জুলাই আন্দোলন - অধ্যায় ৩০
পর্ব ৩০
লোকনাথ মোটরসাইকেলটা একটা ছোট্ট টিনের হোটেলের সামনে দাঁড় করাল। রাস্তার পাশে সস্তা ধোঁয়া ওঠা হোটেল, সামনে কয়েকটা প্লাস্টিকের চেয়ার-টেবিল।
“ভাবী, চলুন কিছু খেয়ে নিই। ঢাকা যেতে এখনো অনেক সময় লাগবে। এখন না খেলে আর সুযোগ পাব না।”
চৈতি কিছু বলল না। নীরবে মোটরসাইকেল থেকে নেমে পড়ল। তার শরীর এখনো আগের স্পিডব্রেকারের ঘটনায় অস্বস্তিতে ভরা। লোকনাথের পিছন পিছন সে টিনের হোটেলটায় ঢুকল।
ভিতরে তেল-পোড়া গন্ধ আর মাছি উড়ছে। লোকনাথ একটা চেয়ার টেনে বসে বলল,
“ভাবী, আপনি কী খাবেন?”
চৈতি শুকনো গলায় বলল,
“আমি কিছু খাব না।”
লোকনাথ ভুরু কুঁচকে বলল,
“খেয়ে নেন। না হয় আর সুযোগ পাবেন না। অনেক কাজ ঢাকায় গিয়ে।”
চৈতি গলার স্বর ভারী করে বলল,
“ঐটা নিয়ে তোমার ভাবতে হবে না।”
লোকনাথ মনে মনে হাসল। *দেমাগ কত মাগীর! বড়লোকি দেখায়।*
একটু পরে লোকনাথের ভাত-ডাল আর মাছের ঝোল এসে গেল। সে খেতে শুরু করল। চৈতির একটু ঘৃণাই লাগছিল এই নোংরা হোটেলে খাবার খেতে দেখে। সে মুখ ঘুরিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে রইল।
হঠাৎ একটা ছোট্ট মেয়ে ফুলের ঝুড়ি নিয়ে এসে দাঁড়াল। বয়স ছয়-সাতের মতো। ঝুমুর সমবয়সী।
চৈতির বুকের ভিতরটা মুচড়ে উঠল। সে নরম গলায় ডাকল,
“এই যে শুনো… তোমার নাম কী?”
মেয়েটা লাজুক গলায় বলল, “রিতা।”
“বাহ, খুব সুন্দর নাম তো। তুমি কোন ক্লাসে পড়ো?”
রিতা মাথা নিচু করে বলল, “আমি পড়ি না।”
চৈতির চোখে পানি চলে এল। মায়ার অনুভূতিতে তার গলা বুজে আসছিল। সে বলল,
“আচ্ছা রিতা, তোমার ফুলগুলো তো অনেক সুন্দর। কত করে বিক্রি করছ?”
রিতা চালাক চোখে তাকিয়ে বলল, “একটা ১০০ টাকা।”
চৈতি তার ব্যাগ খুঁজল। কিন্তু হঠাৎ মনে পড়ল — সে ব্যাগটা বাসায়ই ভুলে রেখে এসেছে। তার মুখ লজ্জায় লাল হয়ে গেল।
সে একটু ইতস্তত করে লোকনাথের দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলল,
“লোকনাথ… তোমার কাছে ১০০ টাকা হবে? আমি বাসায় গিয়ে দিয়ে দিব।”
লোকনাথ ভাত মাখতে মাখতে বিরক্ত হয়ে, রিতার উদ্দেশ্যে বলল,
“১০০ টাকায় দুইটা ফুল হলে দাও, না হয় থাকুক।”
রিতা বুঝে গেল লোকনাথ বোকা খদ্দের না। সে তাড়াতাড়ি বলল, “আচ্ছা দেন।”
চৈতি দুইটা ফুল নিল। রিতা ফুল দিতে দিতে হাসি মুখে বলে গেল,
“আপনাদের জুটি অনেক সুন্দর। স্বামী নিগ্রো, স্ত্রী রাশিয়ান।”
চৈতি লজ্জায়-রাগে একসাথে লাল হয়ে গেল।
“দেখছো কী বলে গেল! কী বেয়াদব মেয়ে!”
লোকনাথ মজা পেল কথাটায়, লোকনাথ হাসতে হাসতে বলল,
“রাস্তার এগুলো এরকমই হয় ভাবী।”
লোকনাথের খাওয়া শেষ হলো।
খাওয়া শেষ করে তারা হোটেল থেকে বেরিয়ে মোটরসাইকেলের কাছে গেল। তখনই দূরে একটা দোকানের পাশে রিতাকে দেখতে পেল। মেয়েটা পলিথিনের ব্যাগে আঠা ঢেলে নাকের কাছে ধরে জোরে জোরে শুঁকছে। তার চোখ আধবোজা, শরীরটা একটু একটু কাঁপছে।
চৈতির মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। তার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।
**এতটুকু শিশু… নেশা করে বেড়াচ্ছে। আসলেই এই দেশটা এদের জন্য কিছুই করছে না। আমরা সবাই শুধু নিজের স্বার্থ নিয়ে ব্যস্ত…**
সে চুপ করে মোটরসাইকেলে উঠে বসল। আর কোনো কথা বলল না।
ঢাকায় পৌঁছাতে তাদের প্রায় আড়াই ঘণ্টা লেগে গেল। শহরের ব্যস্ত রাস্তা, গাড়ির হর্ন, ধুলো আর গরম — সব মিলিয়ে চৈতির মাথা ঝিমঝিম করছিল। লোকনাথ কয়েকটা জায়গায় খোঁজ নিয়ে অবশেষে NCP অফিসের সামনে মোটরসাইকেল থামাল।
অফিসে ঢুকতেই একজন মাঝবয়সী নেতা হাসিমুখে এগিয়ে এলেন।
“আসসালামু আলাইকুম। আপনিই কি চৈতি আপা? কুদ্দুস মিয়ার বউমা?”
চৈতি লজ্জায় মাথা নিচু করে বলল, “জ্বি।”
“খুব ভালো লাগল আপনাকে পেয়ে। NCP-এর পক্ষ থেকে আপনাকে স্বাগতম। মহিলা প্রার্থী খুব কম, আপনি এগিয়ে এসেছেন — এটা সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক। কুদ্দুস মিয়ার মত লোক হয় না, নিজে BNP করে, কিন্তু ছেলের বউকে অন্য দল সাপোর্ট করতে আরো অনুপ্রেরণা দেয়।”
আরও দু-তিনজন নেতা এসে চৈতির সাথে কথা বললেন, তার পরিবার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন, এলাকার অবস্থা জানতে চাইলেন। চৈতি অস্বস্তিতে ছিল, কিন্তু মুখে হালকা হাসি রেখে উত্তর দিচ্ছিল। লোকনাথ পাশে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল।
একটু পর ফর্ম তুলে দেওয়া হলো। লোকনাথ চৈতিকে সবকিছু বুঝিয়ে দিল — কোন জায়গায় কী লিখতে হবে, কোন কাগজপত্র লাগবে। চৈতি মন দিয়ে শুনছিল।
কিন্তু হঠাৎ একটা বড় সমস্যা দেখা দিল।
ফর্মের এক জায়গায় স্পষ্ট লেখা — **স্বামীর নাম ও স্বাক্ষর**।
চৈতির মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল। সে চুপ করে কিছুক্ষণ ফর্মের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে মোবাইল বের করে রাজীবকে ফোন করল।
“হ্যালো, রাজীব?”
“কী হয়েছে?” রাজীবের গলা তাড়াহুড়োয় ভরা।
চৈতি সমস্যাটা খুলে বলতেই রাজীব বিরক্ত হয়ে বলল,
“আমি তো এখন টাঙ্গাইলে। ফিরতে অনেক দেরি হয়ে যাবে। আজই তো শেষ তারিখ। কী করব?”
“এখন কী করব তাহলে?” চৈতির গলা কাঁপছিল।
“দাঁড়াও, বাবাকে জিজ্ঞেস করছি।”
কিছুক্ষণ পর ফোনটা নিয়ে কুদ্দুসের কাছে চলে গেল।
চৈতি নরম, ভয়ার্ত গলায় বলল, “বাবা… ফর্মে স্বামীর স্বাক্ষর লাগবে। রাজীব তো আসতে পারবে না। এখন কী করি?”
কুদ্দুস কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তিনি বুঝতে পারছিলেন পরিস্থিতির গুরুত্ব। আজ যদি ফর্ম জমা না হয়, তাহলে চৈতি প্রার্থী হতে পারবে না। আর যদি অন্য কেউ প্রার্থী হয়, তাহলে তার নিজের জয় অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। আর যদি কেও না দাঁড়ায় তার বিপক্ষে, নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ারও ঝুঁকি আছে।
তিনি রাজীবকে বললেন, “রাজীব, তুই দেখ তো রবিউল মাস্টার আসছে কি না। একটু ডেকে নিয়ে আয়।”
রাজীবকে সরিয়ে দিয়ে কুদ্দুস ফোনটা কানে নিয়ে নিলেন। গলাটা একটু নামিয়ে, কিন্তু আত্মবিশ্বাসের সাথে বললেন,
“শোনো মা… আজই তো শেষ তারিখ। লোকনাথ তো তোমার সাথেই আছে। ওকে দিয়ে স্বাক্ষরটা করিয়ে নাও।”
চৈতি চমকে উঠল।
“কী বলেন বাবা! এটা কীভাবে সম্ভব? লোকনাথ… সে তো…”
“মা, শোনো। এটা জাস্ট একটা স্বাক্ষর। পরে আমি সব ঠিক করে নেব। আমি চাই আমার এলাকার মহিলারা এগিয়ে যাক। ঘর থেকেই যদি শুরু না করি, তাহলে বাইরের মানুষকে কী বলব? তুমি যদি না দাঁড়াও, তাহলে তো সবকিছু ভেস্তে যাবে।”
চৈতির মনে দ্বিধা। একদিকে লজ্জা ও অস্বস্তি, অন্যদিকে শ্বশুরের কথায় বিশ্বাস। সে ভাবল — **বাবা কত বড় চিন্তা করেন। এলাকার মেয়েদের জন্য এত কিছু করতে চান। আমি যদি না করি, তাহলে হয়তো সব নষ্ট হয়ে যাবে।**
সে দুর্বল গলায় বলল, “ঠিক আছে বাবা… কিন্তু…”
“লোকনাথকে ফোন দাও। আমি নিজে ওকে বলছি।”
চৈতি কাঁপা হাতে ফোনটা লোকনাথের দিকে বাড়িয়ে দিল।
লোকনাথ ফোন নিয়ে কানে লাগাল। কুদ্দুস অনেকক্ষণ ধরে বুঝিয়ে বললেন। লোকনাথ মাথা নেড়ে শুনল। তার মুখে একটা চাপা, বিজয়ীর হাসি ফুটে উঠল।
“জ্বি স্যার… ঠিক আছে। আমি করে দিচ্ছি।”
ফোন রেখে লোকনাথ চৈতির দিকে তাকাল। চৈতির গাল দুটো লজ্জায় টকটকে লাল হয়ে গিয়েছে। সে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। লোকনাথ ধীরে ধীরে ফর্মের উপর ঝুঁকে পড়ে, “লোকনাতগ” নামে স্বাক্ষর করল — যেন সে-ই চৈতির স্বামী।
চৈতির বুকের ভিতরটা ছটফট করছিল। তার চোখে জল চলে এসেছিল। সে মনে মনে বলছিল — *এটা কী হচ্ছে… এই লোকটা আমার স্বামীর নামে সাইন করছে…*
কিন্তু সে কিছু বলতে পারল না। শুধু চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
লোকনাথ স্বাক্ষর করে ফর্মটা তুলে দিয়ে চৈতির দিকে তাকিয়ে একটা ছোট্ট হাসি দিল।