মুনমুন সেন - খোলা মনের মহিলা.. - অধ্যায় ৩২
সুলতান গঞ্জের গল্প:
সকাল সকাল মিসেস সেন বেরিয়ে গেলেন সুলতান গঞ্জ গ্রামের উদ্দেশে। নতুন কলেজের জন্য জমি পরিদর্শন করতে। যদিও তাঁর সঙ্গে আরও দুজন প্রফেসর যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু ব্যক্তিগত কারণে তারা আসতে পারেননি। তাই তিনি একাই রওনা দিলেন।
গ্রামের দিকে যাওয়ার পথে প্রকৃতি যেন একটু একটু করে বদলাচ্ছে। শহরের কোলাহল পেছনে ফেলে রেলগাড়ির জানালা দিয়ে দেখা যায় সবুজ মাঠ, দূরে ছোট ছোট কুঁড়েঘর। স্টেশনে পৌঁছাতেই সময় দেখলেন—ঠিক সকাল দশটা। এখান থেকে ভ্যানরিকশা নিয়ে আরও বিশ মিনিটের পথ।
ভ্যানরিকশার চালক বলল, "ম্যাডাম, সুলতান গঞ্জে যাবেন? সেখানে তো বিশেষ কিছু নেই—খুবই গরিব গ্রাম।"
মিসেস সেন হেসে বললেন, "সেই জন্যই তো সেখানে নতুন কলেজ দরকার।"
পথের দুধারে জমিগুলো শুকনো, কয়েকজন কৃষক মাথায় ঝুড়ি নিয়ে হাঁটছেন। দূর থেকে শিশুদের কোলাহল শোনা যায়—সম্ভবত স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দিক থেকে।
ভ্যানরিকশা থামতেই গ্রামের মোল্লা ইসমাইল হুসেন এসে হাজির। তাঁর সাদা পাঞ্জাবি আর টুপিতে এক ধরণের শান্ত আভা। তিনি হাসিমুখে বললেন, "আসুন ম্যাডাম, আমরা আপনার জন্য অপেক্ষা করছি। আপনার থাকার ব্যবস্থা করেছি কলেজের গেস্ট হাউসে। কলেজের জমির পাশেই—গেস্ট হাউস মানে একটা দুই বেডরুমের বাড়ি বলতে পারেন!"
মিসেস সেন মুচকি হেসে বললেন, "ধন্যবাদ, মোল্লা সাহেব। তবে আমি তো আজই ফিরে যাবো ভাবছিলাম..."
মোল্লা ইসমাইল মাথা নেড়ে বললেন, "না না, ম্যাডাম, এত দূর এসে আজকে কি ফিরে যাওয়া যায়? গ্রামের মানুষ আপনার সাথে দেখা করতে চায়। কলেজের ব্যাপারে তাদেরও অনেক কথা আছে। আর... সন্ধ্যায় আমাদের এখানে ছোট একটা মিলাদ মাহফিলও আছে। আপনি যদি আসেন, সবাই খুশি হবে।"
মিসেস সেন ভাবলেন, প্রকৃতপক্ষে গ্রামের মানুষের সঙ্গে সময় কাটালে প্রকল্পটি সম্পর্কে ভালো ধারণা পাওয়া যাবে। তিনি রাজি হয়ে গেলেন।
গেস্ট হাউসটি অবশ্য খুবই সাধারণ—সাদামাটা ইটের দোতলা বাড়ি, সামনে একটি ছোট বারান্দা। ভেতরে প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র ঠিকই আছে, কিন্তু সবকিছুই যেন পুরনো সময়ের স্পর্শে ভরা। জানালা দিয়ে কলেজের প্রস্তাবিত জমিটা দেখা যায়—সবুজে ঘেরা, এক কোণে সেই আমগাছটার ছায়া লম্বা হয়ে পড়েছে।
বিকেলে মোল্লা ইসমাইল নিজেই এসে মিসেস সেনকে গ্রাম ঘুরিয়ে দেখালেন। পথে গ্রামবাসীরা তাঁকে কৌতূহলী দৃষ্টিতে দেখছে। কেউ কেউ এগিয়ে এসে সালাম দিচ্ছে, কেউ বা বাংলায় জড়িয়ে জড়িয়ে কথা বলার চেষ্টা করছে।
"ম্যাডাম, আমাদের ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা শিখলে বড় হবে তো?" এক বৃদ্ধা জিজ্ঞেস করলেন।
"নিশ্চয়ই," মিসেস সেন বললেন, "এখানে কলেজ হলে আর শহরে যেতে হবে না। সবাই বাড়ির পাশেই ভালো শিক্ষা পাবে।"
সন্ধ্যায় মিলাদ মাহফিলে গিয়ে মিসেস সেন দেখলেন, গ্রামের সব সম্প্রদায়ের মানুষ একসাথে বসেছে। আলোচনা হলো কলেজ নিয়ে, ভবিষ্যৎ নিয়ে।
মিসেস সেন যখন ফিরে গেস্ট হাউসে তখন আকাশ ভার করে আসে মেঘে, মোল্লা ইসমাইল বলেন, "ম্যাডাম আজ খুব বৃষ্টি হবে মনে হচ্ছে, দাঁড়ান আমি কাউকে বলছি আপনাকে পৌঁছে দিতে, ওই গেস্ট হাউসের আসে পাশে কোনো বাড়ি ঘর নেই। আপনার অসুবিধে হলে।"
চলবে...