,দুরগা--দুরগা।
ডানলপ থেকে হাই ওয়েতে উঠল।কল্যাণী এক্সপ্রেসওয়ে ধরে যাবে।বৌদি বলল,ওরকম আড়ষ্ট হয়ে বসে আছিস কেন?
--না না ঠিক আছে।
--তোর কি ভয় করছে?
--ভয়ের কি আছে।ভয় করব কেন?
--তোর বউ খুব ভাগ্যবান।
বড় চাকরি করে সেজন্য বৌদি বলছে মনসিজ বলল,ওদের যা অবস্থা আমাকে কিনে বেচতে পারে।
--সব কিনতে পাওয়া যায় না।বৌদি গলা নামিয়ে বলল,মেয়েদের খুশী করার অস্ত্র তোর আছে।
মনসিজের কান লাল হয় ইশারায় ড্রাইভারকে দেখিয়ে বলল,আস্তে।
মোবাইল বাজতে হিমানীদেবী কানে লাগিয়ে বললেন,বল মা...আধ ঘণ্টা হবে বেরিয়েছে...ভাল আছি মা...দেখতে ইচ্ছে করছে কাল তো দেখা হবে মা...ছি ওরকম করে না...আমারও কি দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে না...একা কেন সুভদ্রা আছে তো...আচ্ছা মা।ফোন রেখে হিমানীদেবী আচলে চোখ মোছেন।
প্রজ্ঞা ফোন রাখতে দীক্ষা জিজ্ঞেস করল,কাকে ফোন করলি?
--একজন রিলেটিভ,জরুরী কাজের জন্য আসতে পারবে না।
চৌধুরী ভিলা আলোয় ঝলমল করছে।ক্যাটারারের লোকজনে ছোটাছুটি।চৌধুরী বাবু গরদের ধুতি পরেছেন।প্রদোষ তার ডাক্তার বন্ধুদের নিয়ে ব্যস্ত।সবাই প্রায় বাইরে থেকে এসেছে।তাড়াতাড়ি খেয়ে ট্রেন ধরার তাগিদ।কলকাতা থেকে রমিতার কয়েকজন বন্ধু এসেছে,ওরা রাতে থাকবে সেজন্য তাড়াহুড়ো ণেই।