কমিউনিটি সার্ভিস - অধ্যায় ১০
১.৩
রাতে দুজনেরই একটু ভয়ভয় করছিল। আমি নিজের মনে সাহস যোগাতে সোহানীকে বোঝাচ্ছি, কাকা রসিক মানুষ। একটু দুষ্টুমি করেছে। ও এই অজুহাত মেনেছে বলে মনে হয়না।
একটু ভয়েভয়ে দরজায় সিটকিনি মেরে ঘুমাতে গেলাম। শরীর ক্লান্ত থাকায় ঘুম হল।
সকালে আবার জামি কাকা এল। সোহানী আজ বাথরুমে না ঢুকে আমার গায়ের সঙ্গে লেগে রইল। লোকটা আজ অন্যদিনের মতই ফুরফুরে মেজাজে। গতরাতে যে বদ কাজটা করেছে তার কোন স্মৃতিও যেন নেই। তরকারির বাটি নিয়ে চলে গেল। বলল, আমরাই যেহেতু রান্না করে খাচ্ছি, তাই আর খাবার আনছেনা। যদি প্রয়োজন হয় তবে জানালেই হবে।
বেলা বাড়ার পর টিউশন পড়াতে যাবার জন্য বের হতে গেলে সোহানী বাধা দিচ্ছিল। একা একা আর নিরাপদ বোধ করছেনা। আমিও যে পুরোপুরি নিরাপদ বোধ করছি তা না। জামি কাকা রাতে যে ধরণের পাগলামি করল তাতে ভয় থাকবারই কথা মনে। কিন্ত ওনাকে যতটুকু জানি এত বছর এলাকায় থেকে, বড় কোন অঘটন ঘটাবেনা।
তাছাড়া মওলানা সাহেবের সঙ্গে যোগাযোগ আছে। সকালে বলছিল আমাকে নাকি আজ আছরের ওয়াক্তে মসজিদে যেতে হবে।
টিউশন থাকায় আমি যে সাধারণত আছরের সময় মসজিদে যাইনা তা কাকার জানার কথা না। মানে, আসলেই তার সঙ্গে হুজুরের লোকজন যোগাযোগ করছে। এরমধ্যে খারাপ কিছু করে ফেলবে বলে মনে হয়না।
সোহানী বলেছিল আজ মাছটাছ আনতে। দুপুর বেলায় মাছ-মাংস পাওয়া দুষ্কর। মাছ পেলাম না, গরু আর সবজি কিনতে হল। একবার পড়ানোর ফাঁকে বাসায় দিয়ে গেলাম।
জোহরের সময় মসজিদে গেলাম না। সোহানী ভয় পাচ্ছিল বলে ভোররাতে ফজর পড়তেও বের হইনি। কাকা সকালে বলছিল একেবারে আছরের সময় যেন যাই।
দুপুর বেলায় বাসায় ফিরলে সোহাকে বেশ এক্সাইটেড দেখলাম। ঢুকতেই বলল,
- আজ নাকি কমিউনিটিতে পুলিশ এসেছিল আবার!
কমিউনিটির এক মহিলা ফোন করে কিছু খবর জানিয়েছে সোহাকে। পলাতকদের মধ্যে একজনের স্ত্রীর সঙ্গে আলাপ করেছে অনেকক্ষণ। মহিলা মানুষ বলে থানায় নেয়নি। নিলে কওমীরা এক ইস্যু পেয়ে যায়। তবে খবর বের করতে মরিয়া হলে যা দরকার সব করবে পুলিশ।
ওকে সবজি কাটাকাটিতে ব্যস্ত রেখে আছরের সময় বেরোলাম। নামাজের পর ইমাম সাহেব সেদিনের মত ডাকল। তবে আজ বারান্দায় নয়, ভেতরে আলাপ হচ্ছে।
- কি অবস্থা ইমাম সাহেব, কি হচ্ছে?
কুশলাদি সেরে জানতে চাই।
- কি যে হচ্ছে আল্লাহ ভাল জানেন। আমি যতটুকু জানি হুজুর হাজতে আছেন। ঠিক কি কি মামলা দেয়া হয়েছে জানতে পারিনাই, উকিলকে এখনো দেখা করতে দেয়া হয়নি। কেন্দ্র থেকে চেষ্টা করা হচ্ছে কোর্টে চালান দেয়ার আগে যেন অন্তত জামিন শিওর করা যায়।
- সাক্ষাৎ হয়নি ওনার সঙ্গে কারো?
- সরাসরি হয়নি। থানায় তো দ্বীনের লোক আছে, সেইভাবে কিছু খবর পাঠিয়েছেন। ওগুলো সংগঠনের জন্য... আপনি তো মাশাল্লাহ দায়িত্ব পালন করছেন এত বিপদ জেনেও।
প্রশংসায় মত্ত গলায় বলে ইমাম।
- হুজুরের যা নির্দেশ...
- বিপদ যে আমাদের মহিলাদের উপরও আসতেছে, শুনেছেন?
- পুলিশ নাকি এসেছিল কমিউনিটিতে, ইন্টারভিউ নিয়েছে কার।
- ইন্টারভিউ! কিসের ইন্টারভিউ?
গলা চড়িয়ে ফেলে আবার শান্ত হয় ইমাম।
- দুইটা বদমায়েশ মহিলা পুলিশ নিয়ে এক জানোয়ার এসে হেনস্থা করে গেছে একজন আপাকে। নিকাব খুলিয়ে ছবি উঠিয়েছে, কি বেদতমিজ!
- কাওকে থানায় নিয়ে গেছে?
- না। নিয়ে যেতে চাইবে, সেজন্যই আপনাকে ডাকা। আমাদের মহিলাদের ওদের হাতে ছেড়ে দেওয়া যাবেনা। কতরকমভাবে বেজ্জতি করবে আল্লাহ মালুম।
- কি করবেন?
- যাদের স্বামী গোপনে আছেন, তাদের সরানো হচ্ছে। আমাদের লোক দুইজনকে সরিয়ে নিয়েছে।
- কোথায় নিচ্ছে?
- আশেপাশেই মুভ করা হয়েছে।
বুঝলাম আমাকে ভেঙে বলবেনা।
- বাবুল ভাইয়ের ওয়াইফ বাকি আছে। ওনাকেও আপাতত রাখতে হবে আপনার জিম্মায়।
বলে তাকাল আমার দিকে ইমাম।
- আমার? মানে, আমি তো এক নারী নিয়েই বিপদে আছি। আবার আরেজনকে কই রাখব!
ইমাম সাহেব আমার অজুহাত শুনতে প্রস্তত ছিল, ঘাবড়ালনা।
- আর জায়গা নেই, ভাই। আপনি নিজে একটা সেফ জোন। আমাদের সবকিছুতে তো নজরদারি পড়ে গেছে। সুযোগ বুঝে ভেতরের খবর জেনেই আজকে ভাবীসাহেবাকে আপনার হাওয়ালায় দেয়া হবে।
ইমামের কথামত বাসায় চলে আসি। জানাই সোহানীকে কি হচ্ছে। সে বেশ খুশি হয় শুনে।
- ভাবী থাকবে এখানে? খুব ভাল হবে, সব খবরাখবর পাওয়া যাবে এখন। ইশ, দানিয়েল যেন কই আছে, কি খাচ্ছে.. একবার আলাপ করতে পারতাম..
সোহানী পজিটিভলি নেয়ায় একটু দ্বিধায় পড়ে গেলাম। একা একা বদ্ধ ঘরে দুশ্চিন্তায় সময় কাটাচ্ছে বেচারী। পরিচিত কেউ সঙ্গে থাকলে অন্তত দুজনে মিলে দুশ্চিন্তা করতে পারবে।
ইমাম সাহেব মাগরিবের পর বললেন কুইক বাসায় চলে যেতে। আমি বাসায় ফেরার মোটামোটি পরপরই বেল বাজল।
- আসসালামু আলাইকুম ভাইজান। ভাবীসাবকে নিয়ে আসছি, ভিতরে আসব?
কম বয়সী একটা ছেলে, পাঞ্জাবি-পাজামা পড়নে। সঙ্গে বেগুনি বোরকা মোড়া নারী।
- ওয়ালাইকুম সালাম, এসো।
সোহানী পেছন থেকে খেয়াল করছিল। ওরা ভেতরে ঢুকতে কাছে চলে এল।
- ভাবী, কেমন আছেন ভাবী!
কাছে এসে জড়িয়ে ধরল মহিলাটিকে। সোহানীর চাইতে একটু খাট, দুজনে ইমোশনাল হয়ে কুশল বিনিময় করল কিছুক্ষণ।
- আসো, ভিতরে এসে বসো।
ছেলেটিকে বললাম।
- না ভাই, আমাকে এখনি যেতে হবে। ইমাম সাহেব আসবেন এশার আগে, বাসায় থাকবেন আপনারা।
বলে ছেলেটি বেরিয়ে গেল। আমি একবার ডেকে ওর নাম জিজ্ঞেস করলাম, কিছু বললনা।
চাঁদনী ভাবীর সঙ্গে অল্প আলাপ হল। মহিলা বোরকা-নিকাব গায়ে জড়িয়েই বসে আছে। খুব বেশি জবাব দিলনা। দানিয়েল ভাইদের অবস্থান আর বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে কি কি জানে তা বলতে চাইছেনা। সোহানীকে হয়তো বলবে। ওর কাছ থেকে কথা পাড়ার চেষ্টা করব।
মিনিট বিশেক পর আবার বেল বাজল। হ্যাঁ, ইমাম সাহেবই এসেছেন। সঙ্গে দুজন লোক, আমার পরিচিত না।
- ইমাম সাহেব, মহিলাদেরকে অন্য কোথাও রাখার ব্যবস্থা করা যায়না?
ওনাদের বসতে দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম। আমার ছোট্ট ঘরে দুজন মহিলাকে রাখা যাবেনা বুঝতে পারছিলাম। তারওপর বাবুল ভাইয়ের স্ত্রী খুব জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে।
- ভাই, কষ্ট করেন একটু। কষ্ট করলে প্রতিদান পাওয়া যায়। আপাতত থাকেন, আমরা চেষ্টা করছি।
- ইমাম সাহেব, মানে, মহিলা মানুষ নিয়ে এইটুকু জায়গায়.. আবার আজ ভাবীকে পাঠালেন।
বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করলাম। উনি আমাকে জবাব না দিয়ে চাঁদনী ভাবীর দিকে ফিরলেন।
- ভাবীসাহেবা, আপনি থাকতে পারবেন না আপাতত? একটু কষ্ট হবে।
- ইনশাল্লাহ।
- আপনি?
- জ্বী।
সোহানী ওড়না দিয়ে মুখ ঢেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে। সে-ও ইমাম সাহেবের সঙ্গে একমত। এমতাবস্থায় আমার আর আপত্তি করার সুযোগ রইল না।
- ভাবীসাহেবা, আপনি তো এখনো বাবুল ভাইয়ের বিবি আছেন, তাইনা?
মাথা নাড়ে মহিলা।
- আপনাকে রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে হামিদুল ভাইয়ের জিম্মায়। আপনার জানা আছে বোধহয়, ওনার সঙ্গে এই ঘরে বাস করতে হলে মাহরাম হতে হবে?
- জ্বি।
ইমাম সাহেব এবার ঘুরলেন আমার দিকে। স্মিত হেসে বললেন,
- হয়ে গেল সমাধান।
আমি বুঝতে না পেরে চেয়ে রইলাম।
- বেগানা মহিলা নিয়ে থাকতে অস্বস্তি হচ্ছে তো? সেটা তো আমরাও এলাও করবনা। এজন্যেই তো দুইজন নিয়ে এসেছি স্বাক্ষী হিসাবে। আপনাদের রিশতা হালাল করে বেরোব সবাই এশা পড়তে।
ইমাম সাহেবের ইঙ্গিত বুঝতে পেরে পেরেশানিতে পড়ে গেলাম।
- ঠিক বুঝলামনা ইমাম সাহেব, ক্লিয়ার করে বলবেন?
- আপনাদের শাদী পড়িয়ে দেব এখনি। দেনমোহর বাকী থাকবে ওনার ভরণ পোষণের খরচ হিসাবে, সংগঠন থেকে উসুল করে দেওয়া হবে পরে।
- বিয়ে? মানে, কেন? উনি তো বাবুল ভাইয়ের ওয়াইফ!
আমি হায় হায় করে বলি।
- তালাক পড়িয়েই তো বিয়ে হবে। একসঙ্গে দুই স্বামী থাকবেনা।
- না, বাবুল ভাই তো নেই এখানে! ওনাকে জিজ্ঞেস করতে হবেনা?
আমার অস্বস্তি খেয়াল করে ইমাম সাহেব হাত ঘষলেন।
- ওনার হাজির থাকার প্রয়োজন নেই। ভাবীসাহেবা খুলা করার আবেদন করলে আমি তালাক পড়িয়ে দিতে পারব।
- বাবুল ভাইকে জিজ্ঞেস করতে হবেনা? ওনাকে না জানিয়ে কেমন করে..
- হিজরতে যাবার প্রয়োজন হলে বিবির সুরক্ষার জন্য অন্য পুরুষের জিম্মায় রাখা হয়, ওনার জানা আছে।
ইমাম সাহেব নির্বিকারভাবে জানালেন। আমি আর প্রশ্ন করে যাতে বিব্রত না করতে পারি, ভাবীর দিকে ঘুরে গেলেন।
- ভাবীসাহেবা, বাবুল ভাইয়ের সঙ্গে আপনার বিবাহের খুলা করার অনুমতি দিচ্ছেন?
- জ্বী।
চট করে বলে ফেলল মহিলা, আমি অবাক হলাম।
- অযু আছে? না থাকলে করে আসেন, কুইক বিয়ে পড়িয়ে ফেলি।
- ইদ্দা.. ইদ্দার কি হবে?
- মওলানা সাহেবের ফতোয়া আছে, জরুরি প্রয়োজনে ইদ্দায় ছাড় দেয়া যাবে।
আমি এই অজুহাত নিয়ে একটু ঠেলাঠেলির চেষ্টা করলাম, কোন লাভ হলনা। এদিকে এতক্ষণ চুপ থাকার পর সোহানী বলল,
- আপত্তি করবেন না প্লীজ, দুইজনে একসঙ্গে থাকতে পারব।
এরপর আর ছুটে যাবার রাস্তা রইলনা। বিয়ে পড়ানো হয়ে গেল এশার আগে। ইমাম সাহেবের সঙ্গের লোক দুটো কমিউনিটির বাসিন্দা, তারা সাক্ষী রইল।
চারজনে বেরোলাম এশা পড়তে। নামাজে মনোযোগ দিতে পারলাম না ঠিকমত, নতুন করে সৃষ্ট উৎকন্ঠায় ডুবে আছি যে।
বাসায় ফিরে এলাম নামাজের পর দ্রুত। ইচ্ছে ছিল লোকাল পার্কে একটু হাঁটাহাঁটি করব, বাতাস খাব। কিন্ত নামাজের পর ইমাম সাহেব চট করে বলে গেলেন কয়েকদিন কাজকর্ম ছাড়া বাইরে যেন না থাকি। কি কারণ, আমার ওপর পুলিশের কোন নজরদারি হতে পারে কিনা, কিছু বললেন না। আরো বেশি দুশ্চিন্তা নিয়ে ফিরতে হল।
বাসায় অবশ্য পরিবেশ হাল্কা। দুজনে রান্নাঘরে ব্যস্ত, নিজেরা বেশ গল্পসল্প করছে। আমি বিছানায় হেলান দিয়ে একটু জিরিয়ে নিচ্ছি। সোহানী এল লেবু শরবত নিয়ে।
- কি রান্না করছ? আমি তো দুজনের কথা ভেবে বাজার করেছিলাম।
ওকে জিজ্ঞেস করলাম। রান্না হচ্ছে দেখে খেয়াল হল।
- আগামীকাল বাজার করলেই চলবে। মাছটাছ আনবেন, আমরা কেটে নেবো।
- ওকে।
- ওকে না, বলেন ইনশাল্লাহ!
সোহানীর কথায় একটু বিরক্ত হলাম। তবে প্রতিবাদ করার কারণ খুজে পেলাম না, বললাম ইনশাল্লাহ।
- আপনি টায়ার্ড? ঘুমাবেন?
আমার মরাটে দেহভঙ্গি দেখে জিজ্ঞেস করে বোধহয়।
- না, এখন ঘুমাবোনা। তোমাদের রান্না খেয়ে দেখতে হবেনা।
- হাহাহহ.. বলবেন কিন্ত কার রান্না বেশি ভাল। আপা কিন্ত বাজী ধরেছে ওনারটাই বেশি মার্কস পাবে।
- না বাবা, তোমরা আবার ঝগড়া শুরু করে দেবে তাহলে।
আমি শঙ্কিত হবার মত বলি।
- হিহিহিহহ.. আপার রান্নার হাত কিন্ত ভাল। দেখা করলেন না যে বাসায় ফিরে?
- উনি.. উনি কোথায়?
- কোথায় আবার, কিচেনে। ছোট্ট কিচেন তো, দুইজন একসঙ্গে কাজ করা যায়না - তাই তো এখানে বসে আছি।
- হাহাহহ.. ব্যাচেলরের কিচেন..
আমি হাসি। বলি,
- তুমি এখানে বসে আছো যে, হেল্প লাগবেনা ওনার?
- না, কাটাকুটির কাজ শেষ। ...আপাকে এখন আপনি আপনি করবেন না যেন আবার ওনার সামনে, বেচারী লজ্জ্বা পাবে।
- আচ্ছা..
মহিলা আমার চাইতে বয়সে বড় নিঃসন্দেহে। তুমি করে বলতে একটু বেখাপ্পা লাগবে নিশ্চই।
- যান, দেখা করে আসেন। ঝিমাতে ঝিমাতে ঘুম এসে যাবে।
সোহানী ঠেলেঠুলে উঠিয়ে দিল আমাকে। বাধ্য হয়ে যেতে হল কিচেনে।
সালোয়ার-কামিজ পড়া যুবতী কড়াইয়ে কোন তরকারী নাড়ছে দ্রুতহাতে খুন্তি দিয়ে। নাকে আচমকা মশলার ঘ্রাণ আসায় হাঁচি দিয়ে ফেললাম। নারী চমকে তাকায় বাঁদিকে।
- নামাজ শেষ?
জিজ্ঞেস করে আবার কড়াইয়ে মনযোগ দেয়। একহাতে ওড়না মাথায় তুলতে গিয়েও তোলেনা। তেলে আঁচড়ানো চুল পরিপাটি করে বাঁধা।
- হুম। কি রান্না করছেন?
- ডাল ভুনা করছি। আর রান্না হয়েছে মিষ্টি কুমড়া ভাজি, গরুর মাংস।
- ভাল, ভাল।
ভাল বললেও শঙ্কিত হলাম। আমার সারা মাসের খাওয়াদাওয়ার খরচ দুই দুইটি রাঁধুনির হাতে একসপ্তাও যাবেনা। আগামী মাসে বৌকে আর টাকা পাঠাতে হবেনা।
- আপনি রাগ করেছেন আমার ওপর?
মহিলা জিজ্ঞেস করে। আমি অপ্রস্ততভাবে বলি,
- রাগ! নাহ, কেন?
- এইযে, আমার ঘাড়ে এসে পড়েছি - আমার কারণে বিপদেও পড়তে পারেন।
মহিলার গলার স্বর গতদিনের চেয়ে অনেক কোমল। কমনীয় একটা ভাব আছে।
- বিপদে তো আপনি পড়েছেন, আমার একটা কর্তব্য আছেনা?
মহামতী ভাব করে বলি।
- সবার বিপদ তো আপনিই দূর করছেন। পরশু সোহানীর ঝামেলা, আজ আবার আমি ঝুলে পড়লাম গলায়।
- উফফ, না.. বাবুল ভাই, দানিয়েল ভাইয়ের সঙ্গে আমার লম্বা সম্পর্ক। আমার বিপদেও ওনারা এগিয়ে আসবেন আমি জানি।
- রাগ করেন নি বলছেন?
মহিলার মুখে স্মিত হাসি দেখলাম। সোহানীর চাইতে একটু খাট, কিন্ত স্বাস্থ্য ভাল। বেগুনি সালোয়ার-কামিজে গড়ন বোঝা যাচ্ছে। বোরকায় উচ্চতা ছাড়া কিছু ঠাহর করা যায়নি।
- না, রাগ করার প্রশ্নই ওঠেনা।
সাফ বলে দিলাম।
- আমাকে আপনি আপনি করছেন যে?
বলে মহিলা খুন্তি হাতে তাকায় আমার দিকে। ফর্সা মুখ, বয়স ত্রিশের মত হবে। চোখদুটো গোলগোল, আকর্ষণ করছে। সেদিন মাদ্রাসা থেকে বেরোনোর সময়ও চোখদুটো খেয়াল করেছিলাম।
- মানে, আপনি.. তুমিও তো আপনি করে বলছ..
- আপনি এখন হাজবেন্ড না?
- আ, হ্যাঁ, কিন্ত আপনি, আই মীন তুমি তো সিনিয়র।
- ইশ, সিনিয়র!
দাঁত ভাসিয়ে লজ্জ্বা পাবার মত হাসে চাঁদনী। নারীরা 'সিনিয়র' শুনলে নিজেদের বুড়ি বলা হচ্ছে ভাবে হয়তো। মনে হল ভুলভাল করে ফেললাম নাকি।
- যান, সোহাকে পাঠান। খাবার রেডী করব।
আপনি-তুমির যৌক্তিকতার তর্ক ছেড়ে বেরোতে পেরে ভাল লাগল।
তিনজনে ফ্লোরে বসে খাওয়াদাওয়া করলাম। রান্না বেশ ভাল হয়েছে। আমার মত ব্যাচেলরের কাছে রান্না ভাল মনে হওয়া অবশ্য তেমন বড় কোন ব্যাপার নয়। গিন্নীদের সুস্বাদু রান্না চেখে দেখার অভ্যাস তো নেই।
- আচ্ছা, যেটা বলেছিলাম। কোন আইটেমটা বেশি টেস্ট হয়েছে, মার্কিং করেন তো। আপা যে বেট ধরে আছে..
সোহানী খাওয়ার শেষদিকে মনে পড়ায় বলতে শুরু করে। আমি মাঝপথে বলি,
- বেট ধরা হারাম না? কি শর্ত তোমাদের বাজিতে?
- উফফ, টাকা-পয়সা নেই তো বাজিতে।
সোহানী গা ঝাড়া দিয়ে বলে।
- হাহাহ.. হুম, সবগুলোই ভাল হয়েছে। কে কোনটা রেঁধেছ?
- না না, আগেই বলা যাবেনা। আগে মার্কিং করেন, দ্যান বলছি।
ডাল চাঁদনী রান্না করেছে দেখেছি। তিনটে আইটেমের মধ্যে সহজ মনে হচ্ছে মিষ্টি কুমড়া ভাজিটিই। মাংস রাঁধাটা তুলনামূলক অভিজ্ঞ গিন্নীই করেছে সম্ভবত।
- কুমড়াটা খুব ভাল হয়েছে। তুমি ভেজেছ?
সোহানীর মধ্যে খানিকটা ছেলেমানুষি চঞ্চলতা থাকায় ওকেই 'মার্কস' দেয়ার চেষ্টা করছি। চাঁদনী আবার মার্কসবাদী না বনে গেলেই হয়। সেক্ষেত্রে তিন আইটেমে মার্কস ভাগ করে দিতে হবে।
আমার কথা শুনে সোহানী হো হো করে হেসে ফেলল। খাওয়া দাওয়া শেষ সবার, ও প্লেট-বাটি জড়ো করে নিচ্ছে। চাঁদনী আসার সময় বুদ্ধি করে নিজের ব্যাগে প্লেট-গ্লাস নিয়ে এসেছে, নইলে তো প্লেট সংকট হতো।
- কি হলো?
চাঁদনীও মুচকি হাসছে দেখে জিজ্ঞেস করলাম।
- বেচারী শুধু ভাতই রান্না করেছে।
- ওহ।
ভাত নামের আইটেমটা আমি গুণতিতেই আনিনি ভেবে একটু বোকা বোকা লাগল। বেসিনে গেলাম হাত ধুতে।
- চিন্তা করবেন না, আপার কাছ থেকে রান্না শিখে নিচ্ছি। এখানে থাকতে থাকতেই খাওয়াব ভালকিছু রেঁধে। আর নাহয় বাসায় ফিরে দাওয়াত করব।
সোহানী প্লেট ঘষতে ঘষতে জানায় প্রতিজ্ঞভাবে।
খাওয়া-দাওয়ার পর বিছানায় বসলাম গল্প করতে। ওরা দুজনে বেশ হাসি-তামাশা করছে। দুজনের মধ্যে বন্ডিং বেশ ভাল। একে অপরকে পেয়ে স্বামীদের দুশ্চিন্তা থেকে একটু দূরে থাকতে পারছে।
আমার সঙ্গে কথায় কথায় চাঁদনী জানতে পারে মূল বৌয়ের কথা। সে-ও দেখতে চায় ছবি।
- মাশাল্লাহ, সুন্দর বৌ।
গ্যালারি সোয়াইপ করতে করতে বলে।
- আপনার তো তিন ওয়াইফ হয়েই গেল, আরেকটা আনতে পারবেন।
বলে সোহানী।
- লাগবে আরেকজন? আপনি বললে ফোন করব।
চাঁদনী আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে। আমি না! না! করে ওঠার আগে কথা ধরে সোহানী।
- বাদ আছে নাকি কাওকে হেফাজতে দেবার?
- হুম। হাবিল ভাইয়ের ওয়াইফের ব্যবস্থা আজ রাতে হতে পারে, সন্ধ্যা পর্যন্ত তো সমাধান হয়নি।
- হাবিল ভাইও হিজরতে?
- হ্যাঁ।
এই ভাইকে চিনিনা, তাই কিছু বললাম না। আমার ঘাড়ে আরেকটা না ফেললেই বাঁচি।
- দানিয়েল ভাই, বাবুল ভাইদের কি কোন খবর পওয়া গেল?
জানতে চাইলাম। ওরা হয়তো জানে, বলছেনা। আজ ওদের খুব একটা বিচলিত লাগছেনা, তাই এমন সন্দেহ করছি।
- তেমন কিছু না। নর্থে কোথাও আছে, সেফ প্লেসে। মওলানা সাহেবের লোকজন জানে, বলবেনা এখুনি।
- কেন? তোমাদের হাজবেন্ড, বলবেনা কেন?
- আমরা না জানলেই তো ভালো। মেয়েমানুষ গোপন খবর পেটে রাখতে পারেনা। যদি কাওকে বলে ফেলি?
ভাল যুক্তি! দেখা যাচ্ছে নিজেদের বুদ্ধি নিয়ে ধারণা এতটা ভাল নয় ওদের।
- বারান্দায় কি মশা কামড়ায় রাতে?
সোহানী টপিক বদলে ফেলল। তেমন কিছু জানতে না পেরে ভাল লাগলনা।
- না, কামড়াবেনা।
- তবে আমি চেয়ার নিয়ে বসলাম। বাতাস আসে ভাল বারান্দায়।
- ওখানে যাচ্ছ কেন? বসো, গল্প করি।
চাঁদনি থামায় সোহানীকে।
- হ্যাঁ, বসো। তোমাদের সঙ্গে আলাপ করতে ভাল লাগছে।
আমিও বললাম।
- আপা, গল্প করতে করতে তো রাত পেরিয়ে যাবে। পর্দা টেনে বসি বারান্দায়, আপনারা বাসর করে ফেলেন!
- কি বকছো ফাজিল মেয়ে?
চাঁদনি গলা নামিয়ে ধমক দেয় সোহানীকে। আমি পিঠ সোজা করে বসি।
- কি বকছি? গতরাতে আমাদের বাসর হয়েছে, আজ আপনাদেরটা হবেনা?
সোহানী অবাক হবার ভাব করে বলে।
- আহা, সোহা.. বাদ দাওতো, চল গল্প করি।
আমি বললাম। ভয় হল দুজনে কথা কাটাকাটিতে জড়িতে পড়বে।
- বাদ বললেই চলবে? আমাদের বিয়ে তো হালাল হয়ে গেছে, আপনাদেরটা হতে হবেনা?
সোহানী নাছোড়বান্দা। চাঁদনী আমার দিকে তাকাচ্ছেনা, তার মুখে সলাজ ভাব স্পষ্ট।
- তোমাদের তো হালালার বিয়ে, বাসর ছাড়া তো চলবেই না!
চাঁদনী জবাব দিল।
- তো আপনারটা কি আলাদা? আপনিও তো ফেরৎ যাবেন বাবুল ভাইয়ের কাছে। একই তো কথা!
এবার একটু থমকায় চাঁদনী। মুখে চিন্তার রেখা দেখা দেয়।
- কি যে বলো, তোমার আমার সিচুয়েশন এক হলো নাকি? কি বলেন আপনি?
আমাকে খোচা দেয় সাপোর্ট পাবার আশায়।
- আ.. হ্যাঁ, তোমার অত ব্যস্ত হওয়ার দরকার নেই সোহা।
- ফোন দেন তো, ফোন দেন ইমাম সাহেবকে..
সোহানী এগ্রেসিভভাবে নির্দেশ দেয়। চাঁদনী তাকায় একবার আমার দিকে, আমি কোন পক্ষ নিতে চাইনা। দুই মহিলাতে চেঁচামেচি মারামারি না জুড়ে দিলেই বাঁচি।
ইমাম সাহেবকে সরাসরি ফোন করা বারণ। এক সাগরেদের নম্বরে ফোন করে পরিচয় দিল চাঁদনী। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর কল ট্রান্সফার হল ওনার কাছে।
- আসসালামু আলাইকুম, হুজুর। আমি... জ্বী..
- লাউডস্পীকার দেন!
সোহানী জোর গলায় বলে। স্পীকার চালু করতে হয় চাঁদনীকে।
- আসসালামু আলাইকুম, ইমাম সাহেব। আমি সোহানী বলছিলাম, দানিয়েলের ওয়াইফ।
সোহানী একরকম হাইজ্যাক করে নিল আলোচনা।
- ওয়ালাইকুম সালাম, জ্বি ভাবী.. কোন সমস্যা হয়েছে?
- না, সমস্যা নেই আলহামদুলিল্লাহ। এইযে, আজ যে বিয়ে পড়িয়ে গেলেন না সন্ধ্যায়..
- জ্বি।
- ওনাদের মধ্যে এখন স্বামী-স্ত্রীর কাজ বলতে যেটা বোঝায়, ওটা তো ফরয.. তাইনা?
- হাহাহহ.. হ্যাঁ, করে ফেলাই তো উত্তম।
খিক করে হেসে বলে ইমাম।
- ফরয হয়েছে তো?
এবার জবাব দিতে গিয়ে একটু থমকালেন ইমাম সাহেব। গলা একটু নামিয়ে বললেন,
- হুমম, করে ফেলতে বলেন!
চাঁদনী চিন্তিত মুখ করে বসে আছে। বলল,
- কিন্ত হুজুর, আমি তো দেনমোহরের টাকা পাইনি হাতে।
- সমস্যা নেই ভাবীসাব, টাকা আজ ক্যাশ হয়েছে। আগামীকাল হাতে পেয়ে যাবেন।
আমি ভাবলাম আরো প্রশ্ন তুলবে চাঁদনী, কিন্ত মোটামোটি চুপ করে গেল সে।
ফোন রেখে গুণগুণ করতে করতে সোহানী চেয়ার নিয়ে গেল বারান্দায়। পর্দা টেনে ওখানে বসে রাতের শহুরে বাতাস খাবার প্রস্ততি নিচ্ছে।
- সোহা?
ঠায় বসে থাকা চাঁদনী কি মনে হতে চেঁচিয়ে ডাকে।
- জ্বি?
- আমার তো ইদ্দা হয়নি, এখন ফিজিক্যাল কিছু হওয়া উচিত হবেনা।
- তোহ? বিয়ে তো পড়িয়ে গেছে ইমাম সাহেব।
এবার আমাকে তাগাদা দেয় সোহা।
- আপনি যান তো, বাথরুম হয়ে আসেন। আমি রেডী করছি আপাকে। যান, যান!
আমি বাথরুমে ঢুকে চোখেমুখে পানি দিলাম। আজ গতদিনের মত নার্ভাস লাগছেনা। ওদের দুজনের মাঝে আমি তর্ক করছিনা। শুধু
চাইছি ওরা যাতে ঝগড়া না বাঁধায়।
বাথরুমের ছাল ওঠা আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে একটু রোমাঞ্চ অনুভব করলাম। মনে হল পাশে চাঁদনির চাঁদবদন ফুটে রয়েছে।
- গতরাত্রে আমাকে শিখাচ্ছিলেন.. ইশশ.. আমার মনে আছে!
সোহানীর চড়া গলা কানে গেল। চাঁদনীর আপত্তি মানবেনা গোঁয়াড় এই মেয়ে।
- না না, খোলেন খোলেন.. টালবাহানা চলবেনা!
- আহ হাহ.. কি একরোখা মেয়ে, দেখেন তো ভাই...
এবার চাঁদনিও চেঁচায়। সোহানীর খিলখিল হাসির আওয়াজ পাওয়া যায় তারপর।
- ভাই! হাজবেন্ডকে ভাই বলে ডাকে, হু?
বাথরুমের আটক গরম হাওয়ায় রক্ত গরম হচ্ছে। দুই নারীর কলকাকলীতে চিন্তাশক্তি লোপ পাচ্ছে, বাড়ছে অদৃশ্য আকাঙ্খা।
পড়নে মাগরিবের সময় গায়ে দেয়া পাঞ্জাবি-পাজামাই আছে। পাঞ্জাবি খুলে রেখে ব্লাডার খালি করে নিলাম। ওভেনের মত হীট বাড়তে থাকা বাথরুমে স্যান্ডো গেঞ্জি ভিজে গায়ের সঙ্গে লেপ্টে যাচ্ছে। খুলে গা মুছে নিলাম।
- আপনার হয়েছে? বের হোন!
সোহানীর ডাক শুনে বেরোলাম। আমাকে খালি গায়ে দেখে দুজনেই তাকাল। তাকাল, তবে তাকিয়ে থাকার মত শরীরের কাঠামো নয় আমার। খেলাধুলা, শরীরচর্চা করা হয়না বেশ কয়েক বছর যাবৎ।
- যান, ফ্রেশ হয়ে আসেন।
উঠিয়ে দিল চাঁদনীকে। তার জামা খুলে নিয়েছে সোহানী। হাতাকাটা শেমিজটা ধরে টানাটানি করছে।
জড়োসড়ো হয়ে চাঁদনী বাথরুমে ঢুকে যেতে আমার কাছে এল সোহা। ফিসফিস করে বলল,
- আপা কিন্ত খুব চালাক। পিছলে যেতে চাইবে, ছাড়বেন না!
- হুমম।
সোহানীর ব্যস্ততা কোন রাগ থেকে নাকি নিছক চাঞ্চল্য, তা ধরতে পারলাম না।
আমার মনে হচ্ছিল চাঁদনী বাথরুমে ঢুকে চুপচাপ বসে থেকে সময়ক্ষেপণ করবে। না, দ্রুতই বেরিয়ে এল।
- এখন কি ফার্মেসি খোলা পাওয়া যাবে?
জিজ্ঞেস করে আমায়। মাঝখানে ঢুকে পড়ে সোহা।
- কেন?
- কন্ডম আনতে হবেনা?
সোহানীর চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল। এই মুহুর্তের অপেক্ষায়ই ছিল সে।
- না না, কন্ডম মানিনা! আমাকে খোলা করিয়েছেন!
সোহানীর দৃঢ়তা দেখে শঙ্কিত হয় চাঁদনী।
- ওরে বাবা, তোমার তো হালালা। আমার কি তেমন কিছু নাকি?
জবাবে দাঁত ভাসিয়ে দেয় সোহা।
- রেডি হন তোহ!
সতীনের তাগাদায় শেমিজটা খুলে ফেলে চাঁদনী। গোলাপী ব্রেসিয়ারে মোড়া তুলতুলে শরীর প্রত্যক্ষ করে শ্বাস নেবার গতি বেড়ে যায়।
- বললাম আমার ইদ্দা হয়নাই..
বিড়বিড় করে বলে অভিযোগের মত। সোহা বড় সতীনের সালোয়ার টেনে নামিয়ে দিচ্ছে। চাঁদনীর মুখে অস্বস্তি স্পষ্ট।
- ইদ্দা ফিদ্দা করে করে ঈমান দুর্বল করতেছেন। বুকে সাহস রাখেন, দেনেওয়ালা দেওয়ার হলে দিবেই।