২টি ছাদ ও কয়েকটি বিকেল... - অধ্যায় ১৫

🔗 Original Chapter Link: https://xossipy.com/thread-73110-post-6261302.html#pid6261302

🕰️ Posted on Fri Jul 10 2026 by ✍️ Dead people (Profile)

🏷️ Tags:
📖 3261 words / 15 min read

Parent
পর্ব ১৫ (১) সাইফ অনেকদিন পর সেই ঠিকানাটার সামনে এসে দাঁড়াল, আর দাঁড়ানোটা শুধু শারীরিক না—মনে হচ্ছিল সে যেন নিজের পুরনো একটা জীবনের সামনে দাঁড়িয়ে আছে, যেটাকে সে বহুদিন ধরে এড়িয়ে গেছে, পাশ কাটিয়ে গেছে, কখনো ব্যস্ততার অজুহাতে, কখনো নিজের ভেতরের ভয়কে যুক্তি বানিয়ে। গেটটা আগের মতোই আছে—কালচে রঙ উঠে গিয়ে জায়গায় জায়গায় মরিচা ধরেছে, লোহার ফাঁকগুলো দিয়ে ভেতরের অন্ধকার বাগানটা দেখা যায়, যেখানে আলো ঢোকে ঠিকই কিন্তু পুরোটা না, যেন জায়গাটাও নিজেকে লুকিয়ে রাখতে শিখে গেছে। তার চোখে পড়ে—মাটিতে ছড়িয়ে থাকা শিউলি ফুল, সাদা পাপড়ি আর কমলা ডাঁটা—অদ্ভুতভাবে পরিচিত, অদ্ভুতভাবে শান্ত, অথচ সেই শান্তির ভেতরেই একটা চাপা কষ্ট লুকানো। এই দিনটা—আরিবার জন্মদিন—সে বছরের পর বছর এড়িয়ে গেছে, যেন এই একটা দিনকে এড়িয়ে গেলে বাকি দিনগুলো সহজ হয়ে যাবে। সে ফোন বন্ধ রেখেছে, বন্ধুদের এড়িয়ে গেছে, এমনকি নিজের ভেতরেও একটা দেয়াল তুলে রেখেছে, যাতে এই নাম, এই স্মৃতি, এই অনুভূতিগুলো ঢুকতে না পারে। কিন্তু আজ সেই দেয়ালটা কোথাও ভেঙে গেছে। সে নিজেও বুঝতে পারছে না—কেন আজ সে এখানে এসেছে, কেন আজ সে পালাতে পারেনি। মনে হচ্ছিল—যে জিনিস থেকে এতদিন পালিয়েছে, সেটার সামনে দাঁড়ানো ছাড়া আর কোনো উপায় নেই, কারণ পালিয়ে থাকা মানে বাঁচা না, শুধু সময় পার করা। গেটটা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই একটা গন্ধ তাকে থামিয়ে দিল—পুরোনো বইয়ের, হালকা ধুলোর, আর খুব মৃদু একটা পারফিউমের স্মৃতি, যেটা এখন আর কেউ ব্যবহার করে না, কিন্তু তবুও বাতাসে কোথাও আটকে আছে। এই গন্ধটা এমন, যেটা সরাসরি মনে আঘাত করে না, বরং ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকে যায়, আর তারপর একসময় বুঝতে পারো—তুমি ইতিমধ্যে হারিয়ে গেছো। ড্রয়িংরুমে কয়েকজন বসে আছে, কিন্তু সেই বসাটা কোনো জমায়েতের মতো না, বরং একটা অপেক্ষার মতো—যেখানে কেউ আসবে না, তবুও সবাই বসে আছে। কারও মুখে হাসি নেই, কেউ উচ্চস্বরে কথা বলছে না, কেক কাটার কোনো আয়োজন নেই, বেলুন নেই, গান নেই। এটা কোনো জন্মদিন না—এটা একটা স্মরণ, একটা অনুপস্থিত মানুষকে ঘিরে থাকা উপস্থিত মানুষের নিঃশব্দ আয়োজন, যেখানে প্রত্যেকেই নিজের মতো করে শোক বহন করছে, কিন্তু কেউ কাউকে দেখাচ্ছে না। সাইফের মনে হলো, এই ঘরের প্রতিটা জিনিস তাকে চিনে ফেলেছে—সোফার কোণ, টেবিলের ওপর রাখা বই, দেয়ালে ঝুলে থাকা ছবিগুলো—সব যেন তাকে জিজ্ঞেস করছে, “এতদিন কোথায় ছিলে?” ঠিক তখনই আদিরা এগিয়ে এল। সে আগের মতোই আছে, আবার আগের মতো না। তার চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ, কিন্তু সেই ক্লান্তির ভেতরেও একটা কোমলতা আছে—যেটা সহজে চোখে পড়ে না, কিন্তু অনুভব করা যায়। সে কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে থাকল, যেন নিশ্চিত হতে চাইছে—এই মানুষটা সত্যিই এসেছে। তারপর খুব আস্তে বলল, “তুমি আসবা ভাবিনি।” এই কথাটার ভেতরে কোনো অভিযোগ নেই, কোনো চাপ নেই—শুধু একটা সত্য, যেটা সে অনেকদিন ধরে মেনে নিয়েছে। সাইফ হালকা মাথা নাড়ল, “আমিও ভাবিনি।” এই দুইটা ‘ভাবিনি’ শব্দের ভেতরে এত বছর জমে আছে—অপেক্ষা, এড়িয়ে যাওয়া, না বলা কথা, আর কিছু ভুল সিদ্ধান্ত, যেগুলোর জন্য কেউ কাউকে পুরোপুরি দোষ দিতে পারে না। তারা কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে, আর সেই নীরবতাটা অস্বস্তিকর না, বরং ভারী—যেন দুজনেই জানে, এই নীরবতার ভেতর অনেক কথা লুকিয়ে আছে, যেগুলো বলার সময় এখনো আসেনি। কিছুক্ষণ পর আদিরা তাকে নিয়ে গেল একটা ছোট্ট রুমে। দরজাটা খোলার সাথে সাথে সময় যেন থেমে গেল। রুমটা ঠিক আগের মতোই রাখা—টেবিলে বইগুলো একই জায়গায়, দেয়ালে ঝুলে থাকা ছবিগুলো অপরিবর্তিত, জানালার পাশে সেই চেয়ারটা—যেখানে বসে কেউ ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করত, হাসত, রাগ করত, আবার ঠিক হয়ে যেত। মনে হচ্ছিল—এই রুমটা সময়ের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে, এখানে কিছুই বদলায়নি, শুধু মানুষটা নেই। এই ‘না থাকা’-টাই সবচেয়ে বেশি চোখে লাগে। সাইফ ধীরে ধীরে ভেতরে ঢোকে, হাত দিয়ে টেবিলটা ছুঁয়ে দেখে, যেন নিশ্চিত হতে চাইছে—এটা সত্যিই আছে। তার ভেতরে একটা চাপা কম্পন শুরু হয়, যেটা সে লুকানোর চেষ্টা করে, কিন্তু পুরোপুরি পারে না। আদিরা আলমারি খুলে একটা খাম বের করল। খামের ওপর হাতের লেখা—আরিবার। সেই বাঁকা, একটু তাড়াহুড়ো করা অক্ষর, যেটা সাইফ একসময় চোখ বন্ধ করেও চিনতে পারত। এই অক্ষরগুলো দেখে তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ করে শক্ত হয়ে যায়, যেন কেউ ভেতর থেকে কিছু চেপে ধরেছে। “এটা ও তোমার জন্য লিখেছিল,” আদিরা বলল, কণ্ঠে কোনো নাটকীয়তা নেই, শুধু একটা দায়িত্ব শেষ করার অনুভূতি। “কখনো দিতে পারিনি।” এই ‘পারিনি’ শব্দটার ভেতরে কত পরিস্থিতি, কত বাধা, কত নীরবতা জমে আছে—সেটা কেউ আলাদা করে বলে না, কিন্তু বোঝা যায়। সাইফ খামটা হাতে নেয়। তার আঙুল কাঁপছে, খুব হালকা, কিন্তু স্পষ্ট। সে বুঝতে পারে—এই কাগজের ওজন কাগজের না, এটা স্মৃতির, অসমাপ্ত কথার, আর সেই সব অনুভূতির যেগুলো সে বহুদিন ধরে চাপা দিয়ে রেখেছে। খামটা খুলতে তার একটু সময় লাগে, যেন সে প্রস্তুত না, আবার প্রস্তুত হওয়ার সময়ও নেই। ভেতরে একটা ছোট্ট চিঠি। খুব বড় না, কয়েকটা লাইন মাত্র। কিন্তু প্রতিটা লাইনের ভেতরে থেমে যেতে হয়, কারণ এগুলো শুধু লেখা না—এগুলো একটা মানুষের শেষ চাওয়া, শেষ বোঝাপড়া, শেষ ভালোবাসা। “তুমি যদি কখনো আমাকে হারাও, চেষ্টা করো নিজেকে হারাইও না।” এই লাইনটা পড়ার সাথে সাথে সাইফের শ্বাস একটু ভারী হয়ে যায়। সে থামে, চোখ বন্ধ করে, আবার পড়ে। “আমি চাই না, আমার অভাব তোমাকে অন্য কারও কাছে নিয়ে যাক শুধু ফাঁকা জায়গা ভরতে।” তার আঙুল কাগজের ওপর শক্ত হয়ে ওঠে। “ভালোবাসা কারও জায়গা ভরার জন্য না—ভালোবাসা নতুন জায়গা তৈরি করে।” এই লাইনটা তার মাথার ভেতর বারবার ঘুরতে থাকে। “তুমি যদি আবার কাউকে ভালোবাসো, নিশ্চিত হয়ে নিও—তুমি তাকে ভালোবাসছ, আমাকে না।” শেষ লাইনে কোনো স্বাক্ষর নেই, শুধু একটা ছোট্ট দাগ—যেটা হয়তো চোখের পানির। সাইফ অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থাকে। সময় কত কেটে যায়, সে জানে না। মনে হচ্ছিল—তার ভেতরের অনেকগুলো দরজা একসাথে খুলে যাচ্ছে, আর প্রতিটা দরজার পেছনে একটা করে প্রশ্ন দাঁড়িয়ে আছে। সে কি সত্যিই শিউলিকে ভালোবেসেছে? নাকি সে শুধু একটা ফাঁকা জায়গা ঢাকতে চেয়েছে? সে কি নিজের অনুভূতিকে বুঝেছে, নাকি শুধু পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নিয়েছে? এই প্রশ্নগুলো তাকে ভেতর থেকে নাড়িয়ে দেয়, কারণ এগুলোর উত্তর সহজ না, আর হয়তো কোনোদিন পুরোপুরি পাওয়া যাবে না। আদিরা চুপচাপ তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। তার চোখে কোনো চাপ নেই, কিন্তু একটা গভীর বোঝাপড়া আছে। সে খুব আস্তে বলল, “তুমি ওকে খুব ভালোবাসতা, আমি জানি।” এই কথাটা বলার সময় তার কণ্ঠে কোনো ঈর্ষা নেই, কোনো অভিযোগ নেই—শুধু একটা সত্যের স্বীকারোক্তি। “কিন্তু ভালোবাসা কখনো কারও জায়গা না।” সে একটু থামে, যেন শব্দগুলো ঠিকভাবে বসাতে চাইছে। “তুমি কি নিজেকে ঠিকমতো জিজ্ঞেস করছ?” এই প্রশ্নটা খুব সাধারণ শোনায়, কিন্তু এর ভেতরে একটা চাপ আছে—নিজেকে সত্যি করে দেখার চাপ। সাইফ কোনো উত্তর দেয় না। সে শুধু বসে থাকে, চিঠিটা হাতে, চোখ কোথাও দূরে। তার মাথার ভেতর একটা শব্দ বারবার ফিরে আসছে—“নতুন জায়গা তৈরি করে।” সে বুঝতে পারছে—ভালোবাসা মানে শুধু ধরে রাখা না, কখনো কখনো ছেড়ে দেওয়াও। কিন্তু সে কি পারবে? সে কি নিজেকে নতুন করে গড়তে পারবে, নাকি পুরনো স্মৃতির ভেতরেই আটকে থাকবে? বাইরে তখন সন্ধ্যা নেমে এসেছে। লাইট জ্বলছে, কিন্তু আলোটা পুরো উজ্জ্বল না—একটু নরম, একটু ক্লান্ত। লোকজন ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে, ঘর ফাঁকা হয়ে আসছে। সাইফ উঠে দাঁড়ায়, চিঠিটা আবার খামে ঢোকায়, কিন্তু সে জানে—এই কথাগুলো আর কখনো খামের ভেতর থাকবে না, এগুলো এখন তার ভেতরে ঢুকে গেছে। বের হওয়ার আগে সে একবার পিছনে তাকায়। মনে হয়—এই বাড়িটা তাকে অনেক আগেই ছেড়ে দিয়েছে, শুধু সে নিজেই নিজেকে ছাড়তে পারেনি। শহরের আলো তখন ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছিল, কিন্তু সেই নরম আলোয়ও একটা অদ্ভুত তীক্ষ্ণতা ছিল—যেন প্রতিটা আলো ছায়ার ভেতরে কিছু লুকিয়ে রাখছে। সেই ছায়ার ভেতরেই নীলা নিজের জন্য একটা দেয়াল তুলছিল, খুব নিঃশব্দে, খুব ধীরে, যেন কেউ টের না পায়। বাইরে থেকে তাকে দেখলে সবকিছু স্বাভাবিক—সে হাসছে, প্রশ্ন করছে, মাথা নেড়ে কথা শুনছে—কিন্তু এই স্বাভাবিকতার ভেতরেই একটা হিসেবি দূরত্ব জমে উঠছে। এই দূরত্বটা এমন না যে হঠাৎ চোখে পড়ে, বরং এমন যে একটু বেশি সময় একসাথে থাকলে, একটু গভীরভাবে তাকালে বোঝা যায়—এখানে কিছু নেই, বা যা আছে সেটা পুরোটা খোলা না। রাফি প্রথমে এই পরিবর্তনটা ধরতে পারেনি, কারণ সে অভ্যস্ত ছিল নীলার নীরবতাকে ভালোবাসা হিসেবে দেখতে, তার চুপচাপ থাকা মানেই সে কাছে আছে—এই বিশ্বাসে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সে বুঝতে শুরু করল, এই চুপ থাকা আগের মতো না। আগের চুপ থাকা ছিল আশ্রয়, এখনকার চুপ থাকা যেন একটা দূরত্ব তৈরি করে, একটা সীমারেখা টেনে দেয়। সে মাঝে মাঝে কথা বলতে গিয়ে থেমে যায়, কারণ বুঝতে পারে—এই কথাগুলো হয়তো আর আগের জায়গায় পৌঁছাবে না। তার মনে হতে থাকে—একই টেবিলে বসে থেকেও তারা যেন আলাদা আলাদা জায়গায় বসে আছে। আর এই অদৃশ্য আলাদা হয়ে যাওয়াটাই সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়, কারণ এর কোনো নির্দিষ্ট কারণ ধরা যায় না, কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় আঙুল দিয়ে বলা যায় না—“এইখানে সমস্যা।” তবুও সমস্যা আছে, খুব স্পষ্টভাবে আছে। ক্যাফেটা আগের মতোই—কাঠের টেবিলের ওপর হালকা দাগ, কোণার প্ল্যান্টটার পাতায় একটু ধুলো জমে আছে, আর পেছনে বাজছে সেই পরিচিত মিউজিক, যেটা একসময় তাদের কাছে একটা স্মৃতি ছিল। এই জায়গাটায় তারা কতবার বসেছে—হাসাহাসি করেছে, ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলেছে, ছোট ছোট প্ল্যান করেছে—কিন্তু আজ সেই একই জায়গাটা যেন অন্যরকম লাগছে। নীলা বসে আছে সোজা হয়ে, তার হাতটা টেবিলের ওপর রাখা, আঙুলগুলো মাঝে মাঝে নড়ছে—একটা অস্থিরতা আছে, কিন্তু সে সেটা লুকানোর চেষ্টা করছে। রাফি তার দিকে তাকিয়ে বুঝতে চেষ্টা করছে—এই মেয়েটা কি সেই একই মানুষ, নাকি তার ভেতরে কিছু বদলে গেছে? “কাজ কেমন চলছে?”—নীলার প্রশ্নটা খুব সাধারণ, কিন্তু এর ভেতরে একটা দূরত্ব আছে, যেন সে শুধু একটা তথ্য জানতে চাইছে, কোনো অনুভূতি না। রাফি একটু অবাক হয়, কারণ এই প্রশ্নটা অনেকদিন পর এসেছে, আর সে নিজেও জানে না—সে কীভাবে উত্তর দেবে। “ভালো… অনেক প্রেসার, কিন্তু ম্যানেজ করে নিচ্ছি”—সে হেসে বলে, কিন্তু তার হাসিটা পুরোপুরি স্বাভাবিক না। নীলা মাথা নাড়ে, কিন্তু তার চোখ রাফির মুখে স্থির থাকে, যেন সে কোনো পরিবর্তন খুঁজছে, কোনো ফাঁক খুঁজছে। “তুমি এখন বদলাইছ”—সে বলে, খুব শান্ত গলায়। এই কথাটা অভিযোগ না, কিন্তু প্রশংসাও না—এটা একটা পর্যবেক্ষণ, যেটার ভেতরে প্রশ্ন লুকিয়ে আছে। রাফি একটু হালকা করার চেষ্টা করে—“ভালো না খারাপ?”—কিন্তু সে নিজেও বুঝতে পারে, এই মজাটা জায়গামতো বসছে না। নীলা সরাসরি উত্তর দেয় না, সে শুধু তাকিয়ে থাকে—গভীরভাবে, একটু বেশি সময় ধরে, যেন সে শুধু মুখ দেখছে না, ভেতরটা পড়ার চেষ্টা করছে। এই দৃষ্টিটা রাফির অচেনা লাগে, কারণ আগে এই চোখে সে এক ধরনের নির্ভরতা দেখত, এখন সেখানে একটা হিসেব আছে। “কি দেখতেছ?”—সে জিজ্ঞেস করে, একটু অস্বস্তি নিয়ে। নীলা খুব আস্তে বলে—“তোমাকে।” কথাটা খুব ছোট, কিন্তু তার ভেতরে একটা ভার আছে, যেন এই ‘তোমাকে’ শব্দটার ভেতরে অনেকগুলো স্তর আছে—পুরোনো তুমি, নতুন তুমি, আর মাঝখানে কোথাও হারিয়ে যাওয়া একটা মানুষ। রাফির বুকের ভেতরটা একটু কেঁপে ওঠে, কারণ সে বুঝতে পারে—নীলা শুধু তাকে দেখছে না, তাকে বিচার করছে। এই বিচারটা শব্দে বলা না হলেও, তার ওজন অনুভব করা যায়। সে কিছু বলতে চায়—নিজেকে ব্যাখ্যা করতে চায়, বলতে চায় যে সে বদলেছে কারণ বদলানো দরকার ছিল, কারণ জীবন তাকে বাধ্য করেছে—কিন্তু শব্দগুলো ঠিকঠাক আসে না। তার মনে হয়, যেটা সে বলবে, সেটা হয়তো যথেষ্ট হবে না। নীলার মাথার ভেতর তখন একসাথে অনেক কিছু চলছে। ডায়েরির সেই লাইনগুলো, তার বাবার সেই সন্দেহ, রকির নাম—সবকিছু মিশে একটা অস্পষ্ট কিন্তু ভারী অনুভূতি তৈরি করেছে। সে রাফির মুখের দিকে তাকিয়ে চেষ্টা করছে—এই মানুষটা কি সেই মানুষ, যাকে সে এতদিন ধরে চিনেছে? নাকি এই মানুষটার ভেতরে আরেকটা গল্প আছে, যেটা সে জানে না? তার মনে পড়ে—কিছু পুরোনো মুহূর্ত, যেখানে রাফি হঠাৎ করে চুপ হয়ে যেত, কিছু প্রশ্ন এড়িয়ে যেত, কিছু জায়গায় যেতে চাইত না। তখন এগুলো ছোট ছোট ব্যাপার মনে হয়েছিল, এখন মনে হচ্ছে—এই ছোট ছোট ব্যাপারগুলোর ভেতরেই হয়তো বড় কিছু লুকানো ছিল। সে সরাসরি কিছু জিজ্ঞেস করতে পারে, কিন্তু করে না—কারণ সে জানে, উত্তর পেলেও সেটা পুরোটা হবে না। কিছু সত্য আছে, যেগুলো মানুষ মুখে বলে না, শুধু আচরণে প্রকাশ পায়। আর সেই আচরণটাই এখন তার সামনে বসে আছে, কিন্তু সে নিশ্চিত না—সে ঠিক কী দেখছে। রাফি হঠাৎ অনুভব করে—তার শরীরের ভেতর একটা টান তৈরি হচ্ছে। সে তার হাতটা একটু এগিয়ে দিতে চায়, নীলার হাত ছুঁতে চায়—আগের মতো, স্বাভাবিকভাবে—কিন্তু থেমে যায়। কারণ সে বুঝতে পারে, এই স্পর্শটা হয়তো এখন আর আগের মতো গ্রহণ করা হবে না। তাদের মাঝে একটা অদৃশ্য দূরত্ব তৈরি হয়েছে, যেটা শুধু জায়গার না, অনুভূতির। সে নিজের আঙুলগুলো শক্ত করে চেপে ধরে, যেন নিজেকে ধরে রাখছে। “সব ঠিক আছে তো?”—সে শেষ পর্যন্ত জিজ্ঞেস করে, খুব আস্তে। নীলা তাকায়, কয়েক সেকেন্ড চুপ থাকে, তারপর বলে—“হ্যাঁ, সব ঠিক।” এই ‘সব ঠিক’ কথাটা এতটাই নিখুঁত যে, সেটা বিশ্বাস করা কঠিন হয়ে যায়। কারণ যেখানে সব সত্যিই ঠিক থাকে, সেখানে এই কথাটা এত হিসেব করে বলা লাগে না। এই কথার ভেতরে একটা দূরত্ব আছে, একটা দরজা বন্ধ থাকার শব্দ আছে। ক্যাফের ভেতরে তখনও সেই একই গান বাজছে, কিন্তু তারা আর সেটা শুনছে না। তাদের দুজনের ভেতরে আলাদা আলাদা শব্দ চলছে—প্রশ্ন, সন্দেহ, অস্বস্তি। বাইরে লোকজন আসছে, যাচ্ছে, কেউ তাদের দিকে তাকাচ্ছে না, কেউ তাদের গল্প জানে না। কিন্তু তাদের টেবিলের ওপর একটা অদৃশ্য ভার বসে আছে, যেটা কেউ সরাতে পারছে না। নীলা ধীরে ধীরে তার কফির কাপটা ঠোঁটে তোলে, কিন্তু সে বুঝতে পারে—সে আসলে কফির স্বাদ নিচ্ছে না, সে শুধু একটা অভ্যাস পূরণ করছে। তার চোখ মাঝে মাঝে রাফির দিকে যায়, আবার সরে যায়—যেন সে নিজেকেই সময় দিচ্ছে, কীভাবে এই মানুষটাকে দেখবে, কীভাবে এই সম্পর্কটাকে বুঝবে। রাফি এই দৃষ্টি লক্ষ্য করে, কিন্তু কিছু বলে না—কারণ সে জানে, এই মুহূর্তে বলা কোনো কথাই যথেষ্ট হবে না। কিছু নীরবতা আছে, যেগুলো ভাঙা যায় না, শুধু পার করে যেতে হয়। শেষ পর্যন্ত তারা উঠে দাঁড়ায়, বিল দেয়, বাইরে বের হয়। রাস্তায় হালকা বাতাস, কিন্তু সেই বাতাসও যেন ভারী লাগে। তারা পাশাপাশি হাঁটে, কিন্তু মাঝখানে একটা ফাঁক থাকে—খুব ছোট, কিন্তু খুব স্পষ্ট। এই ফাঁকটাই বলে দেয়—সবকিছু আগের মতো নেই। নীলা সামনে তাকিয়ে হাঁটে, রাফি তার পাশে, কিন্তু দুজনের চিন্তা আলাদা দিকে চলে যায়। এই সম্পর্কটা এখন একটা মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে কিছু একটা বলা দরকার, কিছু একটা জানা দরকার—কিন্তু কেউই প্রথম শব্দটা উচ্চারণ করতে পারছে না। আর এই না-বলা শব্দগুলোর ভেতরেই সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটা ঘটে যাচ্ছে—ধীরে, নিঃশব্দে, কিন্তু নিশ্চিতভাবে। ঘটনাটা প্রায় ১৫-১৬ বছরের পুরানো… বাস্তবতা কখনো গল্পের মতো সরল হয় না; তার ভেতরে সবসময় একটা জটিলতা থাকে, একটা অদৃশ্য ভাঁজ, যেটা বাইরে থেকে বোঝা যায় না। রাফির জীবনের সেই ভাঁজটা তৈরি হয়েছিল খুব ধীরে, এতটাই ধীরে যে সে নিজেই বুঝতে পারেনি—কখন তার ভেতরে একটা ফাঁকা জায়গা জন্ম নিয়েছে। বেকারত্ব তাকে শুধু অর্থহীন করেনি, তাকে ভেতর থেকে নরম করে দিয়েছিল, দুর্বল করে দিয়েছিল। প্রতিটা ইন্টারভিউ থেকে ফেরার সময় তার মনে হতো—সে যেন একটু একটু করে ছোট হয়ে যাচ্ছে, তার আত্মবিশ্বাসটাও যেন কেউ ধীরে ধীরে খুলে নিয়ে যাচ্ছে। বাসায় ফিরে আয়নার সামনে দাঁড়ালে সে নিজের চোখে একটা অচেনা ক্লান্তি দেখত, যেটা সে আগে কখনো দেখেনি। আর এই ক্লান্তির ভেতরেই যখন নীলার বিয়ের কথা উঠল, তখন সেই ফাঁকা জায়গাটা হঠাৎ করেই গভীর হয়ে গেল। সে বুঝতে পারল—সে শুধু পিছিয়ে নেই, সে আটকে গেছে, আর সবাই সামনে চলে যাচ্ছে। এই আটকে থাকার অনুভূতিটা খুব কষ্টের, কারণ এখানে কেউ তোমাকে ধাক্কা দেয় না, আবার কেউ টেনে তুলেও না—তুমি শুধু দাঁড়িয়ে থাকো, আর সময় তোমার পাশ দিয়ে চলে যায়। এই অবস্থাতেই রকি তার জীবনে ঢুকে পড়েছিল, খুব স্বাভাবিকভাবে, যেন কোনো পুরনো পরিচিত মানুষ হঠাৎ করে এসে পাশে দাঁড়িয়েছে। রকি তাকে কোনো বড় স্বপ্ন দেখায়নি, কোনো জোরালো প্রস্তাব দেয়নি—সে শুধু একটা ছোট, সহজ রাস্তার কথা বলেছিল, “একটু নে, মাথা হালকা হইবো।” এই কথাটার ভেতরে কোনো চাপ ছিল না, বরং একটা স্বস্তি ছিল, একটা সহজ সমাধানের ইঙ্গিত ছিল। রাফি প্রথমে না বলেছিল, কারণ তার ভেতরে তখনও একটা সীমা ছিল, একটা ভয় ছিল—সে জানত, এই রাস্তাটা ঠিক না। কিন্তু জীবনে এমন কিছু দিন আসে, যেদিন মানুষ নিজের সেই সীমাটাকে আর ধরে রাখতে পারে না, কারণ ভেতরের চাপটা বাইরে থেকে বেশি হয়ে যায়। সেই একদিন—খুব খারাপ একটা দিন—যেদিন সে আর না বলতে পারেনি। সেই প্রথমবারটা খুব ছোট ছিল, খুব নিরীহ মনে হয়েছিল। সে ভেবেছিল—এটা শুধু একটা মুহূর্ত, একটা সাময়িক পালানো। কিন্তু এই পালানোর ভেতরেই একটা অদ্ভুত আরাম ছিল, একটা হালকা হয়ে যাওয়ার অনুভূতি, যেটা সে অনেকদিন ধরে খুঁজছিল। ধীরে ধীরে সেই একবারটা দুইবার হলো, তারপর নিয়মিত হয়ে গেল। সে বুঝতেই পারল না—কখন এই “মাঝে মাঝে” জিনিসটা তার জীবনের অংশ হয়ে গেল। সে নিজেকে বোঝাত—এটা কোনো খারাপ কিছু না, এটা শুধু একটা উপায়, নিজের মাথাটা একটু শান্ত রাখার একটা চেষ্টা। কিন্তু সে খেয়াল করেনি—এই শান্তিটা আসলে ধার করা, যেটার জন্য পরে তাকে আরও বড় মূল্য দিতে হবে। তার আচরণে ছোট ছোট পরিবর্তন আসতে শুরু করল—সে হঠাৎ করে চুপ হয়ে যেত, কিছু প্রশ্ন এড়িয়ে যেত, কিছু জায়গায় যেতে চাইত না। কিন্তু এই পরিবর্তনগুলো এতটাই সূক্ষ্ম ছিল যে, সে নিজেই সেগুলোকে গুরুত্ব দেয়নি। তার মনে হতো—সব ঠিক আছে, সে নিয়ন্ত্রণে আছে। সে জানত না—মানুষ যখন ভাবে সে পুরো নিয়ন্ত্রণে আছে, তখনই আসলে সে সবচেয়ে বেশি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। এই অবস্থাতেই একদিন কাদের সাহেব তাকে দেখেছিলেন—একটা অপ্রস্তুত মুহূর্তে, যেখানে রাফি নিজেও জানত না, কেউ তাকে দেখছে। কাদের সাহেব কিছু বলেননি, কোনো প্রশ্ন করেননি—কিন্তু তার চোখে যে দৃষ্টি ছিল, সেটা রাফি এড়িয়ে যেতে পারেনি। সেই দৃষ্টিতে ছিল অবিশ্বাস, একটা সন্দেহ, আর একটা অদ্ভুত হতাশা—যেন তিনি কিছু বুঝে গেছেন, কিন্তু বলতে চাইছেন না। রাফি সেই দৃষ্টিটা অনুভব করেছিল, কিন্তু সে সেটাকে গুরুত্ব দেয়নি। সে ভেবেছিল—একটা ভুল বোঝাবুঝি, একটা ছোট্ট ঘটনা, যেটা সময়ের সাথে মিলিয়ে যাবে। সে জানত না—কিছু দৃষ্টি আছে, যেগুলো কথার থেকেও বেশি শক্তিশালী, যেগুলো মানুষের ভেতরে ঢুকে যায়, আর সেখানে থেকে যায়। কাদের সাহেবের সেই নীরব সন্দেহটা ঠিক সেখানেই থেমে থাকেনি, সেটা ধীরে ধীরে নীলার ভেতরে ঢুকে পড়েছিল। প্রথমে খুব ছোট একটা প্রশ্ন হিসেবে—“রাফি কি ঠিক আছে?”—তারপর সেই প্রশ্নটা বড় হতে হতে একটা ভয় হয়ে দাঁড়াল—“সে কি বদলে যাচ্ছে?” কাদের সাহেব হয়তো পুরো সত্য জানতেন না, কিন্তু তার অভিজ্ঞতা তাকে একটা ইঙ্গিত দিয়েছিল, আর সেই ইঙ্গিতটাই তিনি নীলার ভেতরে রেখে গিয়েছিলেন। তার মৃত্যুর পর সেই ইঙ্গিতটা আর কেউ থামানোর ছিল না, সেটা ধীরে ধীরে শেকড় গেড়ে বসে গেল। নীলা তখন একা—চারপাশে মানুষ আছে, কিন্তু তার প্রশ্নগুলো শেয়ার করার মতো কেউ নেই। সে রাফিকে সরাসরি কিছু জিজ্ঞেস করতে পারত, কিন্তু সে করেনি—কারণ সে ভয় পেত, যদি উত্তরটা তার ভয়কে সত্যি করে দেয়? এই ভয়টাই তাকে চুপ করে রেখেছিল, আর এই চুপ থাকার ভেতরেই সে নিজের ভেতরে একটা দেয়াল তৈরি করতে শুরু করল। এই দেয়ালটা কোনো একদিনে তৈরি হয়নি, এটা তৈরি হয়েছে ছোট ছোট মুহূর্তের ভেতর দিয়ে। যখন রাফি তার দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে চাইত, আর সে চোখ সরিয়ে নিত। যখন রাফি হাসত, আর সে সেই হাসির ভেতরে আগের উষ্ণতা খুঁজে পেত না। যখন রাফি তার হাত ধরতে চাইত, আর সে খুব আস্তে করে হাতটা সরিয়ে নিত—যেন সেটা খুব স্বাভাবিক একটা কাজ, কিন্তু ভেতরে ভেতরে সেটা একটা বড় দূরত্ব তৈরি করত। এই ছোট ছোট পরিবর্তনগুলোই ধীরে ধীরে বড় হয়ে ওঠে, একটা সম্পর্কের ভেতর ফাঁক তৈরি করে। রাফি প্রথমে এই পরিবর্তনগুলো বুঝতে পারেনি, কারণ সে অভ্যস্ত ছিল নীলাকে কাছের মানুষ হিসেবে দেখতে, যে কখনো দূরে যাবে না। সে ভাবত—সময় গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে, এই চুপচাপ সময়টা কেটে যাবে, আবার আগের মতো হয়ে যাবে। কিন্তু সে খেয়াল করেনি—এই সময়টাই আসলে তাদের মাঝে দূরত্ব তৈরি করছে। সে বুঝতে পারেনি—নীলার চুপ থাকা এখন আর শান্তি না, এটা একটা সিদ্ধান্ত, একটা নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা। আজ ক্যাফে তে রাফি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। তার ভেতরের অস্বস্তিটা এতটাই বেড়ে গেল যে, সে সরাসরি জিজ্ঞেস করেই ফেলল—“আমাদের মধ্যে কিছু বদলাইছে?” এই প্রশ্নটা খুব সাধারণ, কিন্তু এর ভেতরে একটা ভয় ছিল, একটা অনিশ্চয়তা ছিল। নীলা একটু তাকাল তার দিকে—খুব বেশি সময় না, কিন্তু সেই কয়েক সেকেন্ডেই অনেক কিছু বোঝা যায়। তারপর সে খুব শান্ত গলায় বলল—“সবকিছুই তো বদলায়।” এই কথাটা শুনতে সাধারণ, কিন্তু এর ভেতরে একটা শেষ লুকিয়ে আছে। এখানে কোনো ব্যাখ্যা নেই, কোনো সমাধান নেই—শুধু একটা মেনে নেওয়া আছে। রাফির মনে হলো—এই উত্তরটা একটা দরজা বন্ধ করে দিল, যেটা সে খুলতে চেয়েছিল। সে বুঝতে পারল না—কীভাবে এই জায়গায় এসে পৌঁছাল তারা, কোথায় ভুল হলো, কখন থেকে সব বদলাতে শুরু করল। তার মনে হতে লাগল—সে যেন একটা গল্পের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে, যার শুরুটা সে জানে, কিন্তু শেষটা তার নিয়ন্ত্রণে নেই। নীলা সেই কথাটা বলার পর আর কিছু যোগ করল না। সে আবার চুপ হয়ে গেল, কিন্তু এই চুপ থাকা আগের মতো না—এটা স্থির, সিদ্ধান্ত নেওয়া চুপ থাকা। তার ভেতরে একটা লড়াই চলছে—একদিকে তার ভালোবাসা, অন্যদিকে তার ভয়। সে জানে—রাফি পুরোটা খারাপ না, সে জানে—রাফির ভেতরে একটা ভালো মানুষ আছে, যাকে সে একসময় ভালোবেসেছিল। কিন্তু সে এটাও জানে—মানুষ শুধু তার ভালো দিক দিয়ে তৈরি হয় না, তার অন্ধকার দিকটাও তাকে গড়ে। আর সেই অন্ধকার দিকটাই এখন তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, যেটাকে সে পুরোপুরি বুঝতে পারছে না। এই না-বোঝাটাই তাকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে, কারণ যেখানে বোঝা যায় না, সেখানে বিশ্বাস করা কঠিন হয়ে যায়। আর যেখানে বিশ্বাস ভেঙে যায়, সেখানে ভালোবাসা টিকে থাকতে চাইলেও পারে না। রাফি বসে থাকে, কিছু বলতে পারে না। তার মনে হয়—সে যদি এখন সবকিছু খুলে বলতে পারত, সব ভুল বোঝাবুঝি দূর করতে পারত—কিন্তু সে নিজেই জানে না, কোথা থেকে শুরু করবে। সে কি বলবে—সে দুর্বল ছিল? সে কি বলবে—সে পালাতে চেয়েছিল? সে কি বলবে—সে নিজেকেই হারিয়ে ফেলেছিল কিছু সময়ের জন্য? এই কথাগুলো কি যথেষ্ট হবে? নাকি এগুলো শুনে নীলা আরও দূরে চলে যাবে? এই দ্বিধাটাই তাকে চুপ করে রাখে। আর এই চুপ থাকার ভেতরেই তাদের মাঝে দূরত্বটা আরও পাকা হয়ে যায়। তারা পাশাপাশি বসে থাকে, কিন্তু তাদের ভেতরের পৃথিবী আলাদা হয়ে যায়—একটা পৃথিবী যেখানে প্রশ্ন আছে, আরেকটা পৃথিবী যেখানে উত্তর নেই। ---
Parent