রাহুলের বন্ধু রোহন ও তার মা - অধ্যায় ৪৭
গাড়িটা ধীরে ধীরে সমুদ্রের পাশের রাস্তা ধরে এগোচ্ছিল। বাইরে অন্ধকার নেমে এসেছে। শুধু রাস্তার দু’পাশের হালকা আলো আর দূরের ঢেউয়ের শব্দ ভেসে আসছিল। গাড়ির ভিতরে একটা অদ্ভুত নীরবতা ছড়িয়ে পড়েছিল।
সুজাতা জানালার পাশে মাথা হেলিয়ে বসে ছিল। তার চুল হাওয়ায় উড়ছিল। রিনা আন্টি তার পাশে চুপ করে বসে ছিল, চোখ বন্ধ। রাহুল গাড়ি চালাচ্ছিল, আর রোহন সামনের সিটে বসে মাঝে মাঝে পিছনের দিকে তাকাচ্ছিল।
কিছুক্ষণ পর সুজাতা হালকা গলায় বলল,
“আজকে সারাদিনটা কী সুন্দর কাটল, না?”
রিনা আন্টি চোখ খুলে হাসল, “হ্যাঁ… অনেকদিন পর এমন শান্তি লাগল।”
কিন্তু কথাটা বলার পরই গাড়ির ভিতর আবার নীরবতা নেমে এল। এই নীরবতাটা সাধারণ ছিল না। কেমন যেন ভারী, চাপা।
রাহুল রিয়ার ভিউ মিররে একবার সুজাতার দিকে তাকাল। সুজাতাও সেই দৃষ্টি ধরতে পেরে চোখ সরিয়ে নিল, কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে একটা হালকা হাসি ফুটে উঠল।
রোহন জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল। তার মনে আজকের সারাদিনের ছবি ভেসে উঠছিল — মা’র হাসি, জেট স্কিতে তার ভয়-মিশ্রিত উত্তেজনা, সূর্যাস্তের সময় তার শরীরের উপর পড়া লাল আলো… সবকিছু।
হঠাৎ সুজাতা পিছন থেকে নরম গলায় বলল,
“রোহন… তুই আজকে খুব চুপচাপ আছিস কেন? কী ভাবছিস?”
রোহন পিছনে ঘুরে তাকাল। গাড়ির হালকা আলোয় সুজাতার মুখটা আবছা দেখা যাচ্ছিল। তার চোখে একটা অদ্ভুত চাহনি।
“কিছু না মা… শুধু… আজকে সবকিছু খুব ভালো লাগছিল।”
সুজাতা হালকা করে হাসল। তার হাসিতে কেমন যেন একটা গভীরতা ছিল। সে ধীরে ধীরে বলল,
“ভালো লাগাটা যেন বেশিক্ষণ থাকে… কখনো কখনো এমন দিনের পর রাতগুলো আরও… অন্যরকম হয়ে যায়।”
রিনা আন্টি চুপ করে শুনছিল। তার হাতটা আস্তে আস্তে সুজাতার হাতের উপর এসে পড়ল। দুজনের আঙুল জড়িয়ে গেল।
রাহুল গাড়ির স্পিড একটু কমিয়ে দিল। গাড়ির ভিতরের বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠছিল। কেউ কোনো কথা বলছিল না, কিন্তু প্রত্যেকের মনে একটা অস্বস্তিকর, উত্তেজক অনুভূতি জেগে উঠছিল।
সুজাতা জানালার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, যেন নিজেকেই বলছে,
“কলকাতায় ফিরলে আবার সব স্বাভাবিক হয়ে যাবে… কিন্তু আজকের এই দিনটা… মনে থেকে যাবে।”
গাড়িটা নীরবে এগিয়ে চলছিল।