পুরনো কথা - অধ্যায় ২
পর্ব ৩
বাড়ির গেট খোলার শব্দ হলো নার্গিসের হাতে। বিকাল থেকে রাতের আঁধার নেমেছে, কিন্তু বাড়ির ভিতরে যেন আরও গাঢ় অন্ধকার। নার্গিস দরজা খুলে দাঁড়াল—তার চোখে উদ্বেগ, কিন্তু মুখে কোনো কথা নেই। করিম খান প্রথমে ঢুকলেন, তার পিছনে লায়লা বেগম, আর সবশেষে কায়নাত—সাদিয়াকে কোলে নিয়ে। সাদিয়া ঘুমিয়ে পড়েছে কোলে, তার ছোট্ট মুখে ক্লান্তির ছাপ।
সবাই ঘরে ঢুকতেই নার্গিস দরজা বন্ধ করে দিল। বাড়ির করিডরে হালকা আলো জ্বলছে, কিন্তু সেই আলোয় সবার মুখ যেন ছায়াময়। কায়নাত একটা কথাও না বলে সোজা নিজের রুমের দিকে চলে গেল। তার পায়ের শব্দ ধীর, ভারী—যেন প্রতিটা পদক্ষেপে স্বামীর রক্তের স্মৃতি বহন করছে।
লায়লা বেগম নার্গিসের দিকে তাকালেন। তার গলা ক্লান্ত, কিন্তু এখনো কর্তৃত্বপূর্ণ।
“নার্গিস, সাদিয়াকে খাইয়ে দে। তারপর ঘুম পাড়িয়ে দিস। আজ অনেক কেঁদেছে বেচারা।”
নার্গিস মাথা নাড়ল। তার চোখে জিজ্ঞাসা।
“ছোট সাহেব... কেমন আছে, বেগম সাহেবা?”
লায়লা এক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন। তার ঠোঁট কাঁপল, কিন্তু চোখ শুকনো।
“জানি না রে... ***** কাছে দোয়া কর শুধু। দোয়া করিস নার্গিস। অনেক দোয়া কর।”
নার্গিস কিছু বলল না। শুধু মাথা নত করে দাঁড়িয়ে রইল। তার হাতে সাদিয়ার ছোট্ট শরীরটা তুলে নিল সে আস্তে করে। সাদিয়ার মাথা তার কাঁধে ঠেকল। নার্গিস চলে গেল রান্নাঘরের দিকে।
পাশে দাঁড়িয়ে করিম খানের চোখ শূন্য। তার মনের ভিতরে একটা ঝড় চলছে। গনেশ এসে গেছে। কুড়ি বছরের অপরাধ এখন দরজায় কড়া নাড়ছে। তার হাতে যে রক্ত লেগে আছে—রিয়াজের রক্ত, গনেশের জীবনের রক্ত—সব মিলে তার বুক জ্বলছে। কী হবে এখন? তার পরিবারকে কি বাঁচাতে পারবেন? নাকি গনেশের আগুন সব পুড়িয়ে ছাই করে দেবে? তার চোখে ভয়, অপরাধবোধ, আর একটা অদ্ভুত অসহায়তা।
লায়লা তার দিকে তাকালেন।
“করিম... আসো। ঘুমাতে যাই। কাল দেখা যাক কী হয়।”
করিমের জ্ঞান ফিরল। সে মাথা নাড়ল, কিন্তু কথা বলল না। দু’জনে ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠল। বাড়িটা যেন নিঃশব্দে কাঁদছে।
পরের সকাল। রোদ উঠেছে, কিন্তু বাড়ির ভিতরে আলো কম। সাদিয়াকে নার্গিসের কাছে রেখে সবাই হাসপাতালের দিকে রওনা দিল। কায়নাতের চোখে-মুখে স্বামীর জন্য গভীর ভালোবাসা আর অসীম চিন্তা মিশে আছে। তার চুল এলোমেলো, চোখ লাল—রাতে ঘুম হয়নি। লায়লা তার পাশে বসে আছে গাড়িতে, করিম সামনে। কেউ কথা বলছে না। শুধু গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দ আর হৃদয়ের ধুকধুক।
হাসপাতালে পৌঁছে তারা আইসিইউ-এর দিকে গেল। ডাক্তার একজনকে অনুমতি দিলেন ভিতরে যাওয়ার। লায়লা আস্তে বললেন,
“কায়নাত, তুমি যাও। রিয়াজ তোমাকেই চাইবে।”
কায়নাতের পা কাঁপছে। সে ধীরে ধীরে দরজা খুলে ঢুকল। আইসিইউ-এর ঠান্ডা বাতাস তার গায়ে লাগল। মেশিনের পিপ পিপ শব্দ। রিয়াজ শুয়ে আছে—তার বুকে ব্যান্ডেজ, মুখ ফ্যাকাশে, কিন্তু চোখ খোলা। তার চোখ সোজা কায়নাতের দিকে।
কায়নাতের চোখে পানি এসে পড়ল। সে বিছানার পাশে এসে দাঁড়াল। তার হাত রিয়াজের হাতের উপর রাখল। রিয়াজের আঙুল সামান্য নড়ল—যেন সে তার স্পর্শ অনুভব করছে।
রিয়াজের গলা দুর্বল, কিন্তু গভীর ভালোবাসায় ভরা।
“তুমি... কি ভেবেছিলে... আমি আর কখনো তোমাকে জ্বালাব না?”
কায়নাতের ঠোঁট কাঁপল। সে হাসার চেষ্টা করল, কিন্তু চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ল।
“রিয়াজ... তুমি...”
রিয়াজের চোখে একটা মৃদু হাসি। তার গলা আরও নরম হলো।
“আমি জানি... তুমি সারারাত জেগে ছিলে। আমার জন্য কাঁদছিলে। কিন্তু দেখো... আমি এখনো এখানে আছি। তোমার জন্য।”
কায়নাত মাথা নিচু করল। তার হাত রিয়াজের হাত চেপে ধরল আরও জোরে।
“তুমি আমাকে ছেড়ে যেয়ো না... প্লিজ। আমি... আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারব না।”
রিয়াজের চোখে একটা আলো জ্বলে উঠল—দুর্বল, কিন্তু জীবন্ত।
“আমি তোমাকে জ্বালাব... অনেক দিন। তোমার সেই লাল শাড়িটা পরে এসো... যেটা আমার সবচেয়ে পছন্দ। আমি সুস্থ হয়ে উঠব... তারপর তোমাকে আবার জড়িয়ে ধরব। তোমার ঠোঁটে চুমু খাব... তোমার শরীরে হাত বুলিয়ে দেব... যেমনটা আগে করতাম।”
কায়নাতের মুখ লাল হয়ে গেল। তার চোখে লজ্জা, ভালোবাসা, আর একটা গভীর উত্তেজনা। সে রিয়াজের কপালে ঠোঁট ছোঁয়াল।
“তুমি সুস্থ হয়ে উঠো... আমি অপেক্ষা করব। প্রতিদিন।”
রিয়াজের চোখ বন্ধ হয়ে এল। তার গলা আরও দুর্বল।
নার্স এসে বলল“ কথা হলো... এবার যান। সময় শেষ। রোগীকে আরাম করতে দেন।”
কায়নাত আরও একবার তার হাত চুমু খেল। তারপর ধীরে ধীরে বেরিয়ে এল। দরজার বাইরে লায়লা আর করিম অপেক্ষা করছেন। কায়নাতের চোখে পানি, কিন্তু মুখে একটা ছোট্ট হাসি।
“ও জেগেছে... ও কথা বলেছে।”
লায়লা তাকে জড়িয়ে ধরলেন। করিম চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন—তার মনে গনেশের ছায়া আরও গাঢ় হয়ে উঠল।
পর্ব ৪
সময় তার নিজস্ব গতিতে বয়ে চলেছে—অনেকটা নীরব নদীর মতো, যা কখনো থামে না। রাত গড়িয়ে দিন হয়, দিন গড়িয়ে আরেকটা দিন। এভাবেই তিন দিন কেটে গেল। রিয়াজের শরীর ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছে। হাসপাতালের ডাক্তাররা বলছে, আর কয়েকদিন পর বাড়ি ফিরতে পারবে। বাড়িতে এখন একটা আশা জেগেছে—যেন সবাই শ্বাস নিচ্ছে, কিন্তু পুরোপুরি নয়।
রাত নেমেছে। রান্নাঘরে হালকা আলো জ্বলছে। কায়নাত একা দাঁড়িয়ে আছে চুলার সামনে। তার হাতে একটা কড়াই, তাতে মুরগির মাংস ঝোল ফুটছে—রিয়াজের সবচেয়ে প্রিয় খাবার। মশলার গন্ধে পুরো রান্নাঘর ভরে গেছে। কায়নাতের চোখে একটা মৃদু হাসি—যেন এই রান্না করতে করতে সে রিয়াজকে ফিরে পাচ্ছে। তার পরনে একটা হালকা সবুজ কামিজ, চুল খোলা, কপালে ঘামের ফোঁটা। সে আস্তে আস্তে নেড়ে দিচ্ছে ঝোলটা, মনে মনে ভাবছে—কাল রিয়াজের জন্য খাবার নিয়ে গেলে বলবে , “তোমার হাতের রান্না ছাড়া আমি বাঁচতে পারি না।”
পাশের টেবিলে সাদিয়া বসে পড়ছে। তার সামনে একটা ছোট্ট বই, কিন্তু তার চোখ বারবার দরজার দিকে যাচ্ছে—দাদুকে খুঁজছে। লায়লা বেগম আর নার্গিস বসে আলু ছিলছে। ছুরির শব্দ আর আলুর খোসা পড়ার শব্দ মিলে একটা ঘরোয়া ছন্দ তৈরি হয়েছে।
নার্গিস আস্তে করে মুখ তুলল।
“বড় সাহেবা... বড় সাহেবকে তো দেখছি না আজ। কোথায় গেলেন যে?”
লায়লা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তার হাত থেমে গেল।
“জানি না রে নার্গিস। একটা ফোন এলো, আর চলে গেল। বলল, কাজ আছে। ফিরবে অনেক রাতে।”
নার্গিস মাথা নিচু করে আবার আলু ছিলতে লাগল। কিন্তু তার চোখে একটা উদ্বেগ। লায়লা চুপ করে রইলেন। বাড়ির ভিতরে যেন একটা অদৃশ্য ছায়া ঘুরছে—করিমের অনুপস্থিতি সেই ছায়াকে আরও গাঢ় করে তুলেছে।
এদিকে, শহরের বাইরে একটা পুরনো কবরস্থান। চাঁদের আলোয় সাদা পাথরের কবরগুলো যেন নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে। করিম খান একা দাঁড়িয়ে। তার পরনে সাধারণ কালো পাঞ্জাবি, মাথায় টুপি নেই। তার হাত কাঁপছে। সামনে একটা বড় কবরের পাশে গনেশ দাঁড়িয়ে—তার বিশাল শরীর চাঁদের আলোয় আরও কালো লাগছে।
গনেশের গলা গভীর, শান্ত—কিন্তু ভিতরে আগুন।
“এসেছেন তাহলে, করিম সাহেব। ভেবেছিলাম আসবেন না।”
করিমের গলা শুকনো। সে চোখ তুলে তাকাল।
“তোমার কত টাকা লাগবে, গনেশ? বলো। আমি দিতে রাজি। যত টাকা চাও।”
গনেশের ঠোঁটে একটা তিক্ত হাসি ফুটল। সে ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।
“টাকা? টাকা দিয়ে আমি কী করব, সাহেব? টাকা তো খুব তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যায়। আর আমার যা হারিয়েছে, সেটা টাকায় ফেরত আসবে না।”
করিমের কপালে ঘাম জমল। তার গলা ভারী হয়ে এল।
“তবে? তবে কী চাও তুমি?”
গনেশ এক পা এগিয়ে এল। তার চোখ করিমের চোখে সোজা।
“আমি তোমার বাড়িতে থাকতে চাই।”
করিমের শরীরে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল। তার চোখ বড় বড় হয়ে গেল। গলা থেকে চিৎকার বেরিয়ে এল—
“অসম্ভব! তোমাকে আমার বাড়িতে? আমার পরিবারের কাছে? তুমি পাগল হয়ে গেছো?”
গনেশের গলা একদম নিচু, কিন্তু কর্তৃত্বপূর্ণ।
“আওয়াজ নামাও, করিম সাহেব। এখানে কেউ শুনবে না, কিন্তু তোমার গলা শুনলে আমার রাগ বাড়বে। আমাকে কাজের লোক হিসেবে রেখে দাও। গাড়ি চালাব, বাগান দেখব, যা বলবে তাই করব। না হলে আমি কোথায় থাকব? রাস্তায়? তোমার জন্য তো রাস্তাই আমার ঘর হয়ে গেছে কুড়ি বছর ধরে।”
করিমের হাত কাঁপছে। সে পিছিয়ে গেল এক পা।
“যদি তুমি আমার পরিবারের কোনো ক্ষতি করো? যদি তুমি...”
গনেশ হাসল—একটা ঠান্ডা, ভয়ঙ্কর হাসি।
“আমি তোমার পরিবারের ক্ষতি করব? চিন্তা করো না। আমি কখনো তা করব না। আমি শুধু থাকতে চাই... তোমার চোখের সামনে। তোমার বাড়িতে। তোমার ছেলের সামনে।তোমার স্ত্রীর সামনে। তোমার ছেলের বউয়ের সামনে। তোমার নাতনির সামনে। যাতে প্রতিদিন মনে পড়ে—যে অন্যায় তুমি করেছিলে, তার দাম এখনো শোধ হয়নি।”
করিমের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। তার গলা থেকে কথা বেরোল না। গনেশ আরও কাছে এল। তার বিশাল হাত করিমের কাঁধে রাখল—হালকা, কিন্তু ভারী।
“মনে আছে সেই পুরান কথা? আমার খেত, আমার বউ, আমার ছেলে... সব কেড়ে নিয়েছিলে তুমি। একটা প্রমোশন এর জন্য। আজ আমি শুধু ফিরে চাই... যা আমার ছিল। একটা ঘর। একটা জায়গা। আর তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে প্রতিদিন দেখতে চাই—তোমার অপরাধবোধ কীভাবে তোমাকে খায়।”
করিম মাথা নিচু করল। তার চোখে জল এসে পড়ল, কিন্তু পড়ল না।
“আমি... ভেবে দেখব।”
গনেশের হাত সরে গেল। সে পিছিয়ে গেল।
“ভাবার সময় নেই। কাল সকালে আমি তোমার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকব। দরজা খুলে দিও। না হলে... পরের গুলিটা হয়তো তোমার ছেলের বুকে লাগবে না। হয়তো অন্য কোথাও লাগবে।”
গনেশ ঘুরে চলে গেল। তার পায়ের শব্দ কবরস্থানের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। করিম একা দাঁড়িয়ে রইল। তার শরীর কাঁপছে। চাঁদের আলোয় তার মুখ যেন একটা ভাঙা মূর্তি।
বাড়িতে ফিরে করিম কোনো কথা বলল না। লায়লা জিজ্ঞাসা করলেন, “কোথায় ছিলে?” করিম শুধু বলল, “কাজ ছিল।” তারপর নিজের ঘরে চলে গেল। রাত গভীর হলো। কিন্তু করিমের চোখে ঘুম নেই। গনেশের কথা তার কানে বাজছে—আর তার মনে একটা ভয় জন্ম নিচ্ছে। কাল সকালে কী হবে?