সুন্দর শহরের ঝাপসা আলো - অধ্যায় ৪১
তাই কলেজ পাশ না করা অবধি এবং চাকরি না পাওয়া অবধি তোর আমার মধ্যে এই দূরত্ব বজায় থাকবে”।
মায়ের কথা শুনে সে তো একদম আকাশ থেকে পড়লো যেন ।চোখ বড় করে, মুখ হাঁ করে তার দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষন । মানে এই চার পাঁচ বছর ধরে মায়ের হাত ধরে তার মহাকাশ যাত্রা স্থগিত থাকবে । মায়েকে জড়িয়ে ধরে ছায়াপথ পার করে তার অসীম অনন্তে পাড়ি দেওয়া বন্ধ থাকবে!!
ভেবেই ওর মন বিষণ্ণ হয়ে উঠল ।
কারণ ওই সুখ যে ঐশ্বরিক ।
তার থেকে এতো দিন বঞ্চিত হয়ে থাকতে পারবে না সে ।
মন কেঁদে ওঠে তার । সে বলে, “আর যে তুমি আমায় বলে ছিলে ভালো রেজাল্ট করলে একটা উপহার দেবে?”
সুমিত্রা কাজের মধ্যেই ছেলেকে বাসনের তাক থেকে প্লেট পেড়ে আনার নির্দেশ দেয় ।
মায়ের কথা মত সেও কয়েকটা প্লেট পেড়ে এনে সেগুলো কে সাজিয়ে রাখে ।
আর ওইদিকে সুমিত্রা সাজানো প্লেটের মধ্যে জলখাবার গুলো এক এক করে রাখতে থাকে ।
সঞ্জয়ের উদ্বিগ্ন মন মায়ের উত্তরের জন্য মুখিয়ে ছিলো । আর সুমিত্রা আপন মনে নিজের কাজ করে যাচ্ছিলো ।
মায়ের এভাবে তার প্রশ্নের উত্তর না দেওয়া দেখে আরও চঞ্চল হয়ে ওঠে ।
সে আবার মায়ের দিকে তাকিয়ে প্রশ্নটা করে, “মা……বলোনা । তুমি যে বলেছিলে আমি ভালো রেজাল্ট করলে একটা উপহার দেবে??”
“কেন আমি তোর কাছে কোনো গুরুত্ব রাখিনা বুঝি? আমি তোর কাছে একটা উপহার নই? কি বলিস?” কাজের ফাঁকে সুমিত্রা তার ছেলেকে উত্তর দেয় ।
মায়ের কথা শুনে সঞ্জয় বিস্মিত হয়ে পড়ে ।সে কাঁপা গলায় বলে, “সেতো নিশ্চয়!!! আমি অন্য কিছু ভেবেছিলাম যদিও”।
ছেলের কথা শুনে সুমিত্রা তার দিকে তাকিয়ে বলে, “কেন তু্ই কি ভেবে ছিলি?”
“নাহঃ ছাড়ো আর শুনতে হবেনা তোমাকে” একটু হতাশাগ্রস্ত ভাব নিয়ে সঞ্জয় তার মাকে উত্তরটা দিলো।
আর তখনি সুমিত্রার নধর পাছাটা যেন খিলখিলিয়ে অট্টহাসি দিয়ে উঠল ।যার শব্দ সঞ্জয়ের কানে এসে বাজলো বোধহয় ফল স্বরূপ তার নজরও ওইদিকে চলে গেলো ।
অভিমানী প্রেমিকের মতো সঞ্জয়ের নজর সেখানে ছিলো ।
পুরোনো দিনের কথা গুলো মনে পড়লো ওর । যখন সে ছোট ছিল । বস্তির ছেলেদের সাথে ভগ্ন অট্টালিকায় যৌন কৌতূহলের নিষ্পাদন করতো । যতসব নর্দমার দল । বিশ্রী । অসহ্য ।কঠোর । অরুচিকর ।
ওপর দিকে মাতৃ গঠন যেন পারিজাত বৃক্ষের নন্দন কানন ।যার প্রত্যেকটা ছিদ্র থেকে বনমল্লিকার সুবাস চুইয়ে পড়ছে ।যার কোমলতা, নমনীয়তা, সৌন্দর্যতা দেখে মুগ্ধ হয় । যার সুরভি নাকে এলে মন তৃপ্ত হয় ।
সুমিত্রা ততক্ষনে খাবার সাজিয়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে খাবার ঘরে চলে আসে এবং টেবিলে সেগুলো কে রাখতে থাকে ।
মায়ের আন্দোলিত পেছনে চোখ রেখে নিরাশার ঢোক গিলে সঞ্জয় মনে মনে ভাবে তার বাল্য কালে ওইরকম অভিজ্ঞতা না হলেই পারতো ।
“খাবার গুলো একটা একটা করে এনে এখানে রাখনা বাবু । মাকে একটু হেল্প কর । দেখনা মেয়ে গুলো এই ঢুকল বলে”।
মায়ের কথায় সঞ্জয়ের সম্বিৎ ফেরে । সে তৎক্ষণাৎ, “হ্যাঁ মা । করছি”। বলে রান্নাঘর থেকে প্লেটে সাজানো খাবার গুলো এনে টেবিলে রাখে ।
পরেরদিন সকালবেলা সঞ্জয় কলেজ যাবার উদ্দেশে তৈরী হয়ে গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে । পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে সময় দেখে নেয়, সাড়ে নয়টা পার হয়ে গিয়েছে তবুও মায়ের আসার নাম নেই এখনও ।
একটু অধৈর্য এর নিঃশ্বাস ফেলে বাড়ির দিকে তাকায় । লেট্ করে কলেজ গেলে কি ভাববে শিক্ষক মহাশয়রা তারই দুশ্চিন্তা মাথায় আসছিলো বারবার ।
মাতো এতো লেট্ করে না । উফঃ কি যে হলো আজ!!! মনে মনে বিড়বিড় করে সে ।
এলেই তাকে ধমক দেবো!! মনের কথাটা মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেলো অবশেষে ।
আরও একবার পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে এনে সময় দেখে । নয়টা পঁয়ত্রিশ!!
তখনি সামনে থেকে একজন নারীর হাসার আওয়াজ কানে এলো ওর । চোখ তুলে দেখে মা!
খুশি মিশ্রিত একটু অবাক ভঙ্গি তে চেয়ে থাকে সে । মুখ খুলে হ্যাঁ হয়ে যায় । আজ মা কি সুন্দর সেজেছে!!!
সুমিত্রার ওভাল মুখশ্রীর মধ্যে ধনুকের ন্যায় বাঁকানো কালো ঘন ভুরু ।আর তার মধ্যিখানে গাঢ় লাল রঙের টিপ । কপালের উপরে সিঁথির সিঁদুর!
মায়ের লম্বা নাকের বাঁ পাশে উজ্জ্বল সোনালি নাকছাবি । তার পাতলা ঠোঁটে আজ বোধহয় হালকা লিপস্টিক লাগানো হয়েছে । আর দুই চোখে কাজলের প্রলেপ!
আহঃ মা বোধহয় অনেক দিন পর চোখে কাজল লাগিয়েছে ।চোখে কাজল লাগালে মাকে আরও সুন্দরী লাগে বিশেষ করে সেই কাজল যখন তার চোখ দুটো কে আর বড়োবড়ো করে দেখাতে সহায়তা করে ।
আর তার পাতলা ঠোঁটের মিষ্টি হাসি । তার মুক্ত ঝরা দাঁত ।
সুমিত্রা কে দেখে আজ সঞ্জয় মুগ্ধ । গেটের সামনে তার মাকে বেরিয়ে আসা দেখে সে ভুলেই গিয়েছে যে দশটার মধ্যে কলেজ পৌঁছাতে হবে ।
ওর আজ গোলাপি সিনথেটিকের ছাপা শাড়ি পরেছে । সাথে গাঢ় গোলাপি রঙের ব্লাউজ ।
সাজগোজ টাও বেশ পরিপাটি । তার হাতের শাঁখা পলার সাথে সোনার চুড়ি দুটি নিজের অস্তিত্বকে ফুটিয়ে তুলছে ।
ছেলের সামনে এসে মৃদু হেসে সুমিত্রা তাকে জিজ্ঞাসা করে, “এমন করে কি দেখছিস??”
অবাক ভাব কাটিয়ে সঞ্জয় বলে, “কত দেরি করে দিয়েছো মনে আছে তোমার?আর এতো সাজুগুজু করে কোথায় যাবে তুমি??”
“বাহঃ রে ছেলের সাথে ওর কলেজ যাচ্ছি । ওর আজ কলেজের শেষ দিন তাই…..” সঞ্জয়ের প্রশ্নের উত্তর দেয় সুমিত্রা ।
মায়ের কথা শুনে চোখ বড় করে বলে, “তা বলে এতো সেজে । তুমি আগে এতো সাজতে না মা!!”
ছেলের কথা শুনে একটু অস্বস্তিতে পড়ে সুমিত্রা বলে, “হ্যাঁ রে সত্যি?? আমি কি বেশি বেশি সেজে ফেলেছি…..?”
“আর নয়তো কি??” সঞ্জয় বলে তার মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে ।
সুমিত্রা নিজের থুতনি তে হাত রেখে বলে, “তাহলে যাই দাঁড়া আমি মুখ টা ধুয়ে আসি শীঘ্রই । আমি ওদের কে বলেছিলাম আমাকে সাজিও না তোমরা । কিন্তু মেয়ে গুলো শুনলো না। যাই আমি মুখ টা ধুয়ে আসি । কিসব ফেস পাউডার লাগিয়ে দিয়েছে ওরা । এমনিতেই আমার কেমন গরম গরম ভাব লাগছে”।
মায়ের কথা শুনে সঞ্জয় তড়িঘড়ি তার হাত ধরে নেয় । বলে, “নাহঃ মা । ওটা আমি এমনিই বলছিলাম ।আসলে আজ তোমাকে খুব সুন্দরী লাগছে তাই বললাম কেউ যেন তোমাকে নজর না দিয়ে দেয়”।
ছেলের কথা শুনে সুমিত্রা তার হাতে একটা চাটি মারে ।
সঞ্জয় মনে মনে খুশি হলেও কিছু বলে না । কারণ সে জানে মা সাজুক না সাজুক তাকে সর্বদাই স্নিগ্ধ সুন্দরী লাগে । ব্যাস কয়েকদিন আগে তাদের ঘর ছেড়ে চলে আসার পর মায়ের মুখের উজ্জ্বলতা হারিয়ে গিয়ে ছিল ।বহুদিন পর মা তার চোখে কাজল লাগিয়েছে । হয়তো খুশি হলেই মা সাজে । আর এমনিতে সুন্দরী।
রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাবার সময় সঞ্জয়ের নজর মায়ের সিঁথির সিঁদুর এবং হাতের সোনার চুড়ি গুলোর উপর নজর পড়ে যাচ্ছিলো বারবার ।
এটা ভেবে সে মনে মনে হাসে যে একসময় সে তার মাকে সিঁদুর না পরার জন্য অনুরোধ করে ছিল । কি দরকার সেই মানুষটার নামে মাথায় সিঁদুর রাখার, যে তাকে বিন্দু মাত্র সম্মান দেয়না ।কিন্তু আজ সে তার মহত্ব বুঝতে পেরেছে । বিবাহিত নারীর শোভার প্রতীক ওটা । ওটাও তার মায়ের ব্যাক্তিত্বকে ফুটিয়ে তোলে । বড় কথা হলো যে মা বিবাহিত সেটা দেখেই অনেকে তার প্রতি লোলুপ দৃষ্টি থেকে নিজেকে সংযত রাখে ।
আর হাতের চুড়ি!!!
ওগুলো তো মা এখন সবসময় পরে থাকে । আগে তো এমন করতো না ।কি জানি??
মনে কথা সে প্রশ্ন রূপে করেই ফেলল, “আচ্ছা মা । তুমি এই সোনার চুড়ি গুলো এখানে সবসময় পরে থাকো কেন? আগে তো তুমি এমন করতে না….”।
ছেলের কথা শুনে সুমিত্রা মুচকি হেসে বলে, “বা রে….এটা কি আমাদের বাড়ি নাকি!! আর যদি আমি এগুলো পরে না থেকে অন্য কোথাও রাখি আর চুরি করে নেয়?? তাহলে কি হবে ভেবে দেখছিস? কাউকে দোষারোপও করতে পারবো না এখানে”।
মা ছেলের কথার মধ্যেই তারা কলেজে পৌঁছে গেলো । ভীষণ লোকজন সেখানে। কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে আছে তারা ।
ছেলেরা তাদের মা বাবা কে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে ।
কলেজের পাশে খেলার মাঠ টায় একটা ছোট্ট স্টেজ বানিয়ে সেখানে এক এক করে কৃতি ছাত্র দের সম্বর্ধনা জানানো হলো । উপহার স্বরূপ মিষ্টির প্যাকেট, এক গোছা পেন এবং একটা কলেজের ব্যাগ দেওয়া হলো ।
সুমিত্রার চোখে খুশির অশ্রু গড়িয়ে পড়লো । যখন সে দেখলো প্রধান শিক্ষক মহাশয় তার ছেলেকে স্টেজে ডাক দিয়ে তাকে নিজের হাতে করে পুরস্কার তুলে দিতে । এবং ছেলের মাথায় এবং পিঠে স্নেহের স্পর্শ দিয়ে তাকে উৎসাহ দিতে । যখন চারিদিকে হাততালির শব্দে পুরো মাঠ হো হো করে উঠল তখন ওর অন্তরে একটা তৃপ্তির আবেগ খেলে গেলো ।
চেয়ারে বসে সেও দূর থেকে সব কিছু দেখে আপ্লুত হচ্ছিলো ।
তখনি পাশে বসে থাকা এক অজ্ঞাত মহিলা ওকে জিজ্ঞেস করে উঠল, “আপনিই কি সঞ্জয়ের মা?”
সুমিত্রা তার দিকে তাকিয়ে হাসি মুখে উত্তর দিলো, “হ্যাঁ”
“আচ্ছা আচ্ছা!! আপনার ছেলে তো বেশ মেধাবী । অনেক গুলো টিউশন দিয়েছেন বোধহয়? তারজন্য এতো ভালো রেজাল্ট করেছে আপনার ছেলে!!”
মহিলার প্রশ্নে সুমিত্রা হাসি মুখে উত্তর দেয় । বলে, “না না তেমন কিছু নয় । আসলে কলেজের টিচার দের সহযোগিতায় আর ওই দুটো প্রাইভেট টিউশন নিয়েছিল সঞ্জয় । ওতেই ঠাকুর কৃপা করেছেন দেখছি”।
সুমিত্রার উত্তর পেয়ে মহিলা নিজের গাল থেকে হাত সরিয়ে একটু উতলা হয়ে বলে, “আচ্ছা এই ব্যাপার । এখনকার ছেলে মেয়েদের লেখা পড়ার কি খরচ জানেন তো?? আমার বর তো আর পারছেনই না সরকারি চাকরি করে । তার উপর দু দুটো ছেলেকে মানুষ করা!! বাব্বাহ হাফিয়ে পড়ছি আমরা । তা ছেলেকে কিসে দেবেন ইঞ্জিনিয়ারিং এ তো???”
সুমিত্রা ধীর স্থির চিত্তে উত্তর দেয়, “হ্যাঁ” বলে ।
“হ্যাঁ সেতো নিশ্চয়ই । আর তাছাড়া এতো ভালো রাঙ্ক করেছে সেটাও তো দেখতে হবে । আর বলবেন নাহ । আমার বড় ছেলেও ইঞ্জিনিয়ারিং এ পড়ে । কত খরচ । বছরে দু লাখ টাকা । ভাবা যায় । কলকাতার নামী প্রাইভেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ । ওখানে পড়লেই চাকরি বাঁধা । তবে এতো খরচ আর টানতে পারছিনা । বুঝলেন তো ।ছোট ছেলেও ইঞ্জিনিয়ারিং পড়বে বলেছে । আমি একদম না করে দিয়েছি ।বলেছি তোদের কে পড়াতে গিয়ে আমরা রাস্তার ভিখারী না হয়ে যাই । অথবা পরের বাড়ির ঝি”।
মহিলার কথা গুলো সুমিত্রার স্থির চিত্তে আঘাত করে । সে উদ্বিগ্ন মন নিয়ে প্রশ্ন করে, “সরকারি কলেজে তো এতো খরচ নেই তাই না….?”
মহিলা, ওর কথা শুনে আবার বিরামহীন ভাবে বলতে থাকে, “হ্যাঁ মানছি সরকারি কলেজে পড়াশোনা কম খরচে হয়ে যায় । তা বলে এই নয় যে ওখানে বিনমূল্যে পড়ানো হয় । এখানে যদি দু লাখ টাকা লাগে, ওখানে নিশ্চয়ই পঞ্চাশ হাজার টাকা তো নেবেই অথবা তিরিশ চল্লিশ হাজার টাকা বছরে তার উপর আলাদা খরচ । আর আপনি ছেলেকে এতো যত্ন করে মানুষ করছেন যখন, তখন সরকারের উপর নির্ভর করে বসে আছেন কেন বলুন তো? ওখানে যদি ওর সিলেকশন না হয় তাহলে তো প্রাইভেটেই দিতে হবে আর না হলে আরও একটা বছর”।
সুমিত্রা, মহিলা টার কথা গুলো মন দিয়ে শোনে । আর কোথাও না কোথাও ওর দৃঢ় সংকল্পে আঘাত হানে ।
সে মহিলার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলে, “আপনি ঠিক বলেছেন । বাড়ি গিয়ে এই বিষয় নিয়ে ভাববো একবার”।