মরীচিকা ও মোহময়ী - অধ্যায় ৭৭
প্রথমেই দেরির জন্য দুঃখপ্রকাশ করছি। আমার গত সপ্তাহেই একটা সিন বাদে পুরো চ্যাপ্টারটা লেখা হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু, পুজোর ব্যস্ততার চোটে এখন আমার কোনদিকে তাকানোর সময় নেই। কোনরকমে অরুণের সিনটা লিখলাম। আবার পুজোর পরে দেখা হবে।
অধ্যায় ২৮
১
স্বপ্নটা শুরু হয়েছিল একটা দমবন্ধ করা, জমাট বাঁধা অন্ধকারের ভেতর দিয়ে। অয়ন প্রথমে বুঝে উঠতে পারছিল না সে কোথায় আছে। চারপাশের বাতাসটা ভীষণ ভারী, নিঃশ্বাসের সাথে সাথে ফুসফুসে বাতাসটা ঢোকার সাথেই তাতে সে একটা পুরোনো স্যাঁতসেঁতে গন্ধ পাচ্ছিল।
সে হাত-পা নাড়ার চেষ্টা করল, কিন্তু তার মনে হলো তার পুরো শরীরটাকে কেউ যেন অদৃশ্য কোন শিকল দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে।
এমন সময় হঠাৎ করে অন্ধকারটা একটা ধূসর, ধোঁয়াটে আলোয় বদলে গেল। সেই আলোয় অয়ন দেখল, সে একটা লম্বা করিডোরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। করিডোরের মেঝেটা কালো আর সাদা চেক কাটা, ঠিক দাবার বোর্ডের মতো। কিন্তু করিডরের মেঝের ওপরে গোড়ালি অবধি জল জমে আছে। তার পায়ের গোড়ালি অবধি সেই কনকনে ঠান্ডা জলে ডুবে আছে।
করিডোরের একদম শেষে একটা বিশাল, পুরোনো দরজা। দরজাটা আধখোলা, ঘরের ভেতর থেকে একটা ম্লান, হলুদ রঙের আলো বেরিয়ে আসছে।
অয়নের অবচেতন মন তাকে চিৎকার করে বললো ওই দরজাটার দিকে না এগোতে। কিন্তু তার শরীর নিজের নিয়ন্ত্রণে ছিল না। তার পা দুটো আপনা আপনি, অদৃশ্য সুতোর টানে ওই দরজার দিকে এগোতে শুরু করল। জমাট বাঁধা ঠান্ডা জলে তার প্রতিটা পদক্ষেপে 'ছলাৎ... ছলাৎ' শব্দ হতে লাগল। ফাঁকা করিডোরে সেই শব্দটার প্রতিধ্বনি বেশ জোরে উঠে আসতে লাগল।
দরজার কাছাকাছি পৌঁছোতেই অয়ন ঘরের ভেতরকার দৃশ্যটা দেখতে পেল। ঘরের মধ্যে
একটা বিশাল ডাইনিং টেবিল। টেবিলটা এতটাই লম্বা যে তার শেষ প্রান্তটা দেখা যাচ্ছে না।
টেবিলের চারপাশের সবকটা চেয়ার ফাঁকা। শুধু কুয়াশার ঠিক আগে, একটা ছায়ামূর্তি বসে আছে।
তার মা। বিদিশা।
বিদিশার পরনে সেই মেরুন রঙের কাঞ্জিভরমটা যেটা তিনি ফেস্টের রাতে পড়েছিলেন, মাথার চুলগুলো নিখুঁতভাবে বাঁধা, সাথে জুঁইফুলের গজরা। কিন্তু তার মুখটা অয়নের দিকে নেই। তিনি সম্পূর্ণ উল্টোদিকে ঘুরে বসে আছেন।
"মা..."
তাকে দেখে অয়নের গলা দিয়ে একটা অস্ফুট, ভাঙা স্বর বেরিয়ে এল।
কিন্তু সেটা বিদিশা হয় শুনতে পেলেন না অথবা শুনতে পেয়েও না শোনার ভান করলেন। অয়নের মনে হল তার বুকের ভেতরটা কেউ যেন একটা ধারালো কিছু দিয়ে চিরে দিল।
"মা, একবার তাকাও..."
অয়ন আবার ডাকল। এবার তার গলায় একটা অসহায় আর্তি।
ঠিক সেই মুহূর্তে ডাইনিং রুমের নিস্তব্ধতা খানখান করে দিয়ে একটা তীক্ষ্ণ, শয়তানি হাসি চারপাশ থেকে প্রতিধ্বনিত হতে শুরু করল। অয়নের মনে হতে লাগল যে, হাসিটা দেয়াল ভেদ করে, ছাদ থেকে, এমনকি পায়ের তলার ঠান্ডা জল থেকেও উঠে আসছে।
গলাটা বিক্রম মালহোত্রার। কিন্তু ঘরে বিক্রম কোথাও নেই।
"তুই একটা জোক, অয়ন! আ কমপ্লিট ফাকিং জোক!"
বিক্রমের গলাটা সাপের হিসহিসানির মতো ওর কানের কাছে বেজে উঠল।
অয়ন দু'হাত দিয়ে নিজের কান চেপে ধরল। তার মনে হচ্ছিল তার মাথার শিরাগুলো ফেটে যাবে। সে ডাইনিং টেবিলের দিকে এক পা এগোতে চাইল মায়ের কাছে যাওয়ার জন্য, কিন্তু পারল না। তার পায়ের তলার গোড়ালি সমান জলটা চোখের নিমেষে বাড়তে বাড়তে তার হাঁটু, তারপর কোমর, তারপর বুক অবধি উঠে এল।
জলটা এত ঠান্ডা যে অয়নের শরীরের প্রতিটা পেশি আড়ষ্ট হয়ে গেল। সে চিৎকার করার জন্য মুখ খুলল, কিন্তু গলা দিয়ে কোনো আওয়াজ বেরোল না, উল্টে এক গাল বরফগলা জল তার গলায় ঢুকে গেল। তার দমবন্ধ হয়ে আসছে। ফুসফুসটা যেন বাতাসের অভাবে ফেটে যেতে চাইছে। সে হাত-পা ছুঁড়ে বাঁচার চেষ্টা করছে, কিন্তু ঠান্ডা জলটা ক্রমশ তাকে নিচের দিকে অতল অন্ধকারের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
সব শেষ। বাঁচার আর কোনো উপায় নেই। অয়ন হাল ছেড়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল।
ঠিক সেই মুহূর্তে, যখন তার ফুসফুসের শেষ অক্সিজেনটুকুও ফুরিয়ে এসেছে, যখন তার চেতনা প্রায় বিলুপ্তির পথে, তখন সে অন্ধকারে একটা স্পর্শ অনুভব করল।
একটা হাত।
অত্যন্ত নরম, কিন্তু অসম্ভব দৃঢ় একটা হাত তার ডান হাতের কব্জিটা শক্ত করে চেপে ধরল।
সেই হাতের স্পর্শের উষ্ণ ভাব জলের ওই হাড়-কাঁপানো ঠান্ডার সম্পূর্ণ বিপরীত। সেই উষ্ণতা হাতটা থেকে জলে ডুবন্ত অয়নের গোটা শরীরে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল। সেই উষ্ণতাটা ইলেকট্রিক শকের মতো অয়নের আড়ষ্ট স্নায়ুগুলোকে জাগিয়ে তুলল।
অয়ন অন্ধকারের মধ্যেই চোখ খোলার চেষ্টা করল। জলের ভেতরে সবটাই ঝাপসা, কিন্তু সে বুঝতে পারল তাকে যে হাতটা ধরে আছে, সেটা কোন পুরুষের নয়। একজন নারীর হাত।
হাতটা তাকে প্রবল শক্তিতে ওপরের দিকে টানতে শুরু করল। অয়নের শরীরটা যেন কোনো এক জাদুবলে হালকা হয়ে গেল। সে ক্রমশ ওই অন্ধকার থেকে ওপরের দিকে উঠতে শুরু করল।
ওপরে ওঠার সাথে সাথে অয়ন একটা অদ্ভুত সুবাস অনুভব করল। সেই স্যাঁতসেঁতে গন্ধটাকে ছাপিয়ে একটা তীব্র মোহময়ী সুবাস তার ইন্দ্রিয়গুলোকে আচ্ছন্ন করে ফেলল।
গন্ধটা জুঁইফুলের মতো মিষ্টি নয়, আবার চন্দনের মতো স্নিগ্ধও নয়। বরং গন্ধটা বুনো, উত্তেজক।
তাকে যে নারী মূর্তিটি ওপরের দিকে টেনে তুলছে, তার মুখটা অয়ন দেখতে পাচ্ছে না। অন্ধকার জলের ভেতর থেকে উপরে তার অবয়বটা
একটা রহস্যময় ছায়ার মতো মনে হচ্ছে। কিন্তু তার স্পর্শের উত্তাপ ক্রমশ বাড়ছে।
এমন সময় হঠাৎই জলের নিচে নারী মূর্তির শরীরটা অয়নের শরীরের খুব কাছাকাছি এসে পড়ল। অয়ন জলের মধ্য দিয়েই একটা ছিপছিপে, অথচ সুডৌল নারী শরীরের অস্তিত্ব অনুভব করতে পারল। তার নগ্ন উরুর সাথে অয়নের পায়ের একটা আলতো ঘর্ষণ হলো। নারী মূর্তির একটা হাত অয়নের বুকের ওপর এসে স্থির হলো। তার লম্বা, নিখুঁত নখগুলো অয়নের শার্টহীন বুকের পেশির ওপর দিয়ে খুব ধীর, কামুক ভঙ্গিতে একটা রেখা টেনে দিল। অন্য হাতের উষ্ণ, নরম আঙুলগুলো অয়নের ঘাড়ের কাছে, তার পেশিবহুল কাঁধের ওপর খেলা করতে লাগল।
সেই স্পর্শে অয়নের মেরুদণ্ড দিয়ে একটা তীব্র স্রোত নেমে গেল। তার শরীরের জমাট বাঁধা ঠান্ডাটা কোথায় যেন উধাও হয়ে গেল। বুকের ভেতরে একটা আদিম আকাঙ্ক্ষা হঠাৎ করেই জেগে উঠল। সে তার ডুবন্ত, অসহায় অবস্থা ভুলে গিয়ে দু'হাত বাড়িয়ে ওই রহস্যময়ী নারী শরীরটাকে নিজের কাছে টেনে নিতে চাইল।
নারী মূর্তিটা ওর আরও কাছাকাছি এগিয়ে এল। তার মুখটা অয়নের কানের একদম কাছে। তার গরম, ভেজা নিশ্বাসটা অয়নের ঘাড়ের কাছে এসে পড়ল। জলের নিস্তব্ধতার মধ্যে থেকে ফিসফিস করে একটা ভীষণ চেনা, হাস্কি গলার স্বর অয়নের কানের পর্দায় আছড়ে পড়ল।
"ওয়েক আপ, অয়ন..."
২
অয়ন চোখ খুলল।
সাঁৎ করে একটা দমকা হাওয়া যেন তার বুকের ভেতর ঢুকে পড়ল। অয়ন একটা দীর্ঘ, খাবি খাওয়ার মতো শব্দ করে ধড়মড় করে বিছানার ওপর উঠে বসল।
তার চোখদুটো বিস্ময়ে আর আতঙ্কে বিস্ফারিত। বুকের বাঁ দিকটায় হৃদপিণ্ডটা যেন পাগলের মতো আছড়ে পড়ছে,
ধুকপুক! ধুকপুক! ধুকপুক! ধুকপুক!
সে কয়েক সেকেন্ডের জন্য বুঝে উঠতে পারল না সে এখন কোথায় আছে। তার চোখের সামনে এখনও সেই অন্ধকার জল আর ওই রহস্যময়ী নারীর অবয়বটা ভাসছে। তার ঘাড়ের কাছে যেন এখনও সেই উষ্ণ নিশ্বাসের স্পর্শ লেগে আছে।
অয়ন দু'হাত দিয়ে নিজের বিছানার চাদরটা শক্ত করে চেপে ধরল। খসখস করে আওয়াজ হলো। চাদরের চেনা, রুক্ষ টেক্সচারটা তার হাতের তালুতে লাগতেই সে ধীরে ধীরে বাস্তবে ফিরে আসতে শুরু করল।
সাউথ ব্লক বয়েজ ডর্ম। তিনতলার কর্নারের ঘরটা। তার নিজের ঘর।
একত্রিশে ডিসেম্বরের ভোর। ঘড়িতে এখনও বোধহয় পাঁচটা বাজেনি। ঘরের ভেতরটা নীলচে-ধূসর, ম্লান আলোয় ডুবে আছে। জানলার পর্দাটা সামান্য খোলা, সেখান দিয়ে কনকনে উত্তুরে ঠান্ডা হাওয়া ঘরের ভেতর ঢুকছে। জানলার পাল্লাটা হাওয়ার ধাক্কায় মাঝে মাঝে মৃদু 'খট-খট' শব্দ করছে।
এই হাড়-কাঁপানো ঠান্ডার ভোরবেলাতেও অয়নের পুরো শরীর ঘামে ভিজে জবজবে হয়ে আছে। তার পরনের টি-শার্টটা ঘামে ভিজে বুকের সাথে লেপ্টে আছে। কপালের দুই পাশ দিয়ে ঘামের ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে। সে ডান হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে কপালের ঘামটা মুছল।
অয়ন চোখ বন্ধ করে কয়েকবার গভীর, লম্বা শ্বাস নিল। তার বুকের ওঠা-নামাটা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করল।
সে চোখ খুলল। ডর্মের ঘরটা বরাবরের মতোই নিস্তব্ধ। পাশের বেডটা খালি। ওর রুমমেট অর্ধেক দিন রুমে থাকে না। ভালোই হয়েছে। এই মুহূর্তে ওর এই বিপর্যস্ত অবস্থাটা কারোর চোখের সামনে না পড়াই ভালো।
অয়ন বিছানা থেকে পা নামিয়ে ঠান্ডা মেঝের ওপর রাখল। স্লিপারটা পরল না। মেঝের কনকনে ঠান্ডা স্পর্শটা তার এখন দরকার।
সে ধীর পায়ে হেঁটে জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
বাইরে ভোরের আলো ফোটেনি। পুরো ক্যাম্পাস চত্বরটা ঘন, সাদা কুয়াশার চাদরে মোড়া। ঘন কুয়াশার মধ্যে কিছুটা দূরে অবস্থিত বাস্কেটবল কোর্টটা দেখা যাচ্ছে। একটু দূরের গাছগুলোকে কালো, অস্পষ্ট ছায়ার মতো দেখাচ্ছে। চারদিক এমন নিস্তব্ধ যে, বহুদূরের হাইওয়ে দিয়ে চলে যাওয়া একটা ট্রাকের ইঞ্জিনের গোঙানিও খুব স্পষ্টভাবে অয়নের কানে এসে পৌঁছোল।
অয়ন জানলার গ্রিলটা শক্ত করে ধরল। লোহার গ্রিলটা বরফের মতো ঠান্ডা।
একটু আগে দেখা সেই স্বপ্নের প্রতিটা ডিটেইল, প্রতিটা অনুভূতি তার মস্তিষ্কে একদম ফ্রেম-বাই-ফ্রেম গাঁথা হয়ে আছে।
অয়ন জানলার বাইরে কুয়াশার অন্ধকারে তাকিয়ে রইল। তার ডান হাতের কব্জির সেই জায়গাটা, ঠিক যেখানে ওই রহস্যময়ী নারীমূর্তিটা তাকে শক্ত করে ধরেছিল, সেখানটা এখনও অদ্ভুতভাবে তেতে আছে।
তার মনের ভেতর এখন তিনটে ছবি খুব পরিষ্কারভাবে ভেসে উঠছে, মায়ের ফিরে না তাকানো, বিক্রম মালহোত্রার বিষাক্ত হাসি আর সেই অজানা নারীর প্রবল উপস্থিতি।
বিদিশার বিশ্বাসঘাতকতা আর বিক্রমের শত্রুতা, এগুলোই এতদিন ধরে অয়নকে ভেতর থেকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিল। কিন্তু, যে আজ সেই অন্ধকার চোরাবালি থেকে তাকে টেনে তুলল, সে কে?
অয়ন ধীরে ধীরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কুয়াশার বুকে তার মুখের উষ্ণ বাষ্প জমা হয়ে এক মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল।
তার জীবনের সবটুকু জুড়ে ছিল মা। ছোটবেলার বিদিশা মানেই অয়নের কাছে এক পশলা রোদ্দুর, একটা নিরাপদ আস্ত জগৎ। অয়ন আর পাঁচটা সাধারণ বাচ্চার মতো ছিল না। সে ছিল একটু বেশিই শান্ত, একটু বেশিই মায়ের আঁচলধরা।
বেশিরভাগ সময়, যখন পাড়ার ছেলেরা রাস্তায় বল পেটাত, অয়ন তখন মায়ের পাশে রান্নাঘরের মেঝেকে ক্যানভাস বানিয়ে চক খড়ি দিয়ে আঁকিবুঁকি কাটত।
বিদিশা কড়াইয়ে খুন্তি নাড়তে নাড়তেই একটু পর পর নিচু হয়ে ওর কপালে চুলগুলো সরিয়ে দিতেন। আঁচল দিয়ে কপালের ঘাম মুছিয়ে দিতেন।
তাঁর একটা অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল। অয়নকে মন খারাপের কথা মুখ ফুটে বলতে হত না। সে একটু মুখ ভার করে বসে থাকলেই তিনি বুঝে যেতেন। তখন সংসারের হাজার ব্যস্ততার মাঝেও বিদিশা এসে ওর গা ঘেঁষে বসতেন।
অয়নকে নিজের কোলের ভেতর একপ্রকার লুকিয়ে ফেলে, ওর পিঠে আস্তে আস্তে হাত বুলোতে বুলোতে বলতেন,
"কী ব্যাপার, আজ আমার অয়নবাবুর মনখারাপ?"
সেই স্পর্শে এমন এক অলৌকিক জাদু ছিল যে, অয়নের ভেতরের সব অভিমান, সব কান্না পলকে ধুয়েমুছে যেত।
কলেজ থেকে ফেরার সময় অয়নের চোখ দুটো শুধু একটা মানুষকে খুঁজত। গেটের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা ভিড়ের মধ্যে সুতির শাড়ি আর ছোট্ট টিপ পরা বিদিশাকে দেখলেই ওর সমস্ত ক্লান্তি উবে যেত। বিদিশা হাতটা বাড়িয়ে দিতেন আর অয়ন নিজের পিটপিটে ছোট্ট হাতটা মায়ের হাতের তালুতে সমর্পণ করে যেন গোটা দুনিয়া জয় করে নেওয়ার ভরসা পেত।
অয়নের মনে পড়ে গেল অনেক বছর আগের এক বিকেলের কথা। বাইরে খেলতে গিয়ে হাঁটুর ছাল ছাড়িয়ে, রক্তাক্ত অবস্থায় কাঁদতে কাঁদতে ঘরে ফিরেছিল সে। দরজায় দাঁড়িয়ে শুধু ফুঁপিয়ে উঠেছিল,
"মা..."
বিদিশা দৌড়ে এসে এক লহমায় অয়নকে পাঁজকোলা করে কোলে তুলে নিয়েছিলেন। সেদিন তুলো আর অ্যান্টিসেপ্টিক বের করতে গিয়ে তাঁর হাত দুটো কাঁপছিল। ওষুধের বোতল খোলার আগে অয়নের কপালে একটা লম্বা, উষ্ণ চুমু খেয়ে বিদিশা ফুসফুস ভরে একটা শ্বাস নিয়ে ফিসফিস করে বলেছিলেন,
"লক্ষ্মী সোনা বাবা আমার... খুব লেগেছে, তাই না ?"
কাটার জ্বালাটা নিমেষে কোথায় যেন উবে গিয়েছিল। বিদিশার গায়ের চন্দনের সুবাস আর তাঁর বাহুমূলের নিরাপদ আশ্রয়টুকুই তখন অয়নের গোটা জগৎ ছিল।
অয়ন জানত, পিছন ফিরে তাকালেই সে দেখতে পাবে একজন দু-হাত বাড়িয়ে তাকে আলিঙ্গন করার জন্য দাঁড়িয়ে আছে।
সেই বিদিশা ওকে সবার সামনে চড় মেরে অপমান করলেন, 'গুণ্ডা' বলে অপমান করলেন, দূর দূর করে তাড়িয়ে দিলেন।
যে হাতটা এতদিন ওকে শুধু আদর করে এসেছে সেই হাতটাই যে মুহূর্তে ওকে আঘাত করল, সেই মুহূর্তে...সেই মায়াময় ঘর, সেই মমতাময়ী মা, সবটা এক লহমায় ঝাপসা হয়ে গেল।
অয়ন জানলার গ্রিলটা চেপে ধরল।
এক অসহ্য শূন্যতায় ওর বুকের ভেতরটা হু-হু করে উঠল।
যে বিদিশা অয়নের সামান্য সর্দি-জ্বরে সারারাত জেগে ওর মাথার পাশে বসে হাত বুলিয়ে দিতেন, সেই মা প্রিন্সিপালের অফিসে বিক্রমের পক্ষ নিলেন। এই আঘাতটা অয়নের কাছে সব আঘাত-অপমানের জ্বালার চেয়েও অনেক বেশি যন্ত্রণাদায়ক।
অথচ, সে কলেজে পালিয়ে এসেছিল শুধু মাত্র মায়ের প্রতি নিষিদ্ধ অনুভূতিগুলো থেকে মনটা ঘুরিয়ে নিতে। এছাড়া এখানে আসার আর অন্য কোন কারণ ছিল না।
অথচ, সেই মা-ই আজ ওর জীবনে আর নেই।
মাকে রক্ষা করা ছাড়া ওর জীবনের আর কোন উদ্দেশ্য ছিল না। অয়ন মায়ের প্রতি এতটাই প্রটেকটিভ ছিল, মাকে এতটাই ভালবাসত যে মাকে নির্যাতিত হতে দেখে ইতালিতে বনগানির উপর উন্মাদের মতো প্রাণঘাতী হামলা চালাতে দুবার ভাবেনি।
তার কী প্রতিদান মা ওকে দিল ?
ভাবতে ভাবতে অয়নের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।
ফেস্টের দিন ও একটা বড় শিক্ষা পেয়েছিল। কাউকে সবটুকু দিয়ে ভালবাসা একটা দুর্বলতা। সেই ভুল ও আর কখনও করবে না। সেদিনের পর থেকেই অয়নের জীবনের মোড় ঘুরে গিয়েছিল।
********************************************
অয়ন জানলার গ্রিল থেকে হাত সরিয়ে ঘরে ফিরে এল। টেবিলের ওপর রাখা জলের বোতলটা তুলে নিয়ে ঢকঢক করে কয়েক ঢোক জল খেয়ে ফেলল। মেঝের শীতল স্পর্শের মতোই ঠাণ্ডা জলটা তার শরীরের অসাড়তাটাকে কাটিয়ে দিতে সাহায্য করল।
সেদিন রাতের স্মৃতিগুলোকে তো ও মন থেকে মুছে ফেলেছিল, সেগুলো আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে কেন ?
অয়নকে খুব বেশিক্ষণ চিন্তা করতে হল না। বৈশালীর সাথে সেদিনের ওই ঘটনাটাই ট্রিগার হিসাবে কাজ করেছে। যখন থেকে ও বুঝতে পেরেছে যে ও আসলে বৈশালীর মাধ্যমে নিজের মাকে শাস্তি দিচ্ছিল, তখন থেকেই না চাইতেও ওর মনে আবার ফেস্টের চেপে রাখা স্মৃতিগুলো মাথাচাড়া দিতে শুরু করেছে।
অয়ন নিজেকে প্রমিস করেছিল যে ও আর কখনো পিছনে ফিরে তাকাবে না। টানা একমাস নিজেকে ঘরবন্দী করে রাখবার সময় ফেস্টের রাতের এই স্মৃতিগুলোই ওর মনে বারে বারে ফিরে আসত। তখন ওর পাগল হবার মতো অবস্থা হয়েছিল।
মিঃ প্রধানের সৌজন্যে স্বাভাবিক জীবনে ফিরলেও অয়ন মানসিকভাবে সেদিন রাতের ঘটনার সাথে আর কখনো ডিল করতে চায়নি।
কিন্তু, সেটা বোধহয় সম্ভব নয়। স্মৃতি মুছে ফেলা যায় না। একটা না একটা সময় আমাদের সবাইকেই অতীতের মুখোমুখি হতে হয়। যেমন ওকে এখন করতে হচ্ছে।
আচ্ছা, যদি সত্যিই বিক্রমের সাথে দেখা হয় তবে ও কী করবে ?
রুডি তো কেবল একটা সিঁড়ি মাত্র, ওর আসল টার্গেট তো বিক্রম। যদি আজ ও বিক্রমকে হাতের নাগালে পায় তাহলে...অয়ন জানে না, ও কী করবে।
তবে ওর হারাবার অনেক কিছু আছে। ওর জীবনটা যে কেবল বিদিশার উপর নির্ভর করে চলতে পারে না, সেটা এখন ও জানে।
বিক্রমকে হাতের কাছে পেয়ে গেলেও কোনরকম হঠকারী কাজ করা চলবে না। প্রয়োজনে ছেড়ে দিতে হবে। এমন কোন কাজ করা যাবে না যেটা ওর কেরিয়ারের ক্ষতি করতে পারে।
তবে বিক্রমকে ভাঙতে হলে কোন একটা জায়গা থেকে তো শুরু করতেই হবে। সেটা না হয় আজ থেকেই শুরু হোক।
বাইরের জানালার দিকে তাকিয়ে অয়ন ফিসফিস করে উঠল। নিজের কানে তার গলার স্বরটা কিছুটা ভাঙা ভাঙা শোনাল,
"দেখা হবে, বিক্রম। খুব শিগগিরই দেখা হবে।"
৩
সকাল পৌনে সাতটা। ৩১শে ডিসেম্বর।
শীতের সকালের ম্লান, ফ্যাকাশে আলোটা জানালার ভারী নীল পর্দার ফাঁক দিয়ে এসে বিছানায় পড়েছে। ঘরের বাতাসটা তামাকের গন্ধে ভারী হয়ে আছে।
খাটের পাশের ছোট মেহগনি সাইড-টেবিলটার ওপর রাখা একটা কাঁচের অ্যাশট্রে উপচে পড়ছে। অন্তত ডজনখানেক আধপোড়া সিগারেটের ফিল্টার সেখানে স্তূপাকার হয়ে আছে, অ্যাশট্রে ছাপিয়ে টেবিলের পালিশ করা কাঠের ওপর ছাই ছড়িয়ে পড়েছে। তার ঠিক পাশেই একটা সিরামিকের মগ; ভেতরে জমে থাকা ব্ল্যাক কফির তলানিটা কাল রাতের, সেটা এখন ঠান্ডা হয়ে কালো কাদার মতো থকথক করছে। মগের গা বেয়ে শুকিয়ে যাওয়া কফির একটা কালচে দাগ নেমে গেছে।
কাল অনেক রাত করে শুতে গেছে অর্জুন। শিশির রায়ের কেসটা হাতে নেবার পর থেকেই এই অবস্থা। আচরণ দেখে তাকে সাংবাদিক কম, গোয়েন্দা বেশি মনে হবে। সুব্রত চক্রবর্তী ঠিকই বলেছিলেন সে খবরের হাড়মাস চিবিয়ে খেতে ভালবাসে।
ওর মগজটা একটানা হাই-ভোল্টেজে চলা ইঞ্জিনের মতো গরম হয়ে আছে। লেপের নিচে আধশোয়া অবস্থায় সে সবেমাত্র একটু তন্দ্রার যাচ্ছিল।
এমন সময় কাঠের টেবিলের ওপর ফোনটা বেজে উঠল। আওয়াজটা সরাসরি অর্জুনের স্নায়ুতে গিয়ে ধাক্কা মারল। সে চোখ না খুলেই হাতড়ে ফোনটা তুলে নিল। ঘাড়ের কাছের পেশিগুলো শক্ত, চোখের ভেতরটা বালির মতো খসখস করছে।
স্ক্রিনের আলোয় চোখটা কুঁচকে গেল তার।
কলার আইডিতে নাম নেই, শুধু একটা সেভ করা নম্বর।
প্যারাডিক।
অর্জুন গলার কাছে জমে থাকা কফটা পরিষ্কার করে কলটা রিসিভ করল।
"বলো।"
অর্জুনের গলাটা ভাঙা, কিন্তু বরফের মতো ঠান্ডা।
"গুড মর্নিং লাহিড়ীদা! ঘুম ভাঙালাম নাকি?"
ওপাশ থেকে প্যারাডিকের চেনা, খসখসে গলা ভেসে এল। রাস্তায় গাড়ি চলাচলের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে।
"কাজের কথা বল প্যারাডিক। খবর কী?"
অর্জুন বিছানা ছেড়ে উঠে বসল। খালি গায়ে জ্যাকেটটা চাপিয়ে নিল সে। মেঝের ঠান্ডাটুকু পায়ের তলা দিয়ে সোজা শিরদাঁড়ায় গিয়ে উঠল।
"সলিড খবর, লাহিড়ীদা। তুমি শিশির রায়ের স্পট খুঁজছিলে না? লোকটা এক্সিডেন্টের আগে কোথায় কোথায় যেত?"
প্যারাডিক একটু গলা নামিয়ে ফিসফিস করে বলল।
"বাইপাসের ধারে একটা হাই-এন্ড জায়গা আছে... 'ভেলভেট লাউঞ্জ'। নাম শুনেছ?"
অর্জুন ঘরের এক কোণে রাখা একটা বিশাল কর্কবোর্ডের দিকে হেঁটে গেল।
"ভেলভেট লাউঞ্জ? হুম, ওটা একটা প্রাইভেট মেম্বারস অনলি ক্লাব। পলিটিশিয়ান আর কর্পোরেটদের আস্তানা।"
"একদম ঠিক ধরেছ।"
প্যারাডিক চুকচুক শব্দ করল।
"শিশির রায় প্রায়ই ওখানে যেত। অ্যাক্সিডেন্টের সাত-আট দিন আগে শেষবার ওই ক্লাবে গেছিল। সন্ধেবেলা ঢুকেছিল, বেরিয়েছিল প্রায় রাত আড়াইটের সময়। লোকাল বাউন্সারদের সাথে আমার একটু খাতির আছে। ওরা কনফার্ম করেছে, ওই রাতে শিশির রায়ের সাথে ভিআইপি কেবিনে আরও কয়েকজন হোমরাচোমরা ছিল।"
অর্জুন কর্কবোর্ডের সামনে এসে দাঁড়াল।
বোর্ডের এমাথা থেকে ওমাথা লাল সুতোর জাল দিয়ে গাঁথা, যেন কোনো মাকড়সার তৈরি করা এক গোলকধাঁধা। পিন দিয়ে আটকানো ছবি আর নিউজ কাটিং।
অর্জুন ডান হাতে একটা লাল মার্কার তুলে নিল।
"আর কিছু?"
"আসল খবরটা তো এখনও দিইনি লাহিড়ীদা!"
প্যারাডিক একটা চাপা উত্তেজনা নিয়ে বলল।
"আজকে থার্টি ফার্স্ট নাইট। ভেলভেট লাউঞ্জে আজ বিশাল প্রাইভেট পার্টির আয়োজন হয়েছে। ইনভাইট-অনলি। কিন্তু ভেতরের খবর হলো, ওই পার্টির ভিড়ের আড়ালে আজ রাতে গ্রাউন্ড ফ্লোরের পেছনের সেফ-রুমে একটা মিটিং হওয়ার কথা আছে। কারা আসবে জানি না, তবে গত দু'দিন ধরে ক্লাবের সিকিউরিটি ডাবল করে দেওয়া হয়েছে।"
মার্কারের ডগাটা কর্কবোর্ডের ওপর একটা সাদা কাগজে সজোরে চেপে বসল।
'ভেলভেট লাউঞ্জ - ৩১শে ডিসেম্বর - মিটিং'।
লেখাটা লিখতে লিখতে অর্জুনের চোয়ালের পেশিগুলো শক্ত হয়ে উঠল। শব্দগুলো লেখার সময় মার্কারের ক্যাঁচক্যাঁচ আওয়াজটা ফাঁকা ঘরে জোরে শোনা যাচ্ছিল।
"ঠিক আছে। তোমার অ্যাকাউন্টে আজ বিকেলের মধ্যে টাকা ঢুকে যাবে।"
"সাবধানে থেকো লাহিড়ীদা। জায়গাটা কিন্তু সুবিধের নয়। আজ রাতে ওখানে মাছি গলার জায়গা থাকবে না।"
জবাব না দিয়ে অর্জুন ফোনটা কেটে দিল।
মার্কারটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে সে দু-হাত দিয়ে নিজের মুখটা ঘষল। কর্কবোর্ডের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার মাথার ভেতরের গিয়ারগুলো আবার দ্রুত ঘুরতে শুরু করল।
লেক গার্ডেনসে অনুসূয়া সেনের ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে আসার পর গত চব্বিশ ঘণ্টায় অনেকগুলো ঘটনা ঘটে গেছে।
অর্জুন স্পষ্ট মনে করতে পারল, সেই গাঢ় ধূসর রঙের হেডলাইট-ঢাকা স্পোর্টস বাইকটার কথা। কালো ভাইজার নামানো হেলমেটের আড়ালে থাকা সেই চোখ জোড়া। অনুসূয়া সেনের ফ্ল্যাট থেকে বেরোনোর পর লোকটা তাকে ফলো করছিল।
কিন্তু অর্জুন যখন সোজা ঘুরে বাইকারটার চোখের দিকে তাকিয়েছিল, তখন সে একটা জিনিস পরিষ্কার বুঝতে পেরেছিল। শিকার যখন বুঝতে পারে যে তাকে শিকার করা হচ্ছে আর সে যখন পালানোর বদলে সরাসরি শিকারির চোখের দিকে তাকায়, তখন মেন্টাল ব্যালেন্সটা পাল্টে যায়।
লোকটা এরপর আর তাকে ফলো করেনি। অর্জুন গত দু-দিন রাস্তায়, অফিসে, বাড়ির নিচে তীক্ষ্ণ নজর রেখেছে। কেউ নেই। ওরা সম্ভবত বুঝে গেছে যে অর্জুন লাহিড়ী সাধারণ কোন রিপোর্টার নয় যে ভয় পেয়ে গুটিয়ে যাবে। ওরা স্ট্র্যাটেজি পাল্টাচ্ছে। আর তার মানেই হলো, ওরা এখন অর্জুনের ওপর সরাসরি আঘাত হানার সুযোগ খুঁজবে।
অর্জুন কিচেনের দিকে হেঁটে গেল। বেসিনের কলটা খুলে চোখে-মুখে ঠান্ডা জলের ঝাপটা দিল কয়েকবার।
জলের ফোঁটাগুলো চিবুক বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে। তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে সে আবার বসার ঘরে ফিরে এল।
গতকাল দুপুরে দেবোত্তমের দেওয়া ইনফরমেশন গুলো অর্জুনের ডেস্কের ওপর পড়ে আছে। অরুণ চ্যাটার্জীর ফাইল।
ভ্যানগার্ড গ্লোবাল ইন্ডিয়ার ইস্টার্ন জোন হেড। অমৃতা রায়ের প্রাক্তন বস। শিশির রায়ের বিয়ের রেজিস্ট্রির প্রধান সাক্ষী।
দেবোত্তম খোঁজ নিয়ে জানিয়েছে, অরুণ চ্যাটার্জী গত পরশু দিন, অর্থাৎ ২৭শে ডিসেম্বর কলকাতা ছেড়ে অফিসের কাজে ভাইজাগ (বিশাখাপত্তনম) উড়ে গেছেন।
লোকটা কি পালাচ্ছে ?
কারণ যাই হোক অরুণ চ্যাটার্জী এখন অর্জুনের ধরাছোঁয়ার বাইরে। আপাতত ওর ফোকাস আজকের রাত।
ভেলভেট লাউঞ্জ।
থার্টি ফার্স্ট নাইটের পার্টি। লোকজনের ভিড়, দামি মদ, হাই-ভলিউম ইডিএম মিউজিক আর হাজার হাজার ওয়াটের লেজার লাইটের নিচে মাতাল হয়ে থাকা একটা এলিট ক্রাউড। তার মধ্যেই, আড়ালে ওই গোপন মিটিংটা হবে। অর্জুনকে যেভাবে হোক আজ রাতে ওই ক্লাবের ভেতরে ঢুকতেই হবে।
কিন্তু কীভাবে?
সাংবাদিকের প্রেস কার্ড দেখিয়ে ওই প্রাইভেট মেম্বারস ক্লাবে ঢোকা যাবে না। বাউন্সাররা সোজা ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেবে। গেস্ট লিস্টে নাম না থাকলে মাছিও গলতে পারবে না।
অর্জুন কফির খালি মগটা হাতে নিয়ে জানালার কাছে এসে দাঁড়াল। নিচে রাস্তাটা আস্তে আস্তে জেগে উঠছে।
তাকে এমন একটা ছদ্মবেশ নিতে হবে, যা ভিড়ের মধ্যে মিশে যায়, আবার ভিআইপি জোন পর্যন্ত যার অনায়াস অ্যাক্সেস থাকে।
ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের লোক? ক্যাটারিং স্টাফ? নাকি মাতাল কোনো বড়লোকের বখে যাওয়া ছেলে?
ক্যাটারিং বা বারটেন্ডারদের ব্যাকগ্রাউন্ড চেক হয়, হঠাৎ করে আজ গিয়ে সেখানে ঢোকা মুশকিল।
ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের লোকজনের গলায় আইডি কার্ড থাকে।
অর্জুন ভাবল। তার চেহারায় এমনিতেই গত কদিনের না-ঘুমানো ক্লান্তির ছাপ। গালে কয়েকদিনের না-কাটা রুক্ষ দাড়ি, চোখের নিচে কালি।
যদি সে একজন নেশাগ্রস্ত, ধনী ক্লায়েন্টের ছদ্মবেশ নেয়? দামি লেদার জ্যাকেট, চোখে রোদচশমা, হাতে একটা ফেক ইনভাইটেশন কার্ড বা কারোর রেফারেন্স?
অর্জুন পকেট থেকে ফোনটা বের করে আবার দেবোত্তমকে ডায়াল করল।
"হ্যালো অর্জুনদা! এত সকালে?"
দেবোত্তমের ঘুমজড়ানো গলা।
"দেব, তোর ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের ওই সোর্সটাকে এখনই লাইন আপ কর।"
অর্জুন দ্রুত নির্দেশ দিল।
"আজ রাতে ভেলভেট লাউঞ্জের পার্টির গেস্ট লিস্টের একটা কপি আমার চাই। অন্তত এমন একটা নাম চাই, যে ইনভাইটেড কিন্তু আজ রাতে পার্টিতে আসছে না। আর একটা ফেক কিউআর কোড বা ই-পাস। বিকেলের মধ্যে।"
"ভেলভেট লাউঞ্জ? অর্জুনদা, ওটা তো ফুল টাইট সিকিউরিটি জোন! ধরা পড়লে..."
"সে দায়িত্ব আমার।"
অর্জুনের গলাটা এবার রূঢ় শোনাল।
"তুই শুধু লিস্টটা জোগাড় কর।"
ফোনটা কেটে দিয়ে অর্জুন আলমারির দিকে এগোল। আজ রাতে খবরের সন্ধানে তাকে সরাসরি বাঘের গুহায় ঢুকতে হবে। আর একবার সেখানে ঢুকলে, ফেরার পথ হয়তো আর নাও থাকতে পারে।