ভয়ংকর শহর ( জেলের কয়েদি ও গৃহবধূর তীক্ত সম্পর্ক) - অধ্যায় ১৯
পর্ব - ১৯
দুই মাস কেটে গেছে সেই রাতের পর।
ঘরের ভেতর এখন অন্যরকম এক নীরবতা। ত্রিশ লক্ষ টাকার ঋণ শোধ করতে গিয়ে পরিবারটা প্রায় হাঁপিয়ে উঠেছে। অর্কের বেতনের বড় অংশ চলে যায় কিস্তিতে। রিশিকাকে সেন্ট জেভিয়ার্স থেকে সরিয়ে সরকারি বাংলা মাধ্যম কলেজে ভর্তি করতে হয়েছে। নতুন কলেজের পোশাক সস্তা, খাতা-কলমও কম খরচের। ঈশানী বাইরের লোকের সামনে হাসিমুখে বলে, “এলাকার কলেজটাই ভালো, দূরের কলেজে যাওয়ার ঝামেলা নেই।” কিন্তু রাতে একা বিছানায় শুয়ে সে চোখের জল মুছে ফেলে। অর্কও বাইরে গিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে চা খেতে বসে হাসে, যেন সব ঠিক আছে। ভেতরে ভেতরে দুজনেরই বুক ভারী।
তুলসি আর আসে না।
একদিন সকালে এসে বলেছিল, “বৌদি, আমি আর পারছি না। বাড়ির খরচ চালানো দায়। বস্তির পাশে একটা ছোট্ট দোকান দেব। চাল-ডাল বিক্রি করব।” ঈশানী কিছু বলতে পারেনি। তুলসির চোখেও লজ্জা ছিল, কষ্টও ছিল। বিদায় নেওয়ার সময় রিশিকার মাথায় হাত বুলিয়ে গিয়েছিল। এখন সেই দোকানটা চলছে। তুলসি আর এই বাড়ির দিকে ফিরে তাকায় না।
আজকের সকাল।
অর্ক অফিসে চলে গেছে। রিশিকা কলেজ বাসে উঠেছে। ঈশানী আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শাড়ি পরছে। হালকা বেগুনি রঙের একটা তাঁতের শাড়ি। ব্লাউজটা একটু টাইট। চুল আঁচড়ে খোঁপা করেছে, কপালে ছোট্ট টিপ। গলায় সস্তা একটা হার। বাইরের লোকেরা যেন না বোঝে ঘরের অবস্থা কী। সে জানে, এই শহরে মানুষ চোখ রাখে। দুর্বলতা দেখালে আরও বেঁধে ধরবে।
বাজার যেতে সে টোটো ভাড়া করল।
টোটো চালক মাঝবয়সী, গোঁফওয়ালা। গাড়ি ছাড়তে ছাড়তে বলতে লাগল, “দিদি, এবার বিজেপি সরকার টোটোওয়ালাদের জন্য স্পেশাল স্কিম আনছে রে। লোন মওকুফ, নতুন ব্যাটারি… শুনলেন?”
ঈশানীর মন অন্য জায়গায়। সে শুধু মাথা নাড়ল। রাস্তায় ধুলো উড়ছে। দুপাশে পানের দোকান, চায়ের দোকান।
হঠাৎ সামনে একটা ট্রাক। টোটো চালক জোরে ব্রেক কষল।
ঈশানীর শরীর সামনে ঝুঁকে পড়ল। শাড়ির আঁচল একটু সরে গেল। ব্লাউজের গলার ভাঁজ খুলে গেল সামান্য। দুধের উপরের সাদা অংশটা, সেই গভীর ক্লিভেজ—রৌদ্রে এক ঝলক চিকচিক করে উঠল।
টোটো চালকের চোখ মিরর দিয়ে সেই দৃশ্যে আটকে গেল।
সে দেখল—ফর্সা, নরম দুধের উপরের অংশ। ব্লাউজের কাপড়টা টানটান হয়ে আছে। একটু নড়লেই যেন আরও খুলে যাবে। চালকের গলা শুকিয়ে গেল। প্যান্টের ভেতর একটা চাপা গরম অনুভূত হল। সে মিরর থেকে চোখ সরাতে পারল না। কল্পনায় সেই ক্লিভেজের ভেতর মুখ গুঁজে দিতে ইচ্ছে করছে। জিভ দিয়ে চেখে দেখতে ইচ্ছে করছে।
ঈশানী সোজা হয়ে বসতে গিয়েই টের পেল চালকের চাহনি। মিররে তার লোলুপ চোখ। রাগের চোখ লাল হয়ে উঠল তার।
“দাদা, একটু দেখেশুনে চালান না।”
কণ্ঠস্বর কঠিন। চালক দ্রুত চোখ সরিয়ে নিল, কিন্তু আবার আয়নায় তাকাল। এবার আরও নির্লজ্জভাবে। ঈশানীর বুকের দিকে।
ঈশানী আর সহ্য করতে পারল না। তার কাছে চাহুনি টা যেন কোনো এক হিংস্র জীবের।
“দাদা, থামান।”
টোটো থামল। সে তাড়াতাড়ি ভাড়া গুনে নামল। পেছন ফিরে তাকাল না। কিন্তু টোটো চালক পেছন থেকে তাকিয়ে রইল। শাড়ির ভাঁজে তার পাছার দোলন দেখতে দেখতে গাড়ি ছাড়ল। মুখে একটা নোংরা হাসি।
ঈশানী হেঁটে এগিয়ে যেতে যেতে মনে মনে গজগজ করতে লাগল।
এই এলাকার মানুষ কি মেয়ে দেখে না? চোখ থাকতে কি লজ্জা নেই? নারীদের কি কোনো নিরাপত্তা নেই এই শহরে? শুধু শরীর দেখলেই পশুর মতো তাকিয়ে থাকে। স্বামী বাড়িতে নেই জানলে আরও বেপরোয়া হয়। সে আরও শক্ত করে আঁচলটা বুকের ওপর টানল।
বাজারে এসে সে দরদাম করতে লাগল। আগের মতো হাত খরচ নয় এখন। তিন টাকা কম করতেও ঝগড়া করে। আলুওয়ালার সঙ্গে কথা কাটাকাটি করল। মাছওয়ালা তার দিকে তাকিয়ে অন্য দোকানদারের সঙ্গে ফিসফিস করল—“ঐ যে ব্যাংকারের বউ… শরীরটা দেখ।” ঈশানী শুনতে পেল। চোখ তুলে কঠিন করে তাকাল। দোকানদার চোখ নামিয়ে নিল।
বাজারের ব্যাগ হাতে নিয়ে সে ফিরছিল। হঠাৎ একটা ধাক্কা।
সামনে থেকে একজন লোক চাদর জড়িয়ে হেঁটে আসছিল। ঈশানীর চোখ অন্যদিকে ছিল। দুজনের কাঁধে কাঁধে লাগল। জোরে। ঈশানীর হাত থেকে ব্যাগটা ছিটকে পড়ল। সবজি ছড়িয়ে গেল ধুলোর ওপর। সে হোঁচট খেয়ে প্রায় পড়েই যাচ্ছিল।
যে লোক চাদরে মোরা ছিল, তার চাদরটা সরে গেল।
ঈশানীর চোখ বড় হয়ে গেল।
কাদের।
দাড়ি আরেকটু বড় হয়েছে। চোখে সেই একই কঠিন চাহনি। কিন্তু এখন সে অবাক হয়ে ঈশানীর দিকে তাকিয়ে আছে।
পাশ থেকে গণেশ এগিয়ে এল। “আরে বস, পড়ে গেছেন কীভাবে! উঠুন…”
গণেশ কাদেরকে ধরে তুলতে গিয়েই অন্যদিকে তাকাল। গনেশ দেখতে পেল ঈশানীকে। তার চোখও বড় হয়ে গেল।
“বস… পালান!” গণেশ চিৎকার করে উঠল।
দুজন মোড়ের দিকে দৌড় দিল।
ঈশানীর শরীর যেন বিদ্যুৎ লাগল। সেও দৌড়াল। কিন্তু শাড়ি। পায়ে জড়িয়ে যাচ্ছে। সে একহাতে শাড়ির ঘের তুলে ধরে দৌড়াতে লাগল। বাজারের ব্যাগ পড়ে রইল পেছনে। সবজি ছড়িয়ে আছে রাস্তায়। সে আর ফিরে তাকাল না।
কাদের আর গণেশ সামনের গলির ভেতর ঢুকে গেল। ঈশানী পেছনে পড়ে যাচ্ছে। শাড়ি নিয়ে আর দৌড়ানো যাচ্ছে না। সে রাস্তায় দাঁড়িয়ে একটা টোটো থামাল।
“দাদা, ওই দুইজনকে ফলো করুন! তাড়াতাড়ি!”
টোটো ছুটল। ঈশানী পিছনের সিটে বসে হাঁপাতে হাঁপাতে তাকিয়ে রইল সামনের দিকে। বুকের ভেতর ধুকপুক করছে। রাগ, ভয়, আর এক অদ্ভুত উত্তেজনা একসঙ্গে নাচছে।
দুই মাস পর। আবার কাদের।