ইন্দ্রাণী তুমি শুধুই আমার - অধ্যায় ৮
পর্ব -৮
ডাক্তারের কথায় আমার যেন ধরে প্রাণ আসলো। ইন্দ্রাণী আনন্দে আমার হাতটা শক্ত করে ধরে ফেললো আবার। মাসিমাও ডুকরে কেঁদে উঠলেন বিপদ কেটে যাওয়ার আনন্দে। ডাক্তার চলে যাওয়ার পর আমি এবার ভালো করে তাকালাম ইন্দ্রাণীর দিকে। ইন্দ্রাণীকে সাহস দিয়ে বললাম, “আমি বলেছি না সব ঠিক হয়ে যাবে, তোমার বাপি ঠিক সুস্থ হয়ে আসবে। এখন খুশি তো?”
ইন্দ্রাণীর দুচোখে তখন জল। টপটপ করে জল পড়ছে ইন্দ্রাণীর দুচোখ বেয়ে। ইন্দ্রাণী হঠাৎ এবার ঝুঁকে পড়ে আমার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে বসলো। আমি সঙ্গে সঙ্গে ইন্দ্রাণীকে দুহাতে বুকের কাছে টেনে নিলাম। তারপর সামনে থাকা মহাদেবের মূর্তিটাকে দেখিয়ে ওকে বললাম, “কি করছো কি ইন্দ্রাণী! ঈশ্বরের সামনে তুমি পায়ে হাত দিচ্ছ আমার? আগে ভগবানকে প্রণাম করো তুমি।”
ইন্দ্রাণী তখন জলভরা চোখে বললো, “আজ থেকে আপনি আমার কাছে ভগবানের থেকেও বেশি সমুদ্র দা। আজ আপনার জন্যই আমার বাপি নতুন জীবন পেলো।” আমি সঙ্গে সঙ্গে ইন্দ্রাণীকে আমার বুকে জড়িয়ে ধরে বললাম, “ধুর পাগলী। এগুলো তো আমার কর্তব্য।”
ইন্দ্রাণী তখনো দুহাতে আঁকড়ে জড়িয়ে ধরে রইলো আমাকে। আমি হঠাৎ খেয়াল করলাম, ইন্দ্রাণীকে আমি এতো ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে ধরে আছি কিন্তু ও আমাকে একবারও বাধা দেয়নি এসবের জন্য। বরং আমাকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে আকঁড়ে ধরে রয়েছে ইন্দ্রাণী। দুর থেকে দেখলে যে কেউ ভাববে আমরা প্রেমিক প্রেমিকা। যেন অনেক দিনের রিলেশন রয়েছে আমাদের মধ্যে। আমার মাথায় কেমন যেন একটা খটকা লাগলো। ইন্দ্রাণী আমাকে এতটা সুযোগ দিচ্ছে কেন হঠাৎ! ও কি প্রেমে পরে গেছে আমার?
হঠাৎ আমার চিন্তায় ছেদ পড়লো, কারণ আমি দুর থেকেই দেখলাম ইন্দ্রাণীর মা আমাদের খোঁজে এদিকে আসছে। আমি এবার ইন্দ্রাণীকে আমার বাহুবন্ধ থেকে ছাড়িয়ে এগিয়ে গেলাম ওর মায়ের দিকে। ইন্দ্রাণীর মা বললেন, “ডাক্তারবাবুরা ডাকছেন আমাদের। এখনই যেতে বললেন।” আমরা গেলে ডাক্তারবাবু আমাদের ওষুধপত্র বুঝিয়ে দিয়ে বললেন, ওনাকে আরও কিছুদিন অবজার্ভেশনে রাখতে হবে। তাই অন্য একটা প্রাইভেট রুমে ইন্দ্রাণীর বাবাকে অ্যাডমিট করে দিলেন ওনারা।
এদিকে আমাদের তখনও কিছুই খাওয়া হয়নি টেনশনে। রাতও গভীর হয়ে গেছে। আমি ওদের বললাম, চলুন মাসিমা আমরা কিছু খেয়ে নিই। আমরা নিচে নেমে খাবারের দোকান খুঁজতে লাগলাম এবার। এতো রাতে বেশিরভাগ দোকানই বন্ধ হয়ে গেছে। তবুও দু একটা দোকান খোলা ছিল। আমরা ওখানেই রাতের খাওয়াদাওয়া সারলাম। তারপর হাসপাতালে বাকি কাজকর্ম সেরে আমি ইন্দ্রাণীকে বললাম, “এখানে তো আমাদের আর কিছুই করার নেই। তোমার বাপিও বিপদের বাইরে এখন। ওনাকে অবজার্ভেশন রুমে রাখা হয়েছে আলাদাভাবে। যা করার ওনারাই করবেন। চলো তাহলে আমরা বাড়ি যাই।”
ইন্দ্রাণীর তখন এমন অবস্থা আমি যা বলছি তাই ও শুনছে। ইন্দ্রাণী তখনই রাজি হয়ে গেল আমাদের কথায়। আমি ইন্দ্রাণীকে আর মাসিমাকে ওদের বাড়িতে ড্রপ করে দিয়ে বাড়ি ফিরে আসলাম। ততক্ষনে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে আকাশে।
দেখতে দেখতে কয়েকদিনের মধ্যেই ইন্দ্রাণীর বাবা একেবারে সুস্থ হয়ে উঠলেন। এর মধ্যে আমিও কয়েকবার গিয়ে দেখে এসেছি ওনাকে, প্রয়োজন মতো জিনিসপত্রও কিনে দিয়েছি। এমনকি হাসপাতালেও ইনফর্মেশন দেওয়া ছিল যে ওনাদের যদি কিছু লাগে তাহলে যেন তখনই দেওয়া হয়, পরে আমি বিল দিয়ে দেবো। তাছাড়া প্রতিদিন ওনাকে দেখতে যাওয়া সম্ভব না হলেও আমি নিয়মিত ইন্দ্রাণীর সাথে ফোনে যোগাযোগ রাখতাম ওনার শরীর ও স্বাস্থ্য নিয়ে। যাইহোক, একটা সময় পর ওনারা বললেন, ইন্দ্রাণীর বাবা এখন সম্পূর্ণ সুস্থ। ওনাকে হাসপাতাল থেকে যেন ছাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। আমি তখনই সমস্ত বিল মিটিয়ে ছাড়িয়ে এনেছিলাম ওনাকে।
এইসব কিছু মিলিয়ে আমার প্রায় পাঁচ লক্ষ টাকা খরচ হয়েছিল, কিন্তু আমি ইন্দ্রাণীর থেকে এক পয়সাও নিইনি। কারণ আমার যা রোজগার তাতে পাঁচ লক্ষ টাকা খরচ করা আমার জন্য কিছুই নয়। সবকিছু মিটিয়ে আমি নিজের গাড়ি করে ওদের বাড়িতে ছেড়ে দিয়ে এসেছিলাম। ইন্দ্রাণীর বাবা মা দুহাত ভরে আশীর্বাদ করেছিলেন আমাকে।
সেই ঘটনার পর কয়েকদিন কেটে গেছে। ইন্দ্রাণীর সাথে আমার সম্পর্ক এখন অনেক ক্লোজ। ইন্দ্রাণী এখন শুধু বিশ্বাসই নয়, ভীষন ভরসাও করে আমাকে। আর তার সাথে সাথে বুবাইকেও অনেক যত্ন নিয়ে পড়ায় ইন্দ্রাণী, ঠিক যেন ওর মায়ের মতো। বিষয়টা আমার খুবই ভালো লাগে।
যাইহোক, একদিন আমি বুবাইয়ের জন্য বেশ দামী আর অন্যরকম খেলনা এনেছিলাম একটা। তেমন কিছু ভেবে বা পরিকল্পনা করে কিনিনি, জিনিসটা দেখে ভালো লেগেছিল বলেই কিনেছিলাম জিনিসটা, কারণ আমার মনে হয়েছিল বুবাইয়ের জিনিসটা খুব পছন্দ হবে। বুবাই তখন পড়ছিল ইন্দ্রাণীর কাছে। কিন্তু আমার তো ওদের পড়ানোর মাঝে যেতে কোনো বাধা নেই, তাই বাড়ি ফিরেই আমি সোজাসুজি বুবাইকে গিয়ে দেখালাম ওই খেলনাটা। বুবাই তো জিনিসটা দেখে ভীষন খুশি হলো। বুবাই তখনই জিনিসটাকে খুলে খেলতে শুরু করে দিলো। ইন্দ্রাণী তখন ওকে একটু বকা দিয়ে বললো পড়তে বসতে। কিন্তু বুবাই খেলনাটা দেখিয়ে ইন্দ্রাণীকে বললো ও একটু খেলতে চায় ওটা নিয়ে। যেহেতু নতুন জিনিস আর ওটা দেখে বুবাই এতো আনন্দে ছিল যে ইন্দ্রাণীও বেশি কিছু বললো না ওকে। ইন্দ্রাণী বুবাইকে বললো, ও আধ ঘণ্টা মতো খেলতে পারে খেলনাটা নিয়ে। বুবাই তো আনন্দে আত্মহারা। বুবাই তখনই জিনিসটা নিয়ে খেলতে শুরু করলো। আমি আর ইন্দ্রাণী দুজনেই ওর আনন্দ দেখে হাসতে লাগলাম। একটু পরেই বুবাই ওটা নিয়ে খেলতে খেলতে বাইরে বেরিয়ে গেলো।
এই মুহূর্তে আমি আর ইন্দ্রাণী একেবারে একা বসে রইলাম ঘরের মধ্যে। বুবাই যখন বাইরে বেরিয়েছে ওকে না ডাকলে ও আর আসবে না, তাছাড়া বুবাই বাইরে থাকলেও ভয় নেই, কারণ মেন গেট আমি শক্ত করে আটকেই এসেছি। ফলে বলা যায় আমার আর ইন্দ্রাণীর মধ্যে বিরক্ত করার মতো কেউ রইলো না আর।
কথাটা ভাবতেই আমার শরীরটা শিরশির করে উঠলো। ইন্দ্রাণীকে আমার মনের কথা বলার মতো এর থেকে ভালো সুযোগ আর হয়তো আসবে না। ঈশ্বর জেনে বুঝেই এই সুযোগটা দিয়েছেন আমায়। আমি আর দেরি করতে চাইলাম না। আমি ঠিক করলাম, আমি আজকেই ইন্দ্রাণীকে আমার মনের কথাটা বলবো।
ইন্দ্রাণী ঘরের মধ্যে মাথা নিচু করে চুপ করে বসে ছিল। আমি এবার ইন্দ্রাণীর ঠিক সামনে খাটের ওপর বসে বললাম, “বুবাই তো খেলছে, তুমি নিশ্চয়ই খুব বোর হচ্ছ ইন্দ্রাণী!”
ইন্দ্রাণী হেসে বললো, “না না সমুদ্র দা, আমার বোর লাগছে না। আপনি আছেন তো এখানে।”
ইন্দ্রাণীর কথা শুনে আমার মনটা তো আনন্দে নেচে উঠলো। আমি হেসে বললাম, “ঠিক আছে, তাহলে তোমার সাথে আজ একটু গল্প করলে তোমার কোনো সমস্যা নেই তো?”
ইন্দ্রাণী উত্তরে খিলখিল করে হেসে বললো, “না না কোনো সমস্যা নেই। বলুন না সমুদ্র দা কি বলবেন।”
আমি এবার একটু সময় নিলাম। তারপর ইন্দ্রাণীর দিকে তাকিয়ে একটু লজ্জা পেয়ে বললাম, “তোমাকে একটা কথা বলবো ভাবছিলাম ইন্দ্রাণী, কিন্তু কথাটা কীভাবে শুরু করবো, বুঝতে পারছি না।”
ইন্দ্রাণী একটু অবাক হলো আমাকে এভাবে কথা বলতে দেখে। তবে ইন্দ্রাণী আমাকে অভয় দিয়ে বললো, “এরকম কেন বলছেন সমুদ্র দা! আমি তো আপনাকে আমার খুব ভালো বন্ধু মনে করি, আর বন্ধু তো তার বন্ধুকে সব কথা শেয়ার করতে পারে তাই না! এখানে সংকোচের কি আছে! তাই কোনোরকম লজ্জা বা সংকোচ না করে আমাকে আপনার সব কথাই বলতে পারেন আপনি।”
ইন্দ্রাণীর কথা শুনে ওর অনুমতি পেয়ে আমি এবার মুহুর্তের মধ্যে ইন্দ্রাণীর নরম হাত দুটোকে আমার হাত দিয়ে চেপে ধরে কোনোরকমে ইন্দ্রাণীকে বললাম, “আমার তোমায় খুব পছন্দ ইন্দ্রাণী, আমি তোমায় নিজের করে পেতে চাই, অন্তরঙ্গ ভাবে পেতে চাই তোমায়। দেহ মন সবরকমের ভালোবাসা দিয়ে ভরিয়ে দিতে চাই তোমায়।”
চলবে... গল্পটা কেমন লাগছে অবশ্যই কমেন্ট করে জানাবেন...
ভালো লাগলে লাইক আর রেপুটেশন দেবেন।।।