মরীচিকা ও মোহময়ী - অধ্যায় ৩৯

🔗 Original Chapter Link: https://xossipy.com/thread-72560-post-6230641.html#pid6230641

🕰️ Posted on Wed Jun 03 2026 by ✍️ RockyKabir (Profile)

🏷️ Tags:
📖 2538 words / 12 min read

Parent
(ফ্ল্যাশব্যাক: আগের দিন সকাল) প্ল্যান অনুযায়ী, বিক্রম গতকাল সকালে অত্যন্ত ফুরফুরে মেজাজে কলেজে এসেছিল। সে আশা করেছিল, কলেজে এসে সে একটা ছন্নছাড়া অবস্থা দেখবে।  ভেন্ডাররা কাজ বন্ধ করে চলে গেছে, ডেকোরেশনের অর্ধেক খোলা হয়ে গেছে, স্টেজ ফাঁকা, প্রিন্সিপাল বিদিশাকে চরমভাবে অপমান করেছেন আর বিদিশা নিজের কেবিনে বসে অসহায়ভাবে কাঁদছেন। সে ভেবেছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে সে বিদিশার কেবিনে ঢুকবে এবং স্টুডেন্ট কাউন্সিলের এমার্জেন্সি ফান্ডের কথা বলে তাকে উদ্ধার করবে। কিন্তু, মেইন অডিটোরিয়ামের সামনে পৌঁছোতেই বিক্রমের পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গিয়েছিল। একি ! ভিতরে পূর্ণগতিতে কাজ চলছে। ফ্লোরাল ডেকোরেশনের লোক ফুল সাজাচ্ছে, স্পিকারদের ডায়াস বসানো হচ্ছে, লাইটিংয়ের ফোকাস চেক করা হচ্ছে, লাইটিংয়ের টেকনিশিয়ানরা ট্রাসে লাইট ফিক্স করছে। সবকিছু একটা ওয়েল-অয়েল্ড মেশিনের মতো চলছে। ভেন্ডারদের কেউ চলে তো যায়ইনি, উল্টে ডবল স্পিডে কাজ করছে! বিক্রম হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। কীভাবে সম্ভব? টাকা এল কোত্থেকে? সুব্রত সেন তো ফান্ড আটকে দিয়েছিলেন!  ঠিক সেই সময় পেছন থেকে একটা তার পরিচিত গলা ভেসে এসেছিল। "তুমি এখানে কী করছ, বিক্রম?" বিক্রম চমকে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। বিদিশা গাঙ্গুলি। তার পরনে একটা সুতির শাড়ি, চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। "ম্যাম... মানে... আমি..." সাজানো স্ক্রিপ্ট পুরো ঘেঁটে যাওয়াতে বিক্রমের মতো ধূর্ত ছেলের গলা দিয়েও কথা বেরোতে চাইছিল না। সে তখনও এই ধাক্কাটা সামলে উঠতে পারেনি। "তোমার তো আজ আসার কথা ছিল না। স্পনসরশিপের ফাইন্যান্সিয়াল কাজগুলো তো শেষ", বিদিশা চোখ সরু করে ওর দিকে তাকিয়েছিলেন। তার গলায় একটা সন্দিগ্ধ ভাব। বিক্রম থতমত খেয়ে গিয়েছিল। তার সহজাত কনফিডেন্স এক লহমায় উধাও হয়ে গিয়েছিল। "ম্যা-ম্যাম... আমি... আমি আসলে শুনেছিলাম কাজ নাকি বন্ধ হয়ে গেছে... মানে ফান্ডিংয়ের কোনো ইস্যু হয়েছে... তাই ছুটে এলাম যদি কোনো হেল্প করতে পারি..." বিক্রম তোতলেছিল। বিদিশার চোখদুটো এক সেকেন্ডের জন্য সরু হয়ে গিয়েছিল। "আমি সামলে নিয়েছি," বিদিশা ঠান্ডা গলায় উত্তর দিয়েছিলেন।  "কিন্তু ফান্ডিংয়ের ইস্যু হওয়ার কথা তুমি কীভাবে জানলে? এই ইনফরমেশন তো শুধু আমি, সাহিল আর অ্যাকাউন্টস ডিপার্টমেন্ট ছাড়া আর কেউ জানে না।"  কথাটা বলে ফেলেই বিক্রম বুঝতে পেরেছিল সে একটা বড়সড় ভুল করে ফেলেছে। শিকার করতে এসে তার নিজেরই শিকারে পরিণত হবার মতো অবস্থা। "ম্যাম, আমি আসলে স্টুডেন্ট কাউন্সিলের এক বন্ধুর কাছ থেকে শুনলাম যে অডিটোরিয়ামের কাজ নাকি ফান্ডের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে। তাই... তাই আমি ছুটে এলাম। যদি কোনো হেল্প লাগে..." বিক্রম একটা ডাহা মিথ্যে বলে কোনমতে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছিল আর মনে মনে প্রার্থনা করছিল বিদিশা যেন সেটা বিশ্বাস করে নেন। বিদিশা তার চোখের দিকে কয়েক সেকেন্ড স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন। বিক্রমের মনে হচ্ছিল সেসময় বিদিশার দৃষ্টি যেন ওর মনের ভেতরটা পড়ে নিচ্ছিল। "আই সি," বিদিশা আর কিছু বলেননি। তিনি ফাইলটা হাতে নিয়ে সোজা অডিটোরিয়ামের ভেতরে চলে গিয়েছিলেন। বিদিশা আর কোনো প্রশ্ন করেননি। তিনি ভেবেছিলেন সাহিলই হয়তো বন্ধুদের কাউকে গল্প করেছে কাজ বন্ধ হওয়ার ব্যাপারটা। সুব্রত সেনের বিষয়টা তার মাথা থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু বিক্রম সেখানেই পাথরের মতো দাঁড়িয়ে ছিল। তার মেরুদণ্ড বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গিয়েছিল। সে বুঝতে পেরেছিল, সে একটা বড় বিপদে পড়তে চলেছে। (বর্তমান সময়) পিলারের আড়ালে দাঁড়িয়ে বিক্রম বিদিশার দিকে আড়চোখে তাকাল। দূর থেকে নেভি-ব্লু সিল্কের রাজকীয় ছটায় বিদিশাকে দেখে ওর হাতের মুঠোটা রাগে শক্ত হয়ে উঠল।  কিন্তু, আজকে বিক্রমের রাগের লক্ষ্য বিদিশা নন। সেদিন ওর নিজের সিক্সথ সেন্স একদম সঠিক ছিল, সুব্রত সেন বড্ড বেশি হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল। লোকটার কোনো লং-টার্ম ভিশন বা প্ল্যান ছিল না, স্রেফ সাময়িক আক্রোশ মেটাতে গিয়ে একটা সুইসাইডাল মুভ খেলে বসেছিল।  বিক্রম ঠান্ডা মাথায় হিসেব করে দেখল, যদি সত্যিই ফান্ডের অভাবে সিম্পোজিয়ামটা ভেস্তে যেত, তবে কলেজ ম্যানেজমেন্ট নিশ্চিতভাবেই একটা হাই-লেভেল এনকোয়ারি কমিটি বসাত। আর সেই তদন্ত শুরু হলে, অফিশিয়াল ট্রেইল ধরে সবার আগে ফাঁসতেন খোদ সুব্রত সেন নিজে! সেক্ষেত্রে সুব্রত সেনের চাকরি তো যেতই, সাথে ব্যাকএন্ডের ডিলিংয়ের সূত্র ধরে বিক্রমের ওপরেও টান পড়তো। 'শালা মালটা নিজে তো ফাঁসতই সঙ্গে আমারও বারোটা বাজাতো,' বিক্রম মনে মনে ভাবল।  বিদিশা ইভেন্টটা নামিয়ে দেওয়ায় একদিক থেকে বিক্রম বেঁচে গেছে। এই মুহূর্তে অবশ্য বিদিশা নয়, তার দরকার প্রফেসর সুব্রত সেনকে। সে একবার প্রফেসর সেনের সাথে বোঝাপড়া করতে চায়। দুপুর দুটো। লাইব্রেরি বিল্ডিং, রেফারেন্স সেকশন। অডিটোরিয়ামের জাঁকজমক, মাইক্রোফোনের গমগমে আওয়াজ আর মানুষের কোলাহল থেকে অনেক দূরে, লাইব্রেরি বিল্ডিংয়ের রেফারেন্স সেকশনটা বরাবরের মতোই নীরবতায় ডুবে আছে।  সোনালি রোদ মেহগনি কাঠের বুকশেলফগুলোর ফাঁক দিয়ে এসে লম্বা টেবিলটায় পড়েছে। বাতাসে পুরোনো বইয়ের সেই নিজস্ব চেনা গন্ধ। লাইব্রেরির এই রেফারেন্স সেকশনটা দেখলে মনে হয় এটা যেন একটা আলাদা গ্রহ। জায়গাটা সবসময় নিস্তব্ধতায় ডুবে থাকে।   অয়ন জানলার ধারের নির্দিষ্ট টেবিলটায় বসে আছে। পরনে একটা ধূসর রঙের শার্ট। সমস্ত শরীর ব্যথায় টনটন করলেও, ওর মনটা লাইব্রেরির মতোই শান্ত, নিস্তব্ধ। কোচের কথামতো সে আজ ডাক্তার দেখাতে গিয়েছিল। তার ক্ষতগুলো দেখে ডাক্তারবাবু ভুরু কুঁচকেছিলেন।  "পড়ে গিয়ে তো এরকম চোট লাগার কথা নয়। মাসলে হেমাটোমা হয়েছে। আগামী এক সপ্তাহ কোনরকম ফিজিক্যাল কন্ট্যাক্ট স্পোর্টস নয়। অ্যান্টিবায়োটিক আর পেনকিলার লিখে দিচ্ছি, ঘরে বসে চুপচাপ রেস্ট নেবে।" এমন সময় ওর চিন্তার ব্যাঘাত ঘটিয়ে জুতোর মৃদু শব্দ তুলে ঋতুপর্ণা এসে টেবিলের উল্টোদিকে বসল। আজ তার পরনে একটা হালকা হলুদ রঙের সুতির কুর্তি, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। হাতে মোটা ক্যালকুলাসের বই আর খাতা। বসার সাথে সাথেই তার চোখ চলে গেল অয়নের মুখের দিকে।  ওর ঠোঁটের কাটার দাগ আর গালের কালশিটেগুলো দেখে ঋতুপর্ণার কপালে কয়েক সেকেন্ডের জন্য একটা সূক্ষ্ম ভাঁজ পড়ল আর সঙ্গে সঙ্গে সেটা মিলিয়েও গেল। সে মনে মনে ভাবল, 'বড়লোকের বখে যাওয়া গুন্ডা ছেলে। নিশ্চয়ই কাল রাতে বারে বা রাস্তায় কারোর সাথে বস্তির ছেলেদের মতো মারপিট করে মুখ ফাটিয়ে এসেছে। এরাই ক্যাম্পাসের পরিবেশটা নষ্ট করে।' অয়ন কোথায় কী করে এসেছে, কার সাথে মারপিট করেছে, এতে তার বিন্দুমাত্র কোনো ইন্টারেস্ট নেই। It is none of her business. সে এখানে শুধু মিস্টার দাসের নির্দেশে এসেছে। "অ্যাডভান্সড ক্যালকুলাসের ভলিউম টু-টা বের করো", সে অত্যন্ত নিস্পৃহ গলায় বলল।  কোনো ব্যক্তিগত প্রশ্ন নয়, কোনো কৌতূহল নয়, কোন সিমপ্যাথি নয়। অয়ন ঋতুপর্ণার এই নির্লিপ্ত অ্যাটিটিউড দেখে মনে মনে একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল।  অয়ন চুপচাপ বইটা নিজের দিকে টেনে নিল। "আজকের টপিকটা মাল্টিপল ইন্টিগ্রালস," ঋতুপর্ণা পেন দিয়ে একটা বেশ বড় এবং জটিল ইকুয়েশন খাতায় লিখে দিল।  "এটা সলভ করতে গেলে তোমাকে প্রথমে লিমিটগুলো সেট করতে হবে, তারপর চেইন রুল অ্যাপ্লাই করে..." ঋতুপর্ণা চিরাচরিত নিয়ম মেনে করা পাতা জোড়া একটা সলিউশনের স্টেপস বোঝাতে শুরু করল। অয়ন খাতার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। আজ তার মাথাটা আশ্চর্যরকম ক্লিয়ার। তার ব্রেন কোনররকম ডিস্ট্র্যাকশন ছাড়াই কাজ করছে। ইকুয়েশনের নাম্বারগুলো ওর চোখের সামনে ভাসতে শুরু করল। সে ঋতুপর্ণার কথা শুনল ঠিকই, কিন্তু তার মস্তিষ্ক ওই এক পাতার লম্বা ক্যালকুলেশনের তোয়াক্কা করল না। অয়ন হাত বাড়িয়ে ঋতুপর্ণার হাত থেকে পেনটা নিল। "লিমিটটা চেঞ্জ করার দরকার নেই" অয়ন অত্যন্ত শান্ত গলায় বলল। তারপর সে খাতায় পেন ঠেকিয়ে, চিরাচরিত চেইন রুল বা সাবস্টিটিউশন মেথড সম্পূর্ণ ইগনোর করে, নিজের মাথায় তৈরি করা একটা অদ্ভুত, আউট-অফ-দ্য-বক্স শর্টকাট নিয়মে মাত্র দুটো লাইনে ইকুয়েশনটা নামিয়ে দিল। "হয়ে গেছে", অয়ন পেনটা খাতার ওপর রেখে দিল। ঋতুপর্ণা ভুরু কুঁচকে খাতাটার দিকে তাকাল।  এত তাড়াতাড়ি হয়ে গেল ? ওর প্রথম ভাবনা ছিল, ছেলেটা নির্ঘাত হাবিজাবি কিছু একটা লিখেছে। কিন্তু সে যখন খাতার ওই লাইন দুটোর দিকে ভালো করে নজর দিল, তার চোখদুটো চশমার কাঁচের ভেতর দিয়ে সামান্য বড় বড় হয়ে গেল। তারপর, কপালের ভাঁজটা একটু গভীর হলো। সে নিজের চশমাটা আঙুল দিয়ে একটু ঠেলে উপরে পাঠিয়ে ইকুয়েশনটার দিকে আবার ভাল করে তাকাল। ঋতুপর্ণা মনে মনে ইকুয়েশনটা ট্রেস করতে শুরু করল। ছেলেটা কোনো ফর্মুলা ফলো করেনি, কোনো থিওরেম লেখেনি। সে মাঝখানের একগাদা স্টেপ জাম্প করে, একটা আন-অর্থোডক্স লজিক অ্যাপ্লাই সোজা ফাইনাল অ্যানসারে পৌঁছে গেছে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, অ্যানসারটা ১০০% কারেক্ট! ঋতুপর্ণা একটা জোর ধাক্কা খেল। সে খাতা থেকে একবার চোখ তুলে অয়নের কালশিটে পড়া শান্ত মুখটার দিকে তাকাল। ছেলেটা জানলার বাইরের দিকে এমনভাবে তাকিয়ে আছে, যেন এই অঙ্কটা সলভ করা ওর কাছে জলভাত। 'এই বখাটে ছেলেটার ব্রেন এভাবে কাজ করে?'  ঋতুপর্ণা নিজের কাছে অবাক হয়ে প্রশ্ন করল। কিন্তু, সে নিজের বিস্ময়টা বাইরে এক বিন্দুও প্রকাশ করল না। মুখটা একইরকম সিরিয়াস রেখে বইটা নিজের দিকে আরেকটু টেনে নিল। "মেথডটা স্ট্যান্ডার্ড নয়। এক্সামে এভাবে লিখলে জিরো পাবে।"  যদিও তার চোখ তখনো ওই দুটো লাইনের ওপর আটকে আছে, "বাট... অ্যানসারটা ঠিক আছে। নেক্সট প্রবলেম।" উত্তরে অয়ন কিছু বলল না। সে পরের অঙ্কটার দিকে মনোযোগ দিল। দুপুর দুটো, মেন অডিটোরিয়াম মেন অডিটোরিয়ামের ভেতরে তখন করতালির শব্দে কান পাতা দায়। আইআইটি থেকে আসা একজন গেস্টের ভাষণ সবে শেষ হয়েছে। মঞ্চের একপাশে দাঁড়িয়ে আছেন বিদিশা গাঙ্গুলি, তাঁর মুখে তৃপ্তির হাসি। পুরো অডিটোরিয়াম জুড়ে আনন্দের পরিবেশ। কিন্তু এই আলো ঝলমলে অডিটোরিয়াম থেকে বেশ কিছুটা দূরে, মেইন বিল্ডিংয়ের দোতলার একটা অব্যবহৃত, অন্ধকার ঘরের ভেতরে তখন অন্য কিছু ঘটছে। যাতে বাইরে থেকে হঠাৎ করে কেউ না এসে পরে সেজন্য ঘরের দরজা, জানালা ভেতর থেকে বন্ধ। ভেতরে থমথমে পরিবেশ। অডিটোরিয়ামের করতালির আওয়াজ এখানে আসছে না। ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে বিক্রম মালহোত্রা আর ডক্টর সুব্রত সেন। একটু আগেই ডঃ সেন কলেজে ফিরেছেন আর ফেরার পরে ঠিকঠাক ভাবে সিম্পোজিয়াম অনুষ্ঠিত হতে দেখে তিনি সটকে পড়েছেন। এই ডিসেম্বরেও টেনশনে তার কপাল দিয়ে বিন্দু বিন্দু ঘাম ঝরছে। তিনি বারবার পকেট থেকে একটা রুমাল বের করে নিজের ঘাড় আর মুখের ঘাম মুছছেন।  শিয়াল-পণ্ডিতের মতো চেনা ধূর্ত চাউনিটা তার চোখে সবসময় খেলা করে, সেটা আজ উধাও। তার জায়গায় বাসা বেঁধেছে চরম আতঙ্ক আর বিভ্রান্তি। "কোথা থেকে পেল টাকাটা?" সুব্রত সেনের গলাটা হিসহিস করে উঠল, ঠিক যেন একটা ফাঁদে পড়া ইঁদুর।  "তুমি না বলেছিলে সব রাস্তা বন্ধ? তুমি না বলেছিলে ও তোমার পায়ে এসে পড়বে? তুমি বুঝতে পারছ মালহোত্রা ? কী ডিজাস্টার হয়ে গেল! আজ সকালে যখন আমি কলেজে পা রাখলাম, আমি ভেবেছিলাম একটা ছন্নছাড়া অবস্থা দেখব।  আর এসে কী দেখছি? স্টেজে নীল মখমলের পর্দা ঝুলছে, ডেলিগেটরা ফাইভ-স্টার হোটেল থেকে গাড়িতে করে এসে নামছেন! কাজ এক সেকেন্ডের জন্যও থামেনি! এসবের মানে কী?", তাঁর গলা কাঁপছে। "আমি... আমি বুঝতে পারছি না, স্যার। পেমেন্ট ক্লিয়ার হয়েছে। কিন্তু কীভাবে হলো, সেটা আমি জানি না।" বিক্রম দাঁতে দাঁত চেপে উত্তর দিল। তার গলার স্বরটাও খাদের মতো নিচু। মনে মনে সে বলল, 'সেটা আমি কি করে বলব, প্ল্যানটা তো আপনার ছিল। তখন আমায় জিজ্ঞাসা করে কাজটা করেছিলেন ?' "কীভাবে হলো মানে? টাকাটা এল কোথা থেকে?" সুব্রত সেন প্রায় বিক্রমের কলার চেপে ধরার উপক্রম করলেন।  বিক্রমের মুখটা থমথমে। সে নিজে যথেষ্ট কোণঠাসা অনুভব করছে। "আমি কী করে জানব স্যার? আপনিই তো বললেন আপনি অ্যাকাউন্টস থেকে ফাইল ব্লক করেছেন! হয়তো নিজের পকেট থেকেই টাকা ঢেলেছে, নয়তো ম্যানেজমেন্টের কাউকে ধরে ফান্ড বের করেছে।" "অসম্ভব!" সুব্রত সেন প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন, পরক্ষণেই আবার গলা নামিয়ে ফেললেন। "আমি কাল রাতে অ্যাকাউন্টস হেডকে ফোন করেছিলাম। ফাইল এখনো রিভিউর জন্যই পড়ে আছে। টোটাল আড়াই লাখ টাকার অ্যাডভান্স! ম্যানেজমেন্ট টাকা দেয়নি! তাহলে বিদিশা টাকাটা পেল কোথায়? ওর কি প্রিন্সিপালের সাথে অন্য কোনো আন্ডারস্ট্যান্ডিং আছে?" বিক্রমের চোখের তারা স্থির হয়ে গেল। "আমার তো মনে হয় সাহিল প্রিন্সিপালকে গিয়ে সব বলে দিয়েছে। আর প্রিন্সিপাল স্যার হয়তো ম্যানেজমেন্টের ইমার্জেন্সি ফান্ড থেকে ডিরেক্ট ভেন্ডারদের অ্যাকাউন্টে টাকাটা ট্রান্সফার করে দিয়েছেন।" সুব্রত সেনের মুখটা আক্ষরিক অর্থেই কাগজের মতো সাদা হয়ে গেল। "সর্বনাশ! যদি প্রিন্সিপাল স্যার বা ম্যানেজমেন্ট জেনে যায় যে আমি ইচ্ছাকৃতভাবে একটা ফেক 'টেকনিক্যাল এরর' দেখিয়ে ফান্ড আটকেছিলাম, তাহলে আমার চাকরি তো যাবেই, জালিয়াতির কেসও হতে পারে! মেয়েটা যদি প্রিন্সিপালকে বলে দেয়...", সুব্রত সেন আর কথা শেষ করতে পারলেন না।  বিক্রমের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।  "আমি আপনাকে বলেছিলাম স্যার, ওভারকনফিডেন্ট হবেন না। এখন যদি উনি ম্যানেজমেন্টকে জানিয়ে দেন যে আপনি ইচ্ছাকৃতভাবে ফাইল আটকেছেন, তাহলে আপনার চাকরি নিয়ে টানাটানি পড়বে!" "আমার চাকরি? তুমি আমাকে জ্ঞান দিচ্ছ?" সুব্রত সেন রাগে ফুঁসে উঠলেন।  "পুরো প্ল্যানটা তোমার ছিল! তুমি আমাকে এই নোংরা পলিটিক্সে জড়ালে নিজের ফ্যান্টাসি মেটানোর জন্য! এখন যদি ইনকোয়ারি হয়, আমি কিন্তু একা ডুবব না মালহোত্রা। আমি সব ফাঁস করে দেব!" বিক্রম আর সুব্রতর এই পার্টনারশিপটা একটা নোংরা বোঝাপড়ার উপর দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু আজ যখন প্ল্যানটা ভেস্তে গেছে, তখন দুজনের মধ্যেই অবিশ্বাসের ফাটল ধরতে শুরু করেছে।  বিক্রম বুঝতে পারল, সুব্রত সেন আসলে একটা মেরুদণ্ডহীন লোক। বিপদ এলে সে সব ঘটনার দায় ওর উপর চাপিয়ে দিয়ে নিজে বাঁচার চেষ্টা করবে। সে সুব্রত সেনের কলারটা চেপে ধরার চিন্তাটা বহু কষ্টে দমন করে নিল।  "ভয় দেখাবেন না স্যার। আপনিই ফাইল আটকেছিলেন, আমার কোথাও কোনো সিগনেচার নেই। এখন নিজেকে বাঁচানোর রাস্তা খুঁজুন। আর বিদিশার সামনে একদম নার্ভাসনেস দেখাবেন না।" তারপর কী একটা ভেবে সুব্রতকে ভরসা জোগাল। "আপনি শান্ত হোন, স্যার, প্যানিক করবেন না" বিক্রম অত্যন্ত ঠান্ডা গলায় বলল।  "প্রিন্সিপাল স্যার যদি জানতেনই যে আপনি ইচ্ছাকৃতভাবে ফাইল আটকেছেন, তাহলে আজ আপনাকে সেমিনারের ফার্স্ট রো-তে সম্মানের সাথে বসতে দিতেন না। উনি হয়তো ভেবেছেন সত্যিই কোনো টেকনিক্যাল এরর হয়েছিল। আপনি এখন অডিটোরিয়ামে ফিরে যান।" সুব্রত সেন ঘামে ভেজা রুমালটা পকেটে ঢোকালেন। তার বুকটা ধড়ফড় করছে।  "হ্যাঁ... হ্যাঁ। আমাকে এখন অডিটোরিয়ামে ফিরে যেতে হবে। আমি স্পনসরশিপের দায়িত্বে আছি, আমি না থাকলে সন্দেহ আরও বাড়বে।" সুব্রত সেন পা টেনে টেনে স্টোররুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। বিক্রম অন্ধকারে একা দাঁড়িয়ে রইল।  সুব্রত সেন ঘর থেকে বেরিয়ে গেলে সে পকেট থেকে নিজের আইফোনটা বের করে আনল। স্ক্রিনের সিক্রেট অডিও ডিরেক্টরিটা খুলে সে প্লে-বাটনটা প্রেস করল। স্পিকারটা কানের খুব কাছে ধরতেই সুব্রত সেনের কণ্ঠস্বরটা স্পষ্ট ফিসফিসিয়ে উঠল: "......ম্যানেজমেন্ট টাকা দেয়নি! তাহলে বিদিশা টাকাটা পেল কোথায়? ওর কি প্রিন্সিপালের সাথে অন্য কোনো আন্ডারস্ট্যান্ডিং আছে? ...সর্বনাশ! যদি প্রিন্সিপাল স্যার বা ম্যানেজমেন্ট জেনে যায় যে আমি ইচ্ছাকৃতভাবে একটা ফেক 'টেকনিক্যাল এরর' দেখিয়ে ফান্ড আটকেছিলাম, তাহলে আমার চাকরি তো যাবেই, জালিয়াতির কেসও হতে পারে! মেয়েটা যদি প্রিন্সিপালকে বলে দেয়..." বিক্রম মুচকি হাসল। "গান্ডু ! ভেবেছিলি সব দায় বিক্রম মালহোত্রার ঘাড়ে চাপিয়ে নিজে সাধু সাজবি?"  এই চালটা ভেস্তে গেলেও ওর একটা মস্ত বড় লাভ হয়ে গেল। ম্যাথ ডিপার্টমেন্টের এই সিনিয়র প্রফেসর এখন থেকে ওর হাতের পুতুল। এই অডিও ক্লিপটার একটা কপি ডক্টর বাগচী বা প্রিন্সিপালের টেবিলে পৌঁছানো মানেই সুব্রত সেনের পুরো কেরিয়ার ধ্বংস হয়ে যাবে। এখন থেকে এই মেরুদণ্ডহীন জীবটাকে ব্ল্যাকমেইল করে বিদিশার প্রতিটা পদক্ষেপের ওপর নজর রাখা বিক্রমের জন্য জলভাত হয়ে গেল। ম্যাথ ডিপার্টমেন্টের খবরাখবর পেতে ওর আর অসুবিধা হবে না। মালহোত্রারা কখনো খালি হাতে ময়দান ছাড়ে না। কিন্তু... রেকর্ডারটা বন্ধ করে ফোনটা পকেটে রাখতে রাখতে ওর ভুরুটা কুঁচকে গেল। তার চোখের মণি দুটো ছোট হয়ে এল। এই রাহুল বোস আজকাল বিদিশার বড্ড বেশি কাছাকাছি ঘোরাফেরা করছে না? ফেস্টের রাতেও রাহুল বোস বিদিশার দিকে ক্ষুধার্ত চোখে তাকিয়ে ছিল। তারও আগে, যেদিন বিক্রম প্রথমবার টিচার্স লাউঞ্জে বিদিশাকে ইমপ্রেস করতে গেছিল, সেদিনও এই রাহুল বোস ওর আর বিদিশার মাঝখানে কাবাব মে হাড্ডি হয়ে বসে ছিল। আজ দুপুরেও শালা বিদিশার সাথে এমনভাবে হেসে হেসে গল্প করছিল, যেন কতকালের চেনা ইয়ার-দোস্ত! বিক্রমের চোখে বিদিশার শরীরের প্রতিটা ইঞ্চি তার ভোগের জন্য নির্দিষ্ট। সেখানে অন্য কোনো পুরুষ এসে ভাগ বসাবে এটা সে কোনোদিন মেনে নেবে না।  বিদিশার সাথে রাহুলের সম্পর্ক কতদূর এগিয়েছে সে বিষয়ে এবার থেকে ওকে তীক্ষ্ণ নজর রাখতে হবে। (বর্তমান সময়: সেমিনার হল) উদ্বোধনী পর্ব শেষ হওয়ার পর টি-ব্রেক চলছে। প্রিন্সিপাল সান্যাল একটু আগে সবার সামনে আবার বিদিশার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। সবাই তার তারিফ করেছে।  এমন সময় ডক্টর বাগচী, ম্যাথমেটিক্স ডিপার্টমেন্টের এইচওডি, হাতে একটা কফির কাপ নিয়ে বিদিশার দিকে এগিয়ে এলেন। তার মুখে একটা চওড়া হাসি। "ফ্যান্টাস্টিক জব, মিস গাঙ্গুলি! এত বড় একটা ইভেন্ট, এতগুলো ডেলিগেট, কিন্তু কোথাও কোনো বিশৃঙ্খলা নেই। সবকিছু একদম ঘড়ির কাঁটার মতো চলছে। অসাধারণ অর্গানাইজেশন।" ড. বাগচী অত্যন্ত আন্তরিক গলায় বললেন। "আই অ্যাম রিয়েলি প্রাউড অফ ইউ। আমি জানতাম আপনি পারবেন।" বিদিশা হাতের ফাইলটা নামিয়ে রেখে ড. বাগচীর দিকে তাকালেন। তার শান্ত মুখে একটা মাপা হাসি। কিন্তু তার দৃষ্টিটা ডঃ বাগচীর মতো উষ্ণ নয়। বিদিশা মনে মনে ভাবলেন, 'কী দারুণ অভিনেতা এই লোকটা! কাল আমার সব ফান্ডিং আটকে দিয়ে, আমাকে সবার সামনে অপদস্থ করার সব বন্দোবস্ত করে, আজ কেমন সাধু সেজে অভিনন্দন জানাচ্ছে!'  বিদিশার বদ্ধমূল ধারণা, প্রভাবশালী স্টুডেন্টদের ফেল করানোর কারণেই ডক্টর বাগচী আর ম্যানেজমেন্ট মিলে তার বিরুদ্ধে এই নোংরা খেলাটা খেললো। "থ্যাংক ইউ, স্যার, আপনাদের সাপোর্ট ছাড়া এটা সম্ভব হতো না।"  বিদিশা বিনীতভাবে উত্তর দিলেও কথাটার আড়ালে ব্যঙ্গ লুকিয়ে ছিল। তিনি ভেবেছিলেন এই গোটা প্ল্যানটা আসলে ডঃ বাগচীর মাথা থেকে বেরিয়েছে। কিন্তু, পুরো কথাটা ড. বাগচীর মাথার উপর দিয়ে গেল, যদিও তিনি সেটা প্রকাশ করলেন না। শুধু হাসিমুখে মাথা নাড়লেন। "অ্যাবসোলিউটলি। এনজয় দ্য সাকসেস, মিস গাঙ্গুলি", বলে তিনি অন্য ডেলিগেটদের দিকে এগিয়ে গেলেন। খানিক দূরে দাঁড়িয়ে এই পুরো দৃশ্যটা দেখছিলেন সুব্রত সেন। এসির মধ্যেও তার কপালে ঘাম জমছে। তিনি বারবার আড়চোখে ওদিকে দিকে তাকাচ্ছেন এটা বোঝার জন্য যে বিদিশা ফান্ডিংয়ের ব্যাপারটা ড. বাগচীকে জানিয়ে দিচ্ছেন কি না। তার বুকটা ধড়ফড় করছে।  কিন্তু, একইসঙ্গে বিদিশাকে দেখে তার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে। তিনি চেষ্টা করছেন যাতে কোনোভাবেই বিদিশার সাথে সরাসরি তার চোখ না মেলে। কেউ তাকে কিছু বললে তিনি জোর করে হেসে উত্তর দিচ্ছেন। তিনি এখন অডিটোরিয়াম থেকে পালাতে পারলে বাঁচেন।
Parent