দেবশ্রী - এক স্বর্গীয় অনুভূতি - অধ্যায় ৪১
“আচ্ছা দিদা! সরলা মাসি কি ওর নিজের বাড়ি যায়না?”
দিদা আমার অকারণ প্রশ্ন শুনে মুচকি হাসলেন, “কেন বলতো দাদুভাই?”
আমি একটু দ্বিধাগ্রস্থ মন নিয়েই বলে ফেললাম, “না মানে সারাক্ষণ এখানেই রয়েছে তাই জিজ্ঞেস করলাম”।
দিদা আবারও হাসলেন, “ওর বাড়ি এখানেই। ওর বরও তো এখানেই কাজ করে। বাগান দেখাশোনা করে”।
আমি তাঁর কথা শুনে হাফ ছাড়লাম। মানে ওই সরলা থাকলে আর মায়ের সামনে যাওয়া যাবে না।
ধুর!!
খাওয়া দাওয়ার পর সারা দুপুর টা বাগানেই কাটিয়ে দিলাম।মায়ের সঙ্গে কথা হয়নি তারপর থেকে। মাও খেয়েছে কি না জানি না। এখন মা ঘুমাচ্ছে। সারা রাতের ধকল কাটিয়ে উঠতে তাঁর সময় লাগবে।
II ৬ II
দেখতে দেখতে বেলা তিনটে বেজে গেলো। দূর থেকে কীর্তন গানের শব্দ পাচ্ছিলাম। বুঝলাম বাবারা ফিরছেন। আমি দৌড়ে গেটের সামনে এসে দাঁড়ালাম। হ্যাঁ সত্যিই বাবারা পায়ে হেঁটে ফিরছেন।
আমাকে গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বাবা জিজ্ঞেস করলেন, “খেয়েছিস বাবু? স্নান করেছিস? আর তোর মা কোথায়?”
বললাম, “হ্যাঁ বাবা আমার স্নান খাওয়া হয়ে গেছে।মা এখন ঘুমোচ্ছে”।
মায়ের কথা শুনে বাবা উদ্বেগ প্রকাশ করল, “এখনও ঘুমোচ্ছে!!”
বাবারা সব ভেতরে চলে গেলো। কৃষ্ণ মন্দিরের সামনে চাতালে কীর্তনীয়া সহ সবাই বসে পড়লেন। তাঁদের জন্য খাবার জলের ব্যবস্থা করা হলো।
দিদা আগেই বেরিয়ে এলেন। বাবা উঠে এসে তাঁর সঙ্গে কথা বলছিলো।
আমিও দৌড়ে মায়ের কাছে ছুটে গেলাম।
মা বিছানায় ডান পাশ ফিরে শুয়ে ঘুমাচ্ছিলো। তাঁকে ডেকে তুললাম, “উঠো মা! দেখো বাবারা সব ফিরে গেছেন”।
মা আমার কথা শুনে ধড়ফড় করে উঠে বলল, “তোর বাবা চলে এসেছে! আর দাদাই?”
আমি মায়ের মুখের দিকে হতবাক হয়ে চেয়ে ছিলাম।
মা নিজের হাত দিয়ে চোখ কচলে বলল, “উফঃ মাথাটা কি যন্ত্রনা করছে রে....”।
তাঁর কথা শুনে আমি তাঁকে পুনরায় শুইয়ে দিলাম, “মা তোমাকে উঠতে হবে না গো। তুমি বিশ্রাম করো”।
“হ্যাঁ রে তুই ঠিক বলছিস। মাথা ব্যাথায় আমি চোখ তুলে তাকাতেও পারছিনা”।
মা আবার বিছানায় শুয়ে চোখ বন্ধ করে দিলো।
শ্মশান থেকে ফেরা সব মানুষ গুলো এক এক করে বিদায় নিলেন।শুধু বাবা ওই দিকে স্নানের জন্য ঢুকে পড়লেন।
আমি ছাদে উঠে বাইরের দৃশ্য দেখতে লাগলাম। সত্যিই বোলপুরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অসাধারণ। বাড়ির পেছনেই পাকা ধানক্ষেত শুরু। তার কিছু দূরে মোরামের লাল কাঁচা রাস্তা। জানি না তার অন্ত কোথায় হয়েছে। রাস্তার ওপারে চাষীরা পাকা ধান কাটছে। আর দূরে ওই সোনাঝুরি গাছ গুলো কে দেখতে তো তুলি দিয়ে আঁকা জল রঙের চিত্র মনে হচ্ছে।তারও ওপারে অজানা গ্রাম!
ছাদেই মনোরম দৃশ্য দেখতে দেখতে সময় পার করে দিলাম।বিকাল সাড়ে চারটা বাজবে। আমি সিঁড়ি দিয়ে ছাদ থেকে নিচে নেমে আসছিলাম। সিঁড়ির নীচে ডান হাতে রান্নাঘর। তার পাশের পাশের রুমটা মায়ের যেখানে মা শুয়ে ছিলো। এখন তার দরজা খোলা। ঘরের মধ্যে কেউ নেই। দুই কাজের লোক বোধহয় বাইরে গিয়েছে। আর দিদা সামনের বাগানে কৃষ্ণ মন্দিরের কাছে বসে আছেন। ঘরে সূর্যের আলো আর ঢুকছে না। তাই একটা শীতল অন্ধকার ছেয়ে রয়েছে চার দিকটায়।
সিঁড়ি থেকে দু চার পা নামতেই মায়ের শোবার ঘরে নজর পড়ে গেলো আমার। দরজার উপরের অংশ থেকে ভেতরের সবটাই দেখাযায়। আমি দেখলাম বিছানার পাশে বাবা মা পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। মা বাবার বুকে মাথা রেখে দু’হাত দিয়ে পিঠ বেষ্টন করে দাঁড়িয়ে আছে। বাবার ডান কাঁধে গাল রেখে মা চোখ বন্ধ করে রয়েছে। বাবা ডান হাত মায়ের পিঠে এবং বাম হাত পাছার উপরে। বেশ রোমহর্ষক দৃশ্য দেখে আমার মনে হিংসার উদ্রেক হলেও মনকে শান্ত করে নিলাম। কারণ মায়ের একটু আদরের প্রয়োজন আছে। কিন্তু একি দেখছি আমি! বাবা কাঁদছে! মানে সত্যিই বাবা মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে! এতো তাজ্জব ব্যাপার। বাবার চোখে জল !বিশ্বাস হয়না। তার উপর শ্বশুর মরাতে। অবাক করার বিষয়। বাবা নিজের চশমা খুলে দিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরা অবস্থাতেই সেটা বিছানার উপর রেখে দিয়ে ডান হাত মায়ের মাথায় রেখে ঠোঁট কাঁপিয়ে কাঁদছে! এতো ক্ষণ যেটা আমি চোখে দেখিনি। মাও তো বাবার শার্টের কাঁধ ভিজিয়ে দিয়েছে। তাঁদের কান্না দেখে আমিও সিঁড়িতেই বসে পড়লাম। হাঁটুর উপর হাত ভাঁজ করে তাঁদেরকে দেখতে লাগলাম। বাবা মায়ের কান্না তে আমারও অবাধ চোখের জল গড়িয়ে পড়লো। আমি হাত দিয়ে আমার চোখের জল মুচ্ছিলাম।
মা বাবার কাঁধ থেকে মুখ সরিয়ে আবদার সুলভ ভঙ্গিতে বলল, “না.... আজকে যেওনা গো!!!”
বুঝলাম বাবা হয়তো কলকাতা ফিরে যেতে চায়ছে। কিন্তু মা তাঁকে বাধা দিচ্ছে।
বাবা মায়ের চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে চাপা গলায় বললেন, “আমি দু দিন পরেই ফিরে যাবো। তুমি চিন্তা করোনা। আমি ঠিক সামলে নেবো...”।
তবে বাবার কাঁদাটা মায়ের জন্য। দাদাইয়ের শোক প্রকাশের জন্য নয়। আর মায়ের কান্না দাদাই চির বিদায় নিয়েছেন বলে এবং এই মুহূর্তে বাবাও কলকাতা ফিরে যেতে চায়ছেন বলেই হয়তো।
বাবা মায়ের কপালে চুমু খেলেন তাপর মায়ের ঠোঁটে ঠোঁট রাখলেন। আর খুবই নিচু স্বরে কথা বলছিলেন। মাকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন বোঝো যাচ্ছে।
আমি ভগ্ন হৃদয় নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে আবার উপরে উঠে গেলাম। নিচে নেমে শব্দ করে তাঁদের ভালোবাসার মুহূর্তে ব্যাঘাত ঘটাতে চাইনা।
ছাদের উত্তর পশ্চিম দিকে চেয়ে ছিলাম। সুদূরে একখানা বিশাল চিমনী অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছিলো। বেলা ঢলতে শুরু করে দিয়েছে। সাঁঝ নামবে এই বোধয়। ঠিক সেই সময়,বাবা আমার কাছে উঠে এলেন। আমার মুখের দিকে তাকালেন, “বাবু আমি ফিরে যাচ্ছি! তুই মাকে দেখিস”।
বাবার কথায় আমি কষ্ট পেলাম। মা এমনিতেই ভীষণ ভেঙ্গে পড়েছে। তার উপর বাবা চলে যাওয়া খুবই হৃদয় বিদারক পরিস্থিতি। বললাম, “কেন বাবা? মায়ের অবস্থা দেখেছো একবার?”
আমার কথা শুনে বাবা মুখ নামালেন, “ আমার কিছু করার নেই বাবু। প্রচুর কাজ পড়ে আছে। সাইট থেকে ডাক আসছে। রুফ কাস্টিং হবে। আমি না গেলে অনেক অসুবিধা হয়ে যাবে…”।
বাবার কথায় আমি নিরুত্তর।
“তুই আছিস তো মাকে দেখার মত। তুই থাকলে ওর মনখারাপ করবে না!”
“কিন্তু বাবা!”
“কি হল বল?”
“থাক ছাড়ো! এমনিতেই মায়ের দেখাশোনা করার মত মানুষের অভাব নেই এখানে”।
“এমন কেন বলছিস বাবু?”
“আমি চাই তুমি আজ যেও না বাবা। এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। বাড়ি ফিরতে আবার রাত হয়ে যাবে”।
“আমার কোন অসুবিধা হবে না। তোর ল্যাপটপে অটোক্যাডটা আনস্টল করে দিসনি তো?”
ল্যাপটপের কথা মাথায় আসতেই ভয় পেয়ে গেলাম। তারপর বুঝলাম যে আমার সব মশলাপাতি পেনড্রাইভে রাখা আছে।
আমি হেসে বললাম, “ না। আনস্টল করিনি বাবা”।
বাবা বললেন, “ঠিক আছে তাহলে”।
নীচে থেকে আবার মায়ের ডাক পেলাম।
“শুনছো! ওগো শুনছো!” – বাবাকে ডাকছে।
বাবা আর আমি সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে এলাম। মা চোখের জল নিয়ে বাবার দিকে চেয়ে আছে, “তুমি যেও না গো!”।
এরই মধ্যে দিদাও সামনের দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলেন। বারান্দায় আমরা চারজন একে ওপরের দিকে তাকালাম। দিদাও বাবাকে অনুরোধ করলেন, “ আজকের দিনটা থেকে যাও বাবা। মেয়ের কষ্টটা বোঝো”।
বাবা, দিদার কথা টালতে পারলেন না। মা এসে সবার সামনে বাবাকে জড়িয়ে ধরল। আমি আর দিদা বাইরে চলে এলাম।
II ৭ II
সন্ধ্যাবেলায় অন্ধকার নামার সঙ্গে সঙ্গে কীর্তনিয়ার দল এসে হাজির হল। তাঁরা এবার থেকে টানা দশ দিন এখানে এসে হরির নাম সংকীর্তন করবেন। আর ঘরের সদস্যগণ ওই চাতালের চার পাশে বসে ঠাকুরের গান শুনবেন।
মাকে দেখলাম অনেকটায় স্বাভাবিক হয়েছে। দুপুরের নাইটি বদলে শাড়ি পরেছে। এবং এক খানা প্রদীপ নিয়ে কৃষ্ণ মন্দিরে ঢুকে তারপর সেই প্রদীপ হাতে নিয়ে দাদাইয়ের শেষ সায়ন কক্ষে প্রবেশ করল।
মা আর বাবা একসঙ্গে পাশাপাশি বসে কৃষ্ণগান শুনছিল। আমি আর দিদা একসঙ্গে বসেছিলাম। দিদা খুব মনোযোগ দিয়ে কীর্তন শুনছিলেন। আর দুই হাত দিয়ে ঈষৎ হাততালি দিচ্ছিলেন।
রাতে খাবার পর বাবা মা একসঙ্গে শুতে গেল। আমি পূর্ব দিকের কক্ষে একলায় ঘুমাবো। তার আগে দিদার রুমে ঢুঁ মেরে আসলাম। দিদা বিছানার এক কোণে বসে চোখে চশমা লাগিয়ে বই পড়ছিলেন। একটা জিনিস লক্ষ্য করছিলাম। দাদাইয়ের বিদায়ের পর দিদার মন শোক শূন্য ছিল। মনে হয় তিনি ব্যাপারটা মেনে নিয়েছেন। মা যেমন মেনে নিতে পারে নি। উন্মাদের মতো আচরণ করছে। কিন্তু দিদা একদম স্বাভাবিক। শান্ত সরোবরের মতো।
আমাকে দরজার দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তিনি আমায় হাসি মুখে ডাকলেন, “ ভেতরে এসো দাদু ভাই!”
একটু ইতস্তত ভাব নিয়ে আমি দিদার বাম পাশে এসে বিছানায় পা ঝুলিয়ে বসলাম।
“এখনও ঘুম পায়নি দাদু ভাই?”
হেসে বললাম, “ কলকাতায় এতো তাড়াতাড়ি আমরা ঘুমাই না দিদামনি”।
দিদাও হেসে বললেন, “ তোমার দাদাই তো সন্ধ্যা সাড়ে আটটার মধ্যেই খাওয়া সেরে ঘুমিয়ে পড়তেন”।
আমি, “ওহ আচ্ছা” বলে তার বইয়ের দিকে চোখ রাখলাম। ভাগবত গীতা! অষ্টম অধ্যায়।
“দিদা তুমি গীতা পাঠ করছ?”
দিদা আমার মুখের দিকে চেয়ে হাসলেন, “হ্যাঁ দাদু ভাই”।
“কি লেখা আছে এতে?”
দিদা সযত্নে উত্তর দিলেন, “জন্ম মৃত্যুর মায়া উপরান্ত অমোঘ জ্ঞান”।
আমি একটু আশ্চর্যচকিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “মানে?”
দিদা বললেন, “ভগবান কৃষ্ণ বলেছেন। জন্মের মতো জীবের মৃত্যুও অবশ্যম্ভাবী। জন্ম হলেই মৃত্যু হবে। সুতরাং মৃত্যু শোক করতে নেই”।
বুঝলাম দিদার এতো সুন্দর মনস্থিরতার কারণ কি!
বললাম, “সেকারণেই তুমি দিদা, দাদাই মারা যাবার পরেও এতো কান্নাকাটি করনি?”
দিদা হাসলেন, “না না। পুরোপুরি তা নয়। এই যে তোমার দাদাই চলে গেলেন। তার একটা একলাভাব তো থাকবেই মনের মধ্যে”।
দিদার মনের মধ্যে চেপে রাখা বেদনার আভাস পেলাম। আমি তাঁর আরও সমীপে এসে, তাঁর দুকাঁধ জড়িয়ে ধরলাম, “আমরা সবাই আছি দিদা। মা আছে, বাবা আছে, আমি আছি। তোমাকে কোন দিন একাকীত্ব বোধ হতে দেবো না”।
দিদা বইয়ের পড়া পৃষ্ঠার মাঝখানে আঙ্গুল দিয়ে বই বন্ধ করে রেখে ছিলেন। হয়তো আমি বাজে বকে তাঁর সময় নষ্ট করছিলাম। বললাম, “আর কি বলেছেন গো দিদা? ভগবান শ্রীকৃষ্ণ.....?”
তিনি বইয়ের ফাঁক থেকে আঙ্গুল বের করে নিলেন। বই বন্ধ করে পাশের টেবিলে রাখলেন। পড়ার জন্য চশমাও খুলে টেবিলের উপরে রাখলেন।
তারপর নিজের থাইয়ের উপর বাম হাতের মুঠো রেখে দেওয়ালে টাঙানো ঠাকুরের ছবির দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমরা সবাই ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সন্তান। মরার পর আমাদের শরীর পঞ্চতত্ত্বে বিলীন হয়ে যায়”।
দিদার কথা গুলো শুনতে বেশ ভালোই লাগছিলো। আমি বিছানার উপর পা তুলে ডান পাশ ফিরে শুয়ে তাঁর কোলে মাথা রেখে দিলাম।দিদা আমার মাথার উপর বাম হাত রাখলেন এবং পরম যত্নে চুলের মধ্যে আঙ্গুল চালাতে শুরু করে দিলেন।
আমি মনোযোগ দিয়ে শুনছিলাম এবং কৌতূহল নিয়ে প্রশ্ন একটা করলাম, “আচ্ছা দিদা! এই পঞ্চ তত্ত্ব কি জিনিস?”
দিদা বললেন, “পঞ্চতত্ত্ব হলো মানুষের শরীরের মূল উপাদান। জল, বায়ু, অগ্নি, পৃথিবী এবং আত্মা। আমাদের শরীরের রক্ত, লালা, কান্না ইত্যাদি জল তত্ত্ব নিয়ে গঠিত। আর নিঃশ্বাস, প্রশ্বাস বায়ু। শরীরের উষ্ণতা, শক্তি হলো অগ্নি তত্ত্ব। আমাদের শরীর মারা যাবার পর এই পঞ্চতত্ত্বে বিলীন হয়ে যাবে। পৃথিবী থেকে আমরা যা নিয়েছি সব এখানেই পড়ে থাকবে। কিন্তু আমাদের আত্মা, পরমাত্মার সঙ্গে বিলীন হয়ে যাবে। পরমাত্মা হলেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ”।
দিদার নরম কোলে মাথা রেখে পৌরাণিক গল্প শুনতে শুনতে হারিয়ে গিয়েছিলাম।
দিদার মুখের দিকে চেয়ে বললাম, “এইসব তুমি তোমার মেয়েকে বলো না গো। বেচারী ভীষণ কষ্ট পাচ্ছে”।
“এগুলো তুমি বলবে দাদুভাই। সে তো তোমার মা। তাঁকে বোঝানোর দায়িত্ব তোমারই”।
“আমিতো এতো কিছু জানতাম না দিদামণি!”
“তুমি ', সন্তান দাদুভাই। তোমার তো এগুলো জানা উচিৎ!”
“তোমার কাছেই শুনলাম। আমার ঠাকুরদা, ঠাম্মা কোনোদিন এইরকম গল্প শোনাই নি আমাকে....”।
দিদা হাসলেন, “তা শোনাবেন কেন?ছাড়ো তোমার ঠাকুরদার কথা। তিনি তো আবার ওই নাস্তিকের রাজনীতি করতেন। বাড়িতে মোটা মুখের দাড়িওয়ালা লোকটার ছবি এখনও আছে না সরিয়ে দিয়েছে?”
আমি ভ্রু কোঁচকালাম। বুঝলাম তিনি কাকে বোঝাতে চাইছেন।
বললাম, “না না দিদা! সে ছবি আর নেই। ঠাকুরদা মারা যাবার পর হয়তো সে ছবি হারিয়ে গেছে”।
দিদা বললেন, “হ্যাঁ। তোমার ঠাকুরদা আর দাদাইয়ের মধ্যে বচসা বেঁধে যেতো। তুমিই বল দাদুভাই দেশে নানান গুণী ব্যক্তি থাকতে কেন বিদেশী লোকের কথা শুনবো। তিনি যা বলতেন তাতে আমাদের গৌতমবদ্ধ, চৈতন্য মহাপ্রভু আছেন...”।
আমি চুপ করে শুনছিলাম। আর তাঁর বাম হাতের অলীক স্পর্শ আমার মাথায় অনুভব করছিলাম।
তিনি দাদাইয়ের ছবির দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে বললেন, “দেখো তোমার দাদাইয়ের দিকে। তিনি সর্বদা একটা আভিজাত্য বজায় রাখতেন। চল্লিশ বছর বয়সের পর থেকে ধুতি পাঞ্জাবী পরতেন। সারাজীবন শিক্ষকতা করেছেন। প্রধান শিক্ষক হয়েছেন। বিনামূল্যে দুস্থ ছেলেদের টিউশন দিয়েছেন। অথচ তোমার ঠাকুরদা সরকারি চাকরি করে প্রচুর টাকা মাইনে পেয়েও ছেঁড়া চপ্পল আর হাফ হাতা শার্ট পরেই কাটিয়ে দিয়েছেন সারাজীবন”।
আমি হাসলাম, “কলকাতার লোকেদের মধ্যে সেই আভিজাত্য কোথায় দিদা!”
দিদা, “ছাড়ো ওইসব কথা দাদুভাই”। বলে নড়ে উঠলেন। আমি তাঁর কোল থেকে মাথা তুলে বসলাম, “দিদা। তোমার ঘুম পেয়ে বোধহয়। আমি অনেকক্ষণ জাগিয়ে রাখলাম।আমি যাই তুমি ঘুমিয়ে পড়”।
তিনি বিছানার মধ্যে বসে বললেন, “নানা দাদুভাই। তুমিও এখানে ঘুমিয়ে পড়। এমনিতেও ওটা বৈঠকখানা। শোবার ঘর নয়”।
আমার কি মনে হলো কে জানে, দিদার এক কথাতেই রাজি হয়ে গেলাম।
দিদার আমার বাম পাশে দেওয়ালের দিকে শুয়ে পড়লেন। আর আমি তাঁর বিপরীত দিকে শুলাম।
লেপের তলায় দুজনে একসঙ্গে। দিদা আমার দিকে মুখ করে ছিলেন। ঘরের নাইট বাল্বের আলোয় তাঁর উজ্জ্বল মুখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিলো।
আমি তাঁর চোখে চোখ রেখে বললাম, “বহু ছোটতে আমি ঠাকুরদা ঠাম্মা কে হারাই। আমার দাদু দিদাই আমার কাছে আপন এবং প্রিয় দিদামণি”।