ছায়ার আড়ালে আগুন-Erotic Thriller [Part-4: অন্তিম যুদ্ধ] - অধ্যায় ৬৫
গল্প: "ছায়ার আড়ালে আগুন" (পার্ট-৪: অন্তিম যুদ্ধ)
পঞ্চষট্টিতম পরিচ্ছেদ: চায়ের কাপে নীরবতা
চা এসে গেল। পরিচারিকা একটা রুপোর ট্রে নিয়ে এসে টেবিলে রাখল। দুটো পাতলা চীনামাটির কাপ, চিনিদানি, দুধের ছোট জগ। রমা আগরওয়াল নিজে চা ঢেলে অংশুমানের হাতে দিলেন। তার আঙুলের স্পর্শ কাপের হাতলে এক মুহূর্তের জন্য লেগে রইল। অংশুমান লক্ষ করলেন, রমার হাতের ত্বক খুব মসৃণ, নখগুলো পরিপাটি করে কাটা, কোনো নেইলপলিশ নেই। শুধু একটা পাতলা সোনার আংটি।
অংশুমান চায়ের কাপ হাতে নিয়ে এক চুমুক দিলেন। চাটা হালকা মিষ্টি। রমা তার সামনের সোফায় বসে নিজের কাপ হাতে নিলেন। লাল শাড়ির ভাঁজ তার ফর্সা হাঁটু পর্যন্ত উঠে গিয়েছিল। তিনি পা দুটো একত্র করে বসেছিলেন। সকালের আলো জানালা দিয়ে এসে তার সিঁথির সিঁদুরে পড়ছিল। ঘরের ভেতরটা শান্ত। শুধু জানালার বাইরে গাছের পাতা নড়ার শব্দ আর দূর থেকে কোনো গাড়ির হর্ন।
“আপনার স্বামী কবে ফিরছেন?” অংশুমান জিজ্ঞেস করলেন।
“আর তিন-চার দিন লাগবে,” রমা বললেন। গলাটা শান্ত ও পরিষ্কার। “আসামে তার নতুন ব্যবসার কিছু কাজ আছে। তিনি যেদিন গেছেন, সেদিন থেকেই এই হুমকির কথা শুনে খুব অস্থির ছিলেন। রাতের পর রাত ফোন করতেন। ছেলেদের কলেজ থেকে ডেকে আনার কথাও ভেবেছিলেন।”
অংশুমান মাথা নাড়লেন। “এখন আর কোনো চিন্তা নেই। ব্যাপারটা আমি দেখেছি। কেউ আর আপনাদের বিরক্ত করবে না। আমি নিজে গিয়ে কথা বলেছি।”
রমা তার দিকে তাকালেন। চোখে একটা কৃতজ্ঞতা মিশে ছিল, কিন্তু তার সাথে আরও কিছু— একটা নীরব পর্যবেক্ষণ। তিনি আস্তে করে বললেন,
“আপনি খুব তাড়াতাড়ি এসেছেন। অনেকেই তো এমন ক্ষেত্রে হাত গুটিয়ে থাকে। ফোন করেই খালাস। আপনি নিজে এসে দেখলেন… এটা ভালো লাগল। আমার স্বামী জানলে খুশি হবেন।”
অংশুমান চায়ের কাপ নামিয়ে রাখলেন। তিনি রমার দিকে তাকালেন। মহিলার ফর্সা মুখ, লাল টিপ, সিঁথির সিঁদুর— সবকিছুই সকালের আলোয় আরও পরিষ্কার দেখাচ্ছিল। লাল শাড়ি তার শরীরের সরু বক্ররেখাগুলো আলতো করে জড়িয়ে রেখেছিল। গলার সোনার হার তার কণ্ঠের সাথে মিশে আছে। অংশুমান লক্ষ করলেন, রমা কথা বলার সময় মাঝে মাঝে চোখ নামিয়ে নেন, আবার তোলেন।
“এটা আমার কাজ,” অংশুমান বললেন। “কিন্তু আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে, আপনি অনেক কিছু একা সামলে রাখেন।”
রমা একটু হাসলেন। হাসিটা ছোট ও সংযত। তিনি চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললেন, “অভ্যাস হয়ে গেছে। স্বামী ব্যবসায় ব্যস্ত থাকেন। মাসের পর মাস বাইরে থাকেন কখনো কখনো। বাড়ি, সন্তান, চাকরবাকর, সবকিছু আমাকেই দেখতে হয়। অভ্যস্ত হয়ে গেছি। একা থাকাটাও একসময় অভ্যাস হয়ে যায়।”
কথাগুলো বলতে বলতে তিনি চায়ের কাপ নামিয়ে রাখলেন। অংশুমান লক্ষ করলেন, তার গলার সোনার হার সামান্য নড়ছে। হাতের চুড়ি থেকে মৃদু শব্দ হচ্ছে। রমার কণ্ঠে একটা নিঃসঙ্গতার ছাপ ছিল, যদিও তিনি তা লুকোতে চেষ্টা করছিলেন।
কিছুক্ষণ নীরবতা নেমে এল। কেউ কেউ কথা বলছিল না। অংশুমান বুঝতে পারছিলেন, এই নীরবতা অস্বস্তিকর নয়। বরং এক ধরনের টান তৈরি করছে। রমাও তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। চোখ সরালেন না। সকালের আলোতে তার ফর্সা মুখ আরও উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল।
“আপনি কি আরও কিছুক্ষণ থাকতে পারেন?” রমা হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন। গলায় সামান্য দ্বিধা। “আমার স্বামী ফোন করবেন হয়তো। আপনি থাকলে আমি তাকে আশ্বস্ত করতে পারব যে ব্যাপারটা সত্যিই মিটে গেছে।”
অংশুমান এক মুহূর্ত চুপ করে থাকলেন। তিনি রমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। মহিলার অনুরোধে কোনো জোর ছিল না, শুধু একটা নরম অনুরোধ। তারপর মাথা নাড়লেন।
“থাকতে পারি।”
রমা আস্তে করে উঠে দাঁড়ালেন। “তাহলে আমি আর এক কাপ চা করিয়ে আনি। আপনি বসুন।”
তিনি লাল শাড়ির আঁচল সামলে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। অংশুমান তার পেছন ফিরে তাকালেন। রমার হাঁটার ভঙ্গি শান্ত ও ভারসাম্যপূর্ণ। শাড়ির ভাঁজ তার ফর্সা পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত দুলছিল। রুপোর ঝুমকোযুক্ত নুপুর ও চটির থেকে মৃদু শব্দ হচ্ছিল।
অংশুমান সোফায় হেলান দিয়ে বসলেন। মনে মনে ভাবলেন— এই বাড়িতে এসে তিনি শুধু একটা কেস মিটিয়ে দিতে এসেছিলেন। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, ব্যাপারটা শুধু কেসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। রমা আগরওয়ালের উপস্থিতি ঘরটাকে অন্য রকম করে তুলেছে। তার শান্ত কণ্ঠ, সংযত হাসি, আর সেই নীরব তাকানো— সবকিছুই অংশুমানের মনে একটা অন্য রকমের দোলা দিচ্ছিল।
রমা কিছুক্ষণ পর ফিরে এলেন। হাতে নতুন চায়ের কাপ। তিনি অংশুমানের কাছে এসে কাপটা দিলেন। এবার তার হাতের স্পর্শ আগেরবারের চেয়ে একটু বেশি সময় ধরে রইল। অংশুমানের আঙুলের সাথে তার আঙুল লেগে গিয়েছিল। দুজনেই টের পেয়েছিলেন। রমা চোখ নামিয়ে নিলেন। অংশুমানও কাপটা নিয়ে সোফায় হেলান দিলেন।
দুজনে আবার বসলেন। চায়ের ভাপ উঠছে। ঘরের ভেতরটা আরও শান্ত হয়ে গেছে। রমা আস্তে করে বললেন,
“আপনি কি বিবাহিত, বড়বাবু?”
প্রশ্নটা হঠাৎ এল। অংশুমান একটু চমকে গেলেন। তারপর মাথা নাড়লেন।
“না।”
রমা কিছু বললেন না। শুধু একটু হাসলেন। সেই হাসিটা এবার আগের চেয়ে একটু বেশি সময় ধরে রইল। তিনি চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে চোখ তুলে অংশুমানের দিকে তাকালেন। চোখে একটা শান্ত, কিন্তু স্পষ্ট আগ্রহ।
অংশুমানও তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। কথা আর এগোচ্ছিল না। কিন্তু নীরবতাটা এখন দুজনের মধ্যে একটা অদেখা সেতু তৈরি করছিল।