একলা চলো রে..LOVE, SEX AUR DHOKA - অধ্যায় ৬
ষষ্ঠ পর্ব:
ড্রয়িংরুমের ছোট চার দেওয়ালের ভেতরে তখন গোধূলির নরম আলো ফিকে হয়ে আসছে। বাইরে ঢাকার ব্যস্ত গলিটার কোলাহল যেন অনেক দূরে কোনো অবাস্তব সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো শোনাচ্ছে। এসি করা বিশাল কেবিন বা বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের সাথে কোনো মিল না থাকা সত্ত্বেও এই ছোট্ট দুই রুমের ফ্ল্যাটটাই এখন আলতাফ সিরাজ চৌধুরীর সমস্ত মনোযোগ এবং চেতনার কেন্দ্রবিন্দু।
তিনি সোফায় ইতির ঠিক পাশেই বসে আছেন। একটু আগে ইতির নরম হাত নিজের মুঠোর মধ্যে নিয়ে তিনি তার তীব্র একাকিত্বের কথা বলেছিলেন। কিন্তু মুহূর্তের উত্তেজনা পেরিয়ে এখন তাঁর মনের ভেতর কাজ করছে এক সুদূরপ্রসারী ও প্রবল সিদ্ধান্ত। ষাটোর্ধ এই কর্পোরেট টাইকুন জীবনে অনেক জয় দেখেছেন, অনেক কঠিন চুক্তি সই করেছেন, কিন্তু আজকের এই চুক্তিটি তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এক জুয়া।
আলতাফ সাহেব তাঁর মুখের সামনে থেকে দৃষ্টি সরিয়ে সরাসরি ইতির চোখের দিকে তাকালেন। তাঁর চোখের সেই গভীর চাউনিতে এক ধরনের না-বলা ব্যাকুলতা আর জেদ স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে।
তিনি ইতির হাতটা আবার নিজের হাতের মধ্যে তুলে নিলেন। খুব নিচু, গম্ভীর ও নরম গলায় তিনি বললেন, "ইতি... তোমাকে আজ একটা কথা পরিষ্কার করে বলতে চাই। আমি কোনো রাখঢাক করতে পছন্দ করি না, তুমিও নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ আমার মনের অবস্থা।"
ইতি সামান্য চমকে গেল। সে আলতাফ সাহেবের চোখের দিকে তাকাতে গিয়েও লজ্জায় ও সংকোচে চোখ নামিয়ে নিল। তার ফর্সা গাল দুটো আবার লালচে বর্ণ ধারণ করেছে। সে অস্পষ্ট গলায় বলল, "কী কথা বলছেন, স্যার? আমি ঠিক বুঝছি না..."
আলতাফ সাহেব একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বললেন, "আমি তোমাকে কোনো গার্ডের বউ বা সাধারণ মেহমান হিসেবে দেখছি না আর। গত কয়েকদিন ধরে তোমাকে দেখার পর, তোমার সাথে কথা বলার পর আমার মনে হচ্ছে—আমার এই শূন্য জীবনে তোমার মতো একজন মানুষের ভীষণ প্রয়োজন। আমি তোমাকে আমার বন্ধু হিসেবে পেতে চাই, ইতি। তুমি কি আমার বন্ধু হবে?"
কথাটা শোনার পর ইতি যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হলো! সে আতিপাতি করে ভাবতেও পারেনি যে দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় একজন শিল্পপতি, শত কোটি টাকার কোম্পানির চেয়ারম্যান, তার মতো একজন সাধারণ সিকিউরিটি গার্ডের স্ত্রীকে সোজাসুজি বন্ধুত্বের প্রস্তাব দেবেন!
ইতি তার হাতটা আলতাফ সাহেবের মুঠোর থেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে আমতা আমতা করে বলল, "এ... আপনি এ কী বলছেন, স্যার! আপনার মাথা ঠিক আছে? আমি কোথায় এক গরিব সিকিউরিটি গার্ডের সাধারণ স্ত্রী, আর আপনি কোথায় সিরাজ এন্টারপ্রাইজের চেয়ারম্যান! আপনার বন্ধু হওয়ার যোগ্যতা কি আমার আছে? সমাজের মানুষ কী বলবে? আর মালেক জানলে..."
-----
ইতি যতই নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার বা লজ্জা পাওয়ার ভান করুক না কেন, আলতাফ সাহেবের ভেতরের জেদ তাতে আরও চড়ে বসল। তিনি মরিয়া হয়ে ইতির হাতটা আরও শক্ত করে চেপে ধরে বললেন, "সমাজ কী বলল, কে কী ভাবল—তাতে আলতাফ সিরাজ চৌধুরীর কিচ্ছু আসে যায় না, ইতি! এই সমাজে টাকার জোর যার আছে, আইন আর সমাজ তার পক্ষেই কথা বলে। কে কী বলবে তাতে আমার কিছু যায় আসে না। আমি শুধু জানি, আমার যা ভালো লাগছে, আমি সেটাই অর্জন করব।"
তিনি থামলেন না। ইতির মুখের ওপর নিজের দৃষ্টি স্থির রেখে একের পর এক এমন সব প্রলোভন ছুড়ে দিতে লাগলেন, যা একজন সাধারণ ও অভাবী পরিবারের মেয়ের মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
"তুমি কি ভাবছ তোমার যোগ্যতা কম? শোনো, আজ থেকে তোমার কোনো অভাব থাকবে না," আলতাফ সাহেব আবেগে কাঁপাকাঁপা গলায় বললেন। "তুমি যা চাও—শাড়ির দোকান থেকে শুরু করে দামি কসমেটিকস, সোনার গহনা, যা তোমার শখ—সব আমি পূরণ করে দেব। তোমার সব কেনাকাটার দায়িত্ব আমার। তুমি শুধু হুকুম করবে, আর তোমার দরজায় জিনিস পৌঁছে যাবে।"
ইতি একটু হেসে ফেলল। তার সেই হাসির ভেতরে বিস্ময় যেমন ছিল, তেমনি ছিল এক অদ্ভুত কৌতূহল। সে ফিসফিস করে বলল, "স্যার, আপনি যা বলছেন, তা তো পাগলামি ছাড়া আর কিছু নয়। এত কিছু কেন দেবেন আমাকে?"
আলতাফ সাহেব আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে বললেন, "শুধু কেনাকাটা নয়, ইতি। আমি মাঝে মাঝেই তোমাকে নিয়ে এই দমবন্ধ করা শহর থেকে বাইরে কোথাও বেড়িয়ে আসব। উইকেন্ডে কক্সবাজার বা সিলেটের কোনো বিলাসবহুল রিসোর্টে যাব আমরা। শুধু তাই নয়—দরকার হলে আমি তোমাকে নিয়ে দেশের বাইরে, সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক বা সুইজারল্যান্ডেও ঘুরতে নিয়ে যাব। তুমি কি কখনো প্লেনে চড়েছো? দেশ দেখেছো বাইরে গিয়ে?"
ইতির চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল। সিঙ্গাপুর বা ব্যাংকক—এসব তো তার কল্পনারও বাইরে। সে শুধু সিনেমা বা টিভিতে দেখেছে। সে মৃদু হেসে মাথা নেড়ে বলল, "স্যার, আপনি যা বলছেন, তা কোনো রূপকথার গল্পের মতো শোনাচ্ছে। এসব তো আমাদের ভাগ্যে কোনোদিনও ছিল না।"
"ভাগ্যে ছিল না তো কী হয়েছে? ভাগ্য আমি তোমার বদলে দেব!" আলতাফ সাহেব দৃঢ় প্রতিজ্ঞার সুরে বললেন।
-----
কিন্তু ইতির মনের কোণে একটা ভয় তো থেকেই যায়। সে একটু চিন্তিত মুখে, শাড়ির আঁচলটা ঠিক করতে করতে বলল, "সবই তো বুঝলাম, স্যার। কিন্তু আপনি এসব কথা বলছেন ঠিকই, তবে আমার তো একটা সংসার আছে। মালেক যদি কোনোভাবে টের পায় বা জানতে পারে যে আপনি আমাকে এসব প্রস্তাব দিচ্ছেন, আর আমি আপনার সাথে বাইরে যাচ্ছি বা বন্ধুত্বের কথা বলছি—তাহলে সে তো আমাকে আস্ত রাখবে না! ও তো মারাই ফেলবে আমাকে, কিংবা পাগল হয়ে যাবে।"
মালেকের কথা উঠতেই আলতাফ সাহেবের মুখের সেই রোমান্টিক ভাবটা আবার একটা ঠান্ডা ও কঠিন কর্পোরেট খোলসে ঢাকা পড়ে গেল। তিনি অবজ্ঞার সুরে হাত নেড়ে বললেন, "মালেক? ওই সাধারণ সিকিউরিটি গার্ডটা তোমাকে মারবে? ওর এত বড় স্পর্ধা হয়েছে যে সে আমার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যাবে? শোনো ইতি, মালেক আমার কোম্পানিতে চাকরি করে, আমার এক ইশারায় ওর চাকরি চলে যেতে পারে। ও তো আমার তলে চলে। তোমার স্বামীর বিষয়টি কীভাবে সামলাতে হবে, সেটা আলতাফ চৌধুরী খুব ভালো করেই জানে। তোমাকে ও নিয়ে এক বিন্দুও ভাবতে হবে না। আমি সব ব্যবস্থা করে দেব।"
ইতি অবাক হয়ে আলতাফ সাহেবের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। সে বুঝতে পারল, এই মানুষটির ক্ষমতার কোনো সীমা নেই। তিনি যা চান, তা যেকোনো ভাবে হাসিল করতে পারেন।
ঠিক তখনই আলতাফ সাহেব পকেট থেকে তাঁর লেদার ওয়ালেটটা বের করলেন। ওয়ালেট খুলে সেখান থেকে একদম মুড়মুড়ে, নতুন পাঁচটি এক হাজার টাকার নোট বের করলেন। মোট পাঁচ হাজার টাকা। তিনি নোটগুলো ইতির চোখের সামনে বাড়িয়ে ধরে বললেন, "নাও, এটা রাখো। নিজের পছন্দমতো ভালো একটা শাড়ি বা নিজের শখের কিছু কিনে নিও।"
ইতি টাকাগুলোর দিকে তাকিয়ে একটু পিছিয়ে গেল। সে ইতস্তত করে বলল, "না স্যার, এত টাকা আমি নিতে পারব না। আপনি সেদিনও দিয়েছেন... আজ আবার..."
"মানা করবে না বলছি!" আলতাফ সাহেব একটু জোর করেই টাকাটা ইতির হাতের মুঠোয় গুঁজে দিলেন।
এতগুলো টাকা একবারে হাতে পেয়ে ইতির অবচেতন মন ভেতরে ভেতরে দারুণ খুশি হয়ে উঠল। গরিবের সংসারে পাঁচ হাজার টাকা মানে অনেক কিছু। সে মনে মনে ভাবতে লাগল, মানুষটা যতই খ্যাপামি করুক না কেন, পকেট থেকে টাকা বের করতে একটুও কার্পণ্য করে না।
ইতি একটু মুচকি হেসে আলতাফ সাহেবের চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। সে একটু রহস্যময় সুরে বলল, "আচ্ছা স্যার, আপনার এত যখন জেদ, তখন আপনার এই বন্ধুত্বের প্রস্তাব আর উপহার আমি এক বাকੇ উড়িয়ে দিচ্ছি না। আমি ভেবে দেখব... সত্যিই ভেবে দেখব আপনার কথাটা।"
-----
আলতাফ সাহেব যখন শুনলেন ইতি তাঁর প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে দেয়নি, বরং "ভেবে দেখবে" বলেছে, তখন তাঁর বুকের ভেতর এক অদ্ভুত বিজয়ের উল্লাস বয়ে গেল। তিনি স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে সোফায় একটু হেলান দিয়ে বসলেন।
কিন্তু ইতির মাথা তখন অন্য একটা খেলায় মজে গেছে। সে চাচ্ছিল আলতাফ সাহেবকে পুরোপুরি নিজের মোহর মধ্যে আটকে ফেলতে, যাতে তাঁর মাথার ঠিক না থাকে।
ইতি আলতাফ সাহেবের সামনে দাঁড়িয়ে মুচকি একটা হাসি দিল। তারপর সেই পাঁচ হাজার টাকার মুড়মুড়ে নোটের বান্ডিলটা হাতে নিয়ে সে ইচ্ছে করেই একটু অন্যরকম একটা ভঙ্গি করল। সে আলতাফ সাহেবের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে অত্যন্ত ধীরস্থির ও খোলামেলা ভঙ্গিতে তার স্লিভলেস ব্লাউজের সামনের কাঁধের ও বক্ষের ভাজের ভেতরে সেই টাকার নোটগুলো গুঁজে দিতে শুরু করল!
তার পরনের হালকা হলুদ শাড়ির আঁচলটা তখন এক পাশে সরিয়ে রাখা, আর ব্লাউজের ফিতার ঠিক পাশেই সে অত্যন্ত সুকৌশলে ও ইচ্ছাকৃতভাবে টাকার বান্ডিলটা এমনভাবে ঢোকাল, যা তার শরীরের কোমল ত্বকের সাথে সরাসরি ঘষা খেল।
আলতাফ সিরাজ চৌধুরীর মতো একজন বজ্রকঠিন মানুষ, যিনি জীবনে কোনোদিন কোনো নারীর সামনে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হননি, তিনি এই দৃশ্য দেখে একেবারে থ মেরে গেলেন!
তাঁর চোখ দুটো ঠিকরে বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো। তিনি পলকহীন দৃষ্টিতে ইতির সেই নমনীয় শরীরের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এল। বুকের ভেতর যে ধুকপুকানি একটু আগে কমে এসেছিল, তা এখন হাজার গুণ বেড়ে গিয়ে তাঁর কান দিয়ে বের হওয়ার উপক্রম হলো।
ইতি টাকাটা ব্লাউজের ভাঁজে গুঁজে দিয়ে একটা দুষ্টু ও লাজুক হাসি দিয়ে আলতাফ সাহেবের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, "টাকাটা সযত্নে রেখে দিলাম, স্যার। আপনার এই উপহার কি আর ফেলে দেওয়া যায়?"
আলতাফ সাহেব তখন আর কোনো কথা বলার মতো অবস্থায় ছিলেন না। তিনি পাথরের মূর্তির মতো সোফায় বসে রইলেন, আর তাঁর চোখের সামনে তখন শুধু ভাসতে লাগল এক নিষিদ্ধ নেশার ঘূর্ণি—যেখান থেকে ফিরে যাওয়ার সমস্ত রাস্তা চিরতরে হারিয়ে গেছে। (চলবে)