দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস? - অধ্যায় ২৯

Original Chapter Link: https://xossipy.com/thread-74058-post-6263070.html#pid6263070

Posted on Mon Jul 13 2026 by Orbachin (Profile)

Tags: None
2465 words / 11 min read

Parent
২৯। মানুষের জীবনে অপেক্ষার চেয়ে ভয়ংকর কোনো শাস্তি পৃথিবীতে নেই। বিশেষ করে সেই অপেক্ষা যদি হয় অনিশ্চয়তার, আর তার সাথে যদি মিশে থাকে চরম আতঙ্ক। গ্রিক পুরাণে প্রমিথিউসের একটা গল্প আছে। তাকে পাহাড়ে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছিল, আর প্রতিদিন একটা ঈগল এসে তার কলিজা ঠুকরে খেত। রাতে সেই কলিজা আবার জোড়া লাগত, পরদিন আবার ঈগল আসত। আমার মনে হয়, প্রমিথিউসের এই শাস্তিটা নেহাতই ছেলেখেলা। তাকে যদি বলা হতো— "ভাই প্রমিথিউস, তোমার প্রেমিকার মোবাইল বন্ধ, সে কোথায় আছে তুমি জানো না, আর তার স্বামী হয়তো তাকে খুন করে স্যুটকেসে ভরে ফেলেছে"— তাহলে প্রমিথিউস বলত, "তার চেয়ে বরং ঈগলকে পাঠাও, কলিজা খাওয়াটাই আরামের।" বসুন্ধরা সিটির সেই বাথরুমের উদ্দাম মিলনের পর কেটে গেছে পাক্কা আটচল্লিশ ঘণ্টা। দুটো দিন এবং দুটো রাত। এই দুই দিনে আমার অবস্থা আক্ষরিক অর্থেই পাগলপ্রায়। আমি মোবাইল হাতে নিয়ে বসে থাকি। হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ পাঠাই।  "আনিকা, তুমি ঠিক আছো?" "আনিকা, প্লিজ একটা রিপ্লাই দাও।" "তোমার কি কোনো বিপদ হয়েছে? আমি কি আসব?" গত দুই দিনে আমি আনিকাকে অন্তত একশোটা মেসেজ দিয়েছি। একটা মেসেজও সিন হয়নি। ডাবল টিক পড়ে না, শুধু একটা সিঙ্গেল টিক হয়ে খঞ্জরের মতো আমার বুকের ভেতর বিঁধে থাকে। হোয়াটসঅ্যাপে অসংখ্যবার অডিও এবং ভিডিও কল দিয়েছি। স্ক্রিনে শুধু 'Calling...' লেখাটা ওঠে, 'Ringing...' হয় না। এর মানে খুব পরিষ্কার— উনার ফোনে ইন্টারনেট কানেকশন নেই। শেষে আমি ডিরেক্ট সেলুলার নেটওয়ার্কে কল দিয়েছি। ওপাশ থেকে একটা যান্ত্রিক নারী কণ্ঠ নির্লিপ্তভাবে বলেছে, "দুঃখিত, আপনার ডায়ালকৃত নাম্বারটি এই মুহূর্তে বন্ধ আছে।" আমি কারওয়ান বাজারের অফিসে ল্যাপটপের সামনে বসে থাকি একটা জ্যান্ত লাশের মতো। আমি যন্ত্রের মতো আন্তর্জাতিক খবর অনুবাদ করছি। 'পুতিনের নতুন পারমাণবিক হুমকি', 'গাজায় বোমা হামলা'— এসব টাইপ করছি, কিন্তু আমার মাথার ভেতর চলছে অন্য একটা থ্রিলার সিনেমা। আমার মনে প্রচণ্ড ভয়। আনিকার কী হলো! সেদিন বসুন্ধরা সিটির বাথরুমের সেই তীব্র, পারমাণবিক মিলনের খবর কি বেলাল সাহেব কোনোভাবে বুঝে গিয়েছিলেন? আমরা যখন বের হচ্ছিলাম, তখন কি উনি আমাদের দেখে ফেলেছিলেন? নাকি আনিকা যখন বাথরুম থেকে বেরিয়ে উনার স্বামীর কাছে গিয়েছিলেন, তখন বেলাল সাহেব উনার স্ত্রীর শরীরের ওই বন্য ঘ্রাণ, ওই এলোমেলো অবস্থা দেখে কিছু সন্দেহ করেছিলেন? পুরুষ মানুষের ইনস্টিংক্ট খুব মারাত্মক হয়। নিজের স্ত্রীর শরীরে অন্য পুরুষের আঁচড় পড়লে সেটা স্বামীরা ঠিকই টের পায়। বেলাল সাহেব কি আনিকাকে ধানমন্ডির ওই ফ্ল্যাটে বন্দি করে ফেলেছেন? উনার ফোন কি কেড়ে নিয়েছেন? নাকি... নাকি... ওহ গড! এই চিন্তাটা আমি কল্পনাতেও আনতে চাই না। কিন্তু মানুষের মস্তিষ্ক একটা আস্ত শয়তান। সে সবচেয়ে খারাপ জিনিসটাই সবার আগে আপনাকে দেখাবে। আমার চোখের সামনে ভাসতে শুরু করল, বেলাল সাহেব রাগের মাথায় কিচেন থেকে ছুরি এনে আনিকাকে জবাই করে দিয়েছেন। উনার সেই ডালিমের দানার মতো ঠোঁট, তরমুজের মতো স্তন, আর ওই নিখুঁত ৩৬-২৮-৩৬-এর শরীরটা রক্তে ভেসে যাচ্ছে। বেলাল সাহেব লাশটা টুকরো টুকরো করে উনার ওই বিশাল লাগেজে ভরছেন। আমি শিউরে উঠে চোখ খুলি। আমি এখন কী করব? এই দুই দিন ধরে আনিকার সাথে আমার কোনো যোগাযোগ নেই। মেয়েটা বেঁচে আছে, নাকি মরে গেছে, নাকি অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে পড়ে আছে— কিচ্ছু বুঝতে পারছি না। আমার কি পুলিশে যাওয়া উচিত? কিন্তু পুলিশে গিয়ে আমি কী বলব? "হ্যালো ওসি সাহেব, আমি রাশেদ। আমি পঁচিশ হাজার টাকা বেতনের একজন অনুবাদক। আমি গত এক মাস ধরে এক লন্ডনপ্রবাসী বিলিয়নিয়ার ইঞ্জিনিয়ারের বউয়ের সাথে শুয়েছি। এখন তার বউকে পাওয়া যাচ্ছে না, একটু খুঁজে দেবেন?" পুলিশ আমাকে আনিকাকে খোঁজার আগে রিমান্ডে নিয়ে বাঁশডলা দেবে। আমি কি ওই ধানমন্ডির ফ্ল্যাটে গিয়ে চেক করে আসব? কিন্তু সেখানে গেলে যদি বেলাল সাহেব দরজা খোলেন? উনি যদি আমাকে দেখেই চিনে ফেলেন, আর আমাকে ফ্ল্যাটের ভেতর টেনে নিয়ে আমারও কোনো ক্ষতি করেন? আমি তো বডিবিল্ডার না যে উনার সাথে মারামারি করে জিতব। আমি তো দুই থাপ্পড় খেলেই অজ্ঞান হয়ে যাব। এই সীমাহীন দোটানা, আতঙ্ক আর একাকিত্বের মাঝে আমি না পারছি খেতে, না পারছি ঘুমাতে। মিরপুরের মেসে আমি একটা পাগলা কুকুরের মতো এপাশ-ওপাশ করি। আমার চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে। তৃতীয় দিন। দুপুরবেলা। আমি অফিসে বসে একটা নিউজ এডিট করছি, আমার চোখ লাল হয়ে আছে। ঠিক দুপুর একটার সময় আমার ফোনটা স্ক্রিনে একটা ভাইব্রেশন দিল। আমি ছোঁ মেরে ফোনটা তুললাম। হোয়াটসঅ্যাপের নোটিফিকেশন। এবং নামটা— 'Anika Nawhar'! আমার শ্বাস আটকে গেল। আমি দ্রুত মেসেজটা ওপেন করলাম। "তুমি কি অফিসে? একটা ঝামেলা হয়েছে। তোমার সাথে কথা বলা প্রয়োজন। ধানমন্ডির গ্লোরিয়া জিন্স কফিতে আসো। কুইক।" মেসেজটা পড়ার পর আমার বুক থেকে যেন এক টন ওজনের একটা পাথর নেমে গেল। আনিকা বেঁচে আছে! আমার অপ্সরী বেঁচে আছে! কিন্তু পরক্ষণেই আরেকটা ভয় এসে চেপে বসল। "একটা ঝামেলা হয়েছে!" কী ঝামেলা? বেলাল সাহেব কি সব জেনে গেছেন? উনি কি ডিভোর্স পেপার পাঠিয়েছেন? আমি আর এক সেকেন্ডও অপেক্ষা না করে সরাসরি হোয়াটসঅ্যাপে কল দিলাম। রিং হলো। কিন্তু আনিকা কলটা সাথে সাথে কেটে দিলেন। একটু পরেই আরেকটা মেসেজ এল: "কল দিও না। তুমি আসো। সব খুলে বলব।" আমি ল্যাপটপটা ধাপ করে বন্ধ করে দিলাম। এহসান ভাই একটু দূরে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছিলেন, আমি উনার দিকে একবারও না তাকিয়ে, কাউকে কিছু না বলে, ব্যাগটা ঘাড়ে ঝুলিয়ে অফিস থেকে পাগলের মতো ছুটে বেরিয়ে এলাম। রাস্তায় নেমে একটা উবার মোটো নিলাম। "মামা, ধানমন্ডি গ্লোরিয়া জিন্স। যত জোরে পারেন টানেন।" কারওয়ান বাজার থেকে ধানমন্ডি যাওয়ার এই পথটুকুতে আমার মনে হলো আমার আয়ু দশ বছর কমে গেছে। গ্লোরিয়া জিন্সের কাঁচের দরজা ঠেলে যখন আমি ভেতরে ঢুকলাম, তখন দুপুর পৌনে দুইটা। কফিশপটার ভেতরটা বেশ শান্ত, এসি চলছে, সুন্দর একটা কফির অ্যারোমা ভাসছে বাতাসে। আমি এদিক-সেদিক তাকালাম। এবং আমি উনাকে দেখলাম। কফিশপের একদম কর্নারের একটা টেবিলে, জানালার পাশে বসে আছেন আনিকা নাওহার। উনাকে দেখে আমি আক্ষরিক অর্থেই বোকা বনে গেলাম। আমি গত দুই দিন ধরে ভেবেছি, উনি হয়তো নির্যাতিতা, বিধ্বস্ত, মুখ-চোখ ফোলা অবস্থায় বসে থাকবেন। কিন্তু আমার সামনে যিনি বসে আছেন, তিনি যেন সদ্য পার্লার থেকে বের হওয়া কোনো রানীর মতো। উনার পরনে একটা খুব এলিগ্যান্ট, হালকা পেস্তা রঙের সালোয়ার কামিজ। চুলগুলো খুব সুন্দর করে ব্লো-ড্রাই করা। চোখে হালকা আইলাইনার, ঠোঁটে ন্যুড লিপস্টিক। উনার চেহারায় বিন্দুমাত্র কোনো উত্তেজনা নেই, কোনো উদ্বেগ নেই, কোনো পাগলামি নেই। একদম স্নিগ্ধ, অপরূপ এবং নিখুঁত একটা রূপ নিয়ে উনি কফির মগ হাতে বসে আছেন। আর আমার নিজের অবস্থা? আমি গত তিন দিন ধরে ঠিকমতো শেভ করিনি, চুল উসকোখুস্কো, চোখের নিচে ডার্ক সার্কেল, শার্টটা কুঁচকে আছে। আমাকে দেখে মনে হচ্ছে আমি রিফিউজি ক্যাম্প থেকে পালিয়ে আসা কোনো লোক, আর উনি কোনো ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্য। আমি হনহন করে হেঁটে উনার টেবিলের সামনে গিয়ে দপ করে একটা চেয়ার টেনে বসে পড়লাম। আমার ভেতরে তখন রাগের একটা আগ্নেয়গিরি ফুটছে। "হোয়াট দ্য হেল ইজ দিস আনিকা!" আমি প্রায় হিসহিস করে, চাপা রাগে ফেটে পড়ে বললাম। "এই দুই দিন তুমি কই ছিলে? তোমার ফোন বন্ধ কেন?" আনিকা উনার কফির মগটা খুব শান্তভাবে টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখলেন। উনার চোখের দৃষ্টিতে কোনো অপরাধবোধ নেই, বরং এক ধরনের অদ্ভুত কাঠিন্য। "চুপ।" আনিকা খুব নিচু, কিন্তু অত্যন্ত কড়া গলায় বললেন। "কোনো কথা না। আমি সব বলব তো বলেছি।" "সব খুলে বলবে! সব খুলে বলবে তো করছ গত কয়েকদিন ধরে!" আমি রাগে গরগর করতে করতে বললাম। "কিন্তু কিছুই তো বলছ না। এই সাসপেন্সের মানে কী? তুমি কি সাইকোপ্যাথ? এই দুই দিনে আমার মাথা খারাপ হওয়ার অবস্থা!" আনিকা উনার ডান হাতের তর্জনী দিয়ে উনার কফির মগের কিনারাটা খুব আলতো করে ঘষতে লাগলেন। উনার ঠোঁটের কোণে একটা খুব সূক্ষ্ম, বাঁকা এবং ঘাতক হাসি ফুটে উঠল। উনি একটু সামনের দিকে ঝুঁকে এলেন। উনার সেই মোহনীয়, ফিসফিস করা গলায়, একদম সরাসরি আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন—"মাথা নাকি বাঁড়া? কোনটা পাগলপ্রায়?" কথাটা শোনার পর আমার মনে হলো গ্লোরিয়া জিন্সের ছাদটা আমার মাথার ওপর ভেঙে পড়ল। এই চরম সিরিয়াস, ক্রাইসিস একটা মুহূর্তে, একটা পাবলিক কফিশপে বসে এই নারী আমাকে এই লেভেলের একটা স্ল্যাং, একটা চূড়ান্ত সেক্সুয়াল এবং উসকানিমূলক কথা বলতে পারল! আমি রাগে, অপমানে এবং একই সাথে এক অদ্ভুত উত্তেজনায় গরগর করতে লাগলাম। আমি কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু আমার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। আনিকা উনার হাসিটা আরেকটু চওড়া করলেন। "আচ্ছা ঠিক আছে বাবা, রাগ কোরো না," আনিকা খুব আদুরে গলায় বললেন। "আমি আদর করে আমার পাগলকে সুস্থ করে দেব। একটু অপেক্ষা করো।" আমি জ্বলন্ত চোখে উনার দিকে তাকিয়ে রইলাম। আনিকা উনার হাত তুলে ওয়েটারকে ইশারা করলেন। এক মিনিটের মধ্যে ওয়েটার এসে দুটো কফি আর এক প্লেট স্টিমড ওনথন( Wonton) দিয়ে গেল। "নাও, খাও। খেতে খেতে শোনো," আনিকা একটা ওনথন কাঁটাচামচে গেঁথে মুখে দিতে দিতে বলা শুরু করলেন। "সেদিন বসুন্ধরা সিটি থেকে ফেরার পর আমার রিয়েলাইজেশন হলো," আনিকা খুব শান্ত গলায়, যেন কোনো সিনেমার রিভিউ দিচ্ছেন, এমনভাবে বললেন। "আমি বুঝতে পারলাম, আমার আর বেলালের সম্পর্কটা আসলে ডেড। এই মরা সম্পর্কটা টেনে নিয়ে যাওয়ার কোনো মানে হয় না। আমি ডিসাইড করলাম, আমি আজ রাতেই বেলালকে সব খুলে বলব। আমি ওকে বলব যে আমি ডিভোর্স চাই।" আমি অবাক হয়ে উনার দিকে তাকালাম। "তুমি বেলাল সাহেবকে সব বলে দিতে চেয়েছিলে?" "হ্যাঁ। আমি চেয়েছিলাম সবকিছু ক্লিয়ার করে দিতে। কিন্তু সেই বলার সুযোগটা আর হলো না।" "কেন?" আমি ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলাম। আনিকা কফিতে একটা চুমুক দিয়ে একটা ছোট দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। "আমরা যখন ডিনার করছিলাম, রাত আটটার দিকে, তখন বেলালের ফোনে একটা কল আসে। ও ফোনটা ধরে একটু ড্রয়িংরুমের দিকে যায়। তারপর ফিরে এসে বলে, ওর একটা খুব ইমার্জেন্সি কাজ পড়েছে, ওকে একটু বের হতে হবে। আমি জিজ্ঞেস করলাম কোথায় যাচ্ছে, ও শুধু বলল— 'আমি এক ঘণ্টার মধ্যে আসছি'। তারপর ও বেরিয়ে যায়।" আনিকা একটু থামলেন। উনার চোখের দৃষ্টিটা এবার একটু গম্ভীর হলো। "এরপর আর ও বাসায় ফিরে আসেনি রাশেদ। আজ তিন দিন হতে চলল, বেলাল নিখোঁজ।" "হোয়াট!" আমি প্রায় চিৎকার করে উঠতে গিয়ে নিজেকে সামলে নিলাম। আমি চারদিকে তাকিয়ে গলার স্বর নামিয়ে বললাম, "বলছ কী এসব? নিখোঁজ মানে কী? কী হয়েছে উনার?" আনিকা একটা চরম বিরক্তিকর মুখ করে আমার দিকে তাকালেন। "আরে, আমি জানলে কি আর এখানে বসে কফি খেতাম? আমি যতোভাবে যোগাযোগ করা যায় করার চেষ্টা করেছি। ওর ফোন বন্ধ। ওর আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব— সবাইকে কল করেছি। কেউ কিচ্ছু জানে না। ওর লন্ডনের কলিগদেরও ফোন করেছি, তারা ভেবেছে ও আমার সাথেই আছে।" আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। বেলাল সাহেব নিখোঁজ! ঢাকা শহরের মতো জায়গায় একজন লন্ডনপ্রবাসী ইঞ্জিনিয়ার নিখোঁজ হয়ে গেল! "তাহলে... তাহলে এখন কী হবে?" আমি আমতা আমতা করে বললাম। "আজ সকালে বেলালের ভার্সিটি লাইফের দুই বন্ধুকে ডেকে এনেছিলাম। ওদের সাথে নিয়ে ধানমন্ডি থানায় গিয়েছিলাম। বেলালের নামে একটা মিসিং রিপোর্ট বা জিডি ফাইল করে এসেছি।" আনিকা খুব শান্তভাবে কথাটা বললেন। আমার মাথার ভেতর তখন হাজারটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। "এক মিনিট দাঁড়াও," আমি হঠাৎ একটা খুব লজিক্যাল প্রশ্ন করে বসলাম। "বেলাল সাহেব যদি নিখোঁজ হয়ে থাকেন, তুমি যদি টেনশনে থাকো, তাহলে গত দুই দিন ধরে তোমার ফোন বন্ধ দেখাচ্ছিল কেন? তুমি আমাকে একটা মেসেজও দিলে না কেন?" আনিকা আমার দিকে এমনভাবে তাকালেন যেন আমি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গাধা। "আরে বুদ্ধু!" আনিকা উনার কাঁটাচামচটা টেবিলে রেখে বললেন। "তুমি কি আসলেই এত বোকা, নাকি বোকা সাজার ভান করো? তুমি যে নাম্বারে আমাকে ফোন দাও, সেটা আমার সেকেন্ড নাম্বার। ওই নাম্বারটা আমি শুধু তোমার সাথে যোগাযোগ করার জন্যই কিনেছিলাম। আমার ফ্যামিলি, ফ্রেন্ডস, আর অফিশিয়াল কাজের জন্য আমার মেইন নাম্বার আলাদা, যেটা সবসময় খোলা থাকে।" আমার চোখ কপালে উঠে গেল। একটা নারী কতটা ধূর্ত, কতটা ক্যালকুলেটিভ হলে পরকীয়া করার জন্য আলাদা একটা বার্নার সিম ব্যবহার করতে পারে!"আর তুমি আমাকে মেসেজ দিতে বলছ?" আনিকা একটু ঝাঁঝালো গলায় বললেন। "আমার স্বামী নিখোঁজ! আমি থানায় দৌড়াচ্ছি, বেলালের বন্ধুদের সাথে কথা বলছি। এই অবস্থায় আমি যদি ওই ফোনটা অন রাখতাম, আর তুমি যদি অনবরত আমাকে কল করতে থাকতে, তাহলে ব্যাপারটা কেমন হতো? যদি বেলালের কোনো বন্ধু বা পুলিশ আমার সেকেন্ড ফোনটা দেখে ফেলত? স্বামীর নিখোঁজের সময় একজন নারী তার গোপন প্রেমিকের সাথে চ্যাটিং করছে— এটা দেখলে পুলিশের সন্দেহ সবার আগে কার ওপর পড়ত, বুঝতে পারছ না?" আমি আনিকার এই সাইকোলজিক্যাল আর লজিক্যাল ব্যাখ্যার সামনে একদম বোবা হয়ে গেলাম। উনার কথায় যুক্তি আছে। কিন্তু উনার এই নিখুঁত, কোল্ড-ব্লাডেড হিসাব-নিকাশ আমাকে মানসিকভাবে প্রচণ্ড একটা ধাক্কা দিল। "কিন্তু আনিকা," আমি একটু রুক্ষ গলায় বললাম, "তুমি থানায় গেলে, বেলালের বন্ধুরা তোমার ফ্ল্যাটে এল। আমি তো গত পঁচিশ দিন ধরে ওই ফ্ল্যাটে ছিলাম। বিল্ডিংয়ের দারোয়ান মফিজ থেকে শুরু করে আশেপাশের দোকানদার— সবাই তো আমাকে চেনে। পুলিশ বা বেলালের বন্ধুরা যদি দারোয়ানকে জেরা করে, দারোয়ান তো আমার কথা বলে দেবে। তখন কী হবে?" আনিকা একটা খুব তৃপ্তির হাসি হাসলেন। উনার চোখে একটা শয়তানি ঝিলিক। "আমি কি এতটা কাঁচা কাজ করতে পারি রাশেদ? আমি জানি দারোয়ান তোমাকে চেনে। তাই আমি থানায় তোমার কথা লুকাইনি। আমি নিজেই পুলিশের কাছে তোমার কথা বলেছি।" "কী!" আমি প্রায় লাফিয়ে উঠলাম। "তুমি পুলিশকে আমার কথা বলেছ? তুমি কি আমাকে ফাঁসাচ্ছ আনিকা?" "আহ! চিল্লাচ্ছ কেন?" আনিকা আমাকে ইশারা করে বসতে বললেন। "শোনো আমি পুলিশকে কী বলেছি। আমি বলেছি, তুমি আমার ছোট ভাইয়ের মতো। তুমি একজন অনুবাদক আর প্রুফরিডার। আমার নতুন উপন্যাসের কাজে আমাকে হেল্প করার জন্য তুমি গত কয়েকদিন আমার বাসায় গেস্ট হিসেবে ছিলে। বেলাল দেশে আসার পর তুমি চলে গেছ। ব্যাস! এতে সন্দেহের কী আছে?" আমি আনিকার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলাম। আমি উনার ছোট ভাই! যে নারীর যোনির প্রতিটি ভাঁজ আমার জিভের স্পর্শে ভিজেছে, যে নারীর স্তন আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা চুষেছি, যে নারীর সাথে আমি বাথরুম থেকে শুরু করে বেডরুম পর্যন্ত আদিম পশুর মতো সঙ্গম করেছি— সেই নারী এখন আমাকে বানিয়েছে উনার ছোট ভাই! আমার বুকের ভেতর একটা প্রচণ্ড কালো রসবোধ বা ডার্ক হিউমার জেগে উঠল। "আমি তোমার ছোট ভাই?" আমি একটা বাঁকা হাসি দিয়ে বললাম। "তুমি কি আমাকে গেম অফ থ্রোনস-এর গল্প শোনাচ্ছ? তুমি কে? তুমি সার্সেই ল্যানিস্টার, আর আমি জেমি ল্যানিস্টার? ভাই-বোনের এই পবিত্র ইনসেস্ট কি ঢাকা শহরের পুলিশ বিশ্বাস করবে?" আনিকা আমার এই তীক্ষ্ণ এবং সারকাস্টিক রেফারেন্সটা সাথে সাথে ধরে ফেললেন। উনার মুখটা একটু শক্ত হলো। "মজা করবে না রাশেদ। পরিস্থিতি সিরিয়াস।" "মজার ব্যাপার কী!" আমি এবার আর নিজেকে আটকাতে পারলাম না। আমার ভেতরের সমস্ত ফ্রাস্ট্রেশন আর অপমান একটা গালি হয়ে বেরিয়ে এল। "আমি তো দেখছি আমি সত্যিই বাঞ্চোদ! আক্ষরিক অর্থেই বেহেঞ্চুদ!" কথাটা খুব আস্তে বললেও, শব্দটা গ্লোরিয়া জিন্সের মতো জায়গায় বসে একজন নারীর মুখের ওপর বলাটা চরম অসভ্যতা। কিন্তু আমার তখন কোনো হুশ ছিল না। আনিকা টেবিলের ওপর দিয়ে উনার হাত বাড়িয়ে আমার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরলেন। "চুপ!" উনার গলায় এবার একটা ভয়ংকর কর্তৃত্ব। "আগে শোনো আমি কী বলছি। পুলিশ হয়তো ইনভেস্টিগেশনের জন্য তোমার সাথে যোগাযোগ করতে পারে। তোমাকে থানায় ডাকতে পারে। ভয়ের কিচ্ছু নেই। পুলিশকে তোমার সার্সেই আর জেমি ল্যানিস্টারের ফ্যান্টাসি শোনানোর কোনো দরকার নেই। আমি যা বলেছি, তুমি জাস্ট সেটাই রিপিট করবে। বলবে তুমি প্রুফরিডিংয়ের জন্য ছিলে। আর সবচেয়ে ইম্পর্ট্যান্ট কথা— পুলিশকে বলবে, বেলাল জানত যে তুমি ওই ফ্ল্যাটে ছিলে। বেলাল আসার পর তুমি চলে এসেছ। আন্ডারস্টুড?" আমি উনার হাতের মুঠো থেকে আমার হাতটা ছাড়িয়ে নিলাম। আমার মাথার ভেতর তখন একটা সাইরেন বাজছে। আমি একটা নিখোঁজ ব্যক্তির কেসে পুলিশের খাতায় ঢুকে গেছি! আমার জীবনটা এখন একটা সুতোর ওপর ঝুলছে। আমাদের কফি খাওয়া শেষ হলো। আনিকা বিল পেমেন্ট করলেন। আমরা গ্লোরিয়া জিন্স থেকে বেরিয়ে এলাম। বাইরে কড়া রোদ। আনিকা উনার সানগ্লাসটা চোখে পরলেন। উনার জন্য একটা উবার অপেক্ষা করছিল। উনি গাড়ির দরজা খুলে ভেতরে ঢোকার আগে আমার দিকে ফিরে দাঁড়ালেন। আমি উনার দিকে তাকিয়ে একটা বিষণ্ণ, তিক্ত হাসি দিয়ে বললাম, "কী ব্যাপার আনিকা? আমার ওই পাগল বাঁড়াটা সুস্থ করবে না? নাকি এখন আমি শুধুই ছোট ভাই?" আনিকা গাড়ির দরজা ধরে আমার দিকে একটু ঝুঁকলেন। উনার ঠোঁটে সেই পুরোনো, ঘাতক আর মোহনীয় হাসিটা আবার ফিরে এল। উনি উনার সানগ্লাসের ওপর দিয়ে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে খুব নিচু, আবেদনময়ী গলায় ফিসফিস করে বললেন— "আর কটা দিন সময় দাও মিস্টার। পরিস্থিতি একটু ঠান্ডা হোক। তোমার ওই পাগলকে আমি এমন সুস্থ করব... যে সে চিরদিনের জন্য পাগল হয়ে যাবে!" কথাটা বলে আনিকা গাড়িতে উঠে বসলেন। দরজা বন্ধ হয়ে গেল। গাড়িটা আমার চোখের সামনে দিয়ে ধানমন্ডির জ্যামের ভেতর হারিয়ে গেল। আমি ফুটপাতে একা দাঁড়িয়ে রইলাম। আমার মাথার ওপর ঢাকা শহরের কাঠফাঁটা রোদ। আমার ভেতরে এখন একটা খুনের মামলার আতঙ্ক, আর একই সাথে একটা চরম, বন্য কামনার আগুন জ্বলছে। আমি জানি না বেলাল সাহেবের কী হয়েছে। আমি জানি না আনিকা নাওহার নামের এই ভয়ংকর, সুন্দরী নারীটি আসলে কে।
Parent