মৌসুমী: আমাদের ব্যক্তিগত মালেনা - অধ্যায় ৫

Original Chapter Link: https://xossipy.com/thread-74920-post-6302119.html#pid6302119

Posted on Tue Sep 01 2026 by Orbachin (Profile)

Tags:fantasy
3202 words / 15 min read

Parent
অধ্যায় ৪: অসম বৃত্তের জ্যামিতি ও নিষিদ্ধ উপহার এক হোয়াটসঅ্যাপের নীল ব্যাকগ্রাউন্ডে জ্বলজ্বল করা একটি মাত্র শব্দ—‘না’। বর্ণমালার হিসেবে নিতান্তই ক্ষুদ্র, কিন্তু এর মনস্তাত্ত্বিক ও শারীরিক অভিঘাত ছিল প্রচণ্ড। এই একটি মাত্র শব্দ প্রতিষ্ঠিত মহাতারকা এবং উদীয়মান তরুণের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা অদৃশ্য, নিরেট সামাজিক কাঁচের দেওয়ালটাকে এক নিমেষে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়েছিল। এ কোনো সাধারণ অস্বীকৃতি নয়; ছিল  চূড়ান্ত, নীরব ও ভয়ংকর সম্মতি। নিষিদ্ধ অরণ্যে প্রবেশের সবুজ সংকেত। পরের কয়েকটা সপ্তাহে মৌসুমীর যাপিত জীবনে নেমে এল এক অদ্ভুত, পরাবাস্তব বসন্ত। ক্যালেন্ডারের পাতায় তখন নভেম্বর ফুরিয়ে ডিসেম্বরের হিমেল হাওয়া ঢাকার রাজপথ ছুঁয়েছে। রাতে উত্তরের বাতাস ব্যালকনির গাছগুলোতে মৃদু কাঁপন তোলে। কিন্তু মৌসুমীর রক্তে তখন বইছিল ফাগুনের মাতাল, অপ্রতিরোধ্য ঘূর্ণিবায়ু। গত এক দশকে তাঁর সকালগুলো ছিল অত্যন্ত একঘেয়ে, সাংসারিক এবং যান্ত্রিক। সকালে ঘুম ভেঙে তিনি কাজের মাসিকে হাঁকডাক দিতেন, নাস্তার মেনু ঠিক করতেন, ড্রাইভারের ছুটির হিসাব নিতেন কিংবা এফডিসির শিল্পী সমিতির কোনো ক্লান্তিকর মিটিং নিয়ে ফোনে কথা বলতেন। কিন্তু এখন? এখন ভোরে চোখ মেলার আগেই তাঁর ডান হাতটি অবচেতনভাবেই চলে যায় নরম সাটিনের বালিশের নিচে রাখা ফোনটার দিকে। ফোনের স্ক্রিনে যদি ইহানের কোনো ‘গুড মর্নিং’ টেক্সট থাকে, কিংবা দশ সেকেন্ডের একটা গাঢ় ভয়েস নোট ভেসে ওঠে—“শুভ সকাল ম্যাম, আজ আপনার দিনটা সুন্দর কাটুক”—তবে মৌসুমীর পুরো দিনটা শরতের মেঘমুক্ত উজ্জ্বল রোদের মতো প্রস্ফুটিত হয়ে ওঠে। আর যদি কোনোদিন সকাল নয়টা বেজে যাওয়ার পরেও নোটিফিকেশন বার শূন্য থাকে? তবে এক তীব্র, অনাহূত অভিমান আর শ্বাসরুদ্ধকর বিষণ্নতা তাঁর বুকের ভেতর চেপে বসে। তিনি তখন কোনো কাজে মন বসাতে পারেন না; মেকআপের ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে অস্থির আঙুলে বারবার হোয়াটসঅ্যাপ স্ক্রল করতে থাকেন। ইহানের সাথে তাঁর এই ডিজিটাল সংযোগের কোনো নির্দিষ্ট সামাজিক সংজ্ঞা ছিল না। এটি ঠিক প্রথাগত প্রেমিকের মতো বাঁধাধরা সম্পর্ক নয়, আবার স্রেফ গুরু-শিষ্য বা সহকর্মীর বন্ধুত্বও নয়। এটি ছিল এক নিষিদ্ধ, ধূসর ও তীব্র কামনামাখা সম্পর্কের চোরাবালি। ইহান কখনো মুখে সরাসরি বলেনি—“আমি আপনাকে ভালোবাসি”। কিন্তু সে মৌসুমীকে এমন এক মহামূল্যবান জিনিস দিতে শুরু করল, যা এই বয়সে একজন মহাতারকার জীবনে সবচেয়ে দুর্লভ—‘সময়’। ওমর সানি সারাদিন তাঁর নতুন রেস্তোরাঁ ব্যবসা, এফডিসির মিটিং আর বন্ধুদের আড্ডায় ব্যস্ত থাকেন। সন্তানরা নিজেদের উচ্চশিক্ষা, ক্যারিয়ার আর নিজস্ব বন্ধুবান্ধবদের ভুবনে নিবেদিত। গুলশানের এই সুবিশাল তিন হাজার স্কয়ার ফিটের ডুপ্লেক্স অ্যাপার্টমেন্টটি মৌসুমীর কাছে রূপ নিয়েছিল এক নিঃসঙ্গ, পাথুরে দুর্গে। আর সেই দুর্গের নিশ্ছিদ্র প্রাচীর ভেদ করে ইহানের উপস্থিতি প্রবেশ করেছিল তপ্ত মরুভূমিতে এক পশলা আকস্মিক শ্রাবণধারার মতো। তারা কথা বলত। ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কখনো গভীর রাতে অডিও কলে, কখনো অলস দুপুরে ভিডিও কলে। ইহান কথা বলত তার বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার ডিপার্টমেন্ট নিয়ে, সত্যজিৎ রায় আর তারকোভস্কির সিনেমা নিয়ে, কখনো বা আধুনিক বিশ্ব রাজনীতির প্যারাডক্স নিয়ে। মৌসুমী মুগ্ধ হয়ে, আধশোয়া হয়ে শুনতেন। তাঁর মনে হতো, তিনি যেন তরুণের প্রখর, সতেজ চোখ দিয়ে পুরো পৃথিবীটাকে নতুন করে দেখছেন। ইহানের গলার স্বর ভারী ও কিছুটা পুরুষালী ভাঙা, কিন্তু তাতে এক ধরনের অদ্ভুত ছেলেমানুষি আবদার ও অধিকারবোধ মিশে থাকত। যখন ভিডিও কলে কথা বলার সময় ইহান হঠাৎ থেমে গিয়ে মৌসুমীর খোলা কাঁধ আর ঢিলেঢালা রেশমি পোশাকের দিকে অপলক তাকিয়ে বলত—“ম্যাম... ওহ সরি, মৌসুমী ম্যাম... এই গাঢ় মেরুন রঙের পোশাকে আপনাকে না একদম অপার্থিব লাগছে। মনে হচ্ছে যেন কোনো ইতালিয়ান ভাস্কর্য কথা বলছে”—তখন মৌসুমীর চিবুক ও গালের রক্তিম আভা কোনো কৃত্রিম মেকআপ দিয়ে ঢাকতে হতো না। মৌসুমী নিজের অজান্তেই লক্ষ্য করলেন, তিনি অবিশ্বাস্যভাবে বদলে যাচ্ছেন। তিনি এখন সকালের জিম সেশনে আগের চেয়ে অনেক বেশি মনোযোগী। ট্রেইনারকে বলে নিজের ‘Regal Fuller Frame’-এর প্রতিটি বাঁককে আরও বেশি আকর্ষণীয় ও টানটান করার কসরত করছেন। কঠোর ডায়েট চার্ট মেনে চলছেন, পার্লারে গিয়ে নিয়মিত বিশেষ হাইড্রা-ফেসিয়াল আর স্কিন পলিশিং করাচ্ছেন। চুলে করিয়েছেন চকোলেট ব্রাউন আর বার্গান্ডির চমৎকার ব্লেন্ড। তাঁর শরীরে বয়সের কারণে যে মেদটুকু জমেছিল (৩৮-৩৬-৪৪ ইঞ্চি), সেটাকে তিনি আগে কিছুটা বার্ধক্যের ভার ভাবতেন। কিন্তু এখন, ইহানের গভীর প্রশংসাসূচক বাক্যগুলো মনে করে তিনি উপলব্ধি করেন—এটাই তাঁর পরম সম্পদ, এটাই তাঁর কামোদ্দীপক রাজকীয় নারীত্ব। ইহান একদিন চ্যাটে লিখেছিল: “ম্যাম, আজকের এই জিরো ফিগারের কৃত্রিম মেয়েদের চেয়ে আপনার এই সুগঠিত, ভরাট আভিজাত্য হাজার গুণ বেশি প্রলুব্ধকর। ঠিক যেন রেনেসাঁ যুগের মাইকেলেঞ্জেলো বা তিশিয়ানের ক্যানভাস থেকে নেমে আসা কোনো চিরন্তন দেবী।” এই  বাক্য মৌসুমীকে যে তীব্র আত্মবিশ্বাস আর নারীত্বের অহংকার এনে দিয়েছিল, তা তাঁর গত তিন দশকের ক্যারিয়ারে কোনো জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার বা ভক্তদের হাততালিও দিতে পারেনি। দুই মাঝেমধ্যে তারা দেখা করতে শুরু করল। তবে চরম সতর্কতায় ও নিশ্ছিদ্র গোপনীয়তায়। গুলশান বা বনানীর কোনো পরিচিত, চাকচিক্যময় রেস্তোরাঁয় নয়—যেখানে পাপারাজ্জি বা পরিচিত মহলের লোলুপ চোখ থাকতে পারে। তারা বেছে নিত ঢাকা শহরের কোলাহলমুক্ত উপকণ্ঠ। কখনো পূর্বাচলের নির্জন হাইওয়ে ধরে দীর্ঘ ড্রাইভ, কখনো তিনশ ফিট সড়কের একদম পেছনের কোনো নামহীন, নিভৃত ক্যাফে। মৌসুমী কখনোই নিজের মার্সিডিজ বা ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে যেতেন না, পাছে ড্রাইভার খোকন কিছু টের পেয়ে যায়। তিনি * না পরলেও বড় কালো ওভারসাইজড সানগ্লাস, মাথায় দামি সিল্কের স্কার্ফ জড়িয়ে সম্পূর্ণ সাধারণ বেশে উবার প্রিমিয়াম কল করতেন। নির্দিষ্ট একটা দূরবর্তী পয়েন্টে গিয়ে তিনি ইহানের প্রাইভেট কারে গিয়ে উঠতেন। গাড়ির পেছনের কিংবা পাশের সিটে পাশাপাশি বসে থাকার সেই সময়গুলোতে বাতাসের প্রতিটি কণা যেন বিদ্যুৎবাহী হয়ে উঠত। ইহান যখন স্টিয়ারিং হাতে ড্রাইভ করত, মৌসুমী তখন বসতেন ঠিক তাঁর বাম পাশের প্যাসেঞ্জার সিটে। তাদের দুজনের শরীরের দূরত্ব থাকত মাত্র কয়েক ইঞ্চি। গাড়ির সেন্ট্রাল এসির ঠান্ডা বাতাসের ভেতর ইহানের শরীর থেকে ভেসে আসত তামাক, পুরুষালী ঘাম আর দামি ওউড পারফিউমের এক অদ্ভুত নেশা ধরানো সুবাস। মাঝেমধ্যে গিয়ার বদলানোর সময় কিংবা আকস্মিক ব্রেক কষার মুহূর্তে ইহানের শক্ত, বলিষ্ঠ কনুই বা হাতের আঙুলের অগ্রভাগ আলতো করে ছুঁয়ে যেত মৌসুমীর শাড়ির পাড় কিংবা উন্মুক্ত কনুই। সেই সামান্য, অতি সংক্ষিপ্ত ছোঁয়ায় মৌসুমীর পরিণত শরীরে এমন সব সুপ্ত, অবদমিত হরমোনের তীব্র বিস্ফোরণ ঘটত—যা তিনি ভেবেছিলেন বহু বছর আগেই তাঁর জীবন থেকে চিরতরে বিদায় নিয়েছে। তাঁর মেরুদণ্ড বেয়ে এক হিমশীতল অথচ দাহ্য শিহরণ নেমে যেত নাভির গভীরে। একদিন রক্তিম বিকেলে তারা উত্তরার দিয়াবাড়ির শেষ প্রান্তে, কাশফুলের বিশাল নির্জন মাঠের পাশে গাড়ি থামিয়েছিল। সূর্য তখন ধীরে ধীরে পশ্চিমের দিগন্তে হেলে পড়ছে। শীতের গোধূলি আকাশটাকে আবির, কমলা আর রক্তিম মায়ায় রাঙিয়ে দিয়েছে। বাতাসে সাদা কাশফুলগুলো এক অপূর্ব ছন্দে দুলছিল। ইহান স্টিয়ারিং হুইলে দুই হাত রেখে আনমনে তাকিয়ে ছিল দূরের রক্তিম দিগন্তের দিকে। গাড়ির ভেতরের মৃদু আলোয় তার ধারালো চোয়াল আর ক্লিন শেভ করা মুখাবয়ব যেন আরও বেশি নিখুঁত দেখাচ্ছিল। মৌসুমী নিজের সিল্কের স্কার্ফটা আলগা করে চশমাটা খুললেন। তাঁর চোখের গভীরতায় জমে থাকা চিরন্তন প্রশ্নটা আর চেপে রাখতে পারলেন না। তিনি খুব নরম, আর্দ্র গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “ইহান... একটা কথা সত্যি বলবে? তুমি আমার সাথে এভাবে গোপনে সময় কাটাও কেন? তোমার বিশ্ববিদ্যালয়ে তো তোমার বয়সী কত রূপসী, আধুনিক আর আকর্ষণীয় তরুণী আছে... তুমি তো তাদের সাথে মিশতে পারো, প্রেম করতে পারো। আমার কাছে তোমার কী পাওয়ার থাকতে পারে?” ইহান ধীরে ধীরে মুখ ঘুরিয়ে সরাসরি মৌসুমীর চোখের দিকে তাকাল। তার চোখের সেই দৃষ্টিতে কোনো চপলতা ছিল না; ছিল এক অবিশ্বাস্য গভীরতা আর অদম্য আকর্ষণ—যা মৌসুমীকে মুহূর্তের মধ্যে শারীরিকভাবে দুর্বল ও দ্বিধাগ্রস্ত করে তুলল। ইহান স্টিয়ারিং থেকে এক হাত নামিয়ে সিটের হাতলের ওপর রাখল। মৌসুমীর হাতের খুব কাছে, কিন্তু স্পর্শ করল না। “সমবয়সী মেয়েদের সাথে কথা বলে আমি কোনো প্রাণ পাই না, ম্যাম,” ইহানের কন্ঠস্বর খাদে নেমে এল। “ওদের চিন্তা-ভাবনা বড্ড অগভীর, বড্ড প্লাস্টিক। ওরা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কেবল ইনস্টাগ্রামের রিলস, মেকআপ ব্র্যান্ড আর ক্ষণস্থায়ী রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস নিয়ে ব্যস্ত থাকে। কিন্তু আপনার পাশে বসলে... আপনার সাথে কথা বললে আমার মনে হয় আমি এক অতলান্ত, রহস্যময় মহাসমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে আছি। যে সমুদ্রের প্রতিটি ঢেউয়ে আছে অভিজ্ঞতা, আভিজাত্য আর এক গভীর বিষাদের গল্প।” ইহান একটু থামল। তার দৃষ্টি মৌসুমীর চোখের পাতা থেকে নেমে এসে স্থির হলো তাঁর ভরাট, রক্তিম ঠোঁটের ওপর। “আমি আপনার স্টারডমের ভক্ত নই ম্যাম,” ইহান ফিসফিস করে বলল, “আমি আপনার এই পরিণত রূপ, এই রাজকীয় উপস্থিতি আর আপনার এই সুপ্ত নারীত্বের অন্ধ পূজারী।” কথাগুলো কি নিছকই কোনো দক্ষ চিত্রনাট্যের সংলাপ? নাকি বিভ্রান্ত তরুণের হৃদয়ের রক্তক্ষরণ? মৌসুমী জানেন না। এবং এই পরম মুহূর্তে তিনি তা জানতেও চান না। তিনি শুধু এই মায়াবী বিষের প্রতিটি ফোঁটা তৃষ্ণার্তের মতো পান করতে চান। তিনি এক মুহূর্তের জন্য ভুলে যেতে চান যে তিনি এই সমাজের চোখে একজন প্রবীণ মহাতারকা, তিনি ভুলে যেতে চান যে তিনি এক পূর্ণবয়স্ক সন্তানের জননী। তিনি শুধু সেই আদিম নারী হতে চান—যে একজন তরতাজা, সুদর্শন পুরুষের চোখে দেবীর মতো আকাঙ্ক্ষিত ও পূজিত হয়ে বেঁচে আছে। কিন্তু প্রতিটি নিষিদ্ধ সুখের পেছনেই ওত পেতে থাকে এক বিষাক্ত কালো ছায়া। মৌসুমীর সেই ছায়াটি ছিল তাঁর নিজস্ব বিবেক আর নীতিবোধের দংশন। রাতে যখন তিনি নিজের সুরম্য প্রাসাদে ফিরে আসতেন, তখন এক ভয়াল অপরাধবোধ তাঁকে চারপাশ থেকে অজগরের মতো পেঁচিয়ে ধরত। ডিনার টেবিলে বসে ওমর সানি যখন তাঁর রেস্তোরাঁর লাভ-ক্ষতি, নতুন জমি কেনা বা রাজনৈতিক বন্ধুদের গল্প করতেন, মৌসুমী তখন প্লেটের দিকে তাকিয়ে রোবটের মতো চামচ নাড়তেন। স্বামীর মুখের দিকে তাকালে তাঁর নিজের আত্মাকে একজন জঘন্য বিশ্বাসঘাতক, এক কলঙ্কিত চরিত্র বলে মনে হতো। অথচ পরক্ষণেই তাঁর বিদ্রোহী মন চিৎকার করে উঠত—“কেন? এই মানুষটা কি গত পনেরো বছরে একবারও আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলেছে—‘মৌসুমী, তোমাকে আজও পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর নারী মনে হয়’? তিনি কি একবারও আমার এই নিঃসঙ্গ আত্মার খবর নিয়েছেন? তবে কেন আমি এক ফোঁটা জীবন্ত অনুভূতির জন্য অপরাধবোধে দগ্ধ হব?” তিন ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়। ঢাকার আকাশ আজ সকাল থেকেই কুয়াশা আর মেঘের চাদরে ঢাকা। মৌসুমীর মনটা আজ সকাল থেকেই এক অদ্ভুত বিষাদ আর গ্লানিতে ভারী হয়ে ছিল। কারণটা ঘটেছিল আগের রাতে। ফেসবুক স্ক্রল করতে গিয়ে তিনি হঠাৎ দেখতে পান তাঁর একমাত্র মেয়ে ফাইজা একটি নতুন ছবি পোস্ট করেছে। ছবিতে ফাইজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে তার ইউনিভার্সিটির সহপাঠী এক তরুণ—যার সাথে ফাইজা প্রেম করছে। ছেলেটি দেখতে অসম্ভব স্মার্ট, বয়স হয়তো তেইশ বা চব্বিশ বছর। সেই ছবিটার দিকে তাকিয়ে মৌসুমীর বুকের ভেতরটা যেন বরফ হয়ে গিয়েছিল। তাঁর মেয়ের প্রেমিকের বয়স চব্বিশ... আর ইহানের বয়স একুশ! হিসাবটা মাথার ভেতর আসতেই মৌসুমীর হাত থেকে মোবাইলটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। এক অসীম লজ্জা আর মানসিক চাবুকের ঘা তাঁর স্নায়ুতে এসে আছড়ে পড়ল। আজ দুপুরেই ইহান মেসেজ দিয়েছিল। সে দেখা করতে চেয়েছে। বলেছে, তার কাছে মৌসুমীর জন্য একটা অত্যন্ত বিশেষ ও ব্যক্তিগত জিনিস আছে, যা সে নিজের হাতে তুলে দিতে চায়। মৌসুমী সকালে শক্ত মনে ঠিক করেছিলেন তিনি যাবেন না। তিনি স্পষ্ট ‘না’ লিখে টেক্সট করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বিকেলে যখন ইহানের একটি মাত্র আকুতিভরা ছোট মেসেজ এল—“ম্যাম, প্লিজ... শুধু আধা ঘণ্টার জন্য। আমি অপেক্ষা করব”—তখন মৌসুমীর সমস্ত নীতিবোধ আর বয়সের অহংকার বালির বাঁধের মতো ভেঙে পড়ল। বিকেল ঠিক সোয়া পাঁচটায় তারা বনানীর এক নিভৃত, আন্ডারগ্রাউন্ড বুক ক্যাফেতে দেখা করল। ক্যাফেটি আধুনিক কায়দায় সাজানো হলেও এর আলো-আঁধারি পরিবেশ বেশ চমৎকার। মেহগনি কাঠের তাকে সাজানো হাজার হাজার পুরোনো বই, কফির কড়া সুবাস আর ব্যাকগ্রাউন্ডে খুব মৃদু লয়ে বাজছে জ্যাজ মিউজিক। কোলাহল থেকে বাঁচতে তারা একদম পেছনের দিকের একটা প্রাইভেট বুথ বেছে নিল। ইহান আজ পরেছে একটি নিখুঁত সাদা রঙের লিনেন শার্ট। শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো, যার ফলে তার ফর্সা ও পেশিবহুল হাত দৃশ্যমান। গলায় খোলা দুটো বোতাম। তাকে দেখাচ্ছিল কোনো গ্রিক পুরাণের তরুণ দেবতার মতো—একাধারে পবিত্র অথচ তীব্রভাবে প্রলুব্ধকর। আর মৌসুমী আজ নিজেকে সযত্নে ঢেকে এনেছেন একটি গাঢ় নীল রঙের কাশ্মীরি সিল্কের সালোয়ার-কামিজে। তাঁর ভরাট বক্ষযুগল ও কোমরকে ঢেকে রেখেছে একটি চওড়া ওড়না। চোখে হালকা সুরমা, ঠোঁটে ন্যুড লিপস্টিক। টেবিলে ধোঁয়া ওঠা দুটি ক্যাপুচিনো দিয়ে গেল ওয়েটার। দুজনেই কিছুক্ষণ নীরব রইলেন। কফির কাপ থেকে ওঠা বাষ্প তাদের দুজনের চোখের মাঝখানে এক মায়াবী পর্দা তৈরি করছিল। “ম্যাম, আপনাকে আজ খুব গম্ভীর আর চিন্তিত দেখাচ্ছে,” ইহান নিচু স্বরে বলল। তার গলার স্বর ক্যাফের মৃদু মিউজিকের সাথে মিশে এক অদ্ভুত মাদকতা তৈরি করছিল। মৌসুমী এক চিলতে ম্লান হাসলেন। কফির কাপে আঙুল ঘষতে ঘষতে বললেন, “কিছু না ইহান। বয়স হচ্ছে তো... মাঝে মাঝে মন আর শরীর কোনোটারই ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকে না।” ইহান টেবিলের ওপর দিয়ে তার ডান হাতটি ধীরে ধীরে এগিয়ে দিল। কিন্তু সে মৌসুমীর হাত স্পর্শ করল না। সে তার হাতের তালুটি মৌসুমীর ফরসা, নিটোল হাতের ঠিক এক সেন্টিমিটার দূরত্বে এনে স্থির করে রাখল। এই যে স্পর্শ না করেও স্পর্শের চরম অনুভূতি তৈরি করা—ইহানের এই শারীরিক দূরত্বের খেলাটা মৌসুমীর রক্তে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। তিনি অনুভব করতে পারছিলেন ইহানের হাতের তালু থেকে নির্গত হওয়া তীব্র জৈবিক উত্তাপ। “বয়স তো স্রেফ একটা পার্থিব সংখ্যামাত্র, ম্যাম,” ইহান এক দৃষ্টিতে তাঁর চোখের দিকে চেয়ে বলল। “আপনি যদি নিজেকে সমাজ আর বয়সের বেড়াজালে বন্দি ভাবেন, তবেই আপনি বন্দি। আমার চোখে আপনি আজও সেই ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’-এর অনন্যা রেশমি, আপনিই আমার চিরন্তন স্বপ্ন।” মৌসুমী এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ নামিয়ে নিলেন। “সিনেমার কাল্পনিক সংলাপ দিও না ইহান। বাস্তব জীবন সিনেমার চেয়ে অনেক বেশি নিষ্ঠুর আর নির্মম।” ইহান কোনো কথা বলল না। সে ধীরে ধীরে নিজের চামড়ার সাইড ব্যাগ থেকে একটি নিখুঁতভাবে মোড়ানো উপহার বের করল। গাঢ় খয়েরি রঙের ভেলভেট পেপারে মোড়ানো মাঝারি সাইজের একটি প্যাকেট। সে প্যাকেটটি টেবিলের ওপর মৌসুমীর হাতের সামনে রাখল। “আপনার জন্য একটা অতি ক্ষুদ্র উপহার এনেছি ম্যাম,” ইহানের চোখেমুখে এক ধরনের অদ্ভুত লাজুকতা ও গভীর অনুভূতি খেলে গেল। “আমি জানি আপনি আপনার জীবনে কোটি টাকার হিরে, সোনা আর বিলাসবহুল উপহার পেয়েছেন। আমার মতো একজন সাধারণ ছাত্রের পক্ষে হয়তো সেসব দেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু এটা আমার সাধ্যের মধ্যে কেনা আমার হৃদয়ের সবচেয়ে দামি জিনিস।” মৌসুমী অবাক চোখে প্যাকেটের দিকে তাকালেন। “কী এটা ইহান?” “খুলে দেখুন।” মৌসুমীর আঙুল কাঁপছিল। তিনি অতি সন্তর্পণে খয়েরি কাগজের মোড়কটি খুললেন। ভেতর থেকে বেরিয়ে এল একটি ক্লাসিক বাঁধাই করা হার্ডকভার বই। বইটির নাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শেষের কবিতা’ নয়, কিংবা কোনো চটুল রোমান্টিক আধুনিক উপন্যাসও নয়।  কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের এক অত্যন্ত মনস্তাত্ত্বিক ও বেদনাবিধুর কালজয়ী উপন্যাস—‘বাদল দিনের দ্বিতীয় কদম ফুল’। মৌসুমী বইটির প্রচ্ছদ দেখে থমকে গেলেন। একজন বিদুষী নারী হিসেবে তিনি এই উপন্যাসের মূল ভাববস্তু খুব ভালো করেই জানেন। এটি এক অসম বয়সী প্রেম, এক প্রবীণ পরিপক্ক নারীর প্রতি এক তরুণের গভীর মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন এবং নিষিদ্ধ ভালোবাসার এক নিঃশব্দ হাহাকারের গল্প! মৌসুমী অত্যন্ত ধীরহাতে বইটির প্রথম সাদা পাতাটি উল্টালেন। সেখানে পৃষ্ঠাটির একদম মাঝখানে, গাঢ় নীল কালির নিব-কলমে গোটা গোটা আধুনিক ক্যালিগ্রাফিতে কিছু একটা লেখা রয়েছে। মৌসুমী নিজের চশমাটা ঠিক করে লেখাটির ওপর চোখ রাখলেন। সেখানে লেখা: “বৃষ্টির কোনো বয়স নেই, সে যখন অঝোরে ঝরে তখন ভিজে যাওয়া মাটির মাতাল গন্ধটা চিরকাল একই থাকে। অনুভূতিরও কি তবে বয়স থাকা জরুরি?  —চিরকালের জন্য আপনার, ‘রেনাতো’।” লেখাটি পড়া মাত্রই মৌসুমীর শরীরের সমস্ত লোমকূপ একযোগে দাঁড়িয়ে গেল! ‘রেনাতো’! সেই ইতালিয়ান মাস্টারপিস ‘Malèna’ সিনেমার সেই কিশোর প্রেমিক—যে মনিকা বেলুচ্চির রূপের বেদীতে নিজের শৈশব ও যৌবন উৎসর্গ করেছিল! ইহান নিজেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘রেনাতো’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। তার মানে, সে মৌসুমীকে স্রেফ কোনো সিনিয়র অভিনেত্রী বা বন্ধু হিসেবে নয়, বরং রক্তমাংসের সেই চরম কামনাময়ী ও অপার্থিব ‘মেলেনা’ হিসেবেই নিজের মনের সিংহাসনে বসিয়ে পূজা করছে! বইটি দুই হাতে শক্ত করে চেপে ধরে মৌসুমী মুখ তুলে ইহানের দিকে তাকালেন। ইহানের তরুণ চোখে তখন কোনো কপটতা নেই; আছে এক সর্বগ্রাসী, অপ্রতিরোধ্য আত্মসমর্পণ আর ভালোবাসার অবুঝ আর্তি। মৌসুমীর বুকের ভেতর এক প্রলয়ংকরী ঝড় বয়ে যেতে লাগল। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। তিনি কি এই ছেলের চোখে সত্যি এক অপ্রতিরোধ্য প্রেমের দেবী? নাকি এটি ফ্রয়েডীয় মনস্তত্ত্বের সেই জটিল টান—কোনো এক মাতৃসম, অভিজ্ঞ ও ভরাট শরীরের নারীর প্রতি এক তরুণের তীব্র আদিম আকর্ষণ? “ধন্যবাদ ইহান...” মৌসুমীর কন্ঠস্বর কেঁপে উঠল, চোখ দুটো ছলছল করে উঠল। “এটা... এটা আমার জীবনের পাওয়া অন্যতম সেরা এবং সবচেয়ে ভারী উপহার।” ইহান নির্মল হাসল। “আপনার চোখে এই মুগ্ধতাটুকুই আমার জীবনের সেরা প্রাপ্তি, ম্যাম।” সেদিন ক্যাফেতে আর বেশিক্ষণ বসা সম্ভব হলো না। মৌসুমী দ্রুত বিল মিটিয়ে উঠে পড়লেন। তাঁর বুকের ভেতর দম বন্ধ হয়ে আসছিল। ইহানের এত কাছে বসে থাকাটা তাঁর জন্য ক্রমেই বিপজ্জনক হয়ে উঠছিল। তিনি তীব্রভাবে ভয় পাচ্ছিলেন—আর পাঁচটা মিনিট যদি তিনি ওই টেবিলের ওপারে বসে থাকেন, তবে হয়তো সমস্ত সামাজিক শালীনতা ভুলে তিনি ইহানের হাত নিজের বুকে টেনে নেবেন! চার রাত তখন পৌনে বারোটা। গুলশানের এই তিনতলা সুরম্য রাজপ্রাসাদ আজ এক অমানবিক নিস্তব্ধতায় ডুবে আছে। ওমর সানি আজও সিলেটে ব্যবসায়িক কাজে ব্যস্ত। একমাত্র ছেলে ফারদিন তার নিজের আলাদা ফ্ল্যাটে থাকে, আর মেয়ে ফাইজা হয়তো পাশের ঘরে ল্যাপটপে সিনেমা দেখছে কিংবা ঘুমিয়ে পড়েছে। কাজের বুয়ারা নিচতলার কোয়ার্টারে চলে গেছে। মৌসুমী তাঁর মাস্টার বেডরুমে সম্পূর্ণ একা। ঘরের সমস্ত উজ্জ্বল আলো নিভিয়ে দেওয়া হয়েছে। শুধু বেডসাইড টেবিলের ভিক্টোরিয়ান শেডের লালচে ল্যাম্পটি জ্বলছে, যা পুরো ঘরে এক রহস্যময়, আলো-আঁধারি ও আদিম রোমান্টিক আভা ছড়িয়ে রেখেছে। মৌসুমী একটি রকিং ইজিচেয়ারে বসে আছেন। তাঁর কোলের ওপর খোলা রাখা সেই উপহার পাওয়া বই—‘বাদল দিনের দ্বিতীয় কদম ফুল’। তিনি তাঁর সিল্কের ভারী কামিজটি বদলে ফেলেছেন। এখন তাঁর পরনে একটি ঢিলেঢালা, মসৃণ কালো সাটিনের স্লিপার নাইটগাউন। সুগঠিত ও ভরাট ‘Regal Fuller Frame’ (৩৮-৩৬-৪৪ ইঞ্চি) সেই পাতলা সাটিনের আড়ালে এক অনাবিল, মাংসল ও রাজকীয় মহিমায় দৃশ্যমান। খোলা কাঁধ আর গলার ত্বক লালচে ল্যাম্পের আলোয় চকমক করছে। সামনে রাখা বিশাল ড্রয়িং ড্রেসিং টেবিলের ফুল-লেংথ বেলজিয়াম আয়নার দিকে তাকিয়ে মৌসুমী হঠাৎ শিউরে উঠলেন। তিনি এক দৃষ্টিতে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকালেন। “মৌসুমী, তুই এ কী করছিস?”—ভেতরের এক অদৃশ্য সত্তা যেন আয়নার ওপার থেকে তীব্র ব্যঙ্গাত্মক হাসিতে ফেটে পড়ল। “এই যে বইটা তুই পরম মমতায় বুকে জড়িয়ে বসে আছিস, এটা কোনো সাধারণ উপহার নয় রে! এটা হলো এক জ্বলন্ত অঙ্গার, এক সর্বনাশা পাপের পরোয়ানা!” মৌসুমী নিজের কপালে হাত রাখলেন। হিসাবটা আবার তাঁর মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগল। এক নির্মম, নিষ্ঠুর গাণিতিক হিসাব! তাঁর নিজের গর্ভজাত বড় ছেলে—ফারদিন। তার বর্তমান বয়স ২৮ বছর। তাঁর একমাত্র আদরের মেয়ে—ফাইজা। তার বয়স ২২ বছর। আর এই ইহান... যে ছেলেটি তাঁকে ‘রেনাতো’ হয়ে উপহার পাঠায়, তার বয়স মাত্র ২১ বছর! মাথাটা বনবন করে ঘুরে উঠল মৌসুমীর। ইহানের বয়স তাঁর নিজের ছেলের চেয়ে পুরো সাত বছরের ছোট! এমনকি তাঁর ছোট মেয়ের চেয়েও এক বছরের ছোট! তাঁর মেয়ে যে তরুণের সাথে প্রেমের সম্পর্কে জড়াচ্ছে, ইহান সেই ছেলের চেয়েও বয়সে অনুজ! আর এমন এক তরুণের সাথে তিনি—বাংলা চলচ্চিত্রের তিন দশকের সম্রাজ্ঞী, লাখো মানুষের আদর্শ ‘প্রিয়দর্শিনী’ মৌসুমী—লুকিয়ে প্রেম করছেন? ডিজিটাল চ্যাটে কামনার শিহরণ খুঁজছেন? নির্জন গাড়িতে বসে তার হাতের ছোঁয়া পাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠছেন? লজ্জা, ঘৃণা আর আত্মধিক্কারে মৌসুমী নিজের দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফেললেন। “ছিঃ মৌসুমী! ছিঃ! তোর এই চরম অধঃপতন? এক কচি ছেলের চাটুকারিতায় নিজেকে সঁপে দিচ্ছিস? সমাজ যদি এই সত্যের এক বিন্দুও জানতে পারে, তবে তোর ত্রিশ বছরের অর্জিত সম্মান, তোর ‘মৌসুমী ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন’, তোর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার—সবকিছু নর্দমার আবর্জনায় পরিণত হবে! মানুষ তোকে নিয়ে ট্রোল করবে, ছিঃ ছিঃ করে থুতু ফেলবে! বলবে—‘বুড়ো বয়সে ভীমরতি ধরেছে মাগির!’” চোখের পাতা বেয়ে গরম অশ্রু গড়িয়ে পড়ল তাঁর চিবুকে। কিন্তু... কিন্তু হৃদয় কি কোনোদিন সমাজের এই অঙ্ক মেনেছে? মৌসুমী চোখ মুছে বইটি আবার হাতে তুলে নিলেন। তিনি বইটির পাতার ভেতর নিজের মুখ ডুবিয়ে দিলেন। নতুন ছাপা বইয়ের কাগজের গন্ধের সাথে সাথে সেখানে স্পষ্ট মিশে আছে ইহানের শরীরের সেই পাগল করা ওউড আর চন্দনের সুবাস! মৌসুমীর চোখের সামনে ভেসে উঠল বিকেলের সেই ক্যাফের দৃশ্য। ইহানের সেই সাদা শার্টের আড়ালে সুগঠিত পৌরুষ, তার কথা বলার সেই বিনীত অথচ আগ্রাসী ভঙ্গি, তার চোখের সেই তীব্র কামনাকুল মুগ্ধতা—যা মৌসুমীকে এক লহমায় পৃথিবীর সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত নারী বানিয়ে দেয়! মৌসুমী সোফায় মাথা এলিয়ে দিয়ে গভীর শ্বাস নিলেন। তাঁর বুকের ভারী খাঁচাটা সাটিনের কাপড়ের নিচে দ্রুত ওঠানামা করতে লাগল। তিনি ভাবলেন, “কেন? আমার কি এই জীবনে এক ফোঁটা পরম সুখ পাওয়ার অধিকার নেই? গত পঁচিশ বছর ধরে আমি কি শুধু একজন আদর্শ স্ত্রী, একজন নিবেদিতপ্রাণ মা আর একজন দায়িত্বশীল সুপারস্টারের মুখোশ পরেই বেঁচে থাকব? ওমর সানি কবে শেষবার আমার হাত ধরে বলেছিল—‘মৌসুমী, আমি তোমাকে পাগলের মতো ভালোবাসি’? কবে শেষবার সে আমার শরীরের প্রতি এমন তীব্র তৃষ্ণা নিয়ে তাকিয়েছিল? আমার ভেতরের রক্তমাংসের নারী তো মরে যায়নি! আমার দেহ তো কোনো পাথরের স্তূপ নয়!” তিনি বইটি আলতো করে নামিয়ে রাখলেন নিজের মসৃণ উরুর ওপর। ঠিক সেই মুহূর্তে, নিঝুম বেডরুমের নীরবতা ভেঙে সাইড টেবিলের ওপর রাখা আইফোনটি কেঁপে উঠল—‘টুং’। মৌসুমী ধীরহাতে ফোনটি তুলে নিলেন। হোয়াটসঅ্যাপ স্ক্রিনে ইহানের মেসেজ ভেসে উঠেছে: “ম্যাম, নিরাপদে বাড়ি পৌঁছেছেন তো? আপনার ওই নীল শাড়ির মায়া আর আপনার চোখের বিষাদ আজও আমাকে সারা রাত ঘুমাতে দেবে না।” মৌসুমী ফোনটা বুকের কাছে চেপে ধরলেন। তাঁর কাঁপাকাঁপা আঙুলগুলো স্ক্রিনের কীবোর্ডে গিয়েও থেমে গেল। তিনি খুব ভালো করেই জানেন—তিনি এক ভয়াল, অন্ধকার ও ধ্বংসাত্মক চোরাবালির কিনারে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি জানেন, এই নিষিদ্ধ পথের শেষ মাথায় অপেক্ষা করছে এক অতল খাদ—যেখানে পা পিছলে পড়লে তাঁর পরিবার, ক্যারিয়ার আর ব্যক্তিত্বের সবকিছু ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। কিন্তু সেই অতল খাদের নিচে অনন্ত পতনের যে উন্মাদনাময়, অবর্ণনীয় শারীরিক ও মানসিক শিহরণ—তা আজ এক মারাত্মক মাদকের মতো মৌসুমীর পুরো শিরা-উপশিরায় ছড়িয়ে পড়েছে। মৌসুমী ইহানের দেওয়া বইটি পরম তৃষ্ণায় নিজের বুকের নরম খাঁচায় আরও শক্ত করে চেপে ধরলেন। তাঁর চোখের কোণ দিয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রুর ফোঁটাটি গিয়ে পড়ল প্রথম পাতার সেই নীল কালির লেখার ওপর—‘আপনার রেনাতো’। এটা কি চরম পাপের অনুশোচনা, নাকি বহু বছর পর এক নিষিদ্ধ ভালোবাসার পরশ পাওয়ার তীব্র আনন্দের অশ্রু—মৌসুমী নিজেও আর আলাদা করতে পারছেন না। বাংলা চলচ্চিত্রের তিন দশকের সবচেয়ে অভিজ্ঞ ও অপরাজেয় সম্রাজ্ঞী আজ এক আনাড়ি তরুণের সাজানো কামনার স্ক্রিপ্টে সম্পূর্ণ আটকা পড়ে গেছেন। এবং সবচেয়ে ভয়ের কথা হলো—তিনি এই স্ক্রিপ্ট থেকে বের হতে চাইছেন না।
Parent