The Barter System - অধ্যায় ৩৩
(continuation of the chapter...)
"ওয়েল... আমি তোকে একটা মেসেজ পাঠিয়েছিলাম," ইন্দিরা সোফায় বসতে বসতে, একটু অভিমানী, নরম গলায় বললেন। "কিন্তু তুই তো সেটার কোনো রিপ্লাই-ই দিলি না।"
রাহুল সাথে সাথে প্রতিবাদ করে উঠল। "দ্যাটস্ নট ট্রু মা! আমি তোমাকে ফোনেই বলেছিলাম। আমি বলেছিলাম যে আমি তোমার মেসেজটা পড়েছি।"
ইন্দিরা এবার পুরোপুরি রাহুলের দিকে ফিরলেন। তাঁর চোখদুটো এখন এক গভীর, স্নিগ্ধ ভালোবাসায় টলটল করছে। "হুমম... আমি ওই মেসেজে লিখেছিলাম যে আমি আমাদের দুজনের জন্য পেঁয়াজি বানাব... আমি ভেবেছিলাম আজ সন্ধেটা আমরা দুজনে একসাথে কাটাব... কাল তোর জন্মদিন... তুই কুড়ি বছরের একটা আস্ত ইয়ং ম্যান হয়ে যাবি... আমি বড্ড এক্সাইটেড ছিলাম জানিস... ভেবেছিলাম আজ সন্ধে থেকেই আমাদের সেলিব্রেশনটা শুরু করব... তা সে ওই সামান্য পেঁয়াজি দিয়েই হোক না কেন..."
ইন্দিরার এই কথাগুলো শুনে রাহুলের বুকের ভেতরটা যেন একটা বিশাল, নরম উষ্ণতায় ভরে গেল। ও নিজের দুটো হাত দিয়ে মাকে শক্ত করে, নিবিড়ভাবে নিজের বুকের সাথে পিষে ধরল।
"ওহ্ মা..." রাহুলের গলার স্বর আবেগে বুজে এল। "আমিও তো ঠিক এটাই চাইছিলাম... তোমার সাথে সময় কাটাতে... তুমি জানো আমি তোমার সাথে একা সময় কাটানোর জন্য কতটা পাগল হয়ে ছিলাম... আর সেই জন্যই তো আমি এত তাড়াতাড়ি ওখান থেকে চলে এসেছি..."
রাহুলের এই কথাটা শুনে ইন্দিরা একটু চমকে গেলেন। সত্যি তো, ছেলেটা এত তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরল কী করে সেটাই তো জিজ্ঞেস করা হয়নি!
তিনি রাহুলের চোখের দিকে তাকালেন। তাঁর মুখের ওই মেকি কাঠিন্যটা এখন পুরোপুরি উধাও হয়ে সেখানে এক অসীম, আদিম প্রশ্রয় ফুটে উঠেছে।
"ওহ্, তাই নাকি? তুই ওই বাড়ি থেকে এত তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এলি... শুধু আমার সাথে সময় কাটাবি বলে?"
"অফকোর্স মা!" রাহুল একদম শিশুর মতো আন্তরিকতায় ঘাড় নাড়ল। "আর তাছাড়া, আমাদের ওই ফোন কলের পর আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে আমি তোমাকে খুব কষ্ট দিয়েছি, তুমি আমার ওপর রেগে আছ। ওই বাড়িতে যতক্ষণ আমি বসে ছিলাম, আমার মাথার ভেতর শুধু একটাই চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছিল—কখন আমি বাড়ি ফিরব, আর কখন তোমাকে ঠিক এইভাবে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলব যে আমি তোমাকে একটুও কষ্ট দিতে চাইনি মা।"
ছেলের এই নির্ভেজাল, অন্ধ ভালোবাসার কথা শুনে ইন্দিরার ঠোঁটের কোণে একটা বাঁধভাঙা, উজ্জ্বল হাসি ফুটে উঠল। তাঁর বুকের ভেতরের সমস্ত সংশয়, সমস্ত ঈর্ষা যেন এক মুহূর্তে কর্পূরের মতো উবে গেল। তিনি রাহুলের ওই সুন্দর, ফর্সা মুখটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন। আজ ওকে বড্ড বেশি হ্যান্ডসাম লাগছে। তিনি নিজের ডান হাতটা তুলে রাহুলের কানের পাশ থেকে একটা অবাধ্য চুলের গোছা সরিয়ে দিয়ে, অত্যন্ত আদুরে আর কৌতুকী সুরে জিজ্ঞেস করলেন:
"তাই? আর তুই ওই বাড়িতে গিয়ে কী বললি? যে আমার বাড়িতে একটা খুব অভিমানী, রাগী মা আমার জন্য বসে আছে, তাই আমাকে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে হবে?"
রাহুলের গালদুটো মুহূর্তের মধ্যে লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। ও একটু অপ্রস্তুত হাসি হেসে বলল, "না... অফকোর্স নট! আমি হোমওয়ার্কের ওই এক্সকিউজটাই দিলাম শেষমেশ। আর বললাম যে আমি অন্য কোনো একদিন আবার আসব।"
ইন্দিরা আবার হাসলেন। তাঁরা দুজনে এখন সোফায় একে অপরের একদম কাছাকাছি, প্রায় গায়ে গা লাগিয়ে বসে আছেন। ইন্দিরা একদৃষ্টে রাহুলের চোখের দিকে তাকিয়ে আছেন। তাঁর চোখে এখন এক তীব্র, নিষিদ্ধ মাতৃত্বের নেশা।
"আর অনেস্টলি বলতে গেলে..." রাহুল একটু ইতস্তত করে বলতে শুরু করল।
ইন্দিরা ক্ষণিকের জন্য একটু অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিলেন ছেলের ওই চোখের দিকে তাকিয়ে। তিনি চমকে উঠে বাস্তবে ফিরলেন। "হ্যাঁ, বল রাহুল... কী অনেস্টলি?"
রাহুল একটু হাসল। "অ্যাকচুয়ালি... বরুণের মা বড্ড বেশিই কথা বলেন... কথা আর শেষ হতেই চায় না। আর কিরম যেন একটা যাত্রাপালার টোন করে কথা বলেন।"
এই কথাটা শুনে ইন্দিরা আর নিজের হাসি চেপে রাখতে পারলেন না। তিনি শব্দ করে, খিলখিল করে হেসে উঠলেন। রাহুলের এই তীক্ষ্ণ অবজারভেশনটা তাঁর ভেতরের ওই এলিটিস্ট ইগোটাকে বড্ড তৃপ্তি দিল।
"আর তুমি জানো আজ কী হলো?" রাহুল মায়ের হাসিতে যোগ দিয়ে বলল। "ওই যে বিরিয়ানির কথা বলেছিলেন না যে উনি নিজে বানাবেন... ওই বিরিয়ানিটা আসলে আমিনিয়া থেকে কেনা ছিল!"
ইন্দিরা হাসতে হাসতেই চোখ বড় বড় করে বললেন, "হোয়াট? বলিস কী!"
"হ্যাঁ মা..." রাহুল একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল। "উনি আমাকে প্লেটে দিতে দিতে বললেন যে উনি নাকি নিজেই বানাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তারপর ওঁর মনে হলো যে ওঁর হাতের বিরিয়ানি নাকি কলকাতার বিরিয়ানির চেয়ে অনেক বেশি স্পাইসি হয়, আর আমি যেহেতু ওতে অভ্যস্ত নই, তাই কালকের বার্থডে-র আগে আমার পেট খারাপ হয়ে যেতে পারে। তাই উনি ডিসাইড করেছেন আমিনিয়া থেকে কিনে আনবেন।"
ইন্দিরা এবার একগাল হেসে, বেশ মজার সুরেই বললেন, "ওহ্... আই সি... বেশ থটফুল বলতে হয়।"
রাহুল চোখ উলটে, হো হো করে হেসে উঠল। "কী যে বলছ মা! আই থিঙ্ক দ্যাট ওয়াজ টোটাল ননসেন্স। আমার তো মনে হয় উনি নিজে ভালো করে বিরিয়ানি বানাতেই পারেন না, তাই নিজের প্রেস্টিজ বাঁচাতে ওইসব আজেবাজে স্টোরি বানিয়েছেন।"
এই কথাটা শোনার পর মা আর ছেলে দুজনেই একযোগে এক প্রবল, প্রাণখোলা হাসিতে ফেটে পড়ল। লিভিং রুমের ওই নিস্তব্ধ পরিবেশে তাদের এই হাসির শব্দ যেন এক চরম স্বস্তির, এক চরম মুক্তির সিম্ফনি তৈরি করল।
হাসতে হাসতেই রাহুল মাকে আরও একবার নিজের বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
"মা... সত্যি কথা বলতে... তোমার সাথে এইভাবে বসে মজা করা, হাসাহাসি করাটা... ওই বাড়িতে বসে থাকার চেয়ে এক কোটি গুণ বেশি বেটার..."
ইন্দিরা অত্যন্ত উষ্ণ, আর গভীর ভালোবাসায় ভরা চোখে রাহুলের দিকে তাকালেন। তাঁর চোখের ওই দৃষ্টিতে পৃথিবীর সমস্ত মাতৃত্ব আর এক আদিম, সংজ্ঞাহীন সমর্পণ যেন গলে গলে পড়ছে। রাহুল তাঁকে আরও শক্ত করে বুকের সাথে পিষে ধরল, আর ইন্দিরাও নিজের দুই হাত দিয়ে ছেলেকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরলেন।
বেশ কয়েক মিনিট ওই নিবিড়, রুদ্ধশ্বাস আলিঙ্গনে থাকার পর, রাহুল ধীরে ধীরে নিজের হাতের বাঁধনটা একটু আলগা করল। ও মায়ের চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। ওর চোখের মণি দুটো এবার এক অন্যরকম, অবাধ্য তৃষ্ণায় চকচক করছে।
"মা..." রাহুল অত্যন্ত নিচু, ফিসফিস করা, আর বড্ড আদুরে গলায় জিজ্ঞেস করল, "একটু... একটু আদর করবে?"
রাহুলের এই সরাসরি, অথচ চরম মিষ্টি আবদারে ইন্দিরার ফর্সা গালদুটো মুহূর্তের মধ্যে লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। তিনি নিজের ভেতরের ওই রোমাঞ্চটাকে লুকোনোর জন্য, এক চরম কপট, অভিমানী ভান করে মুখটা একটু অন্য দিকে ঘুরিয়ে বললেন:
"উহুঁ, মা রেগে আছে না? আমি কিন্তু খুব রেগে আছি..."
রাহুল ওর মায়ের এই নাটকটা খুব ভালো করেই ধরতে পারল। ওর ঠোঁটের কোণে একটা দুষ্টু, মোহময় হাসি ফুটে উঠল। ও মায়ের মুখের আরও একটু কাছে গিয়ে ফিসফিস করল: "ও, খুব রেগে আছ?"
ইন্দিরা এবার ওর দিকে তাকিয়ে, চোখদুটো বড় বড় করে, একদম ছোট বাচ্চাদের মতো ঠোঁট ফুলিয়ে বললেন: "হ্যাঁ তো, খুউউব। আমার বাবুটা মায়ের কথা শোনেনি, রেগে থাকব না?"
রাহুল ওদের এই খুনসুটির খেলাটা আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেল। ও খুব সিরিয়াস একটা মুখ করে, কিন্তু গলার স্বরে চরম দুষ্টুমি মিশিয়ে বলল: "মা কি তাহলে আমাকে বকবে? মারবে?"
ইন্দিরা এবার ওর চুলের মধ্যে হাত ডুবিয়ে দিয়ে, অত্যন্ত আদুরে আর প্রশ্রয়ের গলায় বললেন: "হ্যাঁ, মারব তো, আমার ছেলেটা যে বড্ড দুষ্টু হয়ে গেছে... কাল জন্মদিন বলে সাপের পাঁচ পা দেখেছে..."
রাহুল একটুও না দমে, নিজের মুখটা মায়ের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল: "বেশ, কোথায় মারবে তাহলে?"
ইন্দিরা নিজের ফর্সা, নরম তর্জনীটা দিয়ে রাহুলের ডান গালের একটা নির্দিষ্ট জায়গা নির্দেশ করে ফিসফিস করলেন: "এখানে..."
রাহুল চোখদুটো বুজে ফেলে, এক চরম সমর্পণের সুরে বলল: "মারো তাহলে..."
ইন্দিরা আর এক সেকেন্ডও দেরি করলেন না। তিনি সামান্য ঝুঁকে এসে রাহুলের ডান গালের ওই নির্দিষ্ট জায়গাটার ওপর নিজের নরম, উষ্ণ ঠোঁটদুটো দিয়ে একটা দীর্ঘ, গাঢ় চুমু এঁকে দিলেন।
চুমুর ওই নিবিড় স্পর্শে রাহুলের সারা শরীর এক প্রবল, মাদকতাময় উত্তেজনায় কেঁপে উঠল। কিন্তু ও সাথে সাথে চোখ খুলে, এক চরম নাটুকে ভঙ্গিতে নিজের গালটা হাত দিয়ে চেপে ধরে বলল: "উঃ! খুব জোরে লাগল... কী ব্যথা! আরও মারবে বুঝি?"
ইন্দিরা এবার খিলখিল করে হেসে উঠলেন। এই রোম্যান্টিক খেলার নেশা তাঁকে পুরোপুরি আচ্ছন্ন করে দিয়েছে। "হ্যাঁ মারব তো বটেই। এবার এইখানে..."
কথাটা বলেই তিনি রাহুলের বাঁ গালের ওপর আরও একটা দীর্ঘ, সিক্ত চুমু এঁকে দিলেন।
রাহুল আবার সেই একই নাটক করে চেঁচিয়ে উঠল: "উফফ কী ব্যথা লাগছে মা! এত জোরে মারছ আমায়? আমি কি এতই দুষ্টু?"
ইন্দিরা এবার নিজের মুখটা রাহুলের মুখের একদম কাছাকাছি নিয়ে এলেন। তাঁদের দুজনের শ্বাস একে অপরের ত্বকে আছড়ে পড়ছে। ইন্দিরা অত্যন্ত নিবিড়, ফিসফিস করা গলায় বললেন: "তা আর বলতে... ভীষণ দুষ্টু... আর সব দুষ্টুমি শুধু মায়ের কাছে..."
রাহুল ওই ঘোরের মধ্যেই, অত্যন্ত নিচু, নেশাতুর স্বরে ফিসফিস করে পাল্টা প্রশ্ন করল: "এবার... এবার কোথায় মারবে মা?"
ইন্দিরা খুব ধীর গতিতে, নিজের ফর্সা তর্জনীটা তুলে রাহুলের ওই সামান্য ফাঁক হয়ে থাকা, উষ্ণ ঠোঁটদুটোর ওপর আলতো করে বুলিয়ে দিলেন। তাঁর গলার স্বর এবার এক চরম, আদিম ফিসফিসানিতে নেমে এল: "এই... এইখানটায়..."
রাহুলের হৃৎপিণ্ডটা যেন এক লহমায় গলার কাছে উঠে এল। ও নিজের মুখটা মায়ের মুখের দিকে আরও একটু এগিয়ে নিয়ে গিয়ে, রুদ্ধশ্বাস গলায় ফিসফিস করল: "খুব... জোরে... মারবে... মা?"
ইন্দিরা মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন। তাঁর নিজের চোখদুটো তখন এক অসীম কামনায় আর ভালোবাসায় বুজে আসছে। তিনি নিজের ঠোঁটদুটো রাহুলের ঠোঁটের আরও কাছে নিয়ে গিয়ে বিড়বিড় করলেন: "খুব.... খুউউব... জোরে... "
তাদের ঠোঁটদুটো একে অপরের সাথে মিলিত হওয়ার মাঝখানে তখন আর মাত্র কয়েক মিলিমিটারের ব্যবধান। রাহুলের শরীরটা একটা প্রবল, বন্য চুম্বনের প্রত্যাশায় ধনুকের মতো টানটান হয়ে উঠেছে।
আর ঠিক সেই চরম, রুদ্ধশ্বাস, এবং অবর্ণনীয় মুহূর্তেই...
'টিরিং-টিটিং-টিটিং... টিরিং-টিটিং-টিটিং... তিতিলিং!'
লিভিং রুমের নিস্তব্ধতাকে ফালাফালা করে বেজে উঠল ইন্দিরার মোবাইল ফোন।
ইন্দিরা এক বৈদ্যুতিক শকের মতো ছিটকে পেছনে সরে গেলেন। তিনি বিরক্তি সহকারে দ্রুত ঘাড় ঘুরিয়ে টেবিলের ওপর রাখা ফোনটার দিকে তাকালেন। স্ক্রিনে ভাসছে সুব্রতর নাম।
তিনি একটা দীর্ঘ, হতাশাজনক শ্বাস ফেলে নিজের শাড়ির আঁচলটা ঠিক করে নিয়ে ফোনটা হাতে তুলে নিলেন।
"হ্যাঁ, সুব্রত, বলো," ইন্দিরার গলাটা যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করলেন তিনি। "কী হয়েছে?"
রাহুল সোফায় হতাশ হয়ে বসে, কপালের ঘাম মুছতে মুছতে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
"ইন্দিরা! একটা ইন্টারেস্টিং নিউজ আছে!" ফোনের ওপার থেকে সুব্রতর গলাটা বেশ উত্তেজিত শোনাল। এমনিতে সুব্রত খুব একটা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করার মানুষ নন, কিন্তু আজ তাঁর গলার স্বরে এক অদ্ভুত আনন্দ ঠিকরে পড়ছে। "একদম লাস্ট মোমেন্টে দুটো মারাত্মক কো-ইন্সিডেন্স হয়ে গেল!"
"কো-ইন্সিডেন্স? কীসের কো-ইন্সিডেন্স?" ইন্দিরা ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন।
"আরে, কাল সকালে ভিভান্তা গ্রুপের সাথে আমাদের যে ফাইনাল মিটিংটা ছিল না? ওটা ক্যানসেল হয়ে গেছে!"
"ক্যানসেল? কেন?"
"আরে ওদের সিইও-র নাকি হঠাৎ করে সিভিয়ার ফুড পয়জনিং হয়েছে। লোকটা হসপিটালাইজড। তাই মিটিংটা পুরো এক সপ্তাহের জন্য পোস্টপোন হয়ে গেল। আর সবচেয়ে ভালো ব্যাপার হলো, আমাদের এন্ড থেকে সমস্ত প্রেজেন্টেশন আর ফিনান্সিয়াল ডেটা রেডি করা কমপ্লিট। তাই আগামী এক সপ্তাহ আমাদের আর এই প্রজেক্টটা নিয়ে কোনো মাথা ঘামাতেই হবে না। উই আর টোটালি ফ্রি!"
ইন্দিরা একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন। "ওহ্... দ্যাটস গুড নিউজ। যাক, তোমার ওপর থেকে প্রেশারটা কমল। তা, তুমি কি তাহলে এখন বাড়ি ফিরছ?"
"আরে না না! এটাই তো সেকেন্ড কো-ইন্সিডেন্স!" সুব্রতর গলার উচ্ছ্বাসটা এবার আরও দ্বিগুণ হয়ে গেল। "তুমি জাস্ট বিশ্বাস করতে পারবে না, আমি এখন কার সাথে দেখা করতে যাচ্ছি! মুরলী! মুরলী ইজ ইন কলকাতা!"
মুরলী? ইন্দিরার মগজটা কয়েক সেকেন্ডের জন্য ব্ল্যাঙ্ক হয়ে গেল। মুরলী নামটা তাঁর চেনা চেনা লাগছে, কিন্তু ঠিক মনে পড়ছে না। তারপর হঠাৎ করেই তাঁর মাথায় ফ্ল্যাশ করল। মুরলী মোহন! সুব্রতর কলেজ আর কলেজের বেস্ট ফ্রেন্ড! ওরা দুজনে প্রায় ভাইয়ের মতো ছিল। মুরলী আদতে অন্ধ্রপ্রদেশের মানুষ হলেও ওর পুরো বড় হওয়া আর পড়াশোনা কলকাতাতেই। লোকটা এক চরম আমুদে, প্রাণখোলা, বিশাল হৃদয়ের মানুষ, যে তার মনের সমস্ত ইমোশন খুব লাউডলি এক্সপ্রেস করতে ভালোবাসে। মুরলী এখন পুরোপুরি আমেরিকায়, সিয়াটেলে সেটেলড।
"মুরলী? ওহ্ মাই গড! ও কলকাতায় কবে এল?" ইন্দিরা সত্যিই একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন।
"আরে ও জাস্ট একটা ওয়ান-ডে কনফারেন্সের জন্য আজ সকালে এখানে ল্যান্ড করেছে," সুব্রত একনাগাড়ে বলে চললেন। "ও কাল সকালেই আবার মুম্বই উড়ে যাবে একটা অফিশিয়াল কাজে, তারপর সেখান থেকে ওর হোমটাউনে গিয়ে এক সপ্তাহ থেকে সোজা সিয়াটেলে ব্যাক করবে। ও আজ রাতে আইটিসি রয়্যাল বেঙ্গলে স্টে করছে।"
"ওহ্, দ্যাটস গ্রেট! তাহলে তুমি এখন ওর সাথে দেখা করতে যাচ্ছ?"
"অফকোর্স! কিন্তু, শুধু তাই নয়..." সুব্রত হাসতে হাসতে বললেন। "তুমি তো জানো মুরলী কেমন ক্রেজি একটা ছেলে। ও আমাকে পরিষ্কার বলে দিয়েছে, আজ রাতে আমাকে ওর সাথেই হোটেলে থাকতে হবে! ও বলছে, কাল সকালে ও চলে যাবে, এরপর আবার কবে দেখা হবে তার কোনো ঠিক নেই। তাই ও চায় আমি ওর সাথে সারারাত থাকি, ঠিক যেমন আমরা কলেজের হস্টেলে থাকতাম, সারারাত আড্ডা মারতাম।"
ইন্দিরার বুকের ভেতরটা হঠাৎ করেই একটা অজানা, অস্পষ্ট রোমাঞ্চে ধক করে উঠল। তিনি খুব সতর্কভাবে জিজ্ঞেস করলেন, "তা তুমি কী বললে?"
"আরে আমি তো বললাম যে, ভাই আমি অনেকক্ষণ আড্ডা মারতে পারি, কিন্তু সারারাত স্টে করা আমার পক্ষে পসিবল নয়। কিন্তু তুমি তো চেনো ওকে! ও কি কারোর কথা শোনার বান্দা? আমাকে ফোনে আচ্ছা করে দু-তিনটে গালাগাল দিয়ে বলল, 'তুই যদি আজ রাতে না থাকিস, তাহলে তোর সাথে আমার আর কোনোদিন কোনো সম্পর্ক থাকবে না!' আর তাছাড়া ও নাকি ইউএস থেকে একটা স্পেশাল স্কচ আর আরও কী কী সব নিয়ে এসেছে!" সুব্রত আবার হো হো করে হেসে উঠলেন।
"ওহ্... আই সি... তা তুমি এখন কোথায়?" ইন্দিরার গলার স্বরটা এবার এক অদ্ভুত, চাপা উত্তেজনায় কাঁপতে শুরু করেছে।
"হ্যাঁ, আমি অলরেডি একটা উবার নিয়ে নিয়েছি। এই জাস্ট উঠলাম। রয়্যাল বেঙ্গলের দিকেই যাচ্ছি। কাল বিকেলে ওর ফ্লাইট, আমি ওকে এয়ারপোর্টে ড্রপ করে তারপর বাড়ি ফিরব।"
"আচ্ছা ঠিক আছে। হ্যাভ ফান। কিন্তু প্লিজ, ড্রিঙ্ক রেসপনসিবলি, ওকে?" ইন্দিরা অত্যন্ত স্বাভাবিক গলায় বললেন।
"হ্যাঁ হ্যাঁ, ডোন্ট ওরি। চলি, গুডনাইট।"
"গুডনাইট।"
ইন্দিরা ফোনটা কান থেকে নামিয়ে স্ক্রিনের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর হাতদুটো সামান্য কাঁপছে।
রাহুল সোফা থেকে একটু এগিয়ে এসে, উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞেস করল, "কী হলো মা? আমি ফোনের ওপার থেকে বাবার গলা শুনতে পাচ্ছিলাম। বাবাকে বড্ড এক্সাইটেড মনে হচ্ছিল।"
ইন্দিরা একটা গভীর শ্বাস নিয়ে রাহুলকে পুরো ঘটনাটা খুলে বললেন। মিটিং ক্যানসেল হওয়া থেকে শুরু করে মুরলীর আসা, এবং বাবার সারারাত হোটেলে থাকার প্ল্যান—সবটা।
রাহুল প্রথমটা শুনে বাবার জন্য সত্যিই খুব খুশি হলো। "বাহ্! এটা তো খুব ভালো খবর। বাবা ওর বেস্ট ফ্রেন্ডকে কত বছর পর মিট করছে! বাবারও একটু রিল্যাক্সেশন দরকার ছিল।"
কিন্তু কথাটা বলার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই রাহুলের মগজে যেন একটা বিশাল, প্রলয়ঙ্করী সাইরেন বেজে উঠল। ওর চোখের মণি দুটো বিস্ময়ে আর এক তীব্র, বন্য রোমাঞ্চে বড় বড় হয়ে গেল। ও স্তব্ধ হয়ে ইন্দিরার দিকে তাকাল।
ও ধীরে ধীরে নিজের ডান হাতটা বাড়িয়ে ইন্দিরার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল।
"মা..." রাহুলের গলার স্বরটা বড্ড নিচু, কাঁপানো।
"কী সোনা?" ইন্দিরার নিজের গলাও তখন কাঁপছে।
"মা... বাবা তো... বাবা তো কাল বিকেল অব্দি বাইরে থাকবে..."
ইন্দিরা তখনও যেন এই বাস্তবতার পুরো অভিঘাতটা প্রসেস করে উঠতে পারেননি। তিনি অত্যন্ত ঘোরের মধ্যে বিড়বিড় করলেন, "হ্যাঁ, সেটাই তো বলল। মুরলী খুব ইন্টারেস্টিং লোক... তুই তো ওকে ছোটবেলায় দেখেছিস... ও তো..."
"মা!" রাহুল ওকে মাঝপথেই থামিয়ে দিয়ে এক চরম, রুদ্ধশ্বাস গলায় ফিসফিস করে উঠল। "আমি বলছি যে... বাবা আজ রাতে আর বাড়িতে আসবে না... আর কাল বিকেল পর্যন্ত বাবা বাড়িতে থাকবে না!"
এই কথাটা রাহুলের মুখ থেকে শোনার পর ইন্দিরার মগজের ওপর থেকে শেষ পর্দাটুকুও যেন খসে পড়ল। তাঁর পুরো শরীরটা একটা প্রবল, আদিম আতঙ্কে আর তার চেয়েও হাজার গুণ বেশি আদিম এক কামনায় থরথর করে কাঁপতে শুরু করল। তাঁর হাতের আঙুলগুলো রাহুলের হাতের মুঠোয় বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে গেছে।
"রাহুল..." ইন্দিরার গলা দিয়ে শুধু এই একটা শব্দই বেরোল।
"মা..." রাহুল ওর দুটো হাত দিয়ে ইন্দিরার দুই কাঁধ খুব শক্ত করে চেপে ধরল।
"সোনা..." ইন্দিরা একদৃষ্টে তাঁর ছেলের ওই সুন্দর, ঘর্মাক্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। ওই চোখদুটো, ওই চাহনি... সেখানে তাঁর জন্য এক অসীম, অন্ধ, এবং সর্বগ্রাসী ভক্তি আর প্রেম ছাড়া আর কিচ্ছু নেই। ছেলেটা শুধু তাঁকেই চায়, পৃথিবীর আর কিচ্ছু না।
রাহুল খুব ধীর, অত্যন্ত গভীর এবং নেশাগ্রস্ত গলায় ফিসফিস করে বলল, "মা... আমি কি তোমাকে একটা রিকোয়েস্ট করতে পারি?"
ইন্দিরার শ্বাস তখন প্রায় আটকে এসেছে। তিনি অত্যন্ত অস্পষ্ট, কাঁপানো ফিসফিসানিতে বললেন, "কী রিকোয়েস্ট, সোনা?"
রাহুল মায়ের চোখের দিকে একদম স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে, ওর দীর্ঘদিনের কাঙ্ক্ষিত, পবিত্র আর নিষিদ্ধ আবদারটা উচ্চারণ করল:
"মা... চলো না... এখন একসাথে স্নান করি?"
ইন্দিরা এক লহমায় পাথর হয়ে গেলেন। তাঁর হাতের আঙুলগুলো রাহুলের কাঁধের ওপর বসে গেল।
"সোনা.... স্নান... এখন?" তাঁর গলা দিয়ে কথা বেরোচ্ছিল না।
রাহুল মায়ের চোখের গভীরে তাকিয়ে এক তীব্র, মরিয়া গলায় বলল, "হ্যাঁ মা। আমি এই দিনটার জন্য কতগুলো মাস ওয়েট করে আছি, তুমি জানো? আমি তোমাকে বলেছিলাম, আমি নিজের হাতে তোমাকে শ্যাম্পু করে দেব, তোমাকে ভালো করে স্নান করিয়ে দেব... কিন্তু বাবা বাড়িতে থাকায় সেটা তো একপ্রকার অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এটা জাস্ট ওয়ান ইন আ মিলিয়ন চান্স মা... আমার তো মনে হয় ভগবান নিজে আমাদের জন্য এই সিচুয়েশনটা তৈরি করে দিয়েছেন। প্লিজ মা... এখন আর না কোরো না..."
ইন্দিরার চোখদুটো এক অবর্ণনীয় আবেগে জলে ভরে উঠল। তিনি অত্যন্ত ঘোরের মধ্যে তোতলাতে তোতলাতে বললেন, "কিন্তু... সোনা... আমি তো আজ সকালেই একবার স্নান করেছি..."
"তাতে কী হয়েছে মা! আমিও তো সকালে স্নান করেছি," রাহুল একগুঁয়ে বাচ্চার মতো যুক্তি দিল। "দিনে দু'বার স্নান করলে কোনো মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে না। আর তাছাড়া তোমাকে বড্ড টায়ার্ড দেখাচ্ছে মা... সারাদিন এত খাটনি গেছে তোমার... এখন একটা শাওয়ার নিলে তোমার অনেক আরাম লাগবে..."
ইন্দিরার ঠোঁটের কোণে এক পরম, স্বর্গীয় হাসি ফুটে উঠল। তাঁর চোখদুটো অসীম ভালোবাসায় টলটল করছে। তিনি নিজের দুটো হাত রাহুলের গালদুটোর ওপর রাখলেন।
"আমার ছেলেটা দেখতে দেখতে এত বড় কবে হয়ে গেল রে?" তিনি এক চরম মাতৃত্বের ঘোরে ফিসফিস করে উঠলেন।
রাহুল মায়ের হাতের ওপর নিজের হাতটা রেখে, অত্যন্ত আদুরে গলায় বলল, "মা... প্লিজ আমার এই কথাটা রাখো... জন্মদিনের আগেই আমার সেরা গিফ্টটা পাওয়া হয়ে যাবে।"
ইন্দিরা এক সেকেন্ডের জন্য একটু ইতস্তত করলেন। তাঁর কপালে একটা সূক্ষ্ম ভাঁজ পড়ল।
রাহুল সাথে সাথে সেটা নোটিস করল। "কী হলো মা? কী প্রবলেম? প্লিজ আমাকে বলো..."
ইন্দিরা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, অত্যন্ত বাস্তববাদী গলায় বললেন, "সোনা, গঙ্গা মাসি কাল সকালে আসবে না। আর তোর বাবাও বাড়িতে নেই। তাছাড়া কাল সকালে আমার ওই স্টুডেন্টের সাথে মিটিংটা আছে। তাই আমি ভাবছিলাম... আমি এখনই একবার বেরিয়ে কালকের রান্নার জন্য বাজার-হাটগুলো করে আনব। কালকের বাজারটা তো একটু বড়, আমার সোনাটার বার্থডে বলে কথা... আর তাছাড়া আমার কয়েকটা জরুরি ওষুধও কেনার ছিল।"
রাহুল মায়ের এই কথাগুলো শুনে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে ভাবল। তারপর ওর মুখে এক চওড়া, বিজয়ের হাসি ফুটে উঠল।
"ওহ্, এই ব্যাপার! এই জন্যই তুমি টেনশন করছ?" রাহুল এক গাল হেসে বলল। "উফফ মা, তুমি কি ভুলে গেলে আমি তোমাকে কয়েক মাস আগে কী বলেছিলাম? ব্লিনকিট!! বাইরে বেরোনোর কোনো দরকার নেই মা, তুমি ঘরে বসেই সব অর্ডার করে দিতে পারো।"
ইন্দিরা এবার একটু অবাক হয়ে বললেন, "ওহ হ্যাঁ, ওই অ্যাপটার কথা বলেছিলিস তুই... কিন্তু আমি তো এখনও ওটা ঠিকমতো ইউজ করতে জানি না। তাহলে...তাহলে কিন্তু তোকেই পুরো দায়িত্বটা নিতে হবে। তোকে নিজের হাতে সব ঠিকমতো অর্ডার করতে হবে..."
রাহুলের চোখদুটো এবার হাজার ওয়াটের বাল্বের মতো জ্বলে উঠল। ও উত্তেজনার চোটে মায়ের কাঁধদুটো ধরে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলল:
"মা....!"
"কী হলো?" ইন্দিরা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন।
"মা! পুরো ব্যাপারটা কেমন...কেমন শোনাচ্ছে বলো দেখি??" রাহুলের গলার স্বর আনন্দে ফেটে পড়ছে।
"কীসের মতো?"
"মা! দ্য বার্টার সিস্টেম!! আবার সেই আমাদের বার্টার সিস্টেম! কতগুলো মাস পর!"
ইন্দিরা স্তব্ধ হয়ে রাহুলের ওই উদ্ভাসিত, উত্তেজিত মুখটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর নিজের মগজটাও এই ঘটনাপ্রবাহের অদ্ভুত, অলৌকিক সমাপতনগুলো দেখে সম্মোহিত হয়ে যাচ্ছিল। সব কিছু কেমন যেন একটা পারফেক্ট বৃত্তের মতো এসে মিলছে।
ইন্দিরার ঠোঁটের কোণে একটা প্রচ্ছন্ন, রহস্যময় এবং চরম সমর্পণের হাসি ফুটে উঠল।
"হুমম.. ঠিকই..." তিনি অত্যন্ত নিচু, নেশাতুর গলায় ফিসফিস করে উঠলেন। "...আবার সেই বার্টার সিস্টেম..."
(continued in the next post...)