কমিউনিটি সার্ভিস - অধ্যায় ১
১ম পর্ব
১.১
আসরের ওয়াক্তে দানিয়েল ভাইকে দেখলাম আমার কাতারে, ডানদিকে। বেশ পেরেশান লাগছিল ওনাকে। খেয়াল করলাম ফরয পড়েই উঠে পড়লেন, বসলেন না।
আমি ইমামের সঙ্গে দোয়া পড়ে আস্তে ধীরে মসজিদের বারান্দায় গিয়ে ভাইকে পেলাম। আনমনে বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে আছেন।
- কেমন আছেন ভাই? কোন ঝামেলা হলো নাকি?
দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়ানো, আমার প্রশ্নে সচেতন হলেন।
- হামিদুল, কি খবর তোমার?
- আলহামদুলিল্লাহ। দেখা সাক্ষাৎ নেই, থাকেন কই?
- আর বলোনা, ফ্যামিলি ইস্যু নিয়ে ঝামেলায় আছি।
বলার ধরণে মনে হল বেশ চিন্তিত।
- কি হলো? আপনাদের তো হ্যাপী ফ্যামিলি।
আমি কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করি। দানিয়েল ভাইয়ের বয়স ত্রিশ-বত্রিশ, সুদর্শন। আমার চেয়ে বছর ছয়-সাত বড়। লম্বা চওড়া, মুখে খোঁচা খোঁচা চাপদাঁড়ি। একটা পাবলিকেশন্সে চাকরি করেন। জামাই-বৌয়ের ছোট পরিবার।
- কাজটাজ আছে তোমার আজ কোন?
আমার কথা শুনতে পাননি এমন করে জিজ্ঞেস করে ভাই।
- না, আমার আর কাজ কি। মাগরিবের আগে একটা প্রাইভেট পড়াতে হবে। ...আপনি যান নাই অফিসে?
- যাইনি আজ.. মাগরিবের পর একটু আমার সঙ্গে বেরোতে পারবে?
- পারব তো.. কেউ কিছু বলেছে নাকি?
- হাহাহ... আরে না। কেন?
দানিয়েল ভাই সব সময় দাঁড়ি-টুপিতে থাকেন, সুন্নতী লেবাস থাকে গায়ে। কেউ কোন ঝামেলা করল কিনা ভাবছিলাম।
- মনে হল ভয়ে ভয়ে আছেন।
- একটু দুশ্চিন্তায় আছি, আর কিছুনা। সন্ধ্যায় বের হয়ো আমার সঙ্গে, ইনশাল্লা সমাধান হয়ে যাবে।
প্রাইভেট পড়ানো শেষ করে মাগরিবের সময় মসজিদে এসে দেখি বারান্দায় দানিয়েল ভাই দাঁড়িয়ে। আমাকে দেখে চোখ ঝিলিক দিয়ে উঠল। মনে হলো অপেক্ষা করছিলেন।
ভেতরে ঢুকে ভাই ডেকে নিয়ে গেলেন এক কোণে। কয়েকজন বসে আছে সেখানে।
- আসসালামু আলাইকুম মওলানা সাহেব।
লোকাল মাদ্রাসার পরিচালক আরো তিনজনকে নিয়ে গোল হয়ে বসে আছেন। আমি গিয়ে সালাম জানালাম। সবাই জবাব দিল সালামের।
- কেমন আছেন হামিদুল ভাই?
কাঁচা দাঁড়িঅলা কম বয়সী একজন জিজ্ঞেস করল।
- আলহামদুলিল্লাহ। আপনারা গোলমিটিংয়ে বসলেন যে নামাজের আগে? দানিয়েল ভাই ধরে নিয়ে এল নাকি?
মজা করে জিজ্ঞেস করি।
- হ্যাঁ, বলতে পারেন। ...মওলানা সাহেব, এখন আলাপ করবেন?
সফেদ জোব্বা, সফেদ দাঁড়িতে শোভিত বয়ষ্ক মওলানা এতক্ষণ চুপচাপ তজবি জপছিলেন। প্রশ্ন আসতে মুখ খুললেন।
- জামাত হোক। বেরিয়ে আলাপ আলোচনা হবে।
মওলানার কথার পর আর কোন কথা নেই। কি হচ্ছে, আমার জানতে খুব ইচ্ছে করছে। কিন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া বোধহয় গতি নেই।
অন্যদিন মাগরিবের পর মসজিদে আমরা যারা থাকি একটু বসা হয়। আজ সুন্নত পড়েই দানিয়েল ভাই আমাকে আর মওলানা সাহেবদের দলটাকে নিয়ে বেরোল দ্রুত।
- বাবুল ভাই, কি হচ্ছে বলেন তো? বড়সড় দাওয়াত আছে নাকি?
বাবুল ভাই, দানিয়েল ভাইয়ের ভাল বন্ধু। দুজনেই বেশ লেবাসধারী এবং ধার্মিক মনষ্ক। দানিয়েল ভাই দাঁড়িতে একটা পরিষ্কার কাটিং দিয়ে রাখলেও বাবুল ভাই বাড়তে দিয়েছেন, ফলে ঝাড়ুর মত দেখায়। দেখে যাই মনে হোক, উনি একটা আইটি কোম্পানিতে ভাল পদে আছেন।
- আজ খাওয়াদাওয়ার আয়োজন তেমন নেই।
খাওয়াদাওয়ার কথা জিজ্ঞেস করার কারণ, মাঝে মাঝেই মাদ্রাসায়, ব্যবসায়ের মিলাদে বা কারো বাসা-বাড়িতে দাওয়াত থাকে হুজুরগোছের মানুষের। মওলানা সাহেবের সঙ্গে সেরকম দাওয়াতে আগেও গিয়েছি।
ভাই মাথা নেড়ে বলে আমার হাত ধরলেন। বাবুল ভাই নিশ্চই কিছু বলবেন। হাতের তালুয় তালু চেপে ধরেছেন, হাঁটছি আমরা অন্যদের পিছু পিছু। অন্যদের বলতে মওলানা সাহেব, আর তার সঙ্গে আমার মুখচেনা দুজন পয়ত্রিশ-ছত্রিশ বছর বয়সী লোক।
- যাচ্ছি কোথায় বলুন তো, কমিউনিটির দিকে?
- জ্বি, জ্বি।
ব্যস্ত শহরের এই এলাকায় কয়েকটা গলি আছে বেশ ঠান্ডা। কোয়ার্টার এরিয়া বলে বাড়তি মানুষ কম, কম বয়সী ছেলেমেয়ে বেশি।
সরকারি কোয়ার্টারগুলোর পেছনে দুটো বহুতল বিল্ডিং দানিয়েল ভাইদের কমিউনিটি। ধর্মীয় চেতনাসম্পন্ন লোকজন একসঙ্গে বিল্ডিং দুটিতে ভাড়া থাকছেন বেশ কবছর ধরে। কমিউনিটি ক্রমাগত বড় হচ্ছ।
- হামিদুল ভাই কোন মাসে যেন উঠছেন আমাদের বিল্ডিংয়ে?
বাবুল ভাই জিজ্ঞেস করেন।
- দুমাস পরই উঠছি।
আমি আপাতত এক রুমের বাসা নিয়ে মেসের মত থাকছি মসজিদের কাছে। এপার্টমেন্ট ভাড়া নেয়া হয়েছে দানিয়েল ভাইদের কমিউনিটিতে বাস করার তাগিদে। এতদিন একা একা মুভ করা সম্ভব ছিলনা। এবার গ্রাম থেকে বৌকে নিয়ে আসব পাকা করেছি।
- দানিয়েল কিছু বলেছে ওর বিপদের কথা?
বাবুল ভাই জিজ্ঞেস করে কিছুক্ষণ নীরবতার পর।
- না, কি হয়েছে বলুন তো।
- পারিবারিক ঝামেলা।
- কি, ভাবী রাগ করে বাপের বাড়ি চলে গেছে নাকি?
একটু মজা করেই বলি।
- তা গেছে, কিন্ত আগে ঝগড়া হয়েছে দুজনের বেশ বড়সড়।
- ওহ, কি নিয়ে?
- বিস্তারিত তো জানিনা। তবে সমস্যা হয়েছে, ঝগড়া ছাড়াছাড়িতে গিয়ে ঠেকেছে। তালাক হয়ে গেছে!
বাবুল ভাই এটুকু বলেই চুপ হয়ে গেলেন।
- আজব মানুষ.. দুজনের না কত মিল-মহব্বত?
আমি অবাক হলাম তালাকের কথা শুনে।
- মহব্বত বেশি হলে তিক্ততাও বেশি হয়। সে যাই হোক, আজ সমাধান করার চেষ্টা চলছে।
- কোথায় যাচ্ছি তাহলে এখন, ভাইয়ের বাসায়?
- দেখি ওনারা কোনদিকে যায়।
আমরা দুজনে আস্তে আস্তে হেঁটে কথা বলতে বলতে পিছিয়ে পড়েছি। সামনে চারজনের দলটা বেশ এগিয়ে গেছে।
আমরা কোয়ার্টার আর কমিউনিটির বিল্ডিংদুটো ছাড়িয়ে আরেকটা গলি ধরে এগোচ্ছি। এদিকে ঢোকার মানে হল মাদ্রাসায় যাচ্ছি।
মওলানা সাহেব পরিচালনার দায়িত্বে আছেন মাদ্রাসাটির। কমিউনিটির বাচ্চাকাচ্চা ছাড়াও সরকারি কোয়ার্টারের লোকজন বাচ্চাদের পড়ায় এখানে।
ইদানিং বাচ্চাদের মাদ্রাসায় পড়ানোর ট্রেন্ড চালু হয়েছে খুব। ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার যা-ই বানাক, আগে মাদ্রাসায় পড়িয়ে কোরান-হাদিসের প্রাথমিক পাঠ শিশুদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন অবিভাবকরা।
মাদ্রাসার পকেট গেট দিয়ে ঢুকতে গিয়ে ঠান্ডা বাতাসের দমকে পাতলা পাঞ্জাবি পড়া শরীরে কাঁটা দিল। ভেতরে তিন-চারটা লম্বা লম্বা টিনশেড ঘরে পাঠদান চলে। দেখলাম শিশু থেকে কিশোর বয়সী কিছু ছেলে ভেতরে ঘোরাঘোরি করছে। ক্লাসরুমে ক্লাসরুমে জোরে জোরে পড়ার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। রাতের পড়া চলছে পুরোদমে।
সকালে কম বয়সী নাবালিকা মেয়েদেরও পড়ানো হয় এখানে। একটা মহিলা মাদ্রাসার জন্য জমি সংগ্রহে বেশ দৌড়াদৌড়ি করছে মওলানা সাহেব।
আমরা মওলানা সাহেবের অফিসে ঢুকে বসলাম। চেয়ার-টেবিল নেই রুমে। দামী নরম ইম্পরর্টেড কার্পেটে বসলে অবশ্য চেয়ারের অভাব বোধ হয়না।
- স্টুডেন্ট তো ভালই আছে দেখছি।
বাবুল ভাই মন্তব্য করেন।
- মাশাল্লাহ যেমন আশা করেছিলাম তারচে বেশি।
মওলানা সাহেব তৃপ্তি নিয়ে বলেন।
- মহিলা মাদ্রাসার কাজ কতদূর?
- জমি কালেক্ট করার চেষ্টা চলছে। খালপাড়ে একটা জায়গা ভরাট করে দেবে বলে আশ্বাস দিয়েছে এমপি সাহেব।
- মাশাল্লাহ! কবে জবান দিল?
- বলেছে কয়েকবার। তবে সময় লাগছে। আওয়ামী লোক হলেও দ্বীনের কাজে কমবেশি থাকেন উনি।
মওলানা সাহেব আশান্বিতভাবে বলেন।
- এদের বিশ্বাস নেই, মনে মনে সব কুফরী।
বাবুল ভাই সখেদে বলেন। আমাদের মধ্যে উনি পলিটিক্যালি ইনভেস্টেড বেশি। একসময় জামাতের সঙ্গে ছিলেন, এখন সময় খারাপ বলে কওমীদের সঙ্গে ঘোরেন। দানিয়েল ভাই ছুপা জামাত, সংগঠনের বাইরে কাওকে কিছু বলেন না। আমিই এই রুমের একমাত্র বান্দা যার পলিটিক্যাল চিন্তাভাবনা শূণ্য।
- থাক, বাবুল। আল্লাহ খারাপের অছিলায় ভাল করায় অনেক সময়।
মওলানা সাহেব আর কথা বাড়াতে চাইলেন না। আমিও বাবুল ভাইয়ের পলিটিক্যাল টোন পছন্দ করলাম না। হয়তো আমার রাজনৈতিক কর্মকান্ডে সংযুক্তি নেই বলেই। আমি অত সিরিয়াস ধার্মিকও না। এইযে শ্যামলা-কালো বদনে খোচা খোচা দাঁড়ি, এর কারণ শেভ করতে আলসেমি। দানিয়েল ভাইয়ের সঙ্গে ঢাকায় ভার্সিটিতে পড়ার সময় পরিচয়, এরপর থেকে টিউশানি করছি। সে পরিচয়ের সূত্রেই মসজিদে আনাগোনা।
- এইযে ব্যাটা, তোমার নাম যেন কি? হামিদুল্লাহ না?
হঠাৎ আমার দিকে তাকালেন মওলানা সাহেব।
- হুজুর, হামিদুল ইসলাম।
- আলাপ আছে তোমার সাথে, এসো তো...
একফুট উচু একটা টেবিলের পেছনে একা বসা ছিলেন, আমাকে ডেকে নিয়ে গেলেন। একটা লাল মখমলি তাকিয়া কোলে নিয়ে বসে আছেন শ্বেতশুভ্র লোকটি। আমি পাশে গিয়ে বসতে ডান হাতটা ধরে হ্যান্ডশেকের মত ঝাঁকিয়ে দিলেন, কিন্ত ছাড়লেন না। লোকটার গায়ে সবসময়ই ইম্পোর্টেড দামী আতরের ঘ্রাণ পাওয়া যায়। যত দামীই হোক, আমার কাছে অতিমিষ্ট লাগে।
- নামটাম ভুলে যাই, ভাল বিপদ। আমরা তো সকালে মাঝেমাঝে হাঁটি, নাকি?
হুজুর আফসোসের মত বলেন।
- জ্বি, ফজরের পর।
আমি হেসে বলি। সকাল সকাল আমরা কয়েকজন মিলে হাঁটতে বেরোই মাঝে মাঝে। শহর ব্যস্ত হয়ে ওঠার আগে একটু সতেজ হাওয়া পাওয়া যায় মেইন রোড ধরে হাঁটলে।
- তা কি করছ ব্যাটা, চাকরি-বাকরি?
- টিউশানি করছি। চাকরির জন্য পড়ালেখা চলছে, ইনশাল্লা ভালকিছু হবে।
- হবে, হবে, চেষ্টা করো। বড় বড় পজিশনে দরকার আমাদের লোক...
বলতে বলতে অন্যদের দিকে মুখ ফেরালেন। মনে হল কিছু বলার প্রস্ততি নিচ্ছেন। কোন পলিটিক্যাল ক্যারফা যদি হয় তবে ভালয় ভালয় কেটে পড়তে হবে। এনারা নিজেদের লোক রিক্রুট করে প্রশাসনে ঢোকানোর লম্বা প্রজেক্ট হাতে নিয়ে রেখেছেন। সরকার দলীয় ফ্যামিলির ছেলেপেলে, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান-নাতি যা পাচ্ছে ধরে ব্রেইনওয়াশ দিয়ে কোটায় ঢুকিয়ে দিচ্ছে।
- হুজুর, রাতের খাবারের সময় হয়ে যাবে।
বাবুল ভাই কিসের যেন তাগাদা দিলেন। হুজুর মাথা ঝাঁকালেন।
- ব্যাটা, দানিয়েল কি হয় তোমার?
- বড় ভাই, বেশ কয়েক বছরের পরিচয়।
হুজুর কি বলবেন বা অন্যরা ওনাকে দিয়ে কি বলাতে চাচ্ছেন তা নিয়ে প্রচন্ড কৌতূহল বেড়ে চলেছে। ঠিক ভয় পাচ্ছিনা, কিন্ত লুকোছাপাটা অসহ্য হয়ে উঠছে ক্রমে।
- ওর যে একটা বিপদ এসেছে শুনেছো কি?
- সবকিছু তো জানিনা। তবে, জ্বি, বাবুল ভাই বললেন একটু আগে।
- বিপদ-আপদে ভাইয়ের পাশে তো ভাইয়েরাই থাকে, তাইনা?
- তা তো অবশ্যই। আমি কিন্ত হুজুর আমার গুরুত্বটা বুঝতে পারছিনা।
সোজাসোজি বললাম আমার মনের কথাটা।
- হ্যাঁ, বুঝবে বুঝবে। তুমি কি, দানিয়েল-বাবুলদের সঙ্গে থাকো?
- না, মসজিদের পাশে একটা ছোট বাসায় আছি আপাতত একা একা।
- তাহলে বান্দা ব্যাচেলর?
হাসিহাসি চোখে জিজ্ঞেস করেন হুজুর।
- না, বিয়ে করেছি মাস দুয়েক হয়েছে। দানিয়েল ভাইরা গিয়েছিলেন বিয়েতে গ্রামের বাড়ি।
- আচ্ছা, বৌমা কি.. বাপের বাড়ি?
- হ্যাঁ। আরো মাস দুয়েক থাকবে। পরে নিয়ে আসব এখানে।
- তাহলে এখন তো স্বাধীন। খুব ভাল, খুব ভাল!
কেন যেন খুশি হলেন শুনে।
- দানিয়েলের সমাধানের পথ বেরিয়েছে, বুঝলে। দুজনে রাজি হয়েছে ফিরে আসতে।
- মারহাবা!
আমি খুশি হই শুনে।
- এই তো গেল ভাল খবর। তার সঙ্গে একটু জটিলতা আছে। ওদের তো তালাক হয়ে গেছে এরমধ্যে, শুনেছ তো?
- জ্বি।
- এক-দুই-তিন তালাক দিয়ে দিয়েছে দানিয়েল। এখন তো ওই মেয়ে তোমার ভাইয়ের জন্য হারাম হয়ে গেছে!
আমি এটুকু শুনে সামনে বসা সবার দিকে তাকালাম আড়চোখে। দানিয়েল ভাইকে মাথা নিচু করে বসে থাকতে দেখা গেল।
- তিন তালাক হলে তো... জ্বি জ্বি। এখন কি হবে?
- মেয়েটা তো ওর জন্য হারাম হয়ে গেছে। সমাধান হলো আবার হালাল করতে হবে।
- হারাম বৌকে হালাল করা... হুজুর কিসের কথা বলছেন?
এয়ার কন্ডিশন্ড ঘরের মধ্যে আমার গরম লাগতে শুরু করল হুজুরের কথার গতি-প্রকৃতি আঁচ করে।
- তুমি বুদ্ধিমান ছেলে, বাবুল বলেছে। বুঝতে পেরেছো নিশ্চই।
- হিল্লা বিয়ে পড়ানোর কথা বলছেন নাতো?
সোজাসাপ্টা সন্দেহটা জানিয়ে দিলাম।
- জ্বি বাবা!
- আমি তো জানি হিল্লা বিয়ে সঠিক নয়।
- মত-দ্বিমত আছে, সত্য। কিন্ত এই ছাড়া কোন পথ তো নেই।
মওলানা সাহেবের জবাব।
- তালাকের ব্যাপারটাও তো বিবেচনা করা দরকার। রাগের মাথায় তিন তালাক বলে দিলে তো হয়না শুনেছি।
- রাগের মাথায় বলে দিলে হয়না। দানিয়েলরা তো অনেকদিন ঝগড়া করেছে চুপিচপি। আমাদের বললে মিটমাট করাতাম, বোঝাতাম আগেভাগে। তিনবার আলাদা আলাদা করে তালাক দেয়া হয়ে গেছে। এটা ফাইনাল, কোন সন্দেহ নেই।
- হুজুর কি বলে, ভাই?
আমি পরিস্থিতিটা কোনদিকে গড়াচ্ছে কিছুটা আঁচ করতে পারছি, কিছুটা ধোঁয়াশা। সরাসরি কালপ্রিটকেই ধরলাম। আমার দিকে করুণ চোখে তাকালেন। কাঁধ নামিয়ে ঝুঁকে গেলেন।
- আমার উপকারটা করো ভাই। তুমি দয়া না করলে দুশ্চিন্তায় কাজকরর্ম কিছু হচ্ছেনা।
হঠাৎ দানিয়েল ভাই প্রায় হাতজোর করে কাঁদোকাঁদো গলায় মিনমিন করতে শুরু করলেন। আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম।
- আমাকে দিয়েই কেন.. উমফফ.. কমিউনিটিতে লোকজন আছে কতো...
এড়ানোর জন্য মুখে যা আসে বলছি এলোমেলোভাবে। গুছিয়ে অজুহাত তৈরি করতে পারছিনা। গরম লাগছে, পাঞ্জাবিটা পিঠে ঘেমে লেপ্টে যাচ্ছে। এসিটা কি বন্ধ হয়ে গেল নাকি!
- কমিউনিটির সবার ওয়াইফ আছে। তুমি চুপচাপ কাজটা করে দাও, ভাবীও জানবেনা।
আমাকে বিয়ে করতে হবে একটা। দানিয়েল ভাইয়ের রাগে-অভিমানে তালাক দেয়া বৌকে। এটা নিয়েই তাহলে আজকের দেন-দরবার! দম বন্ধ করা হয়ে যাচ্ছে পরিস্থিতিটা। নেহাৎ ভদ্রতার বশে উঠে না গিয়ে বসে থাকলাম।
- জানবেনা? এমন একটা ঘটনা স্ত্রীর কাছে লুকালে কিভাবে হয়? ওর অনুমতি চাইব কিভাবে? না ভাই...
- অনুমতি কিসের? পুরুষ মানুষের দ্বিতীয় বিয়ে করতে অনুমতি লাগে, কই পেয়েছ এমন কথা?
মওলানা সাহেব এবার দৃঢ় গলায় জিজ্ঞেস করলেন। আমার হাতটা সেই কখন থেকে চেপে ধরে আছেন, একটু চাপ দিলেন।
- না, মানে, লাগার তো কথা।
- কিচ্ছু লাগবেনা।
হুজুরের দৃঢ় কন্ঠের বিপরীতে কিছু বলার সাহস পেলাম না।
- ভাবী সাহেবা জানেন?
শেষ চেষ্টা হিসেবে পাত্রীর সম্মতির কথা জিজ্ঞেস করি।
- সে এক পায়ে খাড়া। বিকাল থেকে মাদ্রাসার মসজিদে বসা আছে। ওঠো তোমরা। এশার আগে বিয়ে পড়িয়ে ফেলি।
বাবুল ভাই মুখ খোলেন এবার। উঠে দাঁড়িয়ে আমার হাত ধরে টেনে তোলেন।
- হামিদুল, অযু আছে? চলো অযু করে আসি।
হুজুরের রুম থেকে বেরিয়ে বাবুল ভাই আমাকে নিয়ে টিনশেড বিল্ডিংয়ে শিক্ষকদের জন্য নির্ধারিত ওয়াশরুমে নিয়ে গেলেন। টাইল করা ছোটখাট অযুখানা, বেসিন-আয়না আর টয়লেট সবই আছে। বাথরুম ফিটিংসগুলো ডোনেট করেছে মসজিদ কমিটির এক লোক, বড় ব্যবসায়ী। কেনার দিন আমাদের নিয়ে গিয়েছিলেন মওলানা সাহেব।
আমার অযু আছে, তবু ভাই ধরে আনায় অযু করে নিলাম। ঠান্ডা পনি চোখেুখে পড়ায় অস্বস্তিকর অবস্থা থেকে একটু পরিত্রাণ মিলল।
- ভাবীকে বিকেলে ওনার বড় ভাই দিয়ে গেছে এই গ্যাঞ্জামের মধ্যে, লম্বা জার্নি করে এসেছে বাসে। ওরা অনেক ঝামেলা করে আয়োজন করেছে, এখন তোমার সিদ্ধান্ত।
অযু করে আয়ানার সামনে দাঁড়িয়ে বলেন ভাই। কওমীরা কিসব ইস্যুতে দক্ষিণাঞ্চলে পুলিশ-সরকার দলীয় লোকজনের সঙ্গে হাঙ্গামা করছে। ভাবীর গ্রামের বাড়ি ওদিকেই কোথায় যেন। তো, 'সিদ্ধান্ত' ভদ্রভাবে কেমন করে বলব ঠাহর করতে পারছিনা।
- হামিদুল, ভয় পেয়ো না।
ভেজা হাত পিঠে রেখে বলেন।
- আমার ভাল লাগছেনা ভাই। ওয়াইফ না থাকলে কোন আপত্তি করতাম না।
অজুহাত হিসেবে বলি।
- সমস্যা তো কিছু নেই। কাবিন-রেজিস্ট্রি হবেনা, দুই সাক্ষীর সঙ্গে কবুল বলবে শুধু।
আইনি কোনধরণের জটিলতায় পড়ার বা প্রমাণ থাকবার যে ভয় নেই, তা বুঝিয়ে বলেন বাবুল ভাই।
এক লহমার জন্য বিয়ে করায় বীরত্ব বা ভয়ের কিছু নেই। কিন্ত এই কথা কোনভাবে কখনো স্ত্রী শুনলে কি হবে তা আন্দাজ করলেই মনে সায় দেয়না।
- তুমি ভয় পেয়োনা। তবু যদি পারবেনা মনে কর, তবে চলে যেতে পার এখুনি। আমি ওনাদের বুঝিয়ে বলব। মনে করো এই বিযয়ে কোন আলোচনা কখনো হয়নি।
বাবুল ভাই আমার চোখের দিকে ধারালো কিন্ত নম্র নজর রেখে অফার করলেন। কয়েক সেকেন্ড চেষ্টা করলাম, কিন্ত ভাইয়ের চোখে চোখ রেখে মনের সিদ্ধান্ত মুখে আনা গেলনা।
***********
বাবুল ভাইয়ের সঙ্গে মওলানা সাহেবের অফিসে ফিরে আসায় সবার মুখ হাসিহাসি হয়েছে। আমাকে কি যেন বলে বাহবা দিয়ে ওঠেন মওলানা সাহেব। চিন্তাগ্রস্থ থাকায় ঠিক কানে যায়নি।
বয়ষ্ক হাতের শক্ত মুঠোয় আমাকে মোটামোটি টেনে নিয়ে যাচ্ছেন। পেছন পেছন আসছে বাকিরা।
মাদ্রাসার এক কোণে মসজিদ। এখানকার ছাত্র-শিক্ষকরা এখানেই নামাজ আদায় করেন। এই মসজিদটায় তেমন জাঁকজমক নেই। টিনশেড মসজিদ, চওড়া করে বানানো আবাসিক ছাত্রদের স্থান সংকুলানের জন্য।
মসজিদের ভেতরে এখন প্রায় ফাঁকা। দুজনকে বসে থাকতে দেখলাম। আমাদের দেখে এগিয়ে এলো।
- ভাবীসাহেবা, চলে আসুন। সবাই এসে গেছে!
বাবুল ভাই পেছনে এক কোণের দিকে তাকিয়ে হাঁক দিলেন। আমরা মসজিদের মাঝে গোল হয়ে বসে পড়লাম।
আগে থেকে বসে থাকা একজন লোক একটা কাগজে আমার পুরো নাম, বাবার নাম, ঠিকানা সব লিখে নিল।
- মেয়ের ডিটেলস নেওয়া হয়েছে?
মওলানা জিজ্ঞেস করলেন।
- দানিয়েল ভাই দিয়েছে।
- আচ্ছা।
মসজিদের বাঁ কোণে কিছুটা জায়গা কালো কাপড় দিয়ে ঘেরা, পর্দা করা। শুধু পুরুষ মাদ্রাসা হলে এখানে নারীর কোন কারবার থাকতনা। তবে এখানে কিন্ডারগার্টেন সমমানের লেভেলে মেয়ে-ছেলে উভয় স্টুডেন্টই আছে। ক্লাস আলাদা হয়, মেয়েদের ক্লাস করানোর জন্য শিক্ষিকা আছেন তিন-চারজন। তাদের বিশ্রাম আর এবাদতের জন্য জায়গাটুকু ভাগ করা। রাতে অবশ্য কোন শিক্ষিকা থাকেনা।
আমাদের গুঞ্জন থেমে গেল সেখান থেকে বোরখা মোড়া একজনকে আসতে দেখে। বেশ দ্রুতপায়ে আমাদের দিকে আসছে। সমগ্র শরীর কালো কাপড়ে মোড়া।
বোরকা-নিকাব তো আছে, হাতে-পায়ে রয়েছে কালো মোজা। খুব সরু বা মোটা নয়, হাঁটার ধরণ দৃপ্ত।
- আসসালামু আলাইকুম।
কাছে এসে সালাম দিল নারীটি। সুমিষ্ট গলার আওয়াজ। সমস্বরে সালাম গ্রহণ করে সবাই।
- এ্যাই, তুমি সরো, জায়গা দাও... মা, তুমি বসো এখানে...
মওলানা সাহেব আমার পাশে বসা লোকটিকে সরিয়ে দেন। নারীটি আমার বাঁ পাশে একটু জায়গা ফাঁকা রেখে বসে পড়ে। হ্যাঁ, এটিই তবে দানিয়েল ভাইয়ের অতীত-ভবিষ্যত স্ত্রী!
- দেখে নাও, জামাই পছন্দ হয় কিনা!
হুজুর হেসে বলেন।
- আপনারা দেখলেই আমার দেখা হয়েছে।
খুবই ভদ্র নরম গলায় বলে মেয়েটি। আওয়াজ থেকে বয়স আন্দাজ করা যায়না, পনেরো-পচিশ-পয়ত্রিশ সবই হতে পারে। সে আমার দিকে চোখ তুলে তাকায়নি এখনো।
সূরা-দুরুদ পড়ে প্রস্ততি শুরু হয়ে গেল খুব দ্রুত। তারপর বিয়ের পড়ানোর পালা। বাবুল ভাই আর একজনকে সাক্ষী রেখে আমাকে আর মেয়েটিকে নিজেদের নাম, ঠিকানা বলে জিজ্ঞেস করা হলো, রাজি কিনা। দু-তিনবার বলতে হলো কবুল। বিয়ে পড়ালেন মওলানা সাহেব।
বিয়েতে দেনমোহর ধরা হয়েছে পাচ হাজার টাকা। টাকাটা আমার হাতে গুঁজে দিয়েছিলেন দানিয়েল ভাই। সেটা আবার মওলানা সাহেব তুলে দিলেন আমার সদ্য প্রস্ততকৃত দ্বিতীয় স্ত্রীর হাতে।
- আলহামদুলিল্লাহ। মোনাজাত ধরি...
হুজুর দোয়ায় কি কি পড়লেন আমি খেয়াল করিনি। আমি শুধু মনে মনে ভাবছি যা করলাম তা ঠিক হলো কিনা। গ্রামে ফেলে আসা বৌয়ের মুখটা বারবার মনে পড়ছে।
- আমীন, ছুম্মা আমীন। বি রাহমাতিকা ওয়া....
দোয়ার পাট চুকে গেলে আমরা আস্তে ধীরে বেরোলাম। বাবুল ভাই মিষ্টি আনিয়েছিলেন, দু-একপিস করে খেতে বাধ্য করলেন সবাইকে।
মসজিদ থেকে বেরোবার সময় থমথমে গুমোট রাতটায় বায়ু চলাচল বেড়ে গেল। বারান্দার বাইরে লাগানো বেলী ফুলের ঘ্রাণে আমার চিন্তা-দুশ্চিন্তায় ছেদ পড়ে। মসজিদে ঢোকার সময়ও তো ফুল ফুটে থাকার কথা। তখন যে পেলামনা সুবাস?
খেয়াল করে দেখলাম, বাইরের সবকিছুই এখন চোখে ভাল ধরা পড়ছে। মসজিদে ঢোকার আগে যতটুকু অস্বস্তি ছিল মনে, তা কমে গেছে। ফুরফুরে লাগছে অনেকটা। একটু আগে যেমন অপরাধবোধ হচ্ছিল, তেমনটা হচ্ছেনা।
ডিনারের সময় হয়ে গেছে। ছেলেপেলেরা বাইরে দৌড়োদৌড়ি করছে খাবার আগে। হুজুর সামনে পড়তে অবশ্য সবাই চুপচাপ সরে যাচ্ছে, অন্যদিকে গিয়ে খেলছে। এরা আবাসিক ছাত্র।
এশা পড়ে মওলানা সাহেবের অফিসে রাতের খাবার খাওয়া হল। স্বাভাবিক খাবার, তবে রাঁধুনির হাত ভাল। আমি ভেবেছিলাম আজ খাওয়ার রুচি হবেনা, কিন্ত অন্যদের মতই প্লেট সাফ করে ফেলেছি।
আমার তথাকথিত বৌয়ের সঙ্গে কবুল বলার পর আর দেখা হয়নি। সে মসজিদেই আছে। সঙ্গ দিতে বাবুল ভাইয়ের স্ত্রী-ও নাকি আছে ওখানে।
- কোথায় পালাও, বৌ নিয়ে যাবেনা?
খাওয়াদাওয়ার পর সবার সঙ্গে আমিও উঠে যাওয়ায় সঙ্গে আসা এক ভাই থামালেন।
- আমি কোথায় নিয়ে যাব! ভাবী বাসায় চলে যাবেনা?
- এখন দানিয়েলের বাসায় কিভাবে যাবে, বোকা! সে তোমার স্ত্রী না এখন?
বাবুল ভাই যোগ দিলেন।
- আমি তো কবুল করে দিলাম। এখন বাকিটা হুজুর ঠিক করে দেবেনা?
- তালাক লাগবে তো আগে। তারপরে গিয়ে দানিয়েলের সঙ্গে আবার বিয়ে। তুমি আজ বৌ নিয়ে যাবে বাসায়। সকালে আমরা আসব, তালাক করিয়ে ভাবীকে নিয়ে আসব।
ভাই পরিষ্কার করলেন ব্যাপারটা।
মাদ্রাসার বাইরে রিকশা দাঁড়িয়ে আছে আমাদের জন্য। দুজন বোরকা মোড়া মহিলা বেরিয়ে এল মাদ্রাসা থেকে। একজন বাবুল ভাইয়ের স্ত্রী। তার হাতে একটা লাল টকটকে ডাফেল ব্যাগ।
- ওঠেন ভাই.. না, সোহা আগে ওঠো।
বাবুল ভাইয়ের গলা মহিলা ধাঁচের, সুরেলা নয়। ভাবী হাতের ব্যাগটা রাখলেন রিকশায়। আমার নতুন বৌকে তুলে দিলেন এরপর।
যে রিকশা ডেকে এনেছে সে ঠিকানা বলে দিয়েছে। তারপর আমি উঠে বসলাম, রিকশা চলতে শুরু করল।
সোহানী আমিন না কি যেন নাম 'বৌয়ের', বিয়ে পড়ানোর সময় শুনেছি। ভাবী ডাকলেন সোহা বলে, মনে হয় ডাকনাম।