জুলাই আন্দোলন - অধ্যায় ১৪
পর্ব ১৪: যাত্রা
পিকনিকের সকালটা শুরু হলো ঝলমলে রোদ দিয়ে। কলেজের মাঠে সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে তিনটা বাস। দুটো সাধারণ, আর প্রথম বাসটা চকচকে এসি বাস—কমিটির লোকজন আর “ভিআইপি” অভিভাবকদের জন্য। এসি বাসের গায়ে লাল ফিতা বাঁধা, ভেতরে ঠান্ডা হাওয়া। এই বাসের সিটগুলো আগেই বুকড। মকবুল, হেডমাস্টার সাহেব, কবির মিয়া সস্ত্রীক, আর কবির মিয়ার মেয়ে-জামাই মিরা, রাহাদ ও তাদের ছেলে মিরাজ—এদের জন্যই সামনের সারিগুলো রাখা।
বাস ছাড়ার সময় ঘনিয়ে আসছে। অভিভাবক-বাচ্চারা হৈচৈ করে উঠছে বাসে। হেডমাস্টার সাহেব লিস্ট হাতে দৌড়াদৌড়ি করছেন। কিন্তু মকবুলের চোখ বারবার গেটের দিকে। তার কপালে ভাঁজ, ঠোঁট শুকনো। কারণ একটাই—চৈতি এখনো আসেনি।
পুরো আয়োজনের মূল উদ্দেশ্যই ছিল চৈতি। মকবুল নিজে হেডমাস্টারকে আলাদা করে ডেকে বলেছিল, “যেভাবে পারেন, ঝুমুর মাকে আনবেন। বাচ্চা মেয়ে, মা ছাড়া যাবে কীভাবে? বুঝিয়ে বলবেন।” হেডমাস্টার কথা রেখেছিলেন। গত দুদিন ধরে চৈতির বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন, সামাজিকতার দোহাই দিয়েছেন, ঝুমুর পড়াশোনার ভবিষ্যৎ টেনেছেন।
কিন্তু চৈতি পাথর। মাথা নিচু করে শুধু বলেছে, “স্যার, মাফ করবেন। আমার শরীরটা ভালো না। আপনারা যান। যদি ঝুমু যেতে চায় যাবে, আমি কিছু জানি না।” হেডমাস্টারের শত যুক্তি, অনুরোধ—সব ওই একটা কথার দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে এসেছে।
মকবুল বাসের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে ঘাম মুছল। রুমালটা ভিজে গেছে। রাগে না হতাশায়—বোঝা যাচ্ছে না। এত টাকা ঢালল, কবির মিয়াকে দিয়ে ফান্ড করাল, এক রাতের প্রোগ্রাম বানাল—সব এই একটা মানুষের জন্য। আর সেই মানুষই আসল না। তার সমস্ত প্ল্যান, সমস্ত ছক, মুখ থুবড়ে পড়ল কলেজের মাঠের ধুলোয়।
ড্রাইভার হর্ন দিল। “ভাই, আর কতক্ষণ? রোদ চড়ে যাচ্ছে।” হেডমাস্টার অসহায় মুখে মকবুলের দিকে তাকালেন। মকবুল দাঁতে দাঁত চেপে আছে কিন্তু কিছু বলল না।
এসি বাসের সামনে দাঁড়িয়ে কবির মিয়ার মেজাজ তখন সপ্তমে। হাতের দামি ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে তিনি রাহাদের উপর ঝাঁঝিয়ে উঠলেন, “এই রাহাদ, মিরা কোথায়? বউ কোথায় থাকে সেটাও জানো না?”
রাহাদ ফোনটা কানে চেপে ধরে আমতা আমতা করল, “বাবা, এই তো কল দিচ্ছি।”
“কল দিচ্ছি মানে?” কবির মিয়ার গলা আরও চড়ল। “তুমি কেমন স্বামী? পিকনিকে আসবে, অথচ নিজের স্ত্রীকে সাথে নিয়ে আসতে পারো না?”
রাহাদ মাথা নিচু করে বলল, “বাবা, ও সকালে বলল ওর নাকি একটা জরুরি কাজ আছে। তাই…”
“কাজ আছে মানে?” কবির মিয়া ধমকে উঠলেন। “দ্রুত ফোন লাগাও। দেখো কোথায় মেয়েটা। সময় নষ্ট হচ্ছে।”
রাহাদ আবার ডায়াল করল। কানের কাছে রিংটোন বেজে যাচ্ছে—টু...টু...টু...। ধরছে না। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। ঠিক তখনই পেছন থেকে খিলখিল হাসির সাথে একটা পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এল, “আরে, কাকে কল দিচ্ছ শুনি?”
রাহাদ চমকে পিছনে তাকাল। তার চোখ আটকে গেল। মিরা দাঁড়িয়ে, ঠোঁটের কোণে সেই পুরনো দুষ্টু হাসি। রাহাদের শক্ত হয়ে থাকা মুখটা মুহূর্তে নরম হয়ে গেল। সেও হেসে ফেলল। কতদিন পর! কতদিন পর দুজনে এভাবে একসাথে, কোনো রাগ-ক্ষোভ ছাড়া হাসল। বাসের সামনের এই ছোট্ট মুহূর্তটা হঠাৎ করেই অনেক দামি হয়ে উঠল।
কিন্তু চমকের তখনও বাকি ছিল। মিরার পাশে, গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে চৈতি।
দুজনেই আজ একই রঙের শাড়ি পরেছে—হালকা গোলাপি জমিনে সোনালি পাড়। খোলা চুল, কপালে ছোট্ট টিপ, চোখে হালকা কাজল, মাথার উপর চশমা। যেন দুই বোন, অথবা... যেন দুই পরী মাটিতে নেমে এসেছে। রূপের দিক দিয়ে কেউ কারও চেয়ে একচুলও কম না। বাসের সিঁড়িতে দাঁড়ানো মকবুলের নিঃশ্বাস আটকে গেল। এই তো, সেই মুখ। যার জন্য এত আয়োজন, এত ছক। সে ভেবেছিল সব শেষ, কিন্তু চৈতি এসেছে। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না।
মকবুল প্রায় দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে নামল। “আ-আরে চৈতি আপনি? আপনি এসেছেন?”
চৈতি একবার শুধু চোখ তুলে তাকাল। কোনো উত্তর দিল না। তার চোখে-মুখে একরকম পাথরের মতো কঠিন শীতলতা।
উত্তরটা দিল মিরা। মকবুলের দিকে তাকিয়ে সে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল, “হ্যাঁ কাকা। কেন, এখন আর জয়েন করার সময় নেই নাকি? দেরি করে ফেলেছি?”
মকবুল তাড়াতাড়ি মাথা নাড়ল। “আরে কী বলো মা! সময় কেন থাকবে না? অবশ্যই আছে। তোমাদের জন্য সব সময় আছে।” তার গলার উৎসাহ বাঁধ মানছে না।
কথা শেষ না হতেই ভিড় ঠেলে হাজির হলো লোকনাথ। দুই হাতে চারটা বড় বড় ব্যাগ। কাঁধে আরও একটা সাইড ব্যাগ ঝুলছে। ঘেমে নেয়ে একাকার। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “উফ, ব্যাগগুলোর যা ওজন। হাত খুলে আসছে।”
মকবুলের হাসি মুখটা মুহূর্তে কালো হয়ে গেল। “লোকনাথ? তুমি এখানে কী করো?”
লোকনাথ মাথা চুলকে আমতা আমতা করে বলল, “ওই... মিরা ভাবীই তো বলল। বলল, ব্যাগপত্র টানার জন্য হলেও তোকে যেতে হবে। আপনি না গেলে কে নেবে এত কিছু?”
মিরা কোমরে হাত রেখে বলল, “হ্যাঁ কাকা, ঠিকই তো। লোকনাথকে রেখে আসব কেন? এতগুলো ব্যাগ কে টানবে? ও যাবে আমাদের সাথে।”
মকবুলের বুকের ভেতরটা আবার খচ করে উঠল। চৈতি এলো, কিন্তু এই আপদটাও সাথে এলো। তার প্ল্যানের মাঝখানে আবার কাঁটা।
ঠিক তখনই বাসের জানালা দিয়ে কবির মিয়ার গর্জন ভেসে এল, “আরে ওই! তোমরা ওখানে পঞ্চায়েত বসিয়েছ নাকি? তাড়াতাড়ি ওঠো সবাই। সময়ের কি কোনো দাম নেই তোমাদের কাছে?”
কবির মিয়ার ধমকে যেন ম্যাজিক কাজ করল। মকবুল, মিরা, চৈতি, লোকনাথ—সবাই হুড়মুড় করে বাসে উঠতে লাগল।
বাসের দরজা বন্ধ হলো। ইঞ্জিন গর্জে উঠল। মকবুল জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। তার মুখে হাসি, কিন্তু চোখে হিসেব। চৈতি এসেছে। খেলা এখন নতুন করে শুরু হবে।
বাস ছাড়ার মুখেই বাঁধল গোল। তৃতীয় বাস থেকে এক অভিভাবক ছুটে এসে হেডমাস্টারকে চেপে ধরলেন, “স্যার, ওই বাসের পোলাপানগুলা বেশি ফাজিল। আপনি একটু ওই বাসে যান। সামলাতে পারছি না।”
হেডমাস্টার অসহায় মুখে মকবুলের দিকে তাকালেন, “চলেন ভাই, আপনিও। দুজন থাকলে ওরা একটু ভয় পাবে।”
মকবুল বিরক্তিতে মুখ কুঁচকাল। তার চোখ তখন এসি বাসের জানালায়, যেখানে চৈতি সবে উঠে বসেছে। “ধুর! তুমি যাও। আমি কেন যাব? আমার কি আর কাজ নেই?”
কিন্তু পাশের সিট থেকে কবির মিয়ার গর্জন ভেসে এল, “এই! তোমরা দুইজন দ্রুত যাও তো। ফাজলামো করার জায়গা পাও না? বাস চালু করতে হবে না?”
কবির মিয়ার ধমকের সামনে মকবুলের সব আপত্তি উবে গেল। মুখ কালো করে, রাগে গজগজ করতে করতে সে আর হেডমাস্টার নেমে গেল এসি বাস থেকে। সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় শেষবারের মতো চৈতির দিকে তাকাল। মনটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল তার। এত আয়োজন, এত প্ল্যান—সবই এখন দূর থেকে দেখতে হবে।
এদিকে এসি বাসের ভেতরের দৃশ্য ততক্ষণে পালটে গেছে। জানালার ধারের পাশাপাশি সিটে বসেছে চৈতি আর মিরা। মিরার চোখে-মুখে আজ অন্যরকম দীপ্তি। কলেজের সেই দস্যি মেয়েটা যেন ফিরে এসেছে। আর মিরাকে পেয়ে চৈতির বুকের ভেতর জমে থাকা বরফটাও গলতে শুরু করেছে। মনে হচ্ছে, দেওয়ালগুলো সরে গিয়ে সেই পুরনো ক্যাম্পাসটা ফিরে এসেছে।
মিরা হাতের মিউজিক বক্সটা অন করল। একটা আধুনিক দিনের গান বাজতে শুরু করল—ধীর লয়ে, কিন্তু নেশা ধরানো সুর। মিরা এক ঝটকায় সিটের উপর উঠে দাঁড়াল। চৈতির হাত ধরে টান দিল, “ওঠ! আজ কোনো বারণ শুনব না।”
চৈতিও উঠে দাঁড়াল। দুই বান্ধবী সিটের উপর দাঁড়িয়ে দুলতে লাগল। তাদের দেখে আরও কয়েকজন অভিভাবক হাততালি দিয়ে যোগ দিল। পুরো বাসটা মুহূর্তে একটা চলন্ত উৎসবে বদলে গেল।
মিরা হাত বাড়িয়ে দিল রাহাদের দিকে। রাহাদ প্রথমে একটু থমকাল, তারপর মিরার হাত ধরে উঠে দাঁড়াল। স্বামী-স্ত্রী যখন একসাথে পা মেলাল, বাসের সবাই মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। তাদের মানিয়েছে দারুণ। রাহাদের শক্ত চোয়ালেও আজ হাসি। তাদের দেখে আরও দু-তিন জোড়া স্বামী-স্ত্রীও উঠে দাঁড়াল। বাসের সরু গলিটা হয়ে উঠল ডান্স ফ্লোর।
ভিড়ের মধ্যেই হঠাৎ চৈতি অনুভব করল, কেউ তার হাত ধরেছে। তাকিয়ে দেখল, লোকনাথ। তার বিশাল কালো হাতের মুঠোয় চৈতির ফর্সা হাতটা হারিয়ে গেছে। অন্য সময় হলে হয়তো ঝটকা দিয়ে ছাড়িয়ে নিত। কিন্তু আজ না। আজ চারপাশে আলো, গান, হাসি। আর সবচেয়ে বড় কথা—রাজীব এখানে নেই। এই পুরো বাসে, এই মুহূর্তে, লোকনাথই তার ‘বাসার লোক’। চৈতি কিছু বলল না। হাতটা ধরা থাকল।
নাচের তালে তালে চৈতি লোকনাথের দিকে ফিরে হেসে জিজ্ঞেস করল, “কেমন লাগছে লোকনাথ?”
লোকনাথের চোখ চৈতির মুখের উপর আটকে ছিল। সে ঢোক গিলে বলল, “এই তো... খুব ভালো। তোমাকে অনেক সুন্দর লাগছে।”
‘তোমাকে’। এই প্রথম লোকনাথ তাকে ‘ভাবী’ না ডেকে ‘তুমি’ বলল। শব্দটা কানের পাশে গরম হলকা হয়ে লাগল চৈতির। এক মুহূর্তের জন্য বুকের ভেতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। এতদিনের সম্বোধনটা এক ঝটকায় ভেঙে গেল। চৈতির আজব লাগল, একটু অস্বস্তিও। কিন্তু গানের তাল, বাসের দুলুনি, চারপাশের হাসি—সব মিলিয়ে সেই অস্বস্তিটা আর টিকল না। হয়তো পরিস্থিতিটাই এমন।
চৈতি আজ বাঁধনহারা। গানের সাথে সে ইচ্ছে করেই বেশি লাফাচ্ছে, ঘুরছে। শাড়ির আঁচল উড়ছে।
লোকনাথ ফিসফিস করে বলল, “আরে, আস্তে। পড়ে গিয়ে ব্যথা পাবে তো।”
চৈতি ঠোঁট উলটে, কপট রাগ দেখিয়ে বলল, “পেলাম ব্যথা! তো কী করবে আমাকে? আমি তো নাচবই।”
লোকনাথের চোখে একরকম চাপা অধিকার ফুটে উঠল। সে গলা নামিয়ে বলল, “মাইর দিব তোমাকে।”
চৈতি খিলখিল করে হেসে উঠল। চোখে কৌতুক। “ওকে, দাও। দাও আমাকে। দেখি কেমন মাইর দাও।”
লোকনাথ আর কিছু ভাবল না। ডান হাতটা তুলে চৈতির নরম গালে আলতো করে একটা চড় মারল। শব্দ হলো না, কিন্তু স্পর্শটা রয়ে গেল। মিষ্টি, কিন্তু শাসনের।
“আর করবি দুষ্টামি?” লোকনাথের গলাটা এখন আর কাজের লোকের মতো শোনাল না।
চৈতি চড় খেয়েও সরল না। বরং তার চোখে একরকম আবদার খেলে গেল। যেন আরও চাইছে। সে মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, “হ্যাঁ।”
লোকনাথ এবার চৈতিকে একটু কাছে টেনে নিল। ভিড়ের মধ্যে তাদের গা ঘেঁষাঘেঁষি হয়ে গেল। চৈতির কানের কাছে মুখ নিয়ে নরম গলায় বলল, “এত লাফিয়ো না।” কথাটায় শাসন ছিল, আবার একরকম আদরও।
চৈতি কি সত্যিই পালটে গেছে? না।
আসলে মিরা যখন রাহাদের হাত ধরে হাসতে হাসতে নাচছে, চৈতির বুকের খুব গভীরে একটা শূন্যতা মোচড় দিয়ে উঠল। সবার জোড়া আছে, তার পাশটা ফাঁকা। ঠিক তখনই লোকনাথ তার হাত ধরল। যে মানুষটা সারাক্ষণ ছায়ার মতো তার সংসারটা পাহারা দেয়, আজ এই চলন্ত বাসে, এই উৎসবের ভিড়ে, সেই শক্তপোক্ত পুরুষটাই হয়ে উঠল তার একমাত্র ‘ভরসা’। আর সেই ভরসার কাছেই সে একটুখানি বাঁধন ছিঁড়তে দিল।
পর্ব ১৩(গ): নীরব আশ্রয়
বাসের গান চলছে। হইচই, হাততালি, পায়ের তাল—সব বজায় আছে। জানালা দিয়ে দুপুরের তীব্র আলো এসে পড়ছে সিটে। সবার হাতে Mojo দেয়া হলো।
লোকনাথ চুপ কথা বলছে না, শুধুই চৈতির দিকে তাকিয়ে।
নীরবতা ভাঙল চৈতি নিজেই। গলাটা আগের মতো চড়া নয়, বরং ক্লান্ত, ভাঙা। “আমি ব্যথা পেলে তুমি কষ্ট পাবে?”
লোকনাথ মুখ না তুলেই উত্তর দিল, “কেন পাব না, বলো তো?”
চৈতি জানালার বাইরে তাকাল। গাছগুলো সরে সরে যাচ্ছে। “জানো, আমি না ওইদিন খুব কষ্ট পেয়েছি।”
“কোন দিন?” লোকনাথ এবার চৈতির চোখে তাকাল।
“যেদিন ঝুমু বলল... আমি নাকি ওর মা না।” চৈতির গলাটা ধরে এল। “তোমার কী মনে হয়? আমি কি সত্যিই খারাপ মা?”
লোকনাথ এক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর দৃঢ় গলায় বলল, “না তো। তুমি দায়িত্ববান। আমি তো দেখি, সারাদিন সংসারটা কেমনে আগলে রাখো।”
কথাটা শুনে চৈতির বুকের ভেতর জমে থাকা পাথরটা একটু নড়ল। সে নিজেও বুঝতে পারছে না, কেন নিজের মেয়ের বিচার দিচ্ছে কাজের লোকটার কাছে। কিন্তু বলা থামাতে পারল না। “তবে কেন ঝুমু অমন করে বলল? বলো তুমি? কোথায় আমার ভুল?”
লোকনাথ আর কোনো উত্তর দিল না। সে ধীরে ডান হাতটা তুলল। আলতো করে চৈতির ঘামে ভেজা কপালে নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল। একটা উষ্ণ, নীরব আশ্বাস।
তারপর চৈতিকে নিজের দিকে টেনে নিল। চৈতির মাথাটা নিজের চওড়া বুকের উপর রাখল। বাঁ হাত দিয়ে চৈতির মাথায় আস্তে আস্তে হাত বুলাতে লাগল, যেমন করে মা কাঁদতে থাকা বাচ্চাকে শান্ত করে। ফিসফিস করে বলল, “তুমি ক্লান্ত। অনেক ক্লান্ত। এখন চোখ বন্ধ করো। একটু ঘুমাও।”
চৈতি বাধা দিল না। লোকনাথের গায়ের ঘাম আর সস্তা সাবানের গন্ধ মেশানো পুরুষালি গন্ধটা তার নাকে এল। এই বুকটা পাথরের মতো শক্ত, কিন্তু আশ্চর্য নিরাপদ। চৈতি চোখ বন্ধ করল। দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে আছে। বাসের দুলুনিতে তাদের শরীর একসাথে দুলছে। কোনো কথা নেই, শুধু দুটো হৃদপিণ্ডের ওঠানামা।
কিছুক্ষণ আগে যেখানে চৈতি আর মিরা পাশাপাশি বসেছিল, সেখানে এখন দৃশ্যপট পালটে গেছে। মিরা সরে গিয়ে বসেছে রাহাদের পাশে। স্বামী-স্ত্রী মাথা কাছাকাছি এনে গল্প করছে, মাঝে মাঝে হেসে উঠছে। বহুদিনের জমা অভিমানের বরফ গলছে।
আর ওদিকে জানালার ধারের সিটে চৈতি বসে আছে লোকনাথের সাথে। চৈতির মাথা এলিয়ে আছে লোকনাথের কাঁধে। নিঃশ্বাস ভারী হয়ে এসেছে—ঘুমিয়ে পড়েছে। লোকনাথ এক হাতে চৈতিকে আগলে ধরে রেখেছে, যেন পড়ে না যায়। তার অন্য হাতটা সিটের হাতলে শক্ত হয়ে বসে আছে।
বাস চলছে। হাইওয়ের মসৃণ রাস্তায় চাকার শব্দটাও যেন কমে এসেছে।
একটু আগে যে বাস গানে, হাসিতে, নাচে কাঁপছিল, সেখানে এখন গভীর নীরবতা। শুধু ইঞ্জিনের একটানা গোঁ গোঁ শব্দ, আর জানালার কাচে বাতাসের শোঁ শোঁ আওয়াজ।
সব শব্দ বিলীন হয়ে গেছে। পড়ে আছে শুধু দুটো ভাঙা মানুষের নিঃশব্দ আশ্রয় খোঁজার দৃশ্য।