জুলাই আন্দোলন - অধ্যায় ১৯
পর্ব ১৯: ফেরার রাত
কুদ্দুস বাড়ি ফিরেছে এক সপ্তাহ হলো। রাজীবও ফিরেছে। ঝড় থেমে গেছে, অন্তত বাইরে থেকে দেখলে তাই মনে হয়। খারাপ সময়ের কালো মেঘ কেটে গিয়ে আবার কুদ্দুসের দোতলা বাড়িতে আলো জ্বলছে।
আজ রাতে ডাইনিং টেবিলে সবাই একসাথে।
মেইন চেয়ারে বসে আছে কুদ্দুস। ভারী শরীর, চোখে পুরনো দাপট ফিরে এসেছে। পাশে রাজীব। তার পাশে চৈতি।
ঝুমু আর ঐশী প্লেট নিয়ে দুষ্টুমি করছে। ভাত ছিটাচ্ছে, হাসছে।
চৈতি ধমক দেয়, “আহ্, খাওয়ার সময় এমন করে না।”
রাজীব হাসে, “থাক, ছোট মানুষ। ছেড়ে দাও। খেলুক।”
রেহানা বেগমের মুখে তৃপ্তির হাসি। কতদিন পর ছেলে-নাতনিদের নিয়ে একসাথে খেতে বসেছেন। সীমা এক কোণে দাঁড়িয়ে সবাইকে ভাত-তরকারি বেড়ে দিচ্ছে। তার চোখ-মুখ শুকনো। জামাইয়ের খবর নেই সাতদিন।
ঠিক তখনই গেটে হট্টগোল।
দুই যুবক লোকনাথকে টেনে-হিঁচড়ে ভেতরে ঢোকালো। লোকনাথের গেঞ্জি ছেঁড়া, মুখে আতঙ্ক।
“ছাড় আমারে! ছাড় কইতাছি!” লোকনাথ চেঁচাচ্ছে, কিন্তু গলা কাঁপছে।
একজন যুবক কুদ্দুসের দিকে তাকিয়ে বলে, “কুদ্দুস ভাই, এই যে আপনের লোকনাথ। পলাইছিল, বস্তিতে লুকায়া ছিল।”
খাওয়ার ঘরে কিছুটা নীরবতা। ঝুমু-ঐশীর হাসি থেমে গেছে। চৈতির হাত কেঁপে উঠল। সীমা দরজার চৌকাঠ ধরে দাঁড়িয়ে পড়েছে।
কুদ্দুস ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। তার ছায়াটা টেবিলের উপর পড়ল। লোকনাথের বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল।
আজ আর রক্ষা নাই। চৈতি ভাবী যদি ওই দিনের কথা বইলা দেয়...
কুদ্দুস এক পা এক পা করে এগিয়ে এলো। লোকনাথ চোখ বন্ধ করে ফেলল।
কিন্তু কুদ্দুস তার দুই কাঁধে হাত রাখল। শক্ত, ভারী হাত। তারপর গমগম করে হেসে উঠল।
“আরে লোকনাথ! তুই যা করছস, আমার লাইগা অনেক কিছু করছস। আমার পরিবারটারে তুই-ই রক্ষা করছস।”
লোকনাথ ফ্যালফ্যাল করে তাকায়। বুঝতে পারে না।
কুদ্দুস এবার তাকে বুকে টেনে নিল। জড়িয়ে ধরল শক্ত করে। ঘরের সবাই হতবাক।
“তুই আমার পোলার মতো। আমার রাজীবের বড় ভাইয়ের মতো।” কুদ্দুসের গলা ভারী হয়ে আসে। “তুই ভাবছস মকবুলের লগে কথা কইছস দেইখা তোরে আমি মারুম? আরে পাগল, আমি জানি না? তুই আমার বউ-পোলার বউ-নাতনিগো বাঁচাইতেই ওই জানোয়ারের কাছে গেছিলি। সময় এখন আমাদের। ডর কিসের?”
লোকনাথের পা কাঁপছে। বিশ্বাসই হচ্ছে না সে বেঁচে গেছে। চোখ দিয়ে পানি এসে পড়ল।
কুদ্দুস তার পিঠ চাপড়ে দিল। “যা, হাত-মুখ ধুইয়া আয়। চল, বস আমাদের লগে। আজ থাইকা তুই এই বাড়িরই পোলা। খাবি আমাদের লগে।”
রাজীবও উঠে এসে লোকনাথের পিঠে হাত রাখল। “যাও , ভয় পাইও না।”
লোকনাথের চোখ প্রথমে গেল সীমার দিকে। সীমা দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে, চোখে পানি। তারপর তার চোখ আটকালো চৈতির উপর।
চৈতি তাকিয়ে আছে তার দিকে। এক মুহূর্ত। তারপর চৈতির ঠোঁটের কোণে একটা হালকা মুচকি হাসি ফুটল। সে-ই হাসি, অনেকদিন পর পরিচিত কাউকে দেখলে যেমন হয়।
লোকনাথের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। গলা শুকিয়ে কাঠ।
মাথা নিচু করে সে বেসিনে দিকে গেল। কিন্তু চোখের সামনে ভাসছে শুধু চৈতির ওই মুচকি হাসি, আর গলার নিচের সেই তিলটা।
বিপদ কেটে গেছে। কিন্তু লোকনাথের ভেতরের আগুনটা আবার দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। সে আবারও ফিদা। আগের চেয়েও বেশি।
ডাইনিং টেবিলে কুদ্দুস তখন মাংসের বাটি টেনে নিচ্ছে। রাজনীতির নতুন চাল সে দিয়ে দিয়েছে। আর কেউ জানল না, এই টেবিলের নিচেই আরেকটা ঝড়ের বীজ বোনা হয়ে গেল।