মা ও ছেলের গল্প - অধ্যায় ২২
( পর্ব - 28 ) মায়ের সেই বুকফাটা কষ্ট আর চরম অসহায় আত্মসমর্পণ দেখার পরেও আসিফের ভেতরের অহংকার আর জেদ একবিন্দু কমলো না। সে নিজের জয় আর জেদের বড়ত্ব বজায় রেখে, মুখে একটা তাচ্ছিল্যের ভাব নিয়ে ধীরপায়ে হেঁটে এসে ড্রইংরুমের সোফায় ধপাস করে বসল। সে পিঠের কাপড়টা কিছুটা সরিয়ে মায়ের দিকে ঘুরে বসে অত্যন্ত গম্ভীর ও আদেশ দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল, আসিফ : "এই তো লাইনে এসেছ! তাহলে এবার মলমটা লাগাও, 'রাবেয়া মাগি'। আর মনে থাকে যেন, আজ থেকে সারাজীবন এই নামেই তোমাকে ডাকব।" রাবেয়া বেগম নিজের বুকের ভেতরের তীব্র কষ্ট আর এই চরম অপমান মুখ বুজে সহ্য করে নিলেন। তাঁর চোখের জল তখনো অঝোরে ঝরছিল, কিন্তু ছেলের শরীরটা যে হাতপাখার বাড়িতে চনচন করে জ্বলছে, সেই মায়ের মন তা কোনোভাবেই ভুলে থাকতে পারল না। রাবেয়া বেগম যখন পরম মমতায় মলমের কৌটা থেকে কিছুটা মলম আঙুলে নিয়ে আসিফের লাল হয়ে যাওয়া পিঠের ক্ষতগুলোতে হাত দিতে গেলেন, ঠিক তখনই আসিফের পুরো শরীর যন্ত্রণায় শিউরে উঠল। মলমের কড়া ঝাঁঝালো উপাদানের কারণে ছাল-ওঠা লাল ক্ষতগুলো যেন জীবন্ত আগুনে পুড়ে খাক হয়ে যেতে লাগল।তীব্র জ্বলুনিতে সোফার কুশন খামচে ধরে সে যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে চিৎকার করে বলল, আসিফ : "উহ্ মা গো! আর পারছি না, পিঠটা একদম পুড়ে যাচ্ছে! মলম দেওয়ার কারণে পিঠ খুব জ্বলছে মা! এর চেয়ে হাতপাখার বাড়িও ভালো ছিল, প্লিজ একটু আস্তে দাও, আমার পিঠটা বাঁচাও মা!" রাবেয়া বেগম ছেলের এমন তীব্র ছটফটানি আর আর্তনাদ দেখে আর স্থির থাকতে পারলেন না। তিনি মলমের কৌটাটা একপাশে রেখে দ্রুত আসিফের একদম কাছে সোফায় ঝুঁকে বসলেন। তারপর পরম মমতায় আসিফের লাল হয়ে যাওয়া পিঠের ক্ষতগুলোর ওপর নিজের মুখটা নামিয়ে আলতো করে ফু দিতে লাগলেন। মায়ের মুখের সেই ঠাণ্ডা বাতাস আসিফের আগুনের মতো জ্বলতে থাকা পিঠে যেন এক স্বর্গীয় শান্তি এনে দিল। রাবেয়া বেগম আসিফের মাথায় এক হাত দিয়ে চুলগুলো বিলি কেটে দিতে দিতে অত্যন্ত নরম, কাতর ও সান্ত্বনার সুরে বললেন, রাবেয়া বেগম : "আসিফ, একটু সহ্য কর বাবা! আর কান্দিস না। মলমটা বড্ড কড়া, তাই প্রথম প্রথম এমন পুড়ছে। আমি ফু দিয়ে দিচ্ছি বাবা, দেখিস আস্তে আস্তে সব জ্বালাপোড়া কমে যাবে।" মায়ের মুখের সেই শীতল ফু আর সান্ত্বনার বাণী আসিফের পিঠের তীব্র জ্বলুনিকে অনেকটাই শান্ত করে আনল। রাবেয়া বেগম পরম যত্নে আসিফের পিঠের শার্টটা টেনে ঠিক করে দিলেন। তারপর তাঁর সেই চেনা, মমতাময়ী হাত দিয়ে ছেলের চোখের জল মুছে দিয়ে অত্যন্ত নরম ও ভালোবাসাময় গলায় বললেন, রাবেয়া বেগম : "জ্বালাটা তো এখন একটু কমেছে, তাই না বাবা? চল, অনেক রাত হলো, এবার ডাইনিং টেবিলে গিয়ে রাতের খাবারটা খেয়ে নিবি আয়।" রাবেয়া বেগম ডাইনিং টেবিলের দিকে এগিয়ে গিয়ে পরম মমতায় রাতের খাবার বাড়তে শুরু করলেন। তিনি পাতিল থেকে ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত, ডাল আর তরকারি সুন্দর করে প্লেটে বেড়ে আসিফের বসার জায়গায় গুছিয়ে রাখলেন। তারপর তিনি অত্যন্ত নরম আর মমতাময়ী গলায় আসিফকে ডাক দিলেন,
রাবেয়া বেগম : "নে বাবা, এবার আর দেরি করিস না, হাত ধুয়ে চটপট খেয়ে নে। অনেক রাত হয়েছে, শরীরটাও ভালো না।"
আসিফ মায়ের পরম যত্নে ভরা ডাক শুনে আর এক মুহূর্তও দেরি না করে খাবার টেবিলে এসে বসল। তারপর মায়ের দিকে মুখ তুলে অত্যন্ত অপরাধী এবং নিচু গলায় বলল,
আসিফ : "টেবিলে শুধু একটি প্লেট কেন মা? তুমি খাবে না?"
আসিফের মুখ থেকে এতক্ষণ পর আবার সেই চেনা "মা" ডাকটি শোনার পরও রাবেয়া বেগমের বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘক্ষণের অভিমান আর অপমান এক নিমেষে পুরোপুরি ধুয়ে মুছে গেল না। তিনি এক ঝটকায় আসিফের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। তাঁর চোখ দুটো তখনো অপমানে ও তীব্র কান্নায় লাল হয়ে আছে।তিনি অত্যন্ত রাগী, কড়া অথচ ভেতরের কষ্টে কাঁপানো গলায় আসিফকে বললেন,
রাবেয়া বেগম : "আমার কোনো খিদে নেই! তুই তোর খাবার খা! এতক্ষণ ধরে নিজের জেদ আর অহংকার দেখানোর পর এখন কোন মুখে আমাকে 'মা' বলে ডাকছিস? তুই চুপচাপ নিজের খাবার শেষ কর, আমার জন্য তোকে ভাবতে হবে না!"
কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে বলেই রাবেয়া বেগম নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ালেন।
তখন আসিফের ভেতরের সমস্ত কৃত্রিম জেদ আর অহংকার এক সেকেন্ডে কর্পূরের মতো উড়ে গেল। মায়ের এই তীব্র কষ্ট আর রাগ সে আর কোনোভাবেই সহ্য করতে পারল না।
সে খাবার টেবিল থেকে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়িয়ে দ্রুত পায়ে মায়ের পেছনে ছুটে গেল। রাবেয়া বেগম নিজের ঘরের দরজার চৌকাঠে পা রাখার আগেই আসিফ পিছন থেকে দুহাতে তাঁর কোমর শক্ত করে জাপটে ধরল। সে মায়ের পিঠের ওপর নিজের মুখটা লুকিয়ে তীব্র অপরাধবোধে আর বুকফাটা কান্নায় ভেঙে পড়ল।আসিফের চোখের গরম জল রাবেয়া বেগমের শাড়ির আঁচল ভিজিয়ে দিতে লাগল। সে কাঁদতে কাঁদতে অবরুদ্ধ গলায় বলতে লাগল,
আসিফ : "আমাকে ক্ষমা করে দাও, মা! আমি একটা চরম নিচ আর ছোটলোকের মতো কাজ করেছি। নিজের জেদ আর অহংকারে অন্ধ হয়ে আমি তোমাকে এতটা কষ্ট দিয়ে ফেলেছি। আজ থেকে আর কোনোদিন তোমার মনে কষ্ট দেব না। তুমি আমাকে আবার ওই হাতপাখাটা দিয়ে পিটিয়ে চামড়া তুলে দাও মা, তাও প্লিজ আমার ওপর থেকে রাগ কোরো না!"
রাবেয়া বেগম আসিফের হাত দুটো আলতো করে নিজের কোমর থেকে সরিয়ে দিলেন এবং ঘুরে তার মুখোমুখি দাঁড়ালেন। তাঁর চোখ দুটো বড় বড় করে, তীব্র অভিমান আর কান্নায় ভেজা গলায় বললেন,
রাবেয়া বেগম : "তখন তোর ওই নোংরা কথা আমি কেন মেনে নিয়েছিলাম জানিস আসিফ? কারণ তুই রাগ করে এই মাঝরাতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিলি। ছেলের একটা বিপদের আশঙ্কায় তখন মায়ের বুকটা কাঁপছিল। আর হাতপাখার বাড়িতে তোর পিঠের চামড়াটা লাল হয়ে উঠেছিল, সেই পিঠে একটু মলম লাগিয়ে দেওয়ার জন্য মায়ের মনটা ছটফট করছিল! সন্তানের কষ্টের সামনে মায়ের নিজের আত্মসম্মান বলতে কিছু থাকে না রে বাবা, তাই তখন তোর ওইসব কথা মুখ বুজে সয়ে নিয়েছিলাম!"
রাবেয়া বেগম : "তোকে আমি ক্ষমা করে দিতে পারি আসিফ, যদি আজ থেকে তুই আমার সব কথা শুনে চলিস।"
আসিফ চোখের জল মুছতে মুছতে মায়ের দুটি হাত নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরল। সে পরম অনুশোচনা আর শ্রদ্ধায় মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
আসিফ : "মা, আমি আজ থেকে প্রতিজ্ঞা করছি, সারাজীবন আমি তোমার সব কথা শুনে চলব। তোমার ইচ্ছার বাইরে আমি আর একটা পা-ও বাড়াব না। শুধু তুমি আর আমার ওপর রাগ করে থেকো না মা। অনেক রাত হয়েছে, এবার চলো, আমার সাথে তুমিও খাবার টেবিলে খেতে বসো।"
ছেলের মুখে এমন সত্যিকারের অনুশোচনা আর বাধ্য ছেলের মতো আকুতি শুনে রাবেয়া বেগমের পাথরের মতো জমে থাকা সব রাগ আর অভিমান এক নিমেষে গলে জল হয়ে গেল। তিনি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না; দুই হাতে আসিফের চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে তাকে শক্ত করে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরলেন।এরপর রাবেয়া বেগম আসিফের হাত ধরে ডাইনিং টেবিলের দিকে এগিয়ে গেলেন। মা ও ছেলে পরম শান্তিতে পাশাপাশি বসে রাতের খাবার খেতে শুরু করলেন। ড্রইংরুমের সেই দীর্ঘক্ষণের ভারী ও থমথমে নীরবতা কেটে গিয়ে সেখানে এক অনাবিল শান্তি, পরম ভালোবাসা আর এক চিরন্তন পারিবারিক মেলবন্ধনের হাওয়া বয়ে গেল।
সারারাত ধরে চলা সমস্ত অভিমান, ক্ষোভ আর কান্নাকাটির পর মা ও ছেলের সম্পর্কের মাঝে আবার সেই চেনা শান্তির সুবাতাস ফিরে এলো। পরম তৃপ্তিতে রাতের খাবার শেষ করে আসিফ নিজের ঘরে চলে গেল। রাবেয়া বেগমও তাঁর ঘরের দরজা বন্ধ করে বিছানায় পিঠ ঠেকিয়ে এক স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
এতক্ষণের মানসিক ঝড় আর ক্লান্তিতে দুজনের চোখেই দ্রুত ঘুম নেমে এলো। আসিফের পিঠের মলম যেমন তার শরীরের ক্ষতগুলোকে জুড়িয়ে দিয়েছিল, তেমনি মায়ের অসীম ক্ষমার পরশ তার মনের ভেতরের সবটুকু অপরাধবোধকেও শান্ত করে দিয়েছিল। আর ওদিকে রাবেয়া বেগমও তাঁর ছেলেকে নিজের চোখের সামনে নিরাপদে ঘরে ফিরে পেয়ে পরম শান্তিতে ঘুমিয়ে পড়লেন। পুরো বাড়ি জুড়ে তখন এক অনাবিল শান্তি আর নীরবতা বিরাজ করতে লাগল।