২টি ছাদ ও কয়েকটি বিকেল... - অধ্যায় ১২

🔗 Original Chapter Link: https://xossipy.com/thread-73110-post-6250540.html#pid6250540

🕰️ Posted on Sun Jun 28 2026 by ✍️ Dead people (Profile)

🏷️ Tags:
📖 2738 words / 12 min read

Parent
পর্ব ১২ঃ বারো বছর—সংখ্যাটা মুখে বললে যতটা হালকা লাগে, বেঁচে থাকলে ততটাই ভারী হয়ে বসে থাকে মানুষের ভেতরে। এই বারো বছরে সময় শুধু ক্যালেন্ডারের পাতায় এগোয় না, মানুষের ভেতরেও অনেক কিছু সরিয়ে দেয়, অনেক কিছু ভেঙে ফেলে, আবার নতুন কিছু গড়ে তোলে। যে মানুষটা একসময় ছিল, সে আর থাকে না—তার জায়গায় অন্য কেউ এসে দাঁড়ায়, যাকে বাইরে থেকে চিনলেও ভেতর থেকে চিনে ওঠা যায় না। এই সময়ের ভেতর দিয়ে যেতে যেতে মানুষ শিখে ফেলে কীভাবে নিজের কষ্ট লুকাতে হয়, কীভাবে কিছু প্রশ্নের উত্তর না দিয়েই বেঁচে থাকতে হয়, আর কীভাবে কিছু অনুভূতিকে নিজের ভেতরের এক কোণে তালা মেরে রাখতে হয়। কিন্তু সব অনুভূতি কি তালা মেনে চলে? কিছু অনুভূতি আছে, যেগুলো সময়ের হিসাব মানে না। সেগুলো ঠিক থেকে যায়—পুরনো দেয়ালের ফাঁকে জমে থাকা ধুলোর মতো, চোখে পড়ে না, কিন্তু আঙুল দিয়ে ছুঁলেই বোঝা যায়, সেগুলো কখনো হারায়নি। নীলা গাড়ির ভেতরে বসে এই কথাগুলো ভাবছিল কি না, সেটা সে নিজেও জানে না, কিন্তু তার বুকের ভেতরে যে চাপা ভার, সেটা তাকে বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছিল—এই ফিরে আসাটা শুধু একটা জায়গায় ফেরা না, এটা একসাথে অনেকগুলো অসমাপ্ত গল্পের সামনে দাঁড়িয়ে পড়া। পাড়াটা এখন আর আগের মতো নেই—এই কথাটা শুধু দেখেই বোঝা যায় না, অনুভব করলেই বোঝা যায়। যে গলিটা একসময় বিকেলের রোদে ধুলো উড়িয়ে দিত, সেই জায়গায় এখন পাকা রাস্তা, যেখানে ধুলো নেই, কিন্তু সেই পুরনো দিনের গন্ধও নেই। টিনের চালের ঘরগুলো একে একে ভেঙে গেছে, জায়গা নিয়েছে রঙ করা বিল্ডিং, যেগুলো দেখতে সুন্দর, কিন্তু ভেতরে সেই পুরনো উষ্ণতা নেই। দেয়ালে নতুন পোস্টার, ছাদে ডিশ অ্যান্টেনা, বারান্দায় ঝুলে থাকা কাপড়—সব মিলিয়ে একটা আধুনিকতার ছাপ, কিন্তু এই আধুনিকতার ভেতরেও কোথাও একটা শূন্যতা লুকিয়ে আছে। নীলা গাড়ির কাঁচ দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ মনে করল, এই গলির বাঁকটা একসময় কত পরিচিত ছিল—এখানেই দাঁড়িয়ে তারা গল্প করত, হাসত, ঝগড়া করত, আবার মিটেও যেত। সেই চায়ের দোকানটা এখন নেই, কিন্তু জায়গাটা দেখলেই মনে হয়, যেন এখনো কেটলির ভেতর পানি ফুটছে, ধোঁয়া উঠছে, আর কেউ একজন খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ডাকছে—“এই, চা খাইয়া যা।” এই স্মৃতিগুলো এত জীবন্ত, এত কাছের, যে মনে হয়, সময় এগোয়নি, সবকিছু ঠিক আগের মতোই আছে—শুধু মানুষগুলো নেই। গাড়িটা যখন পাড়ার সামনে এসে থামল, তখন নীলার বুকের ভেতরে একবার কেমন করে উঠল। দরজা খুলে বাইরে নামার আগে সে এক সেকেন্ড চোখ বন্ধ করে নিল—নিজেকে প্রস্তুত করার মতো। তারপর ধীরে পা বাড়াল বাইরে। সাদা শাড়ি পরা, চুল পেছনে বাঁধা, তবুও কয়েকটা আলগা গোছা বাতাসে উড়ে এসে তার গালে ছুঁয়ে যাচ্ছে। তার চোখের নিচে হালকা কালি—এই কালি শুধু ক্লান্তির না, এটা সময়ের চিহ্ন, রাত জেগে থাকা ভাবনার চিহ্ন, আর না বলা কষ্টের ছাপ। সে শিখে গেছে—সব অনুভূতি প্রকাশ করা যায় না, কিছু অনুভূতি শুধু নিজের ভেতরে বয়ে নিয়ে যেতে হয়, নিঃশব্দে। তার হাঁটার ভঙ্গিতে একটা ধীরতা আছে, যেন সে তাড়াহুড়া করতে চায় না, আবার থেমেও থাকতে চায় না—মাঝামাঝি একটা জায়গায় আটকে আছে। গাড়ির অন্য পাশ থেকে রাফি নামল। তার চেহারায় এখন একটা পরিণত ভাব—যে ছেলেটা একসময় আবেগে সবকিছু ভাসিয়ে দিত, সে এখন হিসেব করে হাঁটে, ভেবে কথা বলে। কিন্তু তার চোখে এখনো একটা জায়গা আছে—যেটা নরম, ভঙ্গুর, আর সেটা সে কাউকে দেখায় না, শুধু নীলার সামনে ছাড়া। এই দুইজন মানুষ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে—দেখতে শান্ত, স্থির, কিন্তু ভেতরে দুজনেরই আলাদা আলাদা ঢেউ চলছে। গাড়ির ভেতর থেকে শুভ্রের ছোট্ট কণ্ঠটা যখন ভেসে এলো—“মা… নামবো?”—তখন সেই ভারী পরিবেশের ভেতরেও একটা নরম মুহূর্ত তৈরি হলো। নীলা একটু ঝুঁকে ভেতরে তাকাল, তার মুখে খুব হালকা একটা হাসি এল—যেটা সে চাইলেও পুরোপুরি লুকাতে পারে না। “আয়, শুভ্র,” সে বলল, খুব নরম গলায়। ছেলেটা নেমে এলো, চারপাশে তাকাতে লাগল কৌতূহলী চোখে। এই জায়গাটা তার কাছে নতুন, কিন্তু সে বুঝতে পারছে—এই জায়গাটা তার মায়ের কাছে অন্যরকম। তার প্রশ্নটা খুব স্বাভাবিক—“এইটা কি নানুর বাসা?” কিন্তু এই স্বাভাবিক প্রশ্নটাই নীলার বুকের ভেতরটা কাঁপিয়ে দিল। সে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল—এই কয়েক সেকেন্ডের ভেতরে কত স্মৃতি, কত না বলা কথা, কত অভিমান ভেসে উঠল, আবার ডুবে গেল। তারপর খুব আস্তে বলল, “হ্যাঁ…” এই ‘হ্যাঁ’-এর ভেতরে শুধু একটা উত্তর না, একটা ইতিহাস আছে—যেটা শুভ্র এখনো বোঝে না। বাড়ির সামনে ভিড়টা দেখেই বোঝা যাচ্ছিল—এটা শোকের ভিড়। এই ভিড় সব জায়গায় একইরকম হয়—কেউ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে, যেন কী বলবে বুঝতে পারছে না; কেউ ফিসফিস করে কথা বলে, যেন অন্যের কষ্টটাও একটা গল্প হয়ে গেছে; কেউ চোখে পানি এনে সহানুভূতি দেখায়, আবার কেউ কৌতূহল লুকাতে পারে না। নীলা ভেতরে ঢুকতেই কয়েকটা মুখ ঘুরে গেল তার দিকে—কেউ চিনে ফেলেছে, কেউ নিশ্চিত না, কেউ পুরনো গল্প মনে করে ফিসফিস করছে। কিন্তু এই শব্দগুলো যেন তার কানে ঢুকছে না। তার চোখ শুধু এক জায়গায় গিয়ে থামল—ঘরের মাঝখানে, সাদা কাপড়ে ঢাকা একটা শরীর। তার বাবা। এই একটা দৃশ্য দেখার জন্য সে কি প্রস্তুত ছিল? হয়তো না। হয়তো মানুষ কখনোই এই দৃশ্যের জন্য প্রস্তুত হতে পারে না। তার পা হঠাৎ ভারী হয়ে গেল, যেন সে সামনে এগোতে চাইছে, কিন্তু শরীর সাড়া দিচ্ছে না। তার ভেতরে একটা টান—একদিকে যেতে চায়, অন্যদিকে থেমে থাকতে চায়। এই দ্বিধাটা কয়েক সেকেন্ডের, কিন্তু অনুভূতিটা অনেক বড়। রাফি তখন তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল, খুব চুপচাপ। সে জানে—এই মুহূর্তে কোনো কথা কাজে আসে না। সে শুধু খুব আস্তে করে নীলার হাতটা ধরল। এই স্পর্শে কোনো নাটকীয়তা নেই, কোনো বড় প্রতিশ্রুতি নেই—শুধু একটা নীরব নিশ্চয়তা, “আমি আছি।” এই একটা স্পর্শেই নীলা বুঝল—সে একা না, যদিও এই মুহূর্তটা তাকে একাই পার হতে হবে। সে ধীরে ধীরে সামনে এগোল, প্রতিটা পদক্ষেপ যেন ভারী হয়ে উঠছে। চাদরটা সরানোর আগে তার হাত কেঁপে উঠল—যেন সে ভয় পাচ্ছে, এই শেষ সত্যিটাকে সামনে থেকে দেখতে। তারপর যখন সে চাদরটা সরাল, তখন তার বাবার মুখটা চোখে পড়ল—চোখ বন্ধ, ঠোঁট শুকনো, মুখে একটা অদ্ভুত শান্তি। এই মানুষটা জীবনে কখনো সহজ ছিল না, কখনো নরম ছিল না, সবসময় কঠিন, নিয়ন্ত্রণে রাখা—কিন্তু আজ তার মুখে যে শান্তি, সেটা যেন সব হিসাব মিটিয়ে ফেলার পরের নীরবতা। নীলার বুকটা তখন হঠাৎ ভেঙে গেল। সে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না—মাটিতে বসে পড়ল। তার হাত কাঁপতে কাঁপতে বাবার কপালে ছুঁল—ঠান্ডা। এই ঠান্ডাটা শুধু শরীরের না, এটা একটা শেষ হওয়ার ঠান্ডা, একটা চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার স্পর্শ। সে খুব আস্তে করে বলল, “আব্বা…” এই একটা শব্দের ভেতরে কত বছরের জমে থাকা অভিমান, রাগ, না বলা কথা, ভালোবাসা—সব একসাথে বেরিয়ে এলো। তার কান্না শব্দ করে না, কিন্তু পুরো শরীর কেঁপে উঠছে। এই কান্না শুধু আজকের না—এটা বহু বছরের, জমে থাকা, আটকে থাকা কান্না, যেটা বের হওয়ার সুযোগ খুঁজছিল। আশেপাশের মানুষজন চুপ করে তাকিয়ে আছে, কেউ কিছু বলছে না—কারণ এই মুহূর্তে কোনো কথাই যথেষ্ট না। শুভ্র তখন একটু দূরে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছিল। সে পুরোটা বুঝতে পারছে না, কিন্তু সে বুঝতে পারছে—তার মা ভেঙে পড়েছে। সে ধীরে ধীরে কাছে এসে মায়ের কাঁধে হাত রাখল—ছোট্ট, নরম একটা হাত। “মা… তুমি কাঁদো না…”—এই ছোট্ট বাক্যটা এত সরল, কিন্তু এর ভেতরে যে ভালোবাসা, যে নির্ভরতা, সেটা নীলার বুককে আরও ভারী করে দিল। সে ছেলেটাকে জড়িয়ে ধরল—এই ছোট্ট মানুষটাই যেন তার বেঁচে থাকার সবচেয়ে বড় কারণ, সবচেয়ে বড় শক্তি। তার মাথায় একটা চিন্তা এল—যে ভালোবাসাটা সে তার বাবার কাছ থেকে পুরোপুরি পায়নি, সেটা কি সে তার ছেলেকে দিতে পারবে? এই প্রশ্নটা তাকে ভেতরে ভেতরে নেড়ে দিল। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামল, আর মানুষজন ধীরে ধীরে চলে যেতে লাগল। বাড়িটা একটু ফাঁকা হলো, শব্দ কমে গেল, শুধু কিছু ফিসফাস আর দূরের আওয়াজ। নীলা বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। আকাশে হালকা চাঁদ উঠেছে—একই চাঁদ, যেটা সে ছোটবেলায় দেখত, একই আলো, একই আকাশ। কিন্তু তার ভেতরের মানুষটা আর আগের মতো নেই। সে রেলিংয়ে হাত রেখে দাঁড়িয়ে থাকল, ঠান্ডা লোহার স্পর্শ অনুভব করল। পেছন থেকে রাফির কণ্ঠ এলো—“চা খাবা?” সে ফিরে তাকাল—রাফির হাতে দুইটা কাপ। এই ছোট্ট প্রস্তাবের ভেতরে একটা স্বাভাবিকতা আছে, একটা চেষ্টা—সবকিছু আবার একটু স্বাভাবিক করার চেষ্টা। নীলা হালকা হাসল, “দাও…” তারা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে চা খেতে লাগল। কোনো বড় কথা নেই, কোনো প্রশ্ন নেই—তবুও এই নীরবতাটা অস্বস্তিকর না। বরং এই নীরবতার ভেতরে একটা নিরাপত্তা আছে। রাফি ধীরে বলল, “এই বাড়িটা আগের মতোই আছে…”—এই কথাটা বলার সময় তার গলায় একটা স্মৃতি মেশানো সুর। নীলা একটু হেসে বলল, “হ্যাঁ… শুধু মানুষগুলো বদলাইছে…” এই একটা বাক্যের ভেতরে একটা গভীর সত্য লুকিয়ে আছে—সময় জায়গাকে বদলায়, কিন্তু মানুষকে আরও বেশি বদলায়। কিছুক্ষণ চুপ থেকে রাফি জিজ্ঞেস করল, “তুমি ঠিক আছো তো?”—প্রশ্নটা খুব সাধারণ, কিন্তু এর ভেতরে যে যত্ন, যে উদ্বেগ, সেটা নীলা স্পষ্ট বুঝতে পারে। সে তার দিকে তাকাল—এই মানুষটা, যাকে সে একসময় হারাতে বসেছিল, আজ তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে, তার স্বামী হয়ে, তার জীবনের অংশ হয়ে। সে বলল, “আমি ঠিক আছি…”—এই কথাটা পুরো সত্য না, আবার মিথ্যেও না। এটা একটা মাঝামাঝি জায়গা—যেখানে মানুষ নিজেকে সামলে রাখতে শেখে। ভেতর থেকে শুভ্র ডাকল—“বাবা!”—এই ডাকটা খুব স্বাভাবিক, কিন্তু এর ভেতরে একটা পরিবার, একটা সম্পর্কের বাস্তবতা আছে। রাফি হাসল, “কি হইছে?”—“আমি ঘুমাবো…”—সে এগিয়ে গিয়ে শুভ্রকে কোলে তুলে নিল। এই দৃশ্যটা খুব সাধারণ—একজন বাবা তার ছেলেকে কোলে নিচ্ছে। কিন্তু নীলা এই দৃশ্যটার দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখে একটা অদ্ভুত শান্তি এল। এই মানুষটা—তার ছেলের বাবা, তার জীবনের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা, সবচেয়ে বড় ভরসা। এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই তাকে মনে করিয়ে দেয়—সে একা না। রাত আরও গভীর হলো। সবকিছু ধীরে ধীরে চুপ হয়ে গেল। নীলা তার পুরনো ঘরে বসে আছে। এই ঘরটা একসময় তার ছিল—এখানে তার শৈশব, তার স্বপ্ন, তার কষ্ট—সবকিছু জমা আছে। সে আলমারি খুলে একটা পুরনো ডায়েরি বের করল। পাতাগুলো হলদে হয়ে গেছে, কিন্তু শব্দগুলো এখনো জীবিত। সে আঙুল দিয়ে পাতাগুলো ছুঁয়ে দেখল—যেন সে নিজের পুরনো সত্তাকে ছুঁতে চাইছে, সেই মেয়েটাকে, যে একসময় এত সহজ ছিল, এত নির্ভার ছিল। পেছন থেকে দরজার শব্দ হলো। রাফি ঢুকল, খুব আস্তে। “ঘুমাও নাই?”—তার গলায় ক্লান্তি, কিন্তু সাথে একটা যত্নও আছে। নীলা মাথা নাড়ল, “ঘুম আসতেছে না…”—এই কথাটা খুব সাধারণ, কিন্তু এর ভেতরে অনেক কিছু আছে। রাফি পাশে এসে বসল, বলল, “চেষ্টা করো…”—তারপর একটু থামল। নীলা খুব আস্তে বলল, “তুমি থাকলে… সহজ লাগে…”—এই কথাটা শুনে রাফি তার হাতটা ধরল। “আমি তো আছিই…”—এই একটা বাক্যের ভেতরে একটা প্রতিশ্রুতি আছে, একটা স্থিরতা, যেটা বারো বছরেও ভাঙেনি। আর এই মুহূর্তে, এই নীরব ঘরের ভেতরে, এই ছোট্ট কথাগুলোই তাদের বেঁচে থাকার সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে দাঁড়ায়। অন্যদিকে, অন্য এক শহরের একদম মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা আলো ঝলমলে একটা অ্যাপার্টমেন্ট—বাইরে থেকে দেখলে যেন সবকিছু নিখুঁত। কাঁচের বারান্দায় শহরের আলো প্রতিফলিত হচ্ছে, দূরের গাড়ির হেডলাইটগুলো ছোট ছোট চলমান তারার মতো মনে হচ্ছে, আর ভেতরে সাজানো-গোছানো ড্রয়িংরুম, নরম সোফা, দেয়ালে ফ্রেম করা হাসিমুখের ছবি—সব মিলিয়ে একটা পরিপাটি, সফল, শান্ত জীবনের প্রতিচ্ছবি। সেই ঘরের মাঝখানে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে শিউলি। সে খুব মন দিয়ে নিজের চুল ঠিক করছে, একটা গোছা বারবার কানের পেছনে গুঁজে দিচ্ছে, আবার খুলে যাচ্ছে। তার মুখে একটা হাসি আছে—যেটা প্রথম দেখায় খুব স্বাভাবিক মনে হয়, কিন্তু একটু গভীরভাবে তাকালে বোঝা যায়, এই হাসিটা পুরোপুরি নিজের না; এটা একটা অভ্যাস, একটা শেখা ভদ্রতা, একটা সামাজিক মুখোশ, যেটা মানুষ পরে নেয় যখন ভেতরের সবকিছু বাইরে দেখাতে চায় না। তার চোখে হালকা ক্লান্তি, কিন্তু সেই ক্লান্তিটাও সে লুকিয়ে রাখতে শিখেছে। পেছন থেকে সাইফ এসে দাঁড়ায়, খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করে, “রেডি?”—এই একটা প্রশ্নের ভেতরে কোনো উত্তেজনা নেই, কোনো বিশেষ অনুভূতিও নেই, যেন প্রতিদিনের মতোই একটা দিন। শিউলি আয়নার ভেতর দিয়ে তার দিকে তাকায়, এক সেকেন্ডের জন্য মনে হয় সে কিছু বলতে চায়, হয়তো কিছু জিজ্ঞেস করতে চায়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত শুধু বলে, “হ্যাঁ…”। এই ‘হ্যাঁ’-এর ভেতরে কোনো গল্প নেই, কোনো প্রশ্ন নেই—শুধু একটা মেনে নেওয়া আছে। ঘরের বাতাসটা তখন খুব শান্ত, কিন্তু সেই শান্তির ভেতরেই একটা চাপা টান লুকিয়ে আছে, যেটা বাইরে থেকে বোঝা যায় না, কিন্তু ভেতরে ধীরে ধীরে জমে ওঠে। সবকিছু যেন ঠিকঠাকভাবেই এগোচ্ছিল, যতক্ষণ না সাইফ ওয়াশরুমে ঢুকে দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে দেয়। দরজাটা বন্ধ হওয়ার সাথে সাথেই ঘরের শব্দগুলো একটু বদলে যায়—পানির শব্দ, টাইলসে প্রতিফলিত হওয়া হালকা প্রতিধ্বনি, আর বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা শিউলির নিঃশ্বাসের শব্দ। ঠিক তখনই টেবিলের ওপর রাখা ফোনটার স্ক্রিন হঠাৎ জ্বলে ওঠে। একটা ছোট্ট আলো, কিন্তু সেই আলো যেন পুরো ঘরটাকে আলাদা করে দেয়। শিউলির চোখ অনিচ্ছাসত্ত্বেও সেদিকে চলে যায়। প্রথমে সে তাকাতে চায় না—নিজেকে বোঝায়, “না, এটা আমার দেখার বিষয় না।” কিন্তু মানুষের কৌতূহল কখনো কখনো যুক্তির চেয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়, ফোনটার কাছে দাঁড়ায়, স্ক্রিনে চোখ পড়ে—একটা মেসেজ। খুব ছোট, মাত্র তিনটা শব্দ—“Miss you today.” কোনো নাম নেই, শুধু একটা অচেনা নম্বর। এই ছোট্ট বাক্যটা যেন মুহূর্তের মধ্যে তার বুকের ভেতরে একটা ভারী পাথর বসিয়ে দেয়। তার শ্বাস ধীরে ধীরে ভারী হয়ে আসে, আঙুলগুলো কাঁপতে চায়, কিন্তু সে নিজেকে থামিয়ে রাখে। কয়েক সেকেন্ড—খুব ছোট একটা সময়, কিন্তু তার ভেতরে অনেক কিছু ঘটে যায়। সে ভাবতে থাকে—এটা কে? কেন? কতদিন ধরে? কিন্তু কোনো প্রশ্নই সে জোরে বলে না। সে শুধু ফোনটা আবার আগের জায়গায় রেখে দেয়, ঠিক যেভাবে ছিল, যেন কিছুই হয়নি। কিন্তু আসলে সবকিছু হয়ে গেছে। তার ভেতরের সেই ছোট্ট, নীরব বিশ্বাসের জায়গাটায় একটা চিড় ধরেছে—শব্দহীন, কিন্তু গভীর। সাইফ যখন ওয়াশরুম থেকে বের হয়, তার মুখে কোনো পরিবর্তন নেই। সে স্বাভাবিকভাবেই তোয়ালে দিয়ে চুল মুছতে মুছতে বলে, “চলো?”—এই ‘চলো’ শব্দটা যেন একটা অভ্যাস, একটা রুটিন, কোনো আবেগ ছাড়াই বলা। শিউলি তার দিকে তাকায়, খুব স্বাভাবিক একটা হাসি দেয়—যে হাসিটা সে আয়নার সামনে অনুশীলন করছিল, আর বলে, “চলো…”। এই দুইটা শব্দের ভেতরে যে কতটা না-বলা কথা আটকে থাকে, সেটা কেউ বুঝতে পারে না। তারা দুজন একসাথে দরজা দিয়ে বের হয়ে যায়—দেখতে একদম পারফেক্ট একটা দম্পতি। বাইরে থেকে দেখলে কেউ বুঝতেই পারবে না, কয়েক মিনিট আগে একটা ছোট্ট মেসেজ তাদের ভেতরের পৃথিবীটাকে একটু নড়িয়ে দিয়ে গেছে। লিফটে নামার সময় তারা দুজন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকে, কিন্তু তাদের মাঝখানে একটা অদৃশ্য দূরত্ব তৈরি হয়—যেটা কেউ চোখে দেখতে পায় না, কিন্তু অনুভব করা যায়। সাইফ হয়তো কিছু বলতে চায়, আবার থেমে যায়। শিউলি কিছু জিজ্ঞেস করতে চায়, কিন্তু নিজের ভেতরেই আটকে রাখে। এই না-বলা কথাগুলোই ধীরে ধীরে মানুষের সম্পর্কের ভেতরে জমে ওঠে—একসময় দেয়াল হয়ে যায়। রাত আরও গভীর হতে থাকে, আর শহরটা ধীরে ধীরে তার নিজের ছন্দে ডুবে যায়। রাস্তার আলো জ্বলে থাকে, দূরের গাড়ির শব্দ কমে আসে, মানুষের ভিড় পাতলা হয়ে যায়। এই একই সময়ে, অন্য এক শহরে, অন্য এক ঘরে দাঁড়িয়ে আছে নীলা। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে সে বাইরে তাকিয়ে আছে—তার সামনে একটা সম্পূর্ণ জীবন। তার পাশে বিছানায় ঘুমিয়ে আছে রাফি আর তাদের ছেলে শুভ্র। এই দৃশ্যটা এতটাই পূর্ণ, এতটাই শান্ত, যে বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে—এই তো সুখ, এই তো সম্পূর্ণতা। শুভ্র ঘুমের মধ্যে মাঝে মাঝে নড়ে ওঠে, তার ছোট্ট হাতটা গিয়ে রাফির বুকে পড়ে, রাফি অজান্তেই সেই হাতটা ধরে ফেলে—এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই একটা পরিবারের আসল ছবি। নীলা সেই দৃশ্যটার দিকে তাকিয়ে থাকে, তার চোখে একটা নরম আলো আসে, কিন্তু সেই আলোর ভেতরেও একটা প্রশ্ন লুকিয়ে থাকে। সে ধীরে ধীরে জানালার কাঁচে হাত রাখে—ঠান্ডা কাঁচ, বাইরে ঠান্ডা হাওয়া। তার ভেতরে একটা অদ্ভুত শূন্যতা কাজ করে, যেটা সে নিজেও পুরোপুরি বুঝতে পারে না। সে ভাবতে থাকে—সবকিছু তো ঠিক আছে, তাহলে এই অস্বস্তিটা কেন? এই হালকা চাপটা কেন? এই প্রশ্নগুলো সে কাউকে করে না—নিজেকেই করে, আর উত্তর না পেয়ে চুপ করে থাকে। এইদিকে আবার শিউলি রাতের শেষে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। বাড়িতে ফিরে এসেছে তারা, সবকিছু আবার স্বাভাবিক। সাইফ বিছানায় শুয়ে আছে, চোখ বন্ধ, কিন্তু তার শ্বাসপ্রশ্বাস বলে দেয়—সে ঘুমায়নি। শিউলি আয়নায় নিজের চোখের দিকে তাকায়—গভীর, ক্লান্ত, একটু প্রশ্নবোধক। সে নিজের প্রতিচ্ছবিকে দেখে মনে করার চেষ্টা করে—এই মেয়েটা কে? সে কি সেই আগের শিউলি? যে সরাসরি কথা বলত, যে ভয় পেত না, যে নিজের অনুভূতিকে লুকাত না? নাকি সে এখন একটা নতুন মানুষ, যে সবকিছু বুঝেও না-বোঝার ভান করে? তার মাথার ভেতরে বারবার সেই তিনটা শব্দ ঘুরতে থাকে—“Miss you today.” এই শব্দগুলো এত ছোট, কিন্তু এত ভারী। সে নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরে, যেন নিজেকে থামাতে চায়। তারপর খুব আস্তে, প্রায় শোনা যায় না এমন একটা কণ্ঠে সে নিজেকেই জিজ্ঞেস করে—“আমি কি সুখী?” এই প্রশ্নটা এত সাধারণ, এত ছোট, কিন্তু এর উত্তর খুঁজতে গেলে মানুষ নিজের ভেতরের গভীরে ডুবে যায়। সে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে, কোনো উত্তর আসে না। শুধু নিজের নিঃশ্বাসের শব্দ শোনে। একই সময়ে, অন্য শহরের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে নীলাও একই রকম একটা প্রশ্নের মুখোমুখি হয়। সে খুব আস্তে ভাবে—“এইবার কি সব ঠিক আছে?” তার সামনে যে জীবনটা আছে, সেটা সে অনেক কষ্টে পেয়েছে। হারিয়েছে, লড়েছে, মেনে নিয়েছে—তারপর এই জায়গায় এসেছে। কিন্তু তবুও কেন মনে হয় কিছু একটা বাকি? কেন মনে হয়, সবকিছু থাকার পরেও কোথাও একটা ফাঁক থেকে গেছে? সে পেছনে তাকায়—রাফি আর শুভ্র ঘুমিয়ে আছে, শান্তভাবে। এই দৃশ্যটা তাকে একটা নিরাপত্তা দেয়, একটা নিশ্চয়তা দেয়, কিন্তু সেই সাথে একটা অদ্ভুত ভয়ও জাগায়—যদি এই শান্তিটা একদিন ভেঙে যায়? যদি এই সম্পূর্ণতাটা আসলে ভেতরে ভেতরে অসম্পূর্ণ হয়? সে জানে না। সে শুধু জানে, এই প্রশ্নগুলোর কোনো সহজ উত্তর নেই। রাত তখন আরও গভীর। দুইটা আলাদা শহর, দুইটা আলাদা ঘর, চারজন মানুষ—সবাই তাদের নিজ নিজ জায়গায় আছে। বাইরে থেকে সবকিছু ঠিকঠাক, সবকিছু সাজানো, সবকিছু স্থির। কিন্তু ভেতরে? ভেতরে চারটা আলাদা মন, চারটা আলাদা লড়াই, চারটা আলাদা প্রশ্ন। কেউ জোরে কিছু বলছে না, কেউ কাঁদছে না, কেউ ভেঙে পড়ছে না—তবুও ভেতরে ভেতরে অনেক কিছু ঘটছে। কারণ মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলো সবসময় শব্দ করে হয় না। কিছু পরিবর্তন নিঃশব্দে আসে, ধীরে ধীরে জায়গা নেয়, আর একসময় মানুষ বুঝতে পারে—সে আগের মতো নেই। সেই রাতটা এমনই একটা রাত। যেখানে কোনো নাটকীয়তা নেই, কোনো বড় ঘটনা নেই, তবুও সবকিছু বদলে যাচ্ছে। আর সেই বদলটা কেউ থামাতে পারছে না। শেষ পর্যন্ত, কেউ কোনো উত্তর পায় না। শিউলির প্রশ্নটা বাতাসে ঝুলে থাকে—“আমি কি সুখী?” নীলার প্রশ্নটাও হারিয়ে যায় রাতের ভেতরে—“এইবার কি সব ঠিক আছে?” আর এই প্রশ্নগুলোর কোনো জবাব আসে না। শুধু সময় এগিয়ে যায়, রাত ফুরোয়, ভোর আসে। কিন্তু কিছু প্রশ্ন থাকে—যেগুলো সময়ও মুছে দিতে পারে না। কারণ সুখ কখনো শুধু পাওয়া দিয়ে মাপা যায় না—কখনো কখনো সুখ নিজেই একটা প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়, আর মানুষ সারা জীবন ধরে সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে থাকে। (চলবে...)
Parent