রাহুলের বন্ধু রোহন ও তার মা - অধ্যায় ১৬
সকালের নরম সূর্যের আলো জানালা দিয়ে ঘরে এসে পড়েছে। ঘড়িতে সময় সাড়ে সাতটা। পাখির ডাক আর রাস্তার দূরের গাড়ির আওয়াজ মিলে সাধারণ একটা সকালের শব্দ তৈরি করছে।
রোহন চোখ খুলল। তার শরীর একটু ভারী লাগছিল, কিন্তু মুখে স্বাভাবিক হাসি। সে বিছানা থেকে উঠে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে কলকাতার সকাল — হালকা কুয়াশা এখনও মিলিয়ে যাচ্ছে, রাস্তায় দুধওয়ালা, সবজিওয়ালার চিৎকার শোনা যাচ্ছে।
সে বাথরুমে গিয়ে মুখ-হাত ধুলো। ঠান্ডা পানিতে মুখ ধোয়ার পর সে বেশ সতেজ বোধ করল। একটা সাদা টি-শার্ট আর জিন্স পরে সে বাইরের ডাইনিং স্পেসে এল।
সুজাতা রান্নাঘরে ছিল। সে একটা হালকা নীল সালোয়ার কামিজ পরে রান্না করছিল। তার চুল পিছনে টাই করে বাঁধা, মুখে সামান্য ক্লান্তির ছাপ থাকলেও হাসিটা একদম স্বাভাবিক।
“এসো বাবু, ব্রেকফাস্ট তৈরি।” সুজাতা নরম গলায় বলল।
টেবিলে গরম গরম পরোটা, আলুর তরকারি, আর এক গ্লাস দুধ সাজানো। পাশে একটা ছোট বাটিতে কাটা ফল — আপেল, কলা আর কমলা।
রোহন বসে পড়ে খেতে শুরু করল। “মা, পরোটাগুলো খুব ভালো হয়েছে আজকে।”
সুজাতা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, “খেয়ে নাও। আজকে তোমার কলেজে কটা ক্লাস আছে?”
“তিনটে। দুপুরের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে।” রোহন মুখ ভর্তি খেতে খেতে বলল।
সুজাতা নিজেও এক কাপ চা নিয়ে তার সামনে বসল। দুজনের মধ্যে সাধারণ কথাবার্তা চলতে লাগল — কলেজের পড়াশোনা, আগামী সপ্তাহে কী পরীক্ষা আছে, বাজারে কী কী আনতে হবে। কোনো অস্বাভাবিকতা নেই। যেন গত রাতের কোনো ঘটনাই ঘটেনি।
খাওয়া শেষ করে রোহন উঠে তার ব্যাগ গুছিয়ে নিল। ব্যাগে ল্যাপটপ, নোটবুক, আর পেনসিল বক্স ঢুকিয়ে সে জুতো পরতে লাগল।
“মা, আমি বেরোচ্ছি।”
সুজাতা দরজা পর্যন্ত এসে তার কপালে আলতো করে চুমু খেল। “সাবধানে যেও। দুপুরে খেয়ে নিও। আর রাহুলের সাথে দেখা হলে বলো বাড়িতে আসতে।”
রোহন হেসে মাথা নেড়ে বেরিয়ে পড়ল।
লিফটে নামার সময় সে রিনা আন্টির ফ্ল্যাটের সামনে দিয়ে গেল। দরজা বন্ধ। কোনো শব্দ নেই।
বাইরে বেরিয়ে রোহন রাস্তায় হাঁটতে লাগল। সকালের রোদ এখন একটু তীব্র হয়েছে। রাস্তায় অটো, বাস, আর ছাত্রছাত্রীদের ভিড়। সে অটো ধরে কলেজের দিকে রওনা দিল।
কলেজে পৌঁছে বন্ধুদের সাথে গল্প করতে করতে ক্লাস শুরু হলো। সারাদিন স্বাভাবিকভাবে কেটে গেল — লেকচার, লাইব্রেরিতে একটু পড়াশোনা, ক্যান্টিনে চা-বিস্কুট, আর বন্ধুদের সাথে আড্ডা। রাহুলের সাথেও দেখা হয়েছিল, কিন্তু দুজনেই স্বাভাবিক আচরণ করল। কোনো অদ্ভুত কথা নয়।
বিকেল চারটে নাগাদ কলেজ শেষ করে রোহন বাড়ির দিকে ফিরল। সূর্য তখন পশ্চিমে ঢলে পড়েছে, হালকা হলুদ আলোয় চারপাশ ভরে গেছে। রাস্তার ধারের চায়ের দোকানগুলোতে ভিড় বাড়ছে।
বাড়ি ফিরে সে দেখল সুজাতা সোফায় বসে টিভিতে সিরিয়াল দেখছে। রান্নাঘর থেকে মাছের ঝোলের গন্ধ আসছে।
“এসে গেছিস? হাত-মুখ ধুয়ে নে। চা করে দিচ্ছি।” সুজাতা স্বাভাবিক গলায় বলল।
রোহন মাথা নেড়ে তার ঘরে গেল।