গোধূলি আলো'র গল্পগুচ্ছ - অধ্যায় ২৯
কথা দিলেও সেই কথা রাখতে পারি নি। শাহেদের সামনে নিজেকে স্বাভাবিক রাখাটা আর সম্ভব হয় নি আমার জন্য। কথা বলতে গেলেও তা জড়িয়ে যেতো। বিষয়টি শাহেদও বুঝতো। একদিন অফিসে যাবার আগে সে আমাকে বলল, আজ রাতে আমার ঘরে আসবেন। কথা আছে।
আমি অভিমান করে বললাম, রাতে তোমার ঘরে যেতে তুমিই তো বারণ করেছিলে।
শাহেদ হেসে বলল, ঠিক আছে। এখন আমি নিজেই আবার যেতে বলছি।
আমি - তুমি যখন খুশি মানা করবে আবার যখন খুশি যেতে বলবে আর আমি বুঝি তোমার কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করবো?
শাহেদ - কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। আমি দরজা খোলা রাখবো। ঘুমিয়ে পড়লে আমাকে ডেকে তুলবেন।
আমি - আচ্ছা, ঠিক আছে।
রাতে শাহেদের ঘরে ওর পাশাপাশি বসে আমি সংকোচে মরে যাচ্ছিলাম। সেই রাত্রির স্মৃতিগুলো বারবার মনে আসছিলো আর আমি মাটির সাথে মিশে যাচ্ছিলাম। আমাকে সহজ করে তুলতে শাহেদ বলল, আপনার সাথে আমার যতো যাই ঘটুক, আপনি আমার মা সেটাই আপনার বড় পরিচয় আমার কাছে। আর সেই সূত্রে পৃথিবীতে আমার সবচেয়ে শ্রদ্ধাভাজন মানুষটাও আপনি। যতো যাই ঘটুক আমাদের মাঝে এই শ্রদ্ধা আর কিছুতেই কমবে না।
আমি - এতো ভনিতা না করে যা বলতে ডেকেছ তাই বলে ফেলো।
শাহেদ কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে বলল, আমি জানি আপনি চাইলেও আর আমার সাথে সহজ হতে পারছেন না। হয়তো সারা জীবনেও আর পারবেন না। তাই এর একটা সমাধান হওয়া উচিত।
আমি - কী সমাধান চাও তুমি?
শাহেদ - সেদিন রাতে আপনি চলে যাবার পর সারা রাত আর ঘুম হয় নি। আপনার কথাগুলো বারবার মনে আসছিল আর আপনার প্রতি স্নেহে, প্রেমে মনটা ভরে উঠছিল। ইচ্ছে হয়েছিল পরদিন সকালেই আপনাকে বলি যে আপনার প্রস্তাবে আমি রাজি। কিন্তু আবার এটাও মনে আসছিল যে এতো বড় একটা সিদ্ধান্তে আসার আগে আরো ভাবা উচিত।
আমি প্রখর দৃষ্টিতে শাহেদের মুখের দিকে তাকিয়ে বললাম, তো কী ভাবলে?
শাহেদ - আমাকে ছাড়া কী আপনার কোনোভাবেই চলবে না? আপনি তো চাইলেই অন্য কাউকে বিয়ে করে নতুন ভাবে সংসার সাজাতে পারেন। আর বাবা, বোনদের না হয় আমিই দেখলাম।
আমি - তুমি সারাদিন থাকো অফিসে। ওদের কিভাবে দেখবে তুমি? ওদের দেখাশোনার জন্য যদি একজন লোক রাখো বা তুমি নিজেই কাউকে বিয়ে করো সে রকম কেউ এসে কি তোমার বাবা, বোনদের ঠিক ভাবে যত্ন নেবে? কাজের লোক এসে যা তা স্বেচ্ছাচারিতা করবে আর তোমার বৌ এসে তোমার বাবা, বোনদের বাড়তি ঝামেলা মনে করবে। দুই ক্ষেত্রেই এই পরিবারটি উচ্ছন্নে যাবে। আর আমিও কি এই বয়সে এসে আমার এতদিনের সংসার, স্বামী, সন্তানদের ছেড়ে নতুন একটা জায়গায় গিয়ে মানিয়ে নিতে পারবো? সুখী হতে পারবো? কখনোই না।