ছায়ার আড়ালে আগুন-Erotic Thriller [Part-4: অন্তিম যুদ্ধ] - অধ্যায় ৪১
গল্প: "ছায়ার আড়ালে আগুন" (পার্ট-৪: অন্তিম যুদ্ধ)
একচল্লিশ পরিচ্ছেদ: ভাঙনের শুরু
রাত প্রায় এগারোটা। রুবিনার ফ্ল্যাটের ভেতরটা নিস্তব্ধ। এসি চলছিল, অথচ বাতাস ভারী লাগছিল। আরিয়ান ঘুমিয়ে পড়েছে তার নিজের ঘরে। রুবিনা বারান্দা থেকে ভেতরে ঢুকলেন। অংশুমান সোফায় বসে ফোন স্ক্রল করছিল। টি-শার্ট আর ট্রাউজারে, চুল এলোমেলো।
রুবিনা তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
“আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
অংশুমান মুখ তুলে তাকাল। “কী সিদ্ধান্ত?”
রুবিনা গলা সোজা করে বললেন, “ড্রাগ ব্যবসা বন্ধ করতে হবে। আমি আর এটা চালাব না।
অংশুমানের হাত থেমে গেল। ফোনটা সে ধীরে ধীরে টেবিলে রাখল। তার চোখ রুবিনার মুখে স্থির হয়ে গেল। কয়েক সেকেন্ড কেউ কথা বলল না। তারপর অংশুমান ধীরে ধীরে বলল,
“তুমি কি বলেছ, আমি ঠিক শুনেছি?”
“হ্যাঁ।” রুবিনার গলা শান্ত, কিন্তু তার নিচে একটা শক্ত ইস্পাতের মতো দৃঢ়তা ছিল। “আমি মন্ত্রী। জনপ্রতিনিধি। এই ব্যবসা চালিয়ে গেলে একদিন সব শেষ হয়ে যাবে। আমার নাম, আরিয়ানের ভবিষ্যৎ, তোমার সবকিছু।”
অংশুমান উঠে দাঁড়াল। তার উচ্চতা রুবিনার চেয়ে অনেক বেশি। সে একটু এগিয়ে এসে বলল,
“তুমি এখন মন্ত্রী বলেই তো সুযোগ আরও বেড়েছে। পুলিশ, প্রশাসন, কাস্টমস—সব জায়গায় আমাদের লোক বসানো গেছে। এখন ব্যবসা বন্ধ করলে আগের তিন বছরের পরিশ্রম বৃথা যাবে। টাকা আসছে। ক্ষমতা আসছে। তুমি বুঝছ না?”
রুবিনা এক পাও পিছু হটলেন না। “আমি বুঝি। তাই বন্ধ করতে চাই। আমি আর এই অন্ধকারে থাকতে চাই না। মানুষ আমাকে ভোট দিয়েছে। আমি তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আইন মানার কথা বলি, আর আড়ালে এই কাজ করি—এটা আর চলবে না।”
অংশুমান হেসে উঠল। সে হাসির মধ্যে রাগ মেশানো ছিল।
“অন্ধকার? তুমি এই অন্ধকার দিয়েই তো আজ এখানে এসেছ। আফজলের পর সিন্ডিকেট কে দাঁড় করিয়েছে? কে রাতের পর রাত গুদাম দেখেছে, লোক ম্যানেজ করেছে, টাকা হিসেব রেখেছে? আমি। আর এখন তুমি এসে বলছ—বন্ধ করে দাও?”
“আমি কৃতজ্ঞ,” রুবিনা বললেন। তার গলা একটু ভারী হয়ে এল। “কিন্তু এখন আর নয়। আমি যদি একবারও ধরা পড়ি, তাহলে শুধু আমি নয়। তুমিও শেষ। আরিয়ানও।”
অংশুমান তার দিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল। দুজনের মধ্যে ব্যবধান এখন খুব কম।
“তুমি ভয় পাচ্ছ। শুধু ভয়। মন্ত্রী হওয়ার পর তোমার সাহস কমে গেছে। আগে তুমি অন্যরকম ছিলে। আগে তুমি ঝুঁকি নিতে পারতে।”
রুবিনার চোখে রাগের ঝলক দেখা গেল। “আগে আমি কোনো দায়িত্বের মানুষ ছিলাম না। এখন আমি। মানুষ আমাকে বিশ্বাস করেছে। আমি তাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারব না।”
“বিশ্বাসঘাতকতা?” অংশুমানের গলা হঠাৎ উঁচু হয়ে গেল। “তুমি আমাকে বিশ্বাসঘাতকতা করছ। এই ব্যবসা আমাদের দুজনের। তুমি একা সিদ্ধান্ত নিতে পারো না। আমি এতদিন রক্ত পানি করে এই সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছি, আর তুমি এক কথায় মুছে দিতে চাও?”
রুবিনাও আর চুপ থাকলেন না। তার গলা উঠে গেল।
“সাম্রাজ্য? এই সাম্রাজ্য যদি একদিন ভেঙে পড়ে, তাহলে আরিয়ানকে নিয়ে আমি কোথায় যাব? তুমি কি কখনো ভেবেছ? আমি মন্ত্রী হয়েছি বলে এখন আর আগের মতো লুকিয়ে থাকতে পারব না। যেকোনো সময় কেউ কিছু একটা খুঁজে পেলে সব শেষ।”
অংশুমান দুই হাত মাথায় দিয়ে ঘুরে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ চুপ করে জানালার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর আবার ঘুরে রুবিনার দিকে তাকাল।
“তুমি সত্যিই এটা চাও?” তার গলা এবার অনেকটা নামিয়ে এনেছিল।
“হ্যাঁ,” রুবিনা দৃঢ়ভাবে বললেন। “আজ থেকে এই ব্যবসা বন্ধ।”
অংশুমান অনেকক্ষণ রুবিনার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখে রাগ, হতাশা আর হিসেব—সব মিশে ছিল। অবশেষে সে গভীর শ্বাস নিল। তার মুখের রাগটা আস্তে আস্তে সরিয়ে একটা ক্লান্ত, মেনে নেওয়ার অভিব্যক্তি আনল। সে সোফায় ভারী হয়ে বসে পড়ল। দুই হাত দিয়ে মুখ চাপড়ে ধরল।
কিছুক্ষণ পর সে মাথা তুলল।
“ঠিক আছে।” তার গলায় এখন ক্লান্তি মেশানো। “তুমি যদি এতটাই চাও, তাহলে বন্ধ করা যাক।”
রুবিনা অবাক হয়ে তার দিকে তাকালেন। “তুমি… রাজি?”
“হ্যাঁ। রাজি।” অংশুমান তার দিকে তাকিয়ে বলল। “তুমি মন্ত্রী। তোমার ইমেজ নষ্ট হোক, আমি চাই না। আরিয়ানের কথাও আছে। ব্যবসা বন্ধ করে দিচ্ছি।”
রুবিনা কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। অংশুমানের চোখে এখন আর রাগ নেই। শুধু একটা ক্লান্ত, হার মেনে নেওয়ার ভাব। রুবিনার কাঁধ থেকে চাপটা ধীরে ধীরে নামতে লাগল। তিনি আস্তে করে এগিয়ে গিয়ে অংশুমানের পাশে বসলেন।
“ধন্যবাদ,” তিনি নিচু গলায় বললেন।
অংশুমান তার দিকে তাকাল। একটা ছোট্ট, ক্লান্ত হাসি দিল। “তুমি শান্ত হও। আরিয়ানের কথা ভেবেই রাজি হলাম।”
রুবিনা তার হাত ধরলেন। অংশুমানও হাতটা ফিরিয়ে ধরল। দুজনে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল। ঘরের ভেতর শুধু এসি-র শব্দ চলছিল।
কিন্তু অংশুমানের চোখের গভীরে অন্য কিছু ঘুরছিল।
সে বাইরে রাজি হয়েছে। রুবিনাকে শান্ত করার জন্য। কিন্তু ভেতরে সে ইতিমধ্যে অন্য পথ ঠিক করে ফেলেছে। ব্যবসা বন্ধ হবে না। শুধু রুবিনার নাম আর থাকবে না। সবকিছু অন্তরার নামে চলবে। অন্তরা বিশ্বস্ত। অন্তরা নিজেও মালিক হতে চায়। আর রুবিনা জানবেও না।
অংশুমান রুবিনার হাতটা আলতো করে চেপে ধরল। মুখে শান্ত হাসি। মনে অন্য হিসেব।
রুবিনা বুঝতে পারেননি। তিনি ভেবেছিলেন, তর্ক শেষ। সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। দুজনের মধ্যে আবার শান্তি ফিরে এসেছে।
কিন্তু আসলে ভাঙনটা এখান থেকেই শুরু হয়ে গেছে। শুধু রুবিনা এখনো টের পাননি।