নিষিদ্ধ নগরের পাণ্ডুলিপি (Manuscript of the Forbidden City) - অধ্যায় ১৬
(আগের অংশের পর থেকে...)
এসআরসি টাওয়ার্সের ১৯ তলায় নীরবের কেবিনটা এখন নিস্তব্ধ। বাইরে রক্তনগরীর নিয়ন আলো আর ট্রাফিকের শব্দ কাঁচের দেওয়ালে এসে বাধা পেয়ে ফিরে যাচ্ছে। টেবিলের ওপর রাখা দামী ম্যাকবুক আর ছড়ানো ফাইলগুলোর মাঝখানে একা বসে আছে নীরব। ঘড়িতে মাঝরাত পার হয়েছে, কিন্তু নীরবের চোখে এক ফোঁটা ঘুমের ছাপ নেই।
বরং তার শরীরের শিরায় শিরায় এখন এক অদ্ভুত ডোপামিন খেলছে। অহিরাজপুর প্রজেক্টের ব্লু-প্রিন্টগুলো যখন সে দেখছে, তার মনে হচ্ছে সে কোনো ব্যবসা করছে না, সে একটা আস্ত সাম্রাজ্য জয় করতে যাচ্ছে। বাবা ব্রিজেশ সিংহ রায় তাকে এই গুরুদায়িত্ব দিয়েছেন—লোকাল ট্রাইবালদের হটিয়ে ওখানকার জমি দখল করে সিং রায় কনগ্লোমারেটের নতুন প্ল্যান্ট বসানো।
নীরব একটা লম্বা শ্বাস নিল। এই যে কয়েকশ মানুষের ভাগ্য তার একটা কলমের খোঁচায় বদলে যাবে—এই পাওয়ার (Power)-টা তাকে এক পৈশাচিক আনন্দ দিচ্ছে। সে ভাবছে, আর মাত্র এক সপ্তাহ। তারপরই সে আর তার শাশুড়ি তনুশ্রী সেন একসাথে অহিরাজপুর যাবে। তনুশ্রীর ‘আলোয়ন ফাউন্ডেশন’-এর আড়ালে তারা সেই সহজ-সরল আদিবাসী মানুষগুলোকে বোঝাবে, প্রয়োজনে ভয় দেখাবে। তনুশ্রীর আভিজাত্য আর নীরবের জেদ—দুটো মিলে অহিরাজপুরের সেই মাটি রক্তনগরীর দখলে আসবেই।
নীরব বিড়বিড় করে বলল, "ক্ষমতা... ক্ষমতা আসলে একটা ড্রাগের মতো। একবার চখলে আর ছাড়া যায় না।"
সে ল্যাপটপ বন্ধ করে নিজের দামী ঘড়িটার দিকে তাকাল। অনেক রাত হয়েছে। সে ইন্টারকমে ফোন করল নিচের সিকিউরিটি ডেস্কে।
"আলম... গাড়ি বের করো। আমি আসছি।"
নিজের কেবিন থেকে বেরোতেই জেনো তার সেই কর্পোরেট বস সুলভ পাওয়ারটা একটু কমে গেল। কিছুক্ষণ আগে যে অদম্য শক্তি সে অনুভব করছিল, সেটা যেন ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে। এখন তাকে ঘরে ফিরতে হবে—যেখানে অপেক্ষা করছে অনুশ্রী। অনুশ্রীর সামনে গেলেই তার আত্মবিশ্বাসের দেওয়ালে কোথায় যেন ফাটল ধরে।
নীরব লিফট থেকে বেরিয়ে ধীর পায়ে নিচে নেমে দেখল আলম গাড়িতে বসে আছে। আলম দ্রুত নেমে দরজা খুলে দিতেই সে পেছনের সিটে গা এলিয়ে বসল। গাড়িটা যখন রাতের শুনশান রাস্তা দিয়ে দৌড়াতে শুরু করল, নীরব কাঁচ নামিয়ে বাইরে তাকাল। আলমের ড্রাইভ করার স্টাইলটা খুব স্মুথ, কিন্তু গাড়ির রিয়ার-ভিউ মিররে যখন আলমের চোখের দিকে নজর পড়ল নীরবের, তার মনে পড়ে গেল অনুশ্রীর কথা। অনুশ্রী আজ সকাল থেকে কেন যেন একটু অন্যমনস্ক ছিল।
নীরবকে চুপচাপ দেখে আলম নিজেই আলতো করে বলল, "স্যার, গাড়ি কি রাস্তার ধারে দাঁড় করাব? আজ কি সিগারেট খাবেন না?"
নীরব ওর দিকে একটু তাকিয়ে হেসেই বলল, "না আলম, আজ আর খাওয়া যাবে না। সিগারেট... তোমার ম্যাডাম বুঝে ফেলেছে আমি সিগারেট খেয়েছি।"
কথাটা শুনে আলমের চোখে যেন এক মুহূর্তের জন্য এক অশুভ হাসির ঝিলিক খেলে গেল। তবে কয়েক সেকেন্ড পরেই সেটা উধাও করে সে গম্ভীর হয়ে বলল, "ওহ! আমি জানি স্যার কেন ম্যাডাম বারণ করেছে। আমার ওই মাগ..."—বলেই নিজের জিভ সামলে নিল আলম। তারপর বলল, "মানে, আমি যার সাথে দেখা করতে যাই, সেও আমাকে সিগারেট খেতে খুব মানা করে।"
নীরব ম্লান হাসল। কিন্তু পরক্ষণেই তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। মনে মনে ভাবল, "কোথায় আমার অনুশ্রী, আর কোথায় ওর সেই রাস্তার নর্দমার বেশ্যা!"
নীরব নিজেকে সামলে নিয়ে একটু তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, "আলম, গাড়িটা সাইডে দাঁড় করাও। সিগারেট খাব না, এমনিতে একটু দাঁড়াব।"
আলম গাড়ি থামিয়ে দিয়ে দেখল নীরব নেমে রাস্তার ধারে একা দাঁড়িয়ে আছে। আলম নিজের সিগারেট প্যাকেট থেকে সিগারেট বের করে ধরিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে নীরবের কাছে এসে দাঁড়াল।
"স্যার... কিছু হয়েছে আপনার? কয়েকদিন ধরে দেখছি আপনি বাড়ি ফেরার পথে কেমন যেন হয়ে যান।"—আলমের গলায় এক ধরণের প্রচ্ছন্ন কৌতূহল।
নীরব ওর দিকে একপলক চোখ রাঙিয়ে তাকাল। সেই চাউনিতে সে স্পষ্ট বুঝিয়ে দিল যে—সে এখানকার বস। তাদের মধ্যে যতই সহজ কথাবার্তা হোক না কেন, আলম যেন নিজের সীমানা না ভোলে। আলম তাড়াতাড়ি চোখ নামিয়ে নিল, এমনকি মুখের ধোঁয়াটুকুও যেন ভয়ে গিলে ফেলল। তোতলাতে তোতলাতে বলল, "সরি স্যার... ভুল হয়ে গেছে।"
নীরবের ভেতরে এক পৈশাচিক আনন্দ হলো। সে দেখল, শুধু চোখের ইশারায় সে আলমকে 'সরি' বলতে বাধ্য করেছে। কিন্তু এই আনন্দটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। একটা চাপা যন্ত্রণা আর নিজের করা কোনো এক ভুলের কথা মনে পড়তেই তার মনটা আবার বিষণ্ণ হয়ে গেল। এই সমস্যা সে কাউকে বলতে পারবে না। এটা তার নিজের তৈরি করা নরক।
দাঁতে দাঁত চেপে নীরব বলল, "আলম, একটা সিগারেট দাও।" গলার স্বরটা সে যতটা সম্ভব গম্ভীর রাখার চেষ্টা করল।
আলমের মুখে এক অদ্ভুত বিজয়ী হাসির ঝিলিক খেলে গেল। সে খুব ধীরেসুস্থে আলাদা প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে নীরবের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, "স্যার, নিন।"
বিড়িতে লম্বা সুখের একটা টান দিয়ে অর্কদেব জানলার বাইরে ধোঁয়াটা ছাড়ল। ধোঁয়া উড়ে যেতেই ওপেন ক্যানাল বা নর্দমার সেই পচা ভ্যাপসা গন্ধটা নাকে এল ওর। রক্তনগরীর ওই ঝকঝকে আলোকসজ্জার ঠিক নিচেই যে এরকম একটা নরক বাস করে, সেটা এই বস্তিতে না এলে বোঝা যেত না।
অনিকেত ল্যাপটপে বসে সিংহ রায় আর সেন ফ্যামিলির ছবিগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিল। স্ক্রিনের আলোয় ওর মুখটা নীলচে দেখাচ্ছে। সে একনাগাড়ে বলে চলল, "বুঝলি অর্ক, প্ল্যান সাকসেস! আমি আলোয়ন ফাউন্ডেশনে ঢুকে পড়েছি। তনুশ্রী সেনের কেবিনে ইনফিল্ট্রেট করা... উফ রে অর্ক, কী বলব! ছবিতে যেমন দেখছি, সামনে তার চেয়েও কয়েক গুণ বেশি খতরনাক। ভাই, এই ছবিগুলো ল্যাপটপ থেকে সরিয়ে নে... তনুশ্রী সেনকে সামনে থেকে দেখলে তো এমনিতেই ধজভঙ্গ রোগীরও বাড়া ফুলে উঠবে! আমি আগামীকাল থেকে ওই মাগির সাথেই থাকব... উফফফ! ভাই, ডিজিটাল প্ল্যানের থেকে ফিজিক্যাল প্ল্যান সবথেকে ভালো।"
কথাগুলো বলার সময় অনিকেতের চোখ দুটো লালসা আর এক অদ্ভুত কামনায় চকচক করে উঠছে। সে যেন তনুশ্রীকে শুধু ধ্বংস করতে নয়, গ্রাস করতে চাইছে।
অর্কদেব তখনও একমনে বিড়ি টেনে যাচ্ছে। জানলার ওপাশে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে সে যেন অন্য কিছু খুঁজছে। অনিকেতের উত্তেজিত কথাগুলো ওর কানে গেলেও সে কোনো উত্তর দিল না।
অনিকেত ওর নীরবতা লক্ষ্য করে ল্যাপটপ থেকে চোখ সরিয়ে বলল, "কী হয়েছে অর্ক ভাই? কথা বলছিস না কেন?"
অর্কদেব ওর দিকে তাকাল। ওর চোখেমুখে এক রাশ বিরক্তি, ক্ষোভ আর চাপা রাগ। অনিকেত দেখে বুঝতে পারল—অর্কদেব ওর মতো অতটা রুক্ষ বা প্রবৃত্তি-চালিত নয়। সে একটু বেশি ইমোশনাল, একটু বেশি সংবেদনশীল।
অনিকেত ওর কাছে এসে কাঁধে হাত রাখল। খোলা জানলার দিকে তাকিয়ে দেখল দূরে রক্তনগরীর আলিশান আলোগুলো হীরের মতো জ্বলছে। সে নরম গলায় বলল, "কী হয়েছে ভাই? তোকে ল্যাপটপ হ্যাকিং বা ডিজিটাল কাজ করতে দিচ্ছি না বলে রাগ করছিস? দেখ, তুই তো নিজেই বললি যে ওদের ডিজিটালি হারানো সম্ভব না, তাই তো আমি মাঠে নামলাম..."
অর্কদেব ওর হাতটা কাঁধ থেকে এক ঝটকায় নামিয়ে দিল। জানলার বাইরে বিড়ির ধোঁয়াটা সজোরে ছেড়ে দিয়ে ধরা গলায় বলল, "দাদা, আমি ফিরে যেতে চাই। আমার আর ভালো লাগছে না। বাবা সাহেব আমাদের জন্য অনেক করেছেন মানছি, কিন্তু উনি যা বলবেন তাই শুনতে হবে—এটার কোনো মানে হয়? আমরা ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি আমাদের কঠোর ট্রেনিং নিতে হবে, পড়াশোনায় বেস্ট হতে হবে। সেসব কি এই বস্তিতে এসে পড়ে থাকার জন্য করেছিলাম?"
বলতে বলতে অর্কদেবের চোখ থেকে দু-ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। এই অন্ধকার, এই নর্দমার গন্ধ আর এই নোংরা প্রতিশোধের খেলা ওকে ভেতরে ভেতরে শেষ করে দিচ্ছে।
অনিকেত চুপ হয়ে গেল। সে নিজেও একটা বিড়ি ধরিয়ে জানলার গ্রিলটা শক্ত করে ধরল। ধোঁয়া ছেড়ে শান্ত গলায় বলল, "দেখ ভাই, আমরা যাই করি না কেন, বাবা সাহেব যেটা বলবেন সেটাই আমাদের করতে হবে। উনি আমাদের জন্য যা করেছেন, তা হয়তো এই দুনিয়ায় কেউ করত না। আমাদের অস্তিত্বটাই তো ওনার দেওয়া।"
পুরো ঘরটায় এক ভারী নিস্তব্ধতা নেমে এল। দুই ভাইয়ের মাঝখানে এখন শুধু বিড়ির ধোঁয়া আর একরাশ না বলা দীর্ঘশ্বাস। ঠিক সেই সময় দরজায় টোকা পড়ল— 'ঠক, ঠক, ঠক'।
অনিকেত গিয়ে দরজাটা খুলল। সামনে দাঁড়িয়ে আছেন কাদের আলী। পরনে একটা চেক কাটা লুঙ্গি আর ঘামে ভেজা স্যান্ডো গেঞ্জি, যার নিচ দিয়ে ওনার মেদবহুল ভুঁড়িটা আধো-খোলা হয়ে উঁকি দিচ্ছে। কাদের আলীর হাতে একটা দামী সিগারেটের প্যাকেট—যেটা তিনি অত্যন্ত যত্ন করে ধরে আছেন।
কাদের আলী ঘরে ঢুকেই দুই ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে এক রহস্যময় হাসি হাসলেন।
কাদের আলী মেসের পুরনো বিছানাটায় বসলেন। অনিকেত টুলটা টেনে নিয়ে ওনার পাশে বসল। বিছানার ওপর রাখা দামী সিগারেটের প্যাকেটটার দিকে অনিকেতের বারবার নজর যাচ্ছে—এই বস্তির ভ্যাপসা ঘরে এরকম দামী জিনিস বেমানান। অনিকেতের মনে মনে প্যাকেটটা হাতানোর লোভ হচ্ছিল।
অনিকেত খুব সম্মান দিয়ে নিচু স্বরে বলল, “কাদের সাহেব, আপনি এখন? মানে এই অসময়ে?”
কাদের আলী নিজের মুখভর্তি লম্বা সাদা দাড়িতে হাত বুলিয়ে একবার অর্কদেবের দিকে তাকালেন। ওনার গলার স্বরটা অদ্ভুত রকমের শান্ত আর মসৃণ, শুনলে মনে হয় মন ভরে যাবে। সেই সুরেলা গলাতেই তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “কী ব্যাপার অর্ক? তোমার মেশিন-পত্তর, টুলস আর অ্যান্টেনারা কোথায়? চুপচাপ যে?”
অর্কদেব একটা লম্বা নিশ্বাস ছেড়ে জানলার দিকে তাকিয়েই বলল, “ওদের টেকনোলজি অনেক অ্যাডভান্সড। আমার এই চিপ সেট-আপ দিয়ে ওদের ডেটা প্রটেকশন ব্রেক করা ইম্পসিবল।” অর্কদেব কারিগরি শব্দগুলো দিয়ে কাদের আলীকে বোঝানোর বেশি চেষ্টা করল না, কারণ সে জানে অনিকেত বা কাদের আলী কেউই এই ডিজিটাল মারপ্যাঁচ বুঝবে না।
কাদের আলী মৃদু হেসে বললেন, “হুম, জানতাম। ওরা আজ অনেক শক্তিশালী, ওদের ছোঁয়া এত সহজ না।”
অর্কদেব এবার রেগে গেল। ওর ভেতরের জমানো বিরক্তিটা ফেটে পড়ল। সে গলার স্বর নামিয়ে তীক্ষ্ণভাবে বলল, “এই ব্যাপারে কি বাবা সাহেব জানেন? উনি কি জানেন আমরা কতটা অসহায়?”
কাদের আলী আবার একটু হাসলেন। “অবশ্যই জানেন। সে তো সব জানেই।”
অর্কদেব এবার রাগে আগুন হয়ে কাদের আলীর সামনে এসে দাঁড়াল। “যখন আপনারা জানতেনই যে আমার সেট-আপ দিয়ে কিছু হবে না, তাহলে এখানে এই নরকে বসে থেকে লাভ কী? আমি বাড়ি চলে যাব। ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি প্রতিশোধ নিতে হবে, রিভেঞ্জ নিতে হবে! কিন্তু কেন? ওরা এমন কী করেছে যে আমাদের জীবনটা এভাবে নষ্ট করতে হবে? আর বাবা সাহেব...”
বলতে বলতে অর্কদেব হঠাৎ থেমে গেল। কাদের আলীর চশমার মোটা ফ্রেমের নিচে ওনার চোখ দুটো রাতের অন্ধকারে আগুনের মতো লাল হয়ে উঠেছে। ওনার চাউনিতে এমন কিছু একটা ছিল যে অর্কদেব মুহূর্তের মধ্যে চুপ হয়ে গেল। অনিকেতও মাথা নিচু করে বসে রইল।
কাদের আলীর গলার স্বর এখন গম্ভীর, কিন্তু শব্দগুলো বেরোচ্ছে খুব মেপে, খুব ক্যালকুলেটেড ভাবে। তিনি বললেন, “প্রতিশোধ! রিভেঞ্জ! এগুলোকে স্রেফ শব্দ হিসেবে ভাবলে ভুলে যাও। আর যদি সত্যি প্রতিশোধ নিতে চাও, তবে জেনে রেখো—প্রতিশোধ হলো পৃথিবীর সেরা রান্না করা ডিশ (Best Cooked Dish)। সময় যত গড়াবে, এই পথ তত বিপজ্জনক হবে। অর্ক, নিজের যন্ত্রণাকে একটা উদ্দেশ্য (Purpose) দাও। আর সেই উদ্দেশ্য হলো বাবা সাহেবের নির্দেশ। উনি যখন আসবেন, তুমি নিজের সব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবে। তুমি দুর্বল হয়ে পড়ছ অর্ক। তোমার যেটা পাওয়ার, সেটা দিয়ে আপাতত সাহায্য করার চেষ্টা করো... নাহলে...”
কাদের আলীর এই শান্ত অথচ শীতল কণ্ঠস্বর শুনে অনিকেতের শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠল। অর্কদেব তখন জানলার পাশে থ হয়ে দাঁড়িয়ে। পরিবেশটা হালকা করতে অনিকেত জিজ্ঞেস করল, “কাদের সাহেব, আপনি কেন প্রতিশোধ নিতে চান? আপনার গল্পটা কী?”
কাদের আলী ওনার সেই বড় বড় লাল চোখ দুটো অনিকেতের দিকে স্থির রেখে বললেন, “অনিকেত, তোমাদের অনেক কিছু জানা বাকি। আস্তে আস্তে সব জানবে। তবে তুমি ঠিক পথেই আছ। তুমি তো তনুশ্রী সেনের কেবিনে ঢুকে পড়েছ, তাই না?”
অনিকেত একটা ক্রূর হাসি হেসে বলল, “হুম, ঢুকে গেছি। আমি ঠিক জেনে নেব কোথায় কী হচ্ছে। কিছু না কিছু ডকুমেন্ট আমি ঠিকই পাব।” সে মোবাইল বের করে দুটো ছবি দেখাল—একটায় লেখা ‘PRISM BIOSCIENCE LABS’ আর অন্যটায় ‘VULCAN CHEMICALS’।
কাদের আলী মোবাইলটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ দেখলেন। তারপর বললেন, “আমি পনেরো বছর ধরে এই শহরে আছি, কিন্তু এই দুটো জায়গা কোথায়, তা আমার জানা নেই। আমাদের এই দুটো জায়গাই খুঁজে বের করতে হবে।”
অর্কদেব কিছু বলতে চেয়েও থেমে গেল। ওর মাথায় বাবা সাহেবের দেওয়া সেই ‘উদ্দেশ্য’ বা ‘পারপাস’ শব্দটা ঘুরপাক খেতে লাগল।
অনিকেত উত্তেজিত হয়ে বলল, “আমি ঠিক খুঁজে বের করব কাদের সাহেব। এটাই আমাদের মেইন প্ল্যান। এই দুটো জায়গাকে ডেস্ট্রয় করতে পারলেই সিংহ রায় আর সেন ফ্যামিলি ধুলোয় মিশে যাবে। বাবা সাহেব তো এটাই চেয়েছেন।”
কাদের আলী অনিকেতের কথা শুনে একটু হাসলেন। তবে সেই হাসিটা সরল ছিল না, ওটার পেছনে লুকিয়ে ছিল অন্য কোনো ডার্ক সত্য।
অনিকেত হাত বাড়িয়ে সিগারেটের প্যাকেটটা ধরতে যাবে, ঠিক সেই মুহূর্তে কাদের আলী কড়া গলায় বলে উঠলেন— “অনিকেত, হাত সরাও! এই সাতটা সিগারেটের একটাও যদি তুমি খেয়ে নাও, তবে তোমার পুরুষত্বের যে গর্ব আর অহংকার, সেটা এক নিমিষেই ধুলোয় মিশে যাবে।”
বলেই কাদের আলী চোখের ইশারায় অনিকেতের দুই পায়ের মাঝখানে ইঙ্গিত করলেন। ওনার চাউনিতে এমন একটা কিছু ছিল যে অনিকেত হকচকিয়ে গেল। এক অজানা ভয়ে সে দ্রুত হাত সরিয়ে নিল এবং সাবধানে প্যাকেটটা বিছানায় রেখে দিল।
টুলটায় ফিরে বসে অনিকেত কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল, “কেন কাদের সাহেব? এতে এমন কী আছে?”
কাদের আলী রহস্যময় এক হাসি হাসলেন। “এই সিগারেটগুলো সাধারণ নয় অনিকেত। এগুলো তৈরি করতে এখনকার বাজারে লাখ লাখ টাকা খরচ হবে। এতে মেশানো আছে আমার নিজের আবিষ্কার করা এক বিশেষ রাসায়নিক তরল... নাম তার— ‘ফ্যালোটিনটন শিরা-সংকোচন সিরাম’ (PhalloTinton VeinCrusher Serum)।”
নামটা শুনে অনিকেত আর অর্কদেব দুজনেই কুঁচকে গেল। অনিকেত বিড়বিড় করে বলল, “এটা খেলে কী হবে?”
কাদের আলী এবার দুজনের দিকেই স্থির দৃষ্টিতে তাকালেন। ওনার কণ্ঠস্বর এখন আরও গম্ভীর। “এই সিগারেটের প্রতিটা ফিল্টারে এক ড্রপ করে এই রাসায়নিক তরল মেশানো আছে। এটা শরীরের ভেতরে গেলেই ম্যাজিকের মতো কাজ শুরু করবে। লিঙ্গের শিরাগুলো কুঁচকে যাবে, আর ন্যানো-ফাইবার দিয়ে কোষগুলো সংকুচিত হয়ে লিঙ্গ আর অণ্ডকোষ প্রায় ৩-৪ ইঞ্চি ছোট হয়ে যাবে সাত দিনের জন্য। সব মিলিয়ে শরীরটা যেন অর্ধেক সাইজে চুপসে যাবে। আর শিরায় শিরায় এক অসহ্য যন্ত্রণা অনুভব হবে... তবে এর একটা বিশেষ উপায়ও আছে.....।”
কথাটা শুনে অনিকেত আর অর্কদেব দুজনেই ভয়ে কুঁকড়ে গেল। এই বস্তির অন্ধকারে বসে থাকা মানুষটা যে এত ভয়ঙ্কর কোনো 'ইললিগ্যাল মেডিসিন' বানাতে পারে, সেটা তারা ভাবতেও পারেনি। কাদের আলী কি তাদের ওপর কোনো এক্সপেরিমেন্ট করছেন? নাকি এই বিষ অন্য কারোর জন্য? ভয়ে দুজনেই সিঁটিয়ে গেল।
অনিকেত শান্ত হওয়ার চেষ্টা করে বলল, “কাদের সাহেব, এই প্ল্যান দিয়ে আপনি কী করবেন?”
কাদের আলী ওদের অবস্থা দেখে মৃদু হাসলেন। “ভয় পেও না। কাছে এসো, বসো।”
দুজনই মন্ত্রমুগ্ধের মতো এসে বিছানায় ওনার দুই পাশে বসল—যেন কোনো আদিম রহস্য শুনতে বসেছে তারা। কাদের আলী বলতে শুরু করলেন...
“তোমাদের একটা গল্প শোনাই, তাহলে সব বুঝতে পারবে।আগেকার দিনে যখন কোনো রাজা যুদ্ধে হারত, তখন বিজয়ী রাজা সেই বংশের সব নারীকে নিয়ে পৈশাচিক আনন্দে মেতে উঠত। রানি, রাজকন্যা, পুত্রবধূ—সবাইকে নিয়ে চলত ;., আর অপমানের উৎসব। এটা ছিল পরাজিত রাজার অহংকার আর পুরুষত্বকে চূর্ণ করার শ্রেষ্ঠ অস্ত্র। প্রাচীন যুগ থেকে মধ্যযুগ—নারীরা বারবার হয়েছে শত্রুর সম্মান ভাঙার হাতিয়ার। কিন্তু আমি যে গল্পটা বলব, সেটা একটু আলাদা... এটা সত্যি কি না জানি না, লোককথিত। এটা বজ্রপুর নামে এক ছোট রাজ্যের গল্প, যারা তলোয়ার না চালিয়ে শুধু লালসার আগুন জ্বালিয়ে এক বিশাল সাম্রাজ্যকে ধ্বংস করেছিল।”
কাদের আলী একটু থামলেন, তারপর ওনার সেই ঘোরলাগা গলায় আবার শুরু করলেন— “বজ্রপুরের রাজা চন্দ্রবর্মনের ছিল মাত্র ৫০০ জন সৈনিক। বিপরীতে মহেন্দ্রপুরের রাজা বিক্রমাদিত্য ছিলেন অজেয়। তার অহংকার ছিল গগনচুম্বী। তিনি নিজে হাজার হাজার দাসী ভোগ করতেন, বলতেন এটাই পুরুষত্বের প্রমাণ। তার ঘরে ছিল রানি ইন্দুমতী, বিবাহিতা কন্যা শকুন্তলা আর পুত্রবধূ মালবিকা। বজ্রপুরের রাজসভায় তখন প্রবীণ লাইব্রেরিয়ান কালনেমি এক অদ্ভুত প্রস্তাব দিল। সে বলল—‘যুদ্ধ মাঠে হবে না, যুদ্ধ হবে নারীর শরীরে’।”
“কালনেমির প্ল্যান ছিল নিষিদ্ধ ফলের মতো। সে জানত, কামনা যখন নিয়ন্ত্রণ হারায়, ধ্বংস অনিবার্য হয়। বজ্রপুরের ৫০ জন ছায়া-সৈনিক টানেল দিয়ে মহেন্দ্রপুরে ঢুকে পড়ল। তারা সাথে নিয়ে গিয়েছিল ‘মধুরা বটি’—প্রাচীন ভেষজ কামোদ্দীপক নির্যাস। খাবারে মিশিয়ে দিলে নারীর শরীরে আগুনের মতো লালসা জাগে, কিন্তু হিতাহিত জ্ঞান লোপ পায়।”
কাদের আলীর গলার স্বর এখন আরও গভীর। “প্রথম রাতে রানি ইন্দুমতীর খাবারে মিশল সেই বটি। ৩০ বছরের বিবাহিত জীবন ভুলে তিনি এক ছায়া-সৈনিকের সাথে মিলিত হলেন। চিৎকার করে বলছিলেন—‘আরও চাই... আরও!’ পরের তিন দিনে শকুন্তলা আর মালবিকাও সেই একই নেশায় ডুবল। শকুন্তলা এক রাতে তিন সৈন্যের সাথে শরীর ভাঙল, আর মালবিকা স্বামীকে ভুলে দারোয়ানদের সাথে গোপন কুঠুরিতে ঢুকল। রাজবাড়ির সম্মান বাইরের রাস্তায় গড়াল। মহেন্দ্রপুরের সব নারী তখন ওই ‘মধুরা বটি’র নেশায় পাগল। তারা বুঝতে পারল, রাজার কথিত শক্তি আসলে একটা মিথ। শহরটা একটা যৌন রাজধানীতে পরিণত হলো।”
“রাজা বিক্রমাদিত্য যখন এসব শুনলেন, ওনার মুখ সাদা হয়ে গেল। যে পুরুষত্বের দম্ভে তিনি দশ হাজার সৈন্য নিয়ে বেরোতেন, আজ তিনি অন্দরমহলে বসে কাঁদছেন। নিজের রানি, কন্যা আর পুত্রবধূর শরীর যখন পরপুরুষের লালসায় লুটে যাচ্ছে, তখন তার সমস্ত তেজ ধুলোয় মিশে গেল। কোনো যুদ্ধ ছাড়াই বজ্রপুর জিতে গেল।”
গল্প শেষ করে কাদের আলী অনিকেতের দিকে তাকালেন। ওনার চোখে তখন এক অদ্ভুত লালচে আভা। তিনি বিড়বিড় করে বললেন, “কালনেমি সেই পুরোনো পুঁথিতে লিখে রেখেছিল: ‘যুদ্ধে যখন রাজা হারে, বিজয়ী তার নারীদের নিয়ে পৈশাচিক আনন্দ করে। কিন্তু লালসা যদি নিজের ঘরেই ঢুকে পড়ে, তাহলে ধ্বংস আরও ভয়ঙ্কর হয়।’ সেই প্রথম নিষিদ্ধ ফল থেকে আজ পর্যন্ত… কিছুই বদলায়নি।”