২টি ছাদ ও কয়েকটি বিকেল... - অধ্যায় ১৩

🔗 Original Chapter Link: https://xossipy.com/thread-73110-post-6252109.html#pid6252109

🕰️ Posted on Tue Jun 30 2026 by ✍️ Dead people (Profile)

🏷️ Tags:
📖 1942 words / 9 min read

Parent
পর্ব ১৩: পাড়াটা এখন আর আগের মতো নেই—এই কথাটা প্রায় সবাই বলে, কিন্তু এই “না থাকা”টার ভেতরেই আসলে সবচেয়ে বড় ভুলটা লুকিয়ে আছে। পাড়াটা একই আছে, শুধু তার শরীরটা বদলেছে, তার গায়ের চামড়াটা নতুন হয়েছে, কিন্তু ভেতরের হাড়গোড়, ভেতরের স্মৃতিগুলো, ভেতরের চাপা শব্দগুলো—সব আগের মতোই রয়ে গেছে। যেন একটা মানুষ, যে বাইরে থেকে নতুন জামা পরে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু তার ভেতরে পুরনো ক্ষতগুলো এখনও শুকায়নি। যে গলিটার ভেতর দিয়ে একসময় বিকেলের দিকে হাঁটলে পায়ের নিচে শুকনো মাটির ধুলো কচমচ শব্দ করত, সেই গলিটা এখন পাকা, মসৃণ, চকচকে—কিন্তু এই মসৃণতার ভেতরেও কোথাও একটা খসখসে অস্বস্তি লুকিয়ে আছে। যারা আগে এই গলি চিনত, তারা হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ থেমে যায়—কারণ তাদের মনে হয়, এই জায়গাটা ঠিক একই না, আবার পুরোপুরি আলাদাও না। গলির শুরুতে যে টিনের চায়ের দোকানটা ছিল, যার ছাউনি বৃষ্টির সময় টপটপ করে পানি পড়ত, আর ভেতরে বসে লোকজন গালাগালি করতে করতে চা খেত—এখন সেটা আধা-পাকা হয়েছে। টিনের ওপর প্লাস্টিকের শেড, পাশে একটা ছোট ফ্রিজ, ভেতরে ঠান্ডা পানীয়, সামনে ঝুলছে মোবাইল রিচার্জের সাইনবোর্ড—সব মিলিয়ে একটা আধুনিকতার ছাপ। তবুও সেই পুরনো কাঠের বেঞ্চটার এক কোণ এখনও বাঁকা, সেখানে বসলে শরীর একটু হেলে যায়, আর সেই হেলে যাওয়ার অনুভূতিটা যেন বলে—“সব ঠিক হয় নাই।” বাতাসে এখন সিমেন্টের গন্ধ, নতুন রঙের তীব্রতা, কিন্তু মাঝে মাঝে হালকা বৃষ্টির পর যখন মাটির গন্ধ ওঠে, তখন মনে হয়—এই জায়গাটা এখনও তার পুরনো গল্পগুলো ভুলে যায়নি, শুধু একটু লুকিয়ে রেখেছে। দুপুরের দিকে কয়েকটা ছেলে এসে জড়ো হয় ওই দোকানের সামনে, নতুন প্রজন্ম, নতুন ভাব, নতুন রঙ—কিন্তু ভেতরের গল্পটা খুব আলাদা না। তাদের চুলের স্টাইল আলাদা, হাতে দামি স্মার্টফোন, চোখে এমন এক ধরনের আত্মবিশ্বাস, যেটা কখনো কখনো ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে, কারণ তারা ভাবে তারা সব বুঝে গেছে, সব নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। তারা জোরে কথা বলে, হাসে, একে অপরকে ঠাট্টা করে, আবার হঠাৎ চুপ হয়ে যায়—যেন তাদের ভেতরে একটা অদৃশ্য সেন্সর কাজ করে, “এখন চুপ থাক, কেউ শুনতেছে।” একজন সিগারেট ধরায়, ধোঁয়াটা একটু বেশি স্টাইল করে ছাড়ে, যেন সে নিজের একটা ইমেজ তৈরি করছে। আরেকজন বলে—“এইখানে দাঁড়াইস না, ক্যামেরা আছে”—এই কথাটা বলার সময় তার চোখে একটা অদ্ভুত সতর্কতা, যেন সে জানে কোথায় দাঁড়ালে ধরা পড়তে হয়, আর কোথায় দাঁড়ালে অদৃশ্য থাকা যায়। কিন্তু সিগারেটটা নিভায় না—কারণ তার ভেতরে একটা বিদ্রোহ আছে, একটা “আমারে কিছু হবে না” টাইপের বিশ্বাস। তাদের কথাবার্তার ভেতর দিয়ে বোঝা যায়—সময় বদলেছে, অপরাধের ভাষা বদলেছে, কিন্তু ইচ্ছাটা বদলায়নি। আগে চুরি মানে ছিল কারও ঘরে ঢুকে জিনিস নিয়ে আসা, এখন চুরি মানে কারও ফোন হ্যাক করা, কারও ব্যক্তিগত ছবি নিয়ে তাকে ব্ল্যাকমেইল করা, কারও বিশ্বাসকে অস্ত্র বানানো। কাজ একই—মানুষকে ব্যবহার করা—শুধু হাতিয়ারটা এখন স্ক্রিনের ভেতরে চলে গেছে। এই ছেলেগুলোর চোখে মাঝে মাঝে একটা ভয় ঝলক দেয়—কিন্তু তারা সেটাকে সঙ্গে সঙ্গে চাপা দিয়ে ফেলে, কারণ তারা শিখে গেছে, ভয় দেখানো যাবে না, ভয়কে শক্তি বানিয়ে দেখাতে হবে। এই ছেলেদের কথার ভেতর একটা নাম বারবার উঠে আসে—রকি। নামটা উচ্চারণ করার সময় তারা একটু নিচু গলায় বলে, একটু সাবধানে বলে, যেন নামটার ভেতরেই একটা অদৃশ্য নিয়ম আছে। রকি এখন আর সেই আগের ছেলেটা নেই, যে হুটহাট রেগে যেত, যার চোখে সবসময় আগুন জ্বলত। এখন সে ধীর, ভারী, হিসেবি—একটা শিকারি প্রাণীর মতো, যে দৌড়ায় না, অপেক্ষা করে। তার গলায় মোটা সোনার চেইন, শরীরটা একটু ভারী হয়েছে, হাঁটার ভঙ্গিতে একটা অলস ক্ষমতা—যেন সে জানে, তাকে তাড়াহুড়ো করতে হবে না, কারণ সময় নিজেই তার জন্য থেমে থাকে। সে দোকানের সামনে এসে দাঁড়াতেই ছেলেগুলোর হাসি থেমে যায়, কেউ আর জোরে কথা বলে না, একটা চাপা নীরবতা নেমে আসে। “কী খবর?”—সে জিজ্ঞেস করে, গলায় কোনো রাগ নেই, কিন্তু সেই শান্ত স্বরের ভেতরেই একটা চাপা হুমকি থাকে। একজন বলে—“ভালো ভাই”—আরেকজন একটু এগিয়ে এসে বলে—“কালকের কাজটা সেট হইছে।” রকি কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে, এমনভাবে তাকায় যেন সে শুধু কথাটা শুনছে না, কথার পেছনের উদ্দেশ্যটাও বুঝে ফেলছে। তারপর ধীরে মাথা নাড়ে—“কাজ করবি, ঠিক আছে। কিন্তু মাথা ব্যবহার করবি। এখনকার সময় আগের মতো না।” তার গলার স্বর নিচু, কিন্তু প্রতিটা শব্দ যেন ভেতরে ঢুকে বসে যায়। সে সিগারেট ধরায়, ধোঁয়াটা ধীরে ছাড়ে, তারপর বলে—“আগে লোকজন ভয় পাইত। এখন ভয় পায় না—কারণ ভয় দেখতে পায় না। ভয়টারে invisible করতে হয়।” এই কথাটা বলার সময় তার চোখে একটা ঠান্ডা স্থিরতা, যেন সে এই খেলার নিয়ম অনেক আগেই শিখে ফেলেছে। ছেলেগুলো চুপ করে শোনে, কেউ হাসে না, কেউ কিছু বলে না—কারণ তারা বুঝে গেছে, এই কথাগুলো মজা না, এই কথাগুলো নিয়ম। দোকানের ভেতরে মমতা চা ঢালছিল, তার হাত থামে না, কিন্তু তার কান একটাও শব্দ মিস করে না। তার মুখে আগের সেই কোমলতা নেই, চোখের নিচে কালি জমেছে, চুলে কিছু সাদা রেখা দেখা যাচ্ছে। সময় তাকে শুধু বয়স দেয়নি, তাকে শক্ত করেছে, তাকে শিখিয়েছে কিভাবে চুপ করে থাকতে হয়। সে চা এগিয়ে দেয়—“নাও”—রকি কাপটা নেয়, একটু তাকায় তার দিকে—“আপা, দোকানটা ভালো চালাইতেছেন।” মমতা হালকা হাসে, কিন্তু সেই হাসিটা খুব দ্রুত মরে যায়—“চালাইতেই তো হইবো।” এই একটা লাইনের ভেতর তার পুরো জীবনটা লুকিয়ে আছে—কেউ নেই, থামার জায়গা নেই, শুধু চালিয়ে যেতে হবে। রহিম চাচা এখন আর দোকানে বসেন না, দোকানের পেছনের ঘরে শুয়ে থাকেন। দুপুরের দিকে তার কাশি বেড়ে যায়, রাতে ঘুম আসে না, শ্বাস নিতে কষ্ট হয়—মনে হয় প্রতিটা শ্বাস তার শরীর থেকে কিছু একটা নিয়ে যাচ্ছে। মমতা মাঝে মাঝে গিয়ে দেখে—তার বুক ধীরে উঠছে-নামছে, যেন প্রতিটা নিঃশ্বাস একটা লড়াই। একদিন বিকেলে বৃষ্টি হচ্ছিল, দোকানে লোক কম, মমতা ভেতরে গিয়ে দেখে—রহিম চাচা জানালার দিকে তাকিয়ে আছে, তার চোখে একটা ফাঁকা দৃষ্টি, যেন সে কিছু দেখছে না, তবুও তাকিয়ে আছে। “কিছু লাগবো?”—মমতা জিজ্ঞেস করে। “না”—তিনি বলেন, ছোট, ক্লান্ত একটা উত্তর। কিছুক্ষণ পর তিনি নিজেই বলেন—“রকি আছিল?” এই প্রশ্নটার ভেতরে একটা ভয় আছে, একটা অজানা আশঙ্কা। মমতা একটু থেমে বলে—“ছিল।” এই এক শব্দের ভেতরে কত কিছু—অভ্যাস, ভয়, মেনে নেওয়া। রহিম চাচা চোখ বন্ধ করেন, তার মুখে একটা ক্লান্তি নেমে আসে, যেন তিনি জানতেন—এই উত্তরটাই আসবে, তবুও শুনে নিতে হলো। বাইরে বৃষ্টি থেমে যায়, কিন্তু বাতাসে একটা ভেজা গন্ধ রয়ে যায়, মাটির গন্ধ, স্মৃতির গন্ধ, আর কোথাও একটা অদৃশ্য অস্বস্তি। এই পাড়াটা বদলেছে, মানুষ বদলেছে, কিন্তু ভেতরের গল্পগুলো বদলায়নি—শুধু নতুন চরিত্র এসেছে, পুরনো চরিত্রগুলো একটু চুপ হয়ে গেছে। আর এই চুপ করে থাকা জায়গাগুলোই সবচেয়ে বিপজ্জনক—কারণ সেখানেই গল্প জমে, সেখানেই বিস্ফোরণ হয়, সেখানেই মানুষ বদলে যায়। সন্ধ্যার আলোটা ধীরে ধীরে বদলাতে থাকে, যেন আকাশ নিজেই রঙ পাল্টে একটা নতুন মেজাজ নিচ্ছে, আর ঠিক সেই সময়েই পাড়ার ভেতর হঠাৎ করে একটা খবর ঢেউয়ের মতো ছড়িয়ে পড়ে—“বাপ্পি আইছে।” প্রথমে কথাটা কেউ ঠিক বিশ্বাস করে না, কারণ কিছু নাম আছে যেগুলো একবার হারিয়ে গেলে মানুষ নিজের মনকে বোঝায়—ওগুলো আর ফিরবে না। কিন্তু তবুও, মানুষের কৌতূহল কখনো মরে না। কেউ একজন চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বলে—“আমি নিজের চোখে দেখছি”—আর এই একটা বাক্যই যথেষ্ট। তারপর খবরটা আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ে, গলির ভেতর থেকে ছাদে, ছাদ থেকে দোকানে, দোকান থেকে ঘরের ভেতরে—যেন বাতাস নিজেই এই নামটা বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। যারা একসময় বাপ্পির সাথে বসে আড্ডা দিয়েছে, তারা হঠাৎ চুপ হয়ে যায়। যারা তাকে ভয় পেত, তারা একটু অস্বস্তিতে পড়ে। আর যারা তাকে ভুলে যেতে চেয়েছিল, তাদের বুকের ভেতরটা হালকা করে কেঁপে ওঠে। কারণ কিছু মানুষকে ভুলে থাকা যায়, কিন্তু তাদের ফিরে আসার সম্ভাবনাটাকে কখনো পুরোপুরি মুছে ফেলা যায় না। রাত একটু গভীর হওয়ার পর তাকে দেখা গেল—চা দোকানের সামনে, একা দাঁড়িয়ে। তার দাঁড়িয়ে থাকার ভঙ্গিটা অদ্ভুতভাবে শান্ত, যেন সে কোথাও তাড়াহুড়ো করে পৌঁছাতে চায় না, বরং সময়কে নিজের দিকে আসতে দিচ্ছে। তার চেহারায় সময়ের ছাপ স্পষ্ট—চুল ছোট করে কাটা, মুখে খসখসে দাড়ি, শরীর আগের থেকে শুকনো কিন্তু তার ভেতরে একটা শক্ত ভাব জমে উঠেছে, যেটা বাইরে থেকে দেখা যায় না, কিন্তু অনুভব করা যায়। কিন্তু সবচেয়ে বেশি বদলেছে তার চোখ। আগে সেই চোখে একটা অস্থিরতা ছিল, একটা দৌড় ছিল—ভয়, লজ্জা, রাগ, সবকিছু মিশে থাকত। এখন সেখানে শুধু স্থিরতা। ঠান্ডা, হিসেবি, অদ্ভুতভাবে ফাঁকা একটা স্থিরতা—যেন সে সবকিছু দেখে, কিন্তু কিছুই তাকে আর নাড়িয়ে দিতে পারে না। এই ধরনের চোখ সাধারণত সেই মানুষদের হয়, যারা অনেক কিছু হারিয়ে ফেলে, তারপর একসময় বুঝে যায়—আর কিছু হারানোর নেই। সে ধীরে দোকানের ভেতরে ঢোকে। মমতা তখন চা ঢালছিল, তার হাতের গতি এক মুহূর্তের জন্য থেমে যায়, কিন্তু সে সেটা লুকানোর চেষ্টা করে। বাপ্পি নিচু গলায় বলে—“এক কাপ চা দিবেন?” এই কণ্ঠে কোনো চাপ নেই, কোনো তাড়াহুড়ো নেই, কিন্তু একটা পরিষ্কার দৃঢ়তা আছে—যেন সে জানে, তার কথার জন্য কেউ না বলবে না। মমতা তাকায় তার দিকে, আর তাদের চোখে চোখ পড়ে। সেই এক মুহূর্তে সময়টা যেন একটু থেমে যায়। বহু বছর আগের একটা রাত, কিছু অসমাপ্ত কথা, কিছু না বলা অনুভূতি—সব একসাথে ফিরে আসে, আবার মিলিয়েও যায়। সে নিজেকে সামলে নিয়ে জিজ্ঞেস করে—“চিনি কম?” বাপ্পি হালকা মাথা নাড়ে—“আগের মতো।” এই “আগের মতো” কথাটা যেন বাতাসে ঝুলে থাকে, কারণ দুজনেই জানে—কিছুই আর আগের মতো নেই, তবুও এই ছোট্ট অভ্যাসগুলো মানুষ ধরে রাখে, যেন নিজেকে মনে করাতে পারে—সবকিছু পুরোপুরি বদলায়নি। দোকানের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেগুলো চুপচাপ তাকিয়ে থাকে। তারা জানে না পুরো গল্পটা, কিন্তু তারা বুঝতে পারে—এই মানুষটা আলাদা। অন্যরকম। তাদের চোখে একটা মিশ্র অনুভূতি—কৌতূহল, ভয়, আর আকর্ষণ। কারণ তারা এমন কাউকে দেখছে, যে তাদের মতো না, কিন্তু তারা যেরকম হতে চায়—অথবা ভয় পায় হয়ে যেতে। দূরে দাঁড়িয়ে রকি সবকিছু দেখছিল। তার চোখে একটা হিসেবি দৃষ্টি, যেন সে পরিস্থিতিটাকে মাপছে, বুঝতে চাইছে—এই ফিরে আসাটা তার জন্য সুযোগ, না ঝুঁকি। সে ধীরে এগিয়ে আসে, তার উপস্থিতিতেই চারপাশের বাতাস একটু ভারী হয়ে ওঠে। “কেমন আছিস?”—সে জিজ্ঞেস করে, গলায় একটা হালকা হাসি, কিন্তু চোখে না। বাপ্পি তাকায় তার দিকে, কয়েক সেকেন্ড চুপ থাকে, যেন সে এই মানুষটাকে নতুন করে পড়ছে। তারপর বলে—“ভালো।” এই “ভালো” শব্দটা এমনভাবে বের হয়, যেন এটা কোনো উত্তর না, শুধু একটা দরজা বন্ধ করার উপায়। রকি বুঝতে পারে—এই মানুষটা আগের বাপ্পি না। আগের সেই আবেগী, ভুল করা ছেলেটা কোথাও নেই। তার জায়গায় এসেছে এমন একজন, যে চুপচাপ থাকে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে হিসাব করে। “কিছু করবি?”—রকি জিজ্ঞেস করে, কথাটা হালকা, কিন্তু এর ভেতরে একটা অফার আছে, একটা প্রলোভন আছে। বাপ্পি হালকা হাসে—একটা ছোট, অদ্ভুত হাসি—যেটা পুরোপুরি বোঝা যায় না। “দেখি”—সে বলে। এই “দেখি” শব্দটা অন্যরকম। এর ভেতরে দ্বিধা নেই, ভয় নেই—বরং একটা অদৃশ্য পরিকল্পনা আছে, যেটা সে কাউকে দেখাচ্ছে না। রকি কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে, তারপর বুঝতে পারে—এই মানুষটাকে ব্যবহার করা সহজ হবে না। আর এই উপলব্ধিটাই তাকে একটু অস্বস্তিতে ফেলে। রাতটা অদ্ভুতভাবে শান্ত থাকে, কিন্তু সেই শান্তি স্বস্তির না, বরং ঝড়ের আগের থেমে থাকা বাতাসের মতো। নতুন ছেলেগুলো ছাদে জড়ো হয়, মোবাইলের আলো তাদের মুখে পড়ে, তারা ফিসফিস করে কথা বলে—“ওই বাপ্পি ভাই কি আবার নামবে?” একজন বলে—“ওর চোখ দেখছিস? ওরে দিয়ে অনেক কিছু করা যাবে।” তাদের কণ্ঠে উত্তেজনা আছে, তারা ভাবে—সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা যায়, মানুষকে ব্যবহার করা যায়। তারা এখনো বোঝে না—যে মানুষ নিজের ভেতরে হিসাব করতে শিখে গেছে, যে মানুষ নিজের ভয়কে মেরে ফেলেছে, তাকে আর কেউ ব্যবহার করতে পারে না। সে নিজেই সিদ্ধান্ত নেয়, নিজেই পথ বেছে নেয়, আর সেই পথ কখনো কখনো অন্যদের জন্য বিপদ হয়ে দাঁড়ায়। ওদিকে বাপ্পি একা হাঁটছে গলির ভেতর দিয়ে। এই গলিটা তার চেনা, প্রতিটা দেয়াল, প্রতিটা মোড় তার মনে আছে। একটা জায়গায় এসে সে থামে—দেয়ালের পাশে। এই জায়গায় একসময় তার হাত কাঁপত, শ্বাস দ্রুত হয়ে যেত, বুকের ভেতরটা ধুকপুক করত। সেই রাতটা তার মনে পড়ে—অস্থিরতা, ভয়, আর একটা ভুল সিদ্ধান্ত, যেটা তার জীবন বদলে দিয়েছিল। কিন্তু আজ—সবকিছু স্থির। তার শ্বাস ধীর, চোখ শান্ত। সে পকেট থেকে একটা পুরনো কয়েন বের করে, আঙুলের মধ্যে ঘোরাতে থাকে। এই ছোট্ট কাজটা যেন তার নিজের সাথে একটা সংযোগ—একটা অভ্যাস, যা তাকে মনে করিয়ে দেয়—সে এখনও মানুষ, পুরোপুরি পাথর হয়ে যায়নি। তার চোখে কোনো আবেগ নেই, কিন্তু তার ভেতরে কিছু চলছে—একটা ঠান্ডা, স্পষ্ট হিসাব। কে কোথায় আছে, কে কী চায়, কে কীভাবে ব্যবহার করে—সব সে দেখছে, মেপে নিচ্ছে। তার মাথার ভেতর যেন একটা বোর্ড গেম চলছে, যেখানে প্রতিটা মানুষ একটা ঘুঁটি। কিন্তু সে জানে—এই খেলাটা সে এবার নিজের নিয়মে খেলবে। বৃষ্টি আবার পড়তে শুরু করে, হালকা, ধীরে, টিনের ছাদে টুপটাপ শব্দ করে। এই শব্দটা একসময় তাকে অস্থির করত, এখন শান্ত করে। পাড়ার বাতিগুলো একে একে নিভে যায়, অন্ধকার ধীরে ধীরে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। সবাই ঘুমিয়ে পড়ে, দরজা বন্ধ করে, নিজেদের নিরাপত্তার ভেতরে ঢুকে যায়। কিন্তু কিছু মানুষ আছে—যারা ঘুমায় না। তারা অন্ধকারে বসে থাকে, অপেক্ষা করে। কারণ তারা জানে—সময় সবসময় একই থাকে না, একটা সময় আসে, যখন সবকিছু বদলায়। আর যারা সেই সময়টার জন্য প্রস্তুত থাকে, তারাই জিতে যায়। বাপ্পি দাঁড়িয়ে থাকে সেই অন্ধকার গলির ভেতরে, বৃষ্টির ফোঁটা তার কাঁধে পড়ে, আর তার চোখে ধীরে ধীরে একটা অদ্ভুত আলো জ্বলে ওঠে—না রাগের, না দুঃখের—শুধু সিদ্ধান্তের। সে জানে—তার গল্প শেষ হয়নি। বরং, আসল গল্পটা এখন শুরু হতে যাচ্ছে। (চলবে...)
Parent