প্রতিমার জীবন সংগ্রামের ইতিকথা - অধ্যায় ৩০
ঊনত্রিংশ পর্ব :-
শিলিগুড়ির বাতাস এখন কিছুটা হিমেল। রাস্তার ধারের ছোট স্টেশনারি দোকানটার ভেতরে কাগজের স্তূপ, নতুন খাতার গন্ধ আর কালির একটা হালকা ঝাঁজ মিশে থাকে। সৌম্য কাউন্টারে বসে একটা খাতা গুছিয়ে রাখছিল। দোকানের বাইরেই রাস্তার ভিড়, মাঝে মাঝে সাইকেলের বেল আর রিকশার হর্নের শব্দ নীরবতাকে ভেঙে দেয়।
ঠিক পাশের দোকানটাই কসমেটিকসের। কাঁচের আলমারিতে সাজানো রঙিন লিপস্টিক, নেইলপলিশ আর নানা রকম সুগন্ধি। সেই দোকানের মালকিন মণিকা। একত্রিশ-বত্রিশ বছর বয়স। বিধবা। পরনে থাকে সাধারণ কালো শাড়ি, কপালে একটা ছোট টিপ। তার শান্ত চেহারায় একটা অদ্ভুত স্থিরতা থাকে, তবে যখন সে হাসে, ঠোঁটের কোণে এক ধরনের মৃদু ঢেউ খেলে যায়।
সৌম্য প্রথম দিকে খুব একটা কথা বলত না। তার চোখের ভেতরেই যেন একটা পুরনো বিষণ্ণতা বাসা বেঁধে থাকত। কিন্তু মণিকা ছিল আলাদা। সে চুপচাপ কথা বলা মানুষটাকে পছন্দ করে।
"সৌম্যবাবু, এই দেখুন, আপনার জন্য কী এনেছি," মণিকা হাসিমুখে দোকানের দরজায় এসে দাঁড়াল। তার হাতে দুটো টিফিন বক্স।
সৌম্য তাকাল। "আবার টিফিন আনলেন? আমি তো বলেছিলাম যে আমার কাছে টিফিন আছে।"
"টিফিন আছে মানে কী? আপনার ওই শুকনো পাউরুটি আর চা দিয়ে কি পেট ভরে? দেখুন, আজ মুগ ডাল আর আলুর দম করেছি। গরম গরমই খাবেন," মণিকা ভেতরে ঢুকে টিফিন বক্সটা কাউন্টারে রাখল।
সৌম্য মৃদু হাসল। "আপনি এত কষ্ট কেন করেন?"
"কষ্ট কোথায়? আমার বাড়িতেই তো রান্না হয়। আর আপনিও তো একা থাকেন। পাশে একটা দোকান থাকলে অন্তত কথা বলার মানুষটা তো থাকে," মণিকার গলায় এক ধরণের সহজ আন্তরিকতা।
সে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর আলমারির দিকে ইশারা করে বলল, "আপনার ওই কোণের তাকটা খুব ধুলো হয়ে গেছে। আমি কি একটু গুছিয়ে দেব? আমার তো এখন দোকান একদম ফাঁকা।"
"না না, আপনি কেন কষ্ট করবেন," সৌম্য বাধা দিতে চাইল।
"আরে চুপ করুন তো! আপনি শুধু খাতা-কলম বিক্রির ব্যাপারটা দেখুন, দোকান গোছানো আমার হাতে ছেড়ে দিন," মণিকা ফিক করে হেসে ফেলল।
দুপুরের রোদ যখন প্রখর হলো, তারা দুজন পাশাপাশি বসে খাবার খেল। মণিকা নিজের হাতের খাবার ভাগ করে সৌম্যর পাতে দিল। সেই মুহূর্তগুলোতে সৌম্যর মনে হতো, জীবনের সব ঝড় যেন এই ছোট্ট দোকানের চার দেওয়ালে এসে থেমেছে। মণিকার যত্নটা কখনো অভিভাবকের মতো, আবার কখনো মনে হতো যেন তার ভেতরে অন্য কোনো টান কাজ করছে।
সেদিন দুপুরটা ছিল খুব ঝলমলে। সৌম্যকে কিছু জরুরি কাগজপত্র কিনতে বাজারে যেতে হলো। যাওয়ার সময় সে তার মোবাইল ফোনটা চার্জে লাগিয়েছিল।
সৌম্যর অনুপস্থিতিতে মণিকা তার দোকানের দেখাশোনা করছিল। হঠাৎ সৌম্যর মোবাইলটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে কোনো নাম নেই, শুধু একটা নম্বর। মণিকা একটু ইতস্তত করল, তারপর ফোনটা হাতে নিল। তার মনে এক ধরণের অধিকারবোধ কাজ করল—সৌম্যর জন্য সে যা করে, সেই তুলনায় এইটুকু তো করা যায়।
সে রিসিভ করল।
"হ্যালো?"
ওপাশ থেকে এক গম্ভীর, সতর্ক কণ্ঠ ভেসে এল। "কে? সৌম্য আছে?"
মণিকা সহজ স্বরে বলল, "না, সৌম্য একটু বাইরে গিয়েছে। আমি ওঁর দোকানের দেখাশোনা করছি। আপনি কে, বলুন তো?"
ফোন কলের ওপাশে প্রতিমা। প্রতিমার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। এই কণ্ঠটা কার? এখন সৌম্যর দোকানে অন্য কেউ থাকে?
"আমি... আমি ওঁর খুব কাছের আত্মীয়। উনি কখন ফিরবেন?" প্রতিমার গলায় এক ধরণের চাপা উত্তেজনা।
"দু-এক ঘণ্টা লাগতে পারে," মণিকা হাসিমুখে বলল। "আপনি কি কিছু বলবেন? আমি মেসেজ দিয়ে দিয়ে দেব।"
প্রতিমা চুপ করে রইল। তার শ্বাস দ্রুত হতে শুরু করল। সে নিজেকে সামলে নিয়ে জিজ্ঞেস করল, "আপনি কে? উনি আপনার ওপর এত বড় আস্থা রেখে বাইরে গিয়েছে কেন?"
মণিকা মৃদু হাসল। তার হাসিতে কোনো ছলনা ছিল না, ছিল কেবল এক ধরণের খোলাখুলি স্নেহ।
"না, আমি পাশের কসমেটিকসের দোকানের মালকিন। সৌম্য আমার খুব ভালো বন্ধু। ও একা থাকে, কাজ করে। ওর দুপুরে ঠিকমতো খাওয়া হয় না, তাই আমি প্রায়ই টিফিন আনি ওর জন্য।"
প্রতিমার গলা যেন হঠাৎ শুকিয়ে গেল। তার কানে শব্দটা যেন বাজল।
"টিফিন? আপনি ওর জন্য রান্না করেন?"
"হ্যাঁ, আমি বাড়ি থেকে রান্না করে আনি। দুপুরে আমরা একসঙ্গে বসে খাবার ভাগ করে খাই," মণিকার কণ্ঠস্বর ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক।
প্রতিমার ভেতরে যেন এক হিংস্র আগুন জ্বলে উঠল। সে কল্পনা করতে পারল—সৌম্যর পাশে বসে অন্য এক নারী খাবার ভাগ করে খাচ্ছে। সৌম্যর ওই চোখের দিকে তাকিয়ে হাসছে। যে সৌম্য কেবল তারই ছিল, এখন তার সাথে প্রতিদিন মেলামেশা করছে অন্য কেউ?
"আপনার সঙ্গে সৌম্যের সম্পর্কটা ঠিক কী?" প্রতিমার আওয়াজ এখন রুক্ষ এবং তীক্ষ্ণ।
মণিকা নির্বিকার রইল। সে একটু মজার সুরে জবাব দিল, "আমার মনে হয় না সেটা বলার মতো কিছু। বরং আপনি বলুন তো, আপনি কে হন সৌম্যের? ওঁর মা? যে এত জিজ্ঞাসাবাদ করছেন?"
প্রতিমা স্তব্ধ হয়ে গেল। এই প্রশ্নটা যেকোনো মা-ই করতে পারে, কিন্তু প্রতিমার ক্ষেত্রে তা তীরের মতো বুকে বিঁধল।
"তুমি এমন করে জিজ্ঞেস করছো কেন? তোমার কোনো অধিকার আছে এই প্রশ্ন করার?"
ফোনের ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর মণিকার কণ্ঠ শোনা গেল—যেন এক ধরণের অভিমান।
"আমার অধিকার না-ই বা থাকল। কিন্তু আমি ওঁকে পছন্দ করি। ও একজন খুব ভালো মানুষ ও ভালো বন্ধু।"
প্রতিমা আর সহ্য করতে পারল না। এক ঝটকায় ফোনটা কেটে দিল।
কলকাতার বাড়িতে প্রতিমা পাথরের মতো বসে রইল। হাতে ফোনটা কাঁপছে। পাশের ঘরে শিশু অনন্যা ঘুম ভেঙে কান্নাকাটি শুরু করেছে, কিন্তু প্রতিমা সেদিকে ভ্রূক্ষেপ করল না। তার মাথায় শুধু একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল—সৌম্য কি তবে তাকে ভুলে গেল?
সে ফিসফিস করে বলল, "সৌম্য, তুই কত দ্রুত ভুলে গেলি আমাকে... আমাদের সেই সম্পর্ককে..."
স্মৃতির ভেতর দিয়ে মেঘের মতো ভেসে এল সেই পুরনো রাতগুলো। সেই উষ্ণতা, সেই শ্বাসের শব্দ। প্রতিমা মনে করল সেই দিনগুলোর কথা, যখন সে নিজেকে সম্পূর্ণ সঁপে দিয়েছিল কেবল সৌম্যের ভালোবাসা ও কামনার কাছে।
"আমার না হয় অতীত ছিল—সেটা পাপ ছিল। ভালোবাসা ছিল, কিন্তু সেটা সমাজ মেনে নেবে না," প্রতিমা শাড়ির আঁচলে চোখ মুছল। "কিন্তু সৌম্য ছিল আমার। ওই ভালোবাসাটাও শুধু আমার ছিল। এখন ও কি অন্য কারোর ভালোবাসার জীবনসঙ্গী হয়ে গেল?"
সে আবার ফোনটা হাতে নিল। সৌম্যর নম্বরটা তার জীবনের শেষ অবলম্বন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে ভাবল, এখন সৌম্য আর তার একার নয়, অন্য এক মেয়ের সৌম্যের উপর অধিকার জন্ম নিয়েছে।
প্রতিমা ফোন করল না। সে অপেক্ষা করল রাত পর্যন্ত। ঘর অন্ধকার হয়ে এল, পরিবারের সবাই ঘুমিয়ে পড়ল। তারপর অত্যন্ত গোপনে ছাঁদে গিয়ে সে সৌম্যর নম্বরে কল করল।
এবার সৌম্যের সাড়া মিলল। ওপাশ থেকে সৌম্যর ঘুম জড়ানো কণ্ঠ ভেসে এল।
"হ্যালো?"
প্রতিমা কোনোমতে বলল, "সৌম্য? আমি।"
"মা? এত রাতে? কিছু হয়েছে?"
প্রতিমা কণ্ঠ শক্ত করার চেষ্টা করল, যদিও ভেতরে সে কাঁপছিল।
"না, কিছু হয়নি। ফোন করলাম শুধু। আচ্ছা, দুপুরে তোকে ফোন করেছিলাম, তখন তুই দোকানে ছিলি না। পাশের দোকানের এক মহিলা তোর ফোনটা তুলেছিল। সে আমাকে জেরা করছিল। পাশের দোকানের সেই মহিলাটা কে? ওর সাথে তোর সম্পর্ক কী?"
সৌম্যর কণ্ঠস্বর স্বাভাবিক। সে একটু থামল।
"ও, মণিকা? পাশের দোকানের মালিক। খুব ভদ্র, সভ্য আর ভালো মানুষ।"
"ভালো মানুষ..." প্রতিমা শুকনো গলায় বলল। "এত খাতির হওয়ার কি খুব দরকার ছিল, যে তোর সাথে দুপুরে খেতে বসবে? তোর জন্য টিফিন আনবে?"
সৌম্য অবাক হলো। সে আগে কখনো তার মাকে এত ঈর্ষান্বিত দেখেনি ও শুনেনি। সে সাবধানে বলল, "এমন কিছু হয়নি, মা। এত রাগ করছো কেন? উনি শুধুই আমাকে বন্ধু ভেবে সাহায্য করছেন।"
"সাহায্য?" প্রতিমার কণ্ঠ এবার ভেঙে এল। "সাহায্যের নামে এখন কেউ তোর কাছে আসবে, তোর হাত ধরবে, তোর চোখের দিকে তাকিয়ে প্রেম করবে। আর আমি চুপ করে বসে দেখব?"
দীর্ঘ নীরবতা নেমে এল দুজনের মাঝে। সৌম্য কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু প্রতিমা আর শুনতে চাইল না। সে এক ঝটকায় ফোনটা রেখে দিল।
অন্ধকার ঘরে ডিজিটাল ঘড়ির সবুজ আলোটা জোনাকির মতো জ্বলছে। প্রতিমার মনে হলো, পুরনো ক্ষতের ওপর কেউ যেন আবার গভীর ছুরি চালিয়ে দিল।
কয়েক দিন পর প্রতিমা আবার ফোন করল। তার কণ্ঠস্বর ছিল বিষণ্ণ, অত্যন্ত করুণ।
"সৌম্য, এবার যখন কলকাতায় আসবি, তখন হোটেলে থাকিস না। তুই দাদুর বাড়িতে (প্রতিমার বাপের বাড়ি) আসবি। সেখানেই থাকিস।"
সৌম্য অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, "কেন মা? হোটেলে কোনো সমস্যা হবে?"
"না... কোনো সমস্যা হবে না। শুধু... তুই দাদুর দিদার বাড়িতে এসে থাক, তাহলে আমরা দেখা করলে কারো চোখে পড়ার ভয় থাকবে না।" প্রতিমা কথাগুলো বলল খুব নিচু স্বরে।
সৌম্য বুঝতে পারল, প্রতিমার গলার স্বরে এক অদ্ভুত কষ্ট মিশে আছে। সে বুঝতে পারল, তার মা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। সে জানত না ঠিক কী কারণে, তবে এই বিষণ্ণতা তাকেও অস্থির করে তুলল।
"ঠিক আছে মা, আমি আসব।"
সৌম্য ফোন রাখল, কিন্তু তার মনে তখন শিলিগুড়ির সেই শান্ত দুপুর আর মণিকার হাসিমুখ। সে জানত না, কলকাতার এই টান আর শিলিগুড়ির এই নতুন নির্ভরতা—এই দুইয়ের মাঝে সে কীভাবে নিজেকে সামলাবে।
পরদিন সকালে সৌম্য দোকানে গেল। মণিকা তার দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। তাকে দেখে সৌম্যর মনে পড়ল গত রাতের সেই ঝগড়ার কথা।
"সব ঠিক আছে তো?" মণিকা এগিয়ে এল। তার চোখে এক অদ্ভুত কৌতূহল।
"হ্যাঁ, ঠিক আছে। তবে গতকাল দুপুরে আমার ফোনটা তুলেছিলে তো?" সৌম্যর কণ্ঠে কোনো অভিযোগ নেই, শুধু জানার ইচ্ছা।
মণিকা হালকা হেসে বলল,
"তোমার মা মনে হয়। খুব অদ্ভুত মানুষ। কথা বলার ধরনটা একটু রুক্ষ, কিন্তু মনে হয় তোমার ওপর খুব অধিকার আছে তার।"
সৌম্য একটু হাসল। "হ্যাঁ, উনি খুব ভালোবাসেন আমাকে।"
"সে কি তোমার ওপর রেগে ছিলেন? মনে হচ্ছিল উনি কিছু জানতে চাইছিলেন।"
"কিছুটা। তুমি আমার ফোনটা তুললে বলে হয়তো উনি একটু অস্বস্তি বোধ করেছে।"
মণিকা তার হাতের ছোট ব্যাগটা ঠিক করে বলল, "আমি শুধু সাহায্য করতে চেয়েছিলাম। তুমি তো জানো, আমি তোমাকে কতটা পছন্দ করি।"
'পছন্দ করি'—শব্দ দুটো সৌম্যর কানে অদ্ভুতভাবে বাজল। সে মণিকার চোখের দিকে তাকাল। সেখানে কোনো ছলনা নেই, শুধু এক গভীর আন্তরিকতা।
"ধন্যবাদ মণিকা। টিফিন আর সবকিছুর জন্য।"
"ধন্যবাদের কী প্রয়োজন? আজ দুপুরের মেনু কী চাও? আমি আলু-পটল দিয়ে তরকারি করছি।"
সৌম্য হাসল। সে বুঝতে পারল, এই শহরের এই ছোট দোকান আর এই সহজ মানুষটাই এখন তার আসল আশ্রয়। কিন্তু হৃদয়ের এক কোণে প্রতিমার সেই কান্নার সুর এখনও প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল।
দুপুর হয়ে এল। রোদ আরও চড়া হলো। মণিকা আবার টিফিন নিয়ে এল। তারা পাশাপাশি বসে খেতে শুরু করল। বাইরের রাস্তায় রিকশার টুংটাং শব্দ আর মানুষের কোলাহল।
হৃদয়ের এক কোণে প্রতিমার সেই কান্নার সুর এখনও প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল।
দুপুর হয়ে এল। রোদ আরও চড়া হলো। মণিকা আবার টিফিন নিয়ে এল। তারা পাশাপাশি বসে খেতে শুরু করল। বাইরের রাস্তায় রিকশার টুংটাং শব্দ আর মানুষের কোলাহল।
"সৌম্য, তোমার মা কলকাতায় থাকেন, তাহলে তুমি কি কখনও কলকাতায় ফিরে যাবে?" মণিকা হঠাৎ প্রশ্ন করল।
সৌম্যর হাত থেমে গেল। সে এক মুহূর্তের জন্য চুপ থাকল। "না, হয়তো, মাঝে মাঝে যাবো। কিন্তু এখানে আমার একটা নতুন জীবন শুরু হয়েছে।"
"নতুন জীবন? তার মানে পুরনো জীবনটা খুব কষ্টের ছিল?"
সৌম্যর মুখে একটি দীর্ঘশ্বাস নেমে এল। সে বলল, "কষ্টের চেয়েও বেশি ছিল জটিলতা। কিছু জিনিস ভুলে যাওয়া সহজ নয়।"
মণিকা তার হাতটা আলতো করে স্পর্শ করল। "কিছু জিনিস ভুলতে হয় না, সৌম্য। শুধু তাদের সাথে মানিয়ে নিতে হয়। তুমি চাইলে আমি তোমার সেই জটিলতাগুলো ভাগ করে নিতে পারি।"
সৌম্য তার দিকে তাকাল। মণিকার চোখে এক অদ্ভুত মায়া। সে অনুভব করল, এই নারী তাকে শুধু খাবার দিচ্ছে না, বরং এক ধরণের মানসিক শান্তি দিচ্ছে যা সে কলকাতার ভিড়ে কখনও পায়নি।
এদিকে কলকাতায় প্রতিমা বিছানায় শুয়ে ছিল। অনন্যা পাশে ঘুমাচ্ছে, কিন্তু প্রতিমার চোখে ঘুম নেই। তার মাথার ভেতরে তখন মণিকার সেই কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল—'আমি ওঁকে পছন্দ করি।'
সে কল্পনা করতে পারছিল সৌম্য আর মণিকার সেই দুপুরগুলো। একসঙ্গে খাবার খাওয়া, হাসাহাসি করা, আর হয়তো একে অপরের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকা। প্রতিমার মনে হলো সে তার হাতের মুঠো থেকে কিছু হারাচ্ছে। যদিও সৌম্য তার ছেলে, কিন্তু তার থেকেও বড় পরিচয় হলো, প্রতিমা সৌম্যের ছেলেকে নিজের পেট থেকে জন্ম দিয়েছে। মনে যে আদিম প্রেম জেগেছিল, তা তাকে শান্তি দিচ্ছে না।
"আমি ওকে ভালোবাসি," সে ফিসফিস করে বলল। "সৌম্য আমার ছিল, আমারই থাকবে।"
সে জানত তার বর্তমান সংসার, অনিরুদ্ধ, সন্তানরা—সবই তার বাস্তব। কিন্তু তার অন্তরের গভীরে যে গোপন কামনাবোধ, তা তাকে প্রতিনিয়ত তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। সে ফোনটা হাতে নিল। সৌম্যর নম্বরটা স্ক্রিনে ভেসে উঠল। সে মেসেজ লিখতে চাইল, কিন্তু হাত কাঁপছিল।
সে ভাবল, সৌম্য কি সত্যিই তাকে ভুলে গেছে? নাকি সে নতুন কাউকে খুঁজে নিয়েছে? এই সন্দেহ তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিল।
পরের কয়েকদিন প্রতিমা খুব অস্থির হয়ে উঠল। অনিরুদ্ধর সাথে তার কথা বললেও সে যেন অন্য কোথাও হারিয়ে যাচ্ছিল।
"প্রতিমা, তোমার শরীর খারাপ লাগছে? তুমি খুব আনমনা আছ।" অনিরুদ্ধ তার কপালে হাত রাখল।
প্রতিমা চমকে উঠল। সে জোর করে হাসল। "না, তেমন কিছু নয়। শুধু একটু মাথা ব্যথা।"
"তাহলে বিশ্রাম নাও। আমি অনন্যাকে দেখছি।"
অনিরুদ্ধর এই যত্ন প্রতিমাকে আরও অপরাধী বোধ করাচ্ছিল। সে ভাবছিল, একদিকে এই স্বচ্ছ ভালোবাসা, আর অন্যদিকে সৌম্যর সাথে তার সেই নিষিদ্ধ আকর্ষণ। সে বুঝল সে এক কঠিন যুদ্ধের ভেতরে আটকা পড়ে আছে।
শিলিগুড়িতে সৌম্যর দিনগুলো কাটছিল শান্তিতে। মণিকার সাথে তার সম্পর্ক এখন আরও গভীর হয়েছে। তারা শুধু কথা বলে না, একে অপরের নীরবতাও বুঝতে শেখে। মাঝে মাঝে মণিকা সৌম্যর দোকানের সামনে বসে থাকে এবং তারা কথা বলে তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে।
সৌম্য, তুমি কি কখনও ভেবেছ আমরা এত ভালো বন্ধু হবো? আমরা তো একে অপরের পাশে থাকতে পারি।" মণিকা একদিন প্রশ্ন করল।
সৌম্যর বুকটা কেঁপে উঠল। সে বলল, "আমি জানি না মণিকা। আমার জীবন খুব অনিশ্চিত।"
"অনিশ্চয়তা তো জীবনেরই অংশ।"
সৌম্য তাকিয়ে দেখল মণিকা তার দিকে তাকিয়ে হাসছে। সেই হাসিতে এক ধরণের আমন্ত্রণ ছিল। সে অনুভব করল, জীবনের এই মোড়ে এসে সে হয়তো নতুন করে বাঁচতে শুরু করেছে।