জুলাই আন্দোলন - অধ্যায় ২৪
পর্ব ২৪
সন্ধ্যা নেমেছে। বাইরে আকাশটা ক্রমশ গাঢ় হয়ে আসছে। চৈতি রান্নাঘরে ব্যস্ত। গরম তেলে মশলার ঝাঁঝালো গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে। তার মন এখনো গত রাতের ঘটনায় অস্থির, কিন্তু সে নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করছে।
পাশের ড্রইং রুম থেকে কথাবার্তার আওয়াজ ভেসে আসছিল। ধীরে ধীরে, থেমে থেমে।
কুদ্দুসের গলা ভারী হয়ে উঠেছে।
“রাজীব, তোর পুরনো কেসগুলো এখনো আছে। থানা থেকে ফোন এসেছে। আগামীকাল পুলিশ আসবে তোকে ধরতে।”
রাজীবের মুখ ফ্যাকাশে। সে চুপ করে বসে আছে।
কুদ্দুস লোকনাথের দিকে তাকালেন। অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
“লোকনাথ… তুই যদি এই দায়টা নিস… তাহলে অনেক সহজ হয়। তোর নামে কোনো কেস নেই। তুই বলবি সব তুই করেছিস। আমরা তোকে দ্রুত ছাড়িয়ে আনব।”
ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠল। কেউ কথা বলছে না। শুধু ঘড়ির টিকটিক শব্দ আর রান্নাঘর থেকে হালকা শব্দ ভেসে আসছে।
লোকনাথ চুপ করে বসে আছে। তার মাথা নিচু। সে কোনো উত্তর দিচ্ছে না।
রাজীব এবার ধীরে ধীরে বলল, গলায় অনুরোধ আর অসহায়তা মিশে,
“লোকনাথ ভাই… প্লিজ। এই কাজটা করে দে। তুই না থাকলে আমি শেষ। আমার দুটো বাচ্চা আছে… চৈতি আছে। তুই যদি বলিস সব অপরাধ তোর, তাহলে আমি বেঁচে যাব।”
লোকনাথ এখনো চুপ। তার চোখ নিচের দিকে। ঘরে টেনশন যেন ছুরির মতো ঝুলছে।
ঠিক তখন চৈতি চা নিয়ে ঘরে ঢুকল। ট্রেতে তিন কাপ চা। তার হাত সামান্য কাঁপছে। সে চায়ের কাপগুলো টেবিলে রাখতে গিয়ে লোকনাথের দিকে তাকাল।
দুজনের চোখাচোখি হলো।
চৈতির চোখে ভয়, লজ্জা আর একটা অদ্ভুত অনুরোধ। গত রাতের স্মৃতি দুজনের মাঝে ঝুলছে। লোকনাথের চোখে সেই রাতের ক্ষুধা, আর এখন একটা নতুন সিদ্ধান্তের দ্বন্দ্ব।
লোকনাথ অনেকক্ষণ চৈতির চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে মুখ তুলে কুদ্দুস ও রাজীবের দিকে তাকাল।
গলা শুকনো, কিন্তু দৃঢ়।
“ঠিক আছে… আমি দায় নেব।”
ঘরটা যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল।
রাজীব স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। কুদ্দুস মাথা নেড়ে বললেন, “ভালো। আমরা তোকে ছাড়িয়ে আনব।”
কিন্তু লোকনাথের চোখ এখনো চৈতির দিকে। সে শুধু চৈতির জন্যই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে — শুধু তার স্বামীকে বাঁচাতে, শুধু চৈতিকে খুশি করার উদ্দেশ্য।
চৈতি চোখ নামিয়ে নিল। তার হাত আরও জোরে কাঁপতে শুরু করেছে।
রাত হয়েছে। ঘরের ভিতরে নরম আলো জ্বলছে। চৈতি ঝুমুর পাশে বসে তাকে পড়াচ্ছে। কিন্তু তার মন অন্য কোথাও। লোকনাথের কথাগুলো, তার চোখের দৃষ্টি, আর আজ সন্ধ্যায় নেওয়া সেই সিদ্ধান্ত — সবকিছু বারবার তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে।
‘লোকনাথ কেন এরকম করল? সে কি এত বোকা? নাকি… সব আমার জন্য করল?’
চৈতির বুকের ভিতরটা অস্বস্তিতে ভারী হয়ে আছে। সে নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু কিছুতেই মন শান্ত হচ্ছে না।
ঝুমু খাতায় লিখছে। “২ + ৫ = ৭”।
চৈতি হঠাৎ রেগে উঠে বলল,
“এটা কী লিখেছো? ২ + ৫ সমান কি ৭ হয় নাকি? ৮ হয়! এই বোকা মেয়ে, একদম মন দিয়ে লেখো!”
ঝুমু ছোট ছোট আঙুল তুলে দেখাল।
“মা, ৭ই তো হয়। এই দেখো…” সে আঙুল গুনতে শুরু করল — এক, দুই, তিন… সাত।
চৈতি তাকিয়ে দেখল। সে নিজেই ভুল করেছে। ২ + ৫ আসলে ৭ই। তার মাথা এত অন্যদিকে ছিল যে সাধারণ অঙ্কও ভুল হয়ে গেছে।
কিন্তু চৈতি ভুল স্বীকার করল না। সে জোর করে বলল,
“হ্যাঁ হ্যাঁ… আমি জানি। তোমাকে দেখলাম পারো কিনা। ঠিক আছে, এবার মন দিয়ে কর।”
ঝুমু আবার অঙ্কে মন দিল। তার ছোট মুখটা গম্ভীর হয়ে গেছে।
চৈতি আর বসে থাকতে পারল না। তার মাথার ভিতরে লোকনাথের ছবিটা বারবার ভেসে উঠছে। সে হঠাৎ উঠে দাঁড়াল।
“আমি লোকনাথের কাছে যাচ্ছি। তুমি অঙ্ক করে যা।”
ঝুমু অংক করতে করতে,"আচ্ছা মা।"
কিন্তু কিছু বলল না। চৈতি দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। তার হৃদস্পন্দন দ্রুত হয়ে উঠেছে। সে জানে না কেন যাচ্ছে, কী বলবে — শুধু জানে, এই অস্বস্তি আর সহ্য করা যাচ্ছে না।