গোধূলি আলো'র গল্পগুচ্ছ - অধ্যায় ৫০
হাজারো প্রতিকূলতার ভেতরেও মঈন ইন্টারে গোল্ডেন এ প্লাস পেলো। এরপর ইন্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটির জন্য ভর্তি কোচিং করে বুয়েটে তার ভর্তিও নিশ্চিত হলো। এরপর একদিন সে আমাকে বললো, মা আমাদের ভবিষ্যৎ তো এখন অনেকটাই নিশ্চিত। তাই ভাবছি এই নরককুন্ডে আর থাকবো না। আমি এখন টিউশনি করেই হাজার হাজার টাকা কামাতে পারবো। আর তাই দিয়ে আমাদের মা-ছেলের কোনো রকমে চলেই যাবে।
আমি মৃদু হেসে বলি, নারে। সারাদিন টিউশনি করালে পড়াশোনা কখন করবি? তার চেয়ে দু একটা টিউশনি করে নিজের পড়ার খরচ নিজে চালাতে পারলেই যথেষ্ট। আমি একেবারে ঘরে বসে না থেকে কিছু একটা করলেই সংসার চলে যাবে।
মঈন অবাক হয়ে বললো, তুমি আবার কি করবে?
আমি বললাম, পড়াশোনা তো করি নি তেমন। তবে গার্মেন্টসের চাকরি তো করতে পারবো।
মঈন আপত্তি জানিয়ে বললো, না। ওসব জায়গায় পরিশ্রম অনেক করতে হয়। আর তাছাড়া তোমার লেভেলের একজন মহিলা ওখানে যারা কাজ করে তাদের সাথে মানিয়ে চলতে পারবে না।
আমি - দুঃসময়ে সব কিছুর সাথেই মানিয়ে চলতে হয়। আমরা যদি বাইরে ঘর নিয়ে ভাড়া থাকতে যাই তাহলে সেখানেই কি মনের মতো পরিবেশ পাবো? কখনোই না। কিন্তু মানিয়ে নিতে হবে। আর কাজের বেলাতেও তাই। তুই আর অমত করিস না বাবা। এই বাড়িতে আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। কোনোভাবে এখান থেকে বেরোতে পারলেই হয়।
সব শুনে অনিচ্ছা সত্ত্বেও মঈন তার সম্মতি দিলো।
পরের মাসেই আমরা নতুন ঘরে চলে আসলাম। একটাই রুম আর তার সাথে একটা বাথরুম। রান্নাঘর বাইরে যেখানে অন্যসব ভাড়াটিয়ারাও রান্না করে। শৈশব থেকেই দুঃখ - কষ্টের ভেতর থাকলেও এমন পরিবেশে থাকতে হয় নি। মানিয়ে নিতে কষ্ট হচ্ছিল। কিন্তু নিজের চেয়ে ছেলেটার জন্য কষ্টের পরিমাণ ছিল বেশি। ওর তো কোনো দোষ নেই। নিজের জিদ আর প্রতিশোধের বশে ওকে নিজের বাবার বাড়ির সুন্দর একটা পরিবেশ থেকে যেখানে সেখানে টেনে নিচ্ছি আমি। নিজেকে বড্ড বেশি অপরাধী মনে হয়। যদিও এই নিয়ে মঈন কোনোদিন কোনো অভিযোগ করে নি আমার কাছে। বরং ভাড়া বাসায় আসার পর তাকে বেশ সুখীই মনে হয়। আর আমিও অন্তত মামার বাড়ি থেকে এখানে বেশি ভালো আছি। সারা দিনের হাড় ভাঙা খাটুনির পর বিছানায় যখন মঈন আমাকে তার বুকে চেপে ধরে তখন সব কষ্ট মুছে গিয়ে খুশির ফোয়ারা ছোটে আমার মনের ভেতর। মঈনের বুকে মাথা রেখে মনে হয় আমি যেনো পরিপূর্ণ সুখী।