পুরনো কথা - অধ্যায় ৪
**পর্ব ৭**
দুপুরের নরম আলো জানালা দিয়ে ঘরে ঢুকছে। কায়নাত সাদিয়াকে কোলে নিয়ে বসে আছে সোফায়। ছোট্ট মেয়েটার মুখে চামচ করে খিচুড়ি তুলে দিচ্ছে, আর মাঝে মাঝে গল্প বলছে—
“তারপর রাজকন্যা দেখল, জঙ্গলের মাঝে একটা ছোট্ট ঝরনা। পানিতে সোনালি আলো ঝিকমিক করছে। সে হাত বাড়িয়ে পানি ছুঁলো…”
সাদিয়া মুখ খুলে হাসছে, খাবারের সাথে সাথে মায়ের গল্প শুনতে শুনতে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। টিভিতে কোনো একটা পুরনো গানের অনুষ্ঠান চলছে—নিচু ভলিউমে, শুধু পটভূমির মতো।
নার্গিস হাতে একটা খালি ট্রে নিয়ে ঘরে ঢুকল।
কায়নাত চোখ তুলে জিজ্ঞেস করল,
“মা কোথায় নার্গিস আপা?”
নার্গিস ট্রেটা টেবিলে রেখে বলল,
“জানি না আপা। সকালে বের হয়েছেন রমজান ভাইয়ের সাথে। গাড়ি নিয়ে।”
কায়নাত একটু ভ্রু কুঁচকে বলল,
“ও আচ্ছা।”
নার্গিস কয়েক সেকেন্ড চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর একটু ইতস্তত করে বলে উঠল—
“ছোট সাহেবা… কাল রাতের ওই ব্যাপারটা… আমি রমজান ভাইয়ের রুমে ছিলাম, গল্প করছিলাম বলে… এখনো রাগ করে আছেন?”
কায়নাত মুচকি হেসে মাথা নাড়ল।
“না, রাগ করিনি। কিন্তু নার্গিস আপা, তুমি খুব সহজ-সরল। একটু সাবধানে থেকো। এত রাতে অন্য পুরুষ মানুষের রুমে বসে থাকা… ভালো না।”
নার্গিস লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করল।
“হ্যাঁ আপা, ঠিক বলেছেন। পরের বার খেয়াল রাখব।”
দুজনেই একসাথে মৃদু হাসল। সাদিয়া হঠাৎ হাত বাড়িয়ে নার্গিসের দিকে তাকাল, “নার্গিস খালা অনেক ভালো, অনেক ভালো !” বলে ডাকল। নার্গিস হেসে তার গাল টিপে দিল।
একটু পর বাইরে গাড়ির শব্দ হল। ইঞ্জিন বন্ধের আওয়াজ, তারপর দরজা খোলার শব্দ। লায়লা বেগম ঘরে ঢুকলেন। তার পরনে হালকা সবুজ শাড়ি, মুখে একটা শান্ত হাসি। পেছনে গনেশ—মানে রমজান—হাতে একটা ছোট ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে।
কায়নাতের চোখ গিয়ে পড়ল গনেশের দিকে। আজ তার চেহারায় অন্যরকম ভদ্রতা। চোখ নিচু করে দাঁড়িয়েছে, লায়লা বেগমের সামনে যেন একদম অন্য মানুষ।
লায়লা বেগম সোফার কাছে এসে বসলেন। সাদিয়াকে কোলে নিয়ে চুমু খেলেন। তারপর কায়নাতের দিকে তাকিয়ে বললেন—
“আজ অনেক দেরি হয়ে গেল। রমজান নিয়ে গিয়েছিলাম বাজারে। ও খুব ভালো করে গাড়ি চালায়। ”
কায়নাত একটু অবাক হয়ে তাকাল। লায়লা বেগমের গলায় যেন কোনো অভিযোগ নেই। বরং একটা হালকা প্রশংসা।
গনেশ নম্র গলায় বলল,
“বড় সাহেবা, আমি ব্যাগটা রান্নাঘরে রেখে আসি?”
লায়লা বেগম মাথা নাড়লেন।
“হ্যাঁ রাখো। আর শোনো, সন্ধ্যায় চা বানাবে। আজ আমার মনটা খুব ভালো আছে। আমরা সকলে খাবো”
গনেশ মাথা নিচু করে “জি আপা” বলে চলে গেল।
লায়লা বেগম সোফায় বসে সাদিয়ার গালে হাত বুলিয়ে দিলেন। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন—
“ভেবেছিলাম লোকটা ভালো না। কিন্তু দেখো, কত ভদ্র ব্যবহার। গাড়ি চালানো থেকে শুরু করে সবকিছুতেই সাবধানী। আজ সারাদিন আমার সঙ্গে ছিল, একদম সম্মান দিয়ে কথা বলেছে।”
কায়নাত সাদিয়াকে কোলে নিয়ে একটু হাসার চেষ্টা করল। কিন্তু হাসিটা পুরোপুরি মুখে ফুটল না।
“কী জানি মা… আমার তো সুবিধার মনে হয় না।”
লায়লা বেগম একটু চুপ করে তাকালেন কায়নাতের দিকে। মনে মনে ভাবলেন—আগে তো লোকটা কায়নাতের দিকে খারাপভাবে তাকাতো বলে মনে হয়েছিল। চোখে একটা অস্বস্তিকর লোভ ছিল। কিন্তু আজ সারাদিন দেখলেন, একদম সাধারণ, ভদ্র। হয়তো চোখের ভুলই ছিল। বয়স হচ্ছে, চোখও ঠিকমতো দেখে না আর।
তিনি মুখ ফিরিয়ে বললেন,
“হ্যাঁ রে, রিয়াজ কেমন আছে এখন?”
কায়নাত সাদিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
“ভালো আছে মা। সকালে খাইয়ে এসেছি। ডাক্তার বলেছে পরশু বাসায় নিতে পারবেন। ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছে।”
লায়লা বেগমের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। চোখে পানি চিকচিক করে উঠল।
“***** কত রহমত! আমার ছেলে ফিরে আসবে। এতদিনের দুঃখটা শেষ হবে।”
তিনি সাদিয়াকে আরেকবার চুমু খেয়ে উঠে দাঁড়ালেন।
“আমি একটু রান্নাঘরে যাই। নার্গিসকে বলে আসি ঘর পরিষ্কার রাখতে। রিয়াজের সুস্থতার খবরে একটু উৎসব করা দরকার।”
কায়নাত মাথা নাড়ল, কিন্তু তার মনের ভেতরটা আরও ভারী হয়ে উঠল। লায়লা বেগম রান্নাঘরের দিকে চলে যাওয়ার পর সে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
বাইরে গাড়িটা এখনো দাঁড়িয়ে। গনেশ ব্যাগ রেখে ফিরে আসছে। তার চলার ধরনে একটা অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস। হঠাৎ চোখ তুলে সরাসরি কায়নাতের দিকে তাকাল।
চাহনিটা মাত্র দু’সেকেন্ডের।
কিন্তু কায়নাতের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
**পর্ব ৮**
রাতের খাবারের টেবিলে সবাই বসেছে। ঘরে হালকা আলো, প্লেটে গরম গরম রুটি আর মুরগির ঝোলের গন্ধ। সাদিয়া তার ছোট চেয়ারে বসে খেলনা দিয়ে খেলছে, মাঝে মাঝে মায়ের দিকে তাকাচ্ছে।
করিম সাহেব প্লেটে রুটি ছিড়ে মুখে দিচ্ছেন, কিন্তু মন অন্যদিকে। লায়লা বেগম একটু উৎসাহ নিয়ে বলে উঠলেন—
“কাল তো রিয়াজ ঘরে আসবে। সকালে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাবে। আমরা কীভাবে নিয়ে আসব? গাড়িতে কে যাবে? কায়নাতের সাথে, আমার ত বাসা গুছাতে হবে।”
করিম সাহেব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“আমি তো যেতে পারব না কায়নাত। কাল ক্যাম্পে খুব জরুরি মিটিং আছে। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত।”
লায়লা বেগমের চোখ কপালে উঠে গেল।
“কী বলো তুমি? কাল ছেলে বাড়ি ফিরবে, আর তুমি মিটিং? এ কীসের কথা রিয়াজের বাবা?”
করিম সাহেব মাথা নিচু করে বললেন,
“I am so sorry, লায়লা। এটা এড়ানো যাবে না। প্রমোশনের পর এখন এসব মিটিং খুব গুরুত্বপূর্ণ।”
টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে নার্গিস খাবার পরিবেশন করছিল। সে হঠাৎ মুখ তুলে বলে উঠল, একদম সরল গলায়—
“বড় সাহেব, রমজান ভাইকে বলা যায় না? উনি তো খুব ভালো গাড়ি চালান। কালি তো বড় সাহেবা নিয়ে গিয়েছিলেন বাজারে।”
কায়নাতের চামচ হাতে থমকে গেল। সে ধীরে ধীরে লায়লা বেগমের দিকে তাকাল—চোখ দুটো বড় বড়, যেন বলছে, “এটা কী করল নার্গিস?”
মনে মনে কায়নাত ভাবল—‘আহা নার্গিস আপা… এখনো কথা বলা বোঝে না একদম।’
করিম সাহেবের মুখটা একটু শক্ত হয়ে গেল। তিনি জানেন রমজান মানে গনেশ কে। কিন্তু কিছু বলার আগেই লায়লা বেগম উৎসাহ নিয়ে বলে উঠলেন—
“হ্যাঁ, ঠিক বলেছে নার্গিস। রমজান তো সত্যিই খুব ভালো গাড়ি চালায়। কাল সারাদিন আমার সঙ্গে ছিল, একদম সাবধানে, সম্মান দেয়। কোনো অসুবিধা হবে না।”
কায়নাতের মুখটা লাল হয়ে উঠল। সে চুপ করে রইল, কিন্তু হাতের আঙুলগুলো টেবিলের নিচে মুঠো হয়ে গেল। গনেশকে নিয়ে যাওয়া—এটা তার একদম পছন্দ না। কিন্তু এখন সবাই এত উৎসাহী, সে কী করে না বলবে?
নার্গিসও একটু হেসে বলল,
“দেখবেন, রমজান ভাই খুব ভালো মানুষ।”
করিম সাহেব আর কিছু বলতে পারলেন না। সবাই যেন একসঙ্গে রাজি হয়ে গেছে। তিনি একটু থেমে, তারপর গলা তুলে ডাক দিলেন—
“রমজান!”
দরজার কাছে গনেশ দাঁড়িয়ে ছিল। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এল। মাথা নিচু করে বলল,
“জি, সাহেব?”
করিম সাহেব গম্ভীর গলায় বললেন,
“কাল সকালে তুমি গাড়ি নিয়ে হাসপাতাল যাবে। রিয়াজকে নিয়ে আসবে। কায়নাতও যাবে। সাবধানে চালাবে। কোনোরকম ভুল করবে না। বুঝলে?”
গনেশ নম্রভাবে মাথা নাড়ল।
“জি সাহেব। আমি সব সামলে নেব।”
তারপর সে একবার কায়নাতের দিকে তাকাল।
কায়নাতের চোখও তার দিকে চলে গেল। চোখাচোখি হল মাত্র এক সেকেন্ড। গনেশের চোখে সেই একই ছায়া—শান্ত, নিয়ন্ত্রিত, আর একটু বিজয়ের হাসি যেন লুকানো।
কায়নাত দ্রুত চোখ সরিয়ে নিল। তার মুখটা রাগে শক্ত হয়ে গেল। ঠোঁট দুটো টিপে ধরল, যেন কথা আটকে রাখছে। সে মোটেও খুশি না। একদম না।
লায়লা বেগম হাসিমুখে বললেন,
“আচ্ছা, তাহলে ঠিক হল। কাল সকাল দশটায় বের হবে কায়নাত। রিয়াজকে ঘরে আনব। *** কত রহমত!”
করিম সাহেব চুপচাপ মাথা নাড়লেন। কায়নাত খাবারে চামচ ঘুরাতে লাগল, কিন্তু একটাও গ্রাস গলা দিয়ে নামছে না।
টেবিলের ওপারে গনেশ আস্তে আস্তে পিছিয়ে গেল। যাওয়ার আগে আরেকবার কায়নাতের দিকে তাকাল—এবার চোখে একটা নিঃশব্দ প্রশ্ন যেন: “এখন কী করবে?”
কায়নাতের বুকের ভেতরটা পুড়তে লাগল।
সে মনে মনে বলল—
“এ লোকটা… এ বাড়িতে আর এক মুহূর্তও থাকা উচিত না। কিন্তু আমি কীভাবে সবাইকে বোঝাব?”