কুহেলী - এক সতী বিধবার অজানা গন্তব্য (সিরিজ) - অধ্যায় ১০
(10)
এক মাস চোখের পলকে পার হয়ে গেল। গ্রীষ্ম শেষ হয়ে বর্ষার মেঘ দেখা দিয়েছে আকাশে। কুহেলীর মনেও অনেক পরিবর্তন এসে গেছে এই এক মাসে। এখানকার লেবার, সুপারভাইজার, সিকিউরিটি গার্ড সকলের সঙ্গেই তার মিলিয়ে এরইমধ্যে সে নিজের কাজ বুঝে নিয়েছে সবটাই। ছাগলদের খাওয়ানোর উন্নত ঘাসের চাষ ঠিকমতো হচ্ছে কিনা, ছাগলগুলোর স্বাস্থ্য উপযুক্ত আছে কিনা, ছাগীদের ব্রিডিং ঠিকমতো হচ্ছে কিনা, তিন থেকে আট মাস বয়সী বাড়ন্ত ছাগলদের আলাদাভাবে রাখায় কোনো সমস্যা হচ্ছে কিনা, অসুস্থ ছাগলদের কোয়ারেন্টাইন সেকশনে ঠিকমতো চিকিৎসা হচ্ছে কিনা, দানাদার খাদ্য মজুতে কোনো গাফিলতি হচ্ছে না তো....এই নিয়েই তার সারাদিন কেটে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে বাচ্চা ছাগলগুলোকে কোলে নিয়ে আদর তো চলতেই থাকে।
এই সবকিছুর মধ্যে এই এক মাসে সে ব্যবসায় সেরকম কোনো বড়ো গাফিলতি দেখতে পেল না। কিন্তু একটা বিষয় তার কাছে পরিস্কার হল, এখান লেবার ছনিয়া তার দিকে খারাপ দৃষ্টিতে তাকায়।
একদিনের ঘটনা। একবার সে ছাগলদের শেডের তলায় দাঁড়িয়ে ছাগলগুলো পরীক্ষা করছিল অবিনাশের সঙ্গে। এমনসময় ছনিয়া একটা দানার বস্তা হাতে নিয়ে তার পাশ দিয়ে পেরিয়ে চলে যাচ্ছিল। কুহেলী অত ভালোভাবে খেয়াল করেনি ভালো করে তাকে। কিছুক্ষণ পরে তার কি মনে হতে একবার পিছনে ফিরে তাকাতেই লজ্জায় কুঁকড়ে গিয়েছিল। ছনিয়া কুহেলীর পেছনেই দাঁড়িয়ে কুহেলীর মোটা লদকা পোঁদ দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে লুঙ্গি উপরে তুলে ডানহাতে বাড়া ধরে কচলাচ্ছে। কুহেলী ঘুরে তাকাতেই সে শান্তভাবে, যেন কিছুই হয়নি, সেইভাবেই খোলা বাড়া ধরে কচলাতে লাগে তাকে দেখিয়ে দেখিয়ে। কুহেলী দেখে ছনিয়ার বাড়া কমপক্ষে নয় ইঞ্চি লম্বা ও ঘেরেও অনেক মোটা। তা দেখে কুহেলীর কামনার বদলে গা গুলিয়ে ওঠে। তখন ছনিয়া লুঙ্গি নামিয়ে হাসতে হাসতে বলে উঠলো,
বড্ডো গরম এখানে দিদিমনি, ঘামে গোটা গা চুলকোচ্ছে।
তারপর তেমনই হাসতে হাসতে সে কুহেলীর মোটা মোটা দুধের দিকে লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বেরিয়ে গেল সেখান থেকে। এই কথা কুহেলী অবিনাশকে জানায়নি। সে একপ্রকার ভ্যাবলাকান্ত। তাকে বললে সে এসব বিশ্বাস করবেনা, কারণ সে এই পৃথিবীতে যে খারাপ কিছু হয়, তা সে মানেই না। তার কাছে ছনিয়াও অনেক স্নেহের। তাই তাকে এসব বলে লাভও নেই।
সেদিন থেকে কুহেলী ছনিয়াকে চোখে চোখে রাখতে শুরু করে। এইধরনের মানুষদের বিশ্বাস নেই। প্রথমত এটা নিজের রাজ্য নয়, সে অন্য রাজ্যের অতিথি এখন, আর দ্বিতীয়ত, ছনিয়া আশেপাশেই বাড়ি আর তার মেয়েমানুষের প্রতি লোভ, আর সে শুনেছে বিহারীরা নাকি খুব পালোয়ান ও সাহসী হয়, একবার ক্ষেপে গেলে তাকে আটকানো মুশকিল। ছনিয়ার চেহারাও দানবের মতো, লম্বায় সাড়ে ছ'ফুটের ওপর, চওড়া পেশীবহুল ভারী শরীর। এখানে তার ওপর রাগ করে কোনো প্রতিবাদ করলে কাজ তো হবেই না উল্টে তার নিজেরই ক্ষতি হবার সম্ভাবনা। কুহেলী বুদ্ধিমতি মেয়ে। সে জানে এখানে সে আর ওই অবিনাশ ছাড়া বাকি সবাই এখানকারই লোক। তাই তার বিপদের সময় কেউ অবিনাশ ছাড়া যে আর কারোকে পাশে পাবে না, তা সে ভালোভাবেই জানে।
তার মনে শান্তনু ফেরার আগেই এখান থেকে চলে যাবার চিন্তাও এসেছিল। কিন্তু ওই ছনিয়া ছাড়া আর কারোর মধ্যে কোনো সমস্যা না দেখে, এই ছাগলগুলোর ওপর, এই লোকগুলোর ওপর, এই জঙ্গলে ঘেরা তাদের বাড়িগুলোর ওপর মায়া পড়ে যাওয়ায়, আর শান্তনুকে উচিত শিক্ষা দেওয়ার আশায় সে থেকে গেল। যদিও আরও একটা কারণ ছিল তার না যাওয়ার, যদিও সে তা মানতে রাজি ঠিক নয়। কিন্তু যৌবনের জোয়ার যে কুল মানে না, কোনো বাধায় থেমে যায় না, সে তটে আছড়ে পড়বেই, তা হল তার হৃদয়ে ক্রমে ক্রমে ডাক্তার অবিনাশ জায়গা জুড়ে বসছে। সে লজ্জায় এগিয়ে আসছে না তার দিকে, কুহেলীই যেন কিছুটা এগিয়ে চলেছে...তার বন্দরে...খানিক আশ্রয়ের আশায়।
এই কদিনে অবিনাশ ও কুহেলী কাছাকাছি এসেছে। কাজের ফাঁকে ফাঁকে একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকে, ইশারায় বাক্য বিনিময় তো চলেই, রঙ্গ রসিকতা, হাসি ও সেই বকুল গাছের তলায় বসে একে অপরের মনের কথাও বলে চলে অবলিলায়। অবিনাশ জানে কুহেলী বিধবা, তার পরেও তার প্রতি আকর্ষণ বিন্দুমাত্র কমেনি।
একদিন বিকেলে কাজ শেষ করে অবিনাশ ও কুহেলী বকুলতলায় বসে থাকে। অবিনাশের শরীর আজ ভালো নেই, সর্দি সঙ্গে জ্বর। অবিনাশ বলে,
এখান থেকে চলে যাবো ভাবছি, দেশেই পশু পাখির চিকিৎসার হাসপাতাল তৈরি হয়ে গেছে, ওরা আমায় ফোন করে কনফার্মেশন চাইছে।
কুহেলীর ভেতরটা কেমন ফাঁকা হয়ে যায় এই কথা শুনে, এই বিদেশ বিভুঁইয়ে অবিনাশ ছাড়া আর কেইবা আছে তার কাছে, তার মতো আপন ভাব যে সে আর দেখতে পায়না কারোর মধ্যে। তার প্রতি অবিনাশের সম্মান, শ্লীল আচরণ, শ্রদ্ধা বারে বারে প্রকাশ পায় তার কথায়, গল্পে, মনোভাবে। এই মনোভাবই তো কুহেলীকে তার দিকে টেনে নিয়ে চলছে। অবিনাশের এই যাওয়ার কথা শুনে কুহেলী একটু ভারাক্রান্ত মনেই বলে,
সত্যিই চলে যাবেন আপনি?
অবিনাশ এর প্রতুত্তরে তাকিয়ে থাকে কুহেলী চোখের দিকে। বোঝার চেষ্টা করে, এ কি সত্যিই প্রেমের ডাক নাকি স্রেফ বন্ধুত্বের টান!
এমনসময় ঝড় উঠল প্রবল বেগে, সঙ্গে বাজ পড়ার কান ফাটা আওয়াজ। তারা দুজনে দৌড়ে গিয়ে কুহেলীর ঘরে গিয়ে ঢুকলো। ছাগলদের ঘরে ঢোকানো হয়ে গেছে। কুহেলী তাড়াতাড়ি একটা শুকনো তোয়ালে অবিনাশের হাতে দিয়ে বলে,
মাথা টা মুছে ফেলুন।
অবিনাশ হাসে। বেশ লাগে এই মেয়ের কীর্তি গুলো। তার কথা, তার কড়া আদেশ, তার যত্ন সবই অবিনাশকে মুগ্ধ করে বারে বারে।
এমনসময় ঘরের বাইরে রবি এসে দাঁড়ালো। যেহেতু শান্তনু এখন দেশে নেই, তাই গাড়ি ছেড়ে রবি এখন এই খামারের কাজেই লেগে রয়েছে কুহেলী আসার পর থেকে। ঘরের মধ্যে উঁকি মেরে রবি বলে,
ম্যাডাম, একবার আপনায় আসতে হবে। দানাদার খাবারের ঘরের ছাদ উড়ে গেছে, বৃষ্টিতে সব ভিজে যাচ্ছে, ছনিয়া মদ খেয়ে পড়ে আছে , আমার কথা সে শুনছেই না, যদি আপনার কথা শোনে। আর যদি খাবার না সরানো হয়, সব খাবার নষ্ট হয়ে যাবে।
সন্ধ্যা হয়ে গেছে, তার ওপর প্রবল ঝড়বৃষ্টির তান্ডব। ছনিয়ার কথা শুনে কুহেলীর মনে খানিক ভয় জমা হলো, এই রবিও সুবিধার নয়। সেই রাতে শান্তনুর সেই কুকর্মের সাক্ষী সে। অবিনাশ বলে ওঠে,
কুহেলী, আমি যাচ্ছি। আমি ছনিয়াকে বলে কাজ সেরে ফেলবো। ও আমায় মানে।
না, আমি যাবো। এই বৃষ্টিতে আপনি গেলে শরীর আরও বেশি খারাপ হয়ে পড়বে, তখন আমাকেই....!
বলে লজ্জায় থেমে গেল কুহেলী। অবিনাশ হাসে শুধু। জানে কুহেলীর আদেশই শেষ কথা। কুহেলী আর দেরি না করে একটা টর্চ ও ছাতা হাতে সেই প্রবল দূর্যোগের মধ্যেই অন্ধকারে বেরিয়ে পড়ল রবির সঙ্গে।
(চলবে)