দেবশ্রী - এক স্বর্গীয় অনুভূতি - অধ্যায় ৪৯
নিজের বাপের বাড়ি থেকে ফিরে আসার পর বেশ উদাসীন লাগছিলো তাঁকে। একটা বিরাট ঝড় তাঁর উপর দিয়ে বয়ে গেছে। পিতৃহীনা মা আমার। দিদা আর বাবা বলেন কিছু সময়ের উপর ছেড়ে দিতে।সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মা সবকিছু ভুলে যাবে।সব কষ্টের নিবারণ হবে।
রান্নাঘরের স্ল্যবের ধারে দাঁড়িয়ে মা দীর্ঘক্ষণ জানালার দিকে তাকিয়ে সময় পের করতো। আমার সঙ্গে তেমন কথা বলতো না। সে বারে আমার ব্যবস্থা নেবে বলেছিল।কিন্তু কই সে নিয়েও তো মা কোন কথা বলেনি। আমিও নিজের রুমে শুয়ে বসে থাকতাম।
প্রায় তিন দিন পর দুপুর বেলা। বাবা বাড়িতে ছিল না। আমি ডাইনিং রুমে সোফায় বসে টিভি দেখছিলাম। মা রান্নাঘর থেকে আমায় ডাক দিলো।
আমি দরজার সামনে এসে দাঁড়ালাম, “কিছু বলছো মা?”
মা আমার দিকে চোখ মেলল, “আর কত দিন তোর ছুটি আছে রে বাবু?”
“আর দশ দিন আছে মা। আঠারোই জানুয়ারী কলেজ খুলবে”।
“আর দশ দিন মাত্র…”। মা’র কথার মধ্যে কেমন হতাশা লক্ষ্য করলাম। মা জানালার দিকে চোখ রাখল।
বুঝতে পারলাম।দশ দিন পর মা সম্পূর্ণ একা হয়ে যাবে। তাঁর একাকীত্বে সঙ্গ দেবার মতো কেউ থাকবে না। এই পরিস্থিতিতে মা’র একজন সঙ্গীর প্রয়োজন ছিল। যে সর্বদা তাঁর সঙ্গে থেকে তাঁর একলা পনা দূর করবে।
“কেন কিছু বলছিলে? মা?” আমি প্রশ্ন করলাম।
মা জানালার দিকে চোখ রেখে বলল, “নাহ কিছু না রে”।
মা’র কথা শুনে আমি সেখান থেকে চলে এলাম। নিজের রুমে বিছানার ধারে দাঁড়িয়ে আমিও জানালার দিকে চেয়ে ছিলাম। কষ্ট পাচ্ছিলাম। কিভাবে সবকিছু বদলে গেলো। মা আমার কেমন মন মরা হয়ে পড়েছে। আবার কলেজে লম্বা ছুটি পাবো সেই চার মাস পর।
নিজের রুম থেকে বেরিয়ে পুনরায় মা’র কাছে চলে এলাম। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর দিকে তাকালাম, “মা…”। বলে ডাকতেই তাঁর অধর কেঁপে উঠলো। আমি তাঁর কান্না দেখতে চাইনা।
দৌড়ে গিয়ে মা’কে আলিঙ্গন করলাম।
“তোমার চোখের জল আমার সহ্য হয়না মা”।
“তুই চলে যাবি শুনে মনটা ভারী হয়ে উঠল রে…। তুই যাস না”।
“আমি কোথাও যাচ্ছি না মা। তুমিও চলো না আমার সঙ্গে কলেজ। আমরা হউস রেন্ট করে নেবো।শুধু তুমি আর আমি থাকবো”।
“তোর বাবাকে আমি বলেছিলাম। ছেলেকে দূরে না পাঠাতে। আমার কত কষ্ট হয় বলতো”।
মা আমার বুকে মাথা রেখেছিলো। আমি তাঁর দুই বাহু ধরে তাঁকে তুলে চোখ রেখে বললাম, “তিন্নির ঘটনার পর তুমি আমাকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিলে। আমি কি আগের মতো তোমার বাবু হতে পারি না? আমরা আগের মতো বন্ধু হতে পারি না মা?”
মা’র চোখের কোণায় জল বিন্দু। আমি তাঁর ঠোঁটে উপর চুমু খেলাম। একবার নয়। দুই বার নয়। তিন বার। তারপর মা’র ওষ্ঠদ্বয়ে ডুব দিলাম। মা বাধা দিলো না। এই প্রথম মা আমাকে নির্দ্বিধায় পরিণত চুম্বনের আস্বাদ দিচ্ছিলো। আমি তাঁর অধর রস পান কর ছিলাম। সত্যিই অভাবনীয়। মা’র কোমল ঠোঁট দুটো কোন পদ্ম পাপড়ির থেকে কম নয়। যার মধ্যে একটা মাখনের মতো মসৃণতা আছে। মিষ্টি সুবাস আছে আর আছে অতুলনীয় স্বাদ। নিজের প্রেমিকা, প্রানপ্রিয়া মা’র ওষ্ঠাধরে ডুব দেবার আনন্দ অপরিসীম। তাঁর পিঠ জড়িয়ে আলিঙ্গন করে ঠোঁটে ঠোঁট মিলিয়ে অমৃত সাগরে পাড়ি দিচ্ছিলাম। মা’র নাক মুখের উষ্ণ শ্বাস আমার নাকের ডগায় অনুভব করছিলাম। আর একটা ম্লান মধুর শিরশিরানি ধ্বনি তাঁর মুখ দিয়ে ভেসে আসছিলো। চঞ্চল ছিল মা’র মন।ছেলের বাহুর মধ্যে নিজেকে বিলিয়ে দিচ্ছিল। মা’র মনে একটা বিরাট খালি ভাব তৈরি হয়েছে সেটা বুঝতে পারছিলাম। তাঁর এখন ভালোবাসার প্রয়োজন। সংস্পর্শের প্রয়োজন। জীবনে প্রথমবার মাকে গভীর ভাবে মুখ চুম্বন করে আমি অকল্পনীয় সুখ পেলাম। যেন মা শুধু আমারই। মা আমার বান্ধবী, আমার প্রেমিকা। সব কিছুই।
কিছুক্ষণ পর আমরা আলিঙ্গন মুক্ত হলাম। মা’র মুখে লজ্জা ভাব স্পষ্ট। সে আমার দিকে তাকিয়ে মুখ নামিয়ে স্ল্যাবের দিকে চোখ রাখল।এই অদ্ভুত অভিজ্ঞতার কারণ জিজ্ঞাসা করার প্রয়োজন বোধ করলাম না। শুধু একটা অবাক সুলভ দৃষ্টি নিয়ে তাঁর দিকে চেয়েছিলাম।
মা আমার দিকে ঘাড় ঘোরালো, “তুই আমার সোনা ছেলে”।
আমি মৃদু হাসলাম। তাঁর বাম কাঁধে ডান হাত রাখলাম, “কিন্তু তুমি আমার সব মা। আমি তোমাকে ভালোবাসি মা”।
মা করুণ দৃষ্টি নিয়ে আমার দিকে তাকাল।
“আমি তোমার দুঃখ কষ্ট মনখারাপ সব কেড়ে নিতে চাই তোমার কাছে থেকে। তোমাকে হাসি খুশি দেখতে চাই মা”।
মা মাথা নাড়ল।
আমি বললাম, “ এখন কয়েকদিন বাবা নিজের কাজে ব্যস্ত থাকবেন। তাই শুধু আমি আর তুমি এই মুহূর্ত গুলো একসঙ্গে থেকে উপভোগ করবো। আজ থেকে আমি তোমার বন্ধু। আর তুমি আমার বান্ধবী”।
মা হাসল।
জিজ্ঞেস করলাম, “রান্না হয়ে গেছে মা?”
মা বলল, “ না রে মাছের ঝালটা এখনও বাকী আছে”।
আমি বললাম, “থাক না মা। আর ঝাল বানাতে হবে না। ভাজা মাছ দিয়েই ভাত খেয়ে নেবো”।
মা হাসল, “বা রে তুই যে বলতিস দাদাই মারা যাওয়ার পর সেদ্ধ সেদ্ধ খেয়ে তোর মুখে অরুচি ধরে গেছে”।
আমি বললাম, “ থাক । আজ নয়। আজ দাদাইয়ের কথা উঠল যখন,দাদাইয়ের গল্পই শুনবো তোমার কাছে থেকে”।
“কি গল্প শুনবি বাবু?”
“তোমার গল্প মা। দাদাইয়ের গল্প। তোমার ছেলে বেলার গল্প… সব শুনবো”।
রান্নায় মনোযোগ দিয়ে মা বলল, “বেশ ভালো কথা। আগে স্নানটা করে আয়। তারপর দু’জন মিলে খেয়ে একসঙ্গে বসে আমার গল্প শোনাবো”।
মা’র কথা মতো আমি স্নানে গেলাম। কিছুক্ষণ পর বেরিয়ে দু’জনে খেতে বসলাম। আজ মা রান্না করেছিলো গাজর দিয়ে বাঁধাকপির তরকারী, মেথির শাক, বেগুণ ভাজা, মাছ ভাজা এবং মুসুর ডাল।
খাওয়ার আগে মা বাবাকে ফোন করে জেনে নিয়েছিলো যে তিনি খেয়েছেন কি না?
বাবা জানিয়েছিলেন যে তিনি খেয়ে নিয়েছেন এবং ফিরতে রাত হয়ে যাবে।
II ৬ II
খাওয়ার পর দুপুরবেলা মা সোফার মধ্যে বসে ছিল। আমি গিয়ে তাঁর কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়লাম। মা আমার চুলের উপর হাত রাখল।
আমি তাঁর দিকে তাকিয়ে বললাম, “এবার বল না মা”।
“কি বলবো বাবু?” মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করলো।
“দাদাইয়ের গল্প”।
“কি গল্প বাবু?”
আমি সোফার মধ্যে উবুড় হয়ে শুয়ে পড়লাম। দু’হাত থুতনিতে রেখে মা’র দিকে চোখ মেলে তাকালাম, “তোমার কাছে দাদাই কেমন মানুষ ছিলেন মা?
মা হাঁফ ছেড়ে বলল, “তোর দাদাই আমার সব চেয়ে কাছের মানুষ ছিলেন। পথিকৃৎ যাকে বলে”।
আমি মনোযোগ দিয়ে মা’র কথা গুলো শুনছিলাম, “আচ্ছা। দাদা মশাই তো ভীষণ রাগী ছিলেন। গম্ভীর তাঁর ব্যক্তিত্ব ছিল। তিনি তোমাকে কড়া অনুশাসনে রেখে ছিলেন তাই না? হয়তো তুমি ভয় পেতে তাঁকে। ভুল করলে প্রহার দিতেন”। আমি হাসলাম।
মা সিলিঙের দিকে চেয়ে বলল, “না। তেমন কিছুই না। গোটা পৃথিবীর কাছে হয়তো বাবা কোঠর, রাগী, দাম্ভিক মানুষ ছিলেন। কিন্তু আমার কাছে তিনি সহজ সরল মানুষ ছিলেন। একজন পিতাপুত্রীর যেমন গভীর সম্পর্ক হয়। ঠিক সেই রকম”।
মা হাসল, “আর অনুশাসনের কথা বলছিস। ওটার জন্য ভয় দেখানোর প্রয়োজন হয়না। আমি ছোট থেকেই বাবা মায়ের অনুগত ছিলাম। শিক্ষক পরিবারে জন্ম বলে শিষ্টাচার হয়তো রক্তে ছিল। প্রহার, মারধর তো দূরের কথা। তোর দাদাই কোনদিন আমায় বকেছে বলে মনে পড়ছে না। রাঙা চোখ দেখিনি তাঁর কোনোদিনই। মুখে শুধু “মা” ছাড়া আর কোন শব্দ শুনিনি………। হ্যাঁ তবে তোর দিদা আমায় ভালোই শাসনে রাখতেন। পেটাতেন। বকতেনও খুব। তখন আবার বাবাই মা’কে বলতো আমাকে না বকতে। পরে একটা সময়ের পর অবশ্য তোর দিদাই আমার প্রিয় বন্ধু হয়ে দাঁড়ায়। আমার সুখ দুঃখ ভাগ করে নেওয়ার একমাত্র মানুষ”।
মা’কে বলতে দিচ্ছিলাম। মা যেন নির্দ্বিধায় সব কিছু বলে। প্রাণ খুলে মনের ভাব প্রকাশ করে। আমি শুধু শুনছিলাম।
জিজ্ঞেস করলাম, “ দিদা কখন থেকে তোমার কাছে প্রিয় বান্ধবীর মতো হয়ে দাঁড়ায় মা?”
মা মুখ নামিয়ে স্বশব্দে হাসল, “প্রত্যেক মায়ে দেরই একটা সময়ের পর নিজ সন্তান দের কাছের মানুষ হয়ে দাঁড়াতে হয় বাবু। বিশেষ করে মেয়ের মা দের”।
আমি অবাক হলাম। তিন্নির কথা গুলো মনে পড়লো। মা মেয়ের অবাধ বন্ধুত্বের কথা। বুঝছিলাম অনেক কিছু।
“কেন মা? ছেলে আর মেয়ের মধ্যে কি তফাৎ আছে? মায়ের তো ছেলে মেয়ে উভয়ের ভালো বন্ধু হওয়া উচিৎ। এক্ষেত্রে মেয়েরা কেন বেশি অগ্রাধিকার পাবে?”
মা আবার হাসল, “ওটারও একটা ব্যাপার আছে বাবু। মেয়েদের বেড়ে ওঠা আর ছেলেদের বেড়ে ওঠা এক জিনিস নয়। মেয়েদের একটা বিরাট পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। সে সময় মেয়েদের মনের অবস্থা অনেক টাই উতলা সাগরের মতো হয়”।
“আমি ঠিক বুঝলাম না মা”।
মা আমার দিকে ঘাড় ঘোরালো, “সে সময় আমিও ঠিক বুঝতে পারিনি বাবু। তোর দিদাও হেঁয়ালির মতো কথা গুলো বলছিল সব”।
“কি কথা মা?”
মা মৃদু হেসে, “সে বলেছিল ঈরা, পিঙ্গলা, সুষুম্নার সংযোগ স্থলে যখন জোয়ার আসবে তখন আমায় জানাবি”।