২টি ছাদ ও কয়েকটি বিকেল... - অধ্যায় ১৪

🔗 Original Chapter Link: https://xossipy.com/thread-73110-post-6258027.html#pid6258027

🕰️ Posted on Mon Jul 06 2026 by ✍️ Dead people (Profile)

🏷️ Tags:
📖 2453 words / 11 min read

Parent
পর্ব ১৪:  পাড়ার ভেতর এমন এক ধরনের অস্বস্তি ধীরে ধীরে জমে উঠছিল, যেটা কেউ সরাসরি দেখতে পায় না, কিন্তু সবাই আলাদা আলাদাভাবে অনুভব করে—যেন হঠাৎ করে বাতাস একটু ভারী হয়ে গেছে, নিঃশ্বাস নিতে গেলে বুকের ভেতর অচেনা একটা চাপ পড়ে। মানুষজন ঠিক আগের মতোই চলাফেরা করছে, চায়ের দোকানে আড্ডা দিচ্ছে, হাসছে, গল্প করছে, কিন্তু সেই হাসির ভেতরেও একটা ফাঁক থেকে যাচ্ছে, একটা থেমে যাওয়া মুহূর্ত, যেখানে শব্দ নেই—শুধু অনুভূতি। এই অনুভূতিটা কেউ নাম দিতে পারছে না, তবুও সেটা আছে, এবং দিন যত যাচ্ছে, ততই সেটা গভীর হচ্ছে। বাপ্পি এই অদৃশ্য অনুভূতিটাকেই গড়ে তুলছিল, যেন একজন চিত্রশিল্পী ধীরে ধীরে একটা ছবি আঁকে—প্রথমে হালকা রেখা, তারপর রঙ, তারপর ছায়া—আর শেষে এমন একটা দৃশ্য তৈরি হয়, যেটা দেখে মানুষ থমকে যায়, কিন্তু বুঝতে পারে না কেন। সে আর আগের মতো তাড়াহুড়া করে না, তার চোখে আর সেই বেপরোয়া আগুন নেই—এখন সেখানে আছে হিসেব, ঠান্ডা, ধীর, এবং খুব নির্ভুল। সে জানে কোথায় আঘাত করতে হয়, কখন করতে হয়, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—কীভাবে এমনভাবে করতে হয়, যেন কেউ বুঝতেই না পারে। রকির সাম্রাজ্যটা বাইরে থেকে যতটা শক্ত মনে হয়, ভেতরে সেটা ততটাই ভঙ্গুর—যেন একটা সুন্দর শরীর, যেটার চামড়া মসৃণ, আকর্ষণীয়, কিন্তু ভেতরে কোথাও কোথাও জমে আছে ক্লান্তি, জমে আছে ক্ষত। বাপ্পি সেই ক্ষতগুলো খুঁজে বের করছিল, খুব সাবধানে, যেন আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে দেখছে—কোথায় চাপ দিলে মানুষ কেঁপে ওঠে। একটা দোকান হঠাৎ করে টাকা দিতে চায় না, একটা লোক হঠাৎ করে গা ঢাকা দেয়, একটা এলাকায় হঠাৎ করে পুলিশ দেখা যায়—সবকিছু যেন আলাদা আলাদা ঘটনা, কিন্তু আসলে সবকিছু একটা সুতোয় বাঁধা, আর সেই সুতোটা কার হাতে আছে—সেটা কেউ দেখতে পাচ্ছে না। এই না-দেখাটাই ভয়ঙ্কর, কারণ মানুষ যেটা দেখতে পায় না, সেটাকেই সবচেয়ে বেশি ভয় পায়। বাপ্পি এই ভয়টাকেই নিজের অস্ত্র বানাচ্ছিল, ধীরে ধীরে, নিশ্চিতভাবে, যেন সে জানে—শেষটা তার দিকেই যাবে। রকির লোক সুমন ছিল এমন একজন, যার উপস্থিতি আলাদা করে বোঝা যেত—তার হাঁটার ভঙ্গি, তার কথা বলার ধরন, তার হাসি—সবকিছুতেই একটা আত্মবিশ্বাস ছিল, যেন সে নিজেই নিজের ছায়াকে ভয় পায় না। সে যখন রাতে টাকা তুলতে বের হতো, তখন পাড়ার বাতাস একটু বদলে যেত—দোকানদাররা চোখ নামিয়ে ফেলত, কেউ কেউ ব্যস্ত হয়ে যেত, যেন হঠাৎ করে খুব জরুরি কিছু মনে পড়ে গেছে। সুমনের একটা অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল—সে একই সঙ্গে ভয় দেখাতে পারত, আবার হাসতেও পারত, আর এই দুইয়ের মাঝামাঝি কোথাও সে মানুষকে আটকে রাখত। কিন্তু সেই মানুষটাই এক রাতে আর ফিরল না—কোনো শব্দ নেই, কোনো চিৎকার নেই, শুধু হঠাৎ করে তার না-থাকা। প্রথমে কেউ খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি, কারণ এই লাইনের মানুষজন মাঝে মাঝেই হারিয়ে যায়, আবার ফিরে আসে। কিন্তু যখন পরদিন সকালে তার ফোনটা ড্রেনের পাশে পাওয়া গেল, স্ক্রিন ভাঙা, সিম উধাও—তখন একটা ঠান্ডা শূন্যতা ছড়িয়ে পড়ল। এই ঘটনাটা আর সাধারণ রইল না, এটা হয়ে গেল একটা বার্তা। কেউ জোরে কিছু বলল না, কিন্তু খুব আস্তে একটা নাম উচ্চারণ করা হলো—“বাপ্পি…” এই নামটা বলার সময় মানুষ চারপাশে তাকায়, যেন শব্দটাই বিপদ ডেকে আনতে পারে। এই ভয়টা সরাসরি না, এটা শরীরের খুব কাছে এসে দাঁড়ানো ভয়—যেটা সরাতে ইচ্ছে করে, কিন্তু সাহস হয় না। কেউ প্রমাণ দিতে পারবে না, কেউ নিশ্চিত না, কিন্তু সবার ভেতরে একটা বিশ্বাস তৈরি হয়ে গেল—এটা কাকতালীয় না। এই অদৃশ্য আঘাত মানুষকে সবচেয়ে বেশি ভাঙে, কারণ তারা বুঝতে পারে—যে মারছে, সে সামনে আসছে না। আর এই অদৃশ্য শত্রুর সাথে লড়াই করা মানে নিজের ছায়ার সাথে লড়াই করা—যেখানে প্রতিটা আঘাতের উৎস অজানা। সুমনের না-ফেরাটা শুধু একজন মানুষের হারিয়ে যাওয়া না, এটা একটা সূচনা—একটা পরিবর্তনের, যেটা আর থামবে না। রকি প্রথমে এই পরিবর্তনটাকে অস্বীকার করেছিল, কারণ সে অভ্যস্ত ছিল সরাসরি লড়াইয়ে—যেখানে প্রতিপক্ষ সামনে দাঁড়ায়, চোখে চোখ রাখে, কথা বলে। কিন্তু এখানে কেউ সামনে আসছে না, শুধু তার চারপাশটা ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের দিকে তাকায়—তার চোখে এখনো সেই আগের শক্তি আছে, কিন্তু ভেতরে কোথাও একটা অস্বস্তি ঢুকে গেছে, যেটা সে চেনে না। সে হিসাবের খাতা খুলে বসে, প্রতিটা সংখ্যা দেখে, আর হঠাৎ করে তার আঙুল থেমে যায়—সংখ্যা মিলে না। এই না-মেলা সংখ্যার ভেতরেই লুকিয়ে আছে একটা সত্যি, যেটা সে এড়িয়ে যেতে পারবে না। সে আবার হিসাব করে, আবার দেখে, কিন্তু ভুল নেই—মানে সমস্যা আছে। তার বুকের ভেতরটা ধীরে ধীরে ভারী হয়ে ওঠে, কিন্তু বাইরে থেকে সে শান্ত থাকে, কারণ সে জানে—তার কাজই হচ্ছে নিজের ভয়কে লুকিয়ে রাখা। “বাপ্পি…” নামটা সে আস্তে করে বলে, যেন সে নিজের সাথে কথা বলছে। তার ঠোঁটের কোণায় একটা হাসি আসে, কিন্তু সেই হাসির ভেতরে একটা ক্লান্তি আছে, একটা চাপা ভয়ও আছে—যেটা সে কাউকে দেখাবে না। সে জানে—এই খেলাটা আগের মতো না, এখানে ভুল করার সুযোগ নেই। তার মাথার ভেতর দ্রুত হিসাব চলতে থাকে—কে, কেন, কীভাবে—আর শেষে একটা নামেই এসে থামে। সে বুঝতে পারে—এটা কোনো এলোমেলো ঘটনা না, এটা পরিকল্পনা। আর এই পরিকল্পনার পেছনে যে আছে, সে এখন আর আগের মতো আবেগ দিয়ে চলে না—সে হিসাব দিয়ে চলে। রকি এই উপলব্ধিটা অনুভব করে, কিন্তু সেটা মেনে নিতে তার কষ্ট হয়। কারণ এর মানে—তার সামনে এমন একজন দাঁড়িয়ে আছে, যে তাকে ভেতর থেকে ভাঙতে জানে। অন্যদিকে বাপ্পি বসে আছে একটা ছোট, অন্ধকার ঘরে, যেখানে আলোটা নরম, একটু কাঁপা কাঁপা—যেন বাতাসের সামান্য নড়াচড়ায়ও সেটা বদলে যায়। তার সামনে টেবিলে ছড়িয়ে আছে কিছু কাগজ—প্রতিটা কাগজে নাম, জায়গা, সময়—সবকিছু এত নিখুঁতভাবে সাজানো যে, সেটা দেখে বোঝা যায়—এটা কোনো হঠাৎ করা কাজ না, এটা দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি। সে প্রতিটা নামের দিকে তাকায়, যেন সেই নামের ভেতর ঢুকে পড়তে চাইছে, বুঝতে চাইছে—কার দুর্বলতা কোথায়। তার আঙুল ধীরে ধীরে একটা নামের ওপর থামে—“রকি।” সে নামটার ওপর একটু চাপ দেয়, যেন এই চাপের ভেতরেই কোনো সিদ্ধান্ত লুকানো আছে। তার মুখে কোনো রাগ নেই, কোনো উত্তেজনা নেই—শুধু একটা স্থিরতা, যেটা ভাঙা কঠিন। বাইরে কুকুর ডাকে, দূরে কোথাও একটা দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ আসে, কিন্তু সে নড়ে না। তার শ্বাস ধীর, তার চোখ স্থির, যেন সে অনেক দূরের কিছু দেখছে। মাঝে মাঝে সে পকেট থেকে একটা পুরনো কয়েন বের করে, আঙুলের মধ্যে ঘোরায়—এই ছোট্ট অভ্যাসটাই তাকে ধরে রাখে, তাকে মনে করিয়ে দেয়—সে এখনো মানুষ। এই মানুষটাকে ধরে রাখাটাই তার জন্য সবচেয়ে কঠিন, কারণ সে জানে—এই পথে যত এগোবে, ততই সে নিজেকে হারাবে। তবুও সে থামে না, কারণ তার কাছে ফিরে যাওয়ার পথ নেই। তার ভেতরে একটা অনুভূতি কাজ করছে—শেষ করার, সবকিছু শেষ করার। আর এই অনুভূতিটা এতটাই গভীর যে, সেটা তাকে আর অন্য কিছু ভাবতে দেয় না। মমতা দোকানে বসে থাকে, তার চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ, তবুও তার ভেতরে একটা অদ্ভুত কোমলতা আছে—যেটা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে। বাপ্পি যখন দোকানে ঢোকে, তাদের চোখে চোখ পড়ে, আর সেই দৃষ্টির ভেতরে অনেক কথা ভাসতে থাকে—যেগুলো তারা কখনো বলেনি, হয়তো বলবেও না। মমতার হাত কাপে চা ঢালতে ঢালতে একটু কাঁপে, কিন্তু সে সেটা সামলে নেয়—কারণ সে জানে, এই কাঁপুনি দেখালে বাপ্পি কিছু বুঝে যাবে। “তুই কি করতেছিস?”—তার প্রশ্নটা খুব আস্তে, কিন্তু তাতে একটা স্পর্শ আছে, যেন সে বাপ্পির খুব কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। বাপ্পি তাকায়, তার চোখে এক মুহূর্তের জন্য নরম কিছু আসে, যেটা সে খুব দ্রুত লুকিয়ে ফেলে। “কিছু না”—সে বলে, কিন্তু এই মিথ্যাটা এতটাই পরিষ্কার যে, সত্য বললেও এর চেয়ে বেশি পরিষ্কার হতো না। মমতা কাপটা এগিয়ে দেয়, আর তাদের আঙুল এক মুহূর্তের জন্য ছুঁয়ে যায়—একটা ছোট স্পর্শ, কিন্তু তার ভেতরে অদ্ভুত একটা উষ্ণতা আছে, যেটা দুজনেই অনুভব করে, কিন্তু কেউ কিছু বলে না। “আমারে মিথ্যা বলিস না”—তার গলায় অনুরোধ, আর সেই অনুরোধের ভেতরে একটা অদ্ভুত ভালোবাসা লুকানো, যেটা কখনো পুরোপুরি প্রকাশ পায়নি। বাপ্পি কিছুক্ষণ চুপ থাকে, তারপর খুব ধীরে বলে—“সব শেষ না করলে কিছুই শেষ হয় না।” এই কথাটা শুধু যুক্তি না, এটা তার বিশ্বাস, তার পথ। মমতা তাকিয়ে থাকে, তার চোখে পানি জমে, কিন্তু সে সেটা ফেলে না—কারণ কিছু কষ্ট আছে, যেগুলো দেখালে ছোট হয়ে যায়। “শান্তিতে থাকতে পারিস না?”—সে জিজ্ঞেস করে, আর এই প্রশ্নটা যেন তার নিজের জন্যও। বাপ্পি হালকা হাসে, একটু কাছে এসে দাঁড়ায়, এতটাই কাছে যে তাদের শ্বাস একে অপরকে ছুঁয়ে যায়—“শান্তি কই?” তার কণ্ঠ নরম, কিন্তু তার ভেতরে একটা ভাঙা সত্যি লুকিয়ে আছে। এই মুহূর্তটা থেমে থাকে, একটু বেশি সময় ধরে, যেন তারা দুজনেই জানে—এটা এমন কিছু, যেটা তারা কখনো পুরোপুরি পাবে না। এইসব ঘটনার ভেতর দিয়ে পাড়ার মানুষ ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছিল, যদিও তারা নিজেরা সেটা বুঝতে পারছিল না। আগে যেখানে তারা নির্দ্বিধায় কথা বলত, এখন সেখানে একটু থামে, চারপাশে তাকায়, তারপর বলে। আগে যেখানে হাসি সহজ ছিল, এখন সেখানে একটা চাপা ভাব আছে—যেন কেউ দেখছে। এই দেখা না-যাওয়া উপস্থিতিটাই তাদের ভেতরে একটা অদ্ভুত উত্তেজনা তৈরি করছে, যেটা একই সঙ্গে ভয় আর আকর্ষণ—যেন অন্ধকার ঘরে দাঁড়িয়ে থাকা, যেখানে কিছু দেখা যায় না, কিন্তু অনুভব করা যায়। এই অনুভূতিটা মানুষের ভেতরে ঢুকে যায়, ধীরে ধীরে, এবং একসময় সেটা তাদের আচরণ বদলে দেয়। বাপ্পি এই পরিবর্তনটাকেই চাইছিল, কারণ সে জানে—মানুষকে বাইরে থেকে ভাঙা কঠিন, ভেতর থেকে ভাঙা সহজ। আর সে এই ভেতরের ভাঙাটাই তৈরি করছিল, খুব ধীরে, খুব নিখুঁতভাবে। রকি এখনো লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত, কিন্তু সে বুঝতে পারছে—এই লড়াইটা অন্যরকম, এখানে শক্তির চেয়ে বেশি দরকার ধৈর্য। আর বাপ্পির কাছে সেই ধৈর্য আছে, সেই অপেক্ষা করার ক্ষমতা আছে। এই দুই মানুষের মধ্যে এখন যে খেলা চলছে, সেটা শুধু দখলের না—এটা বেঁচে থাকার, অস্তিত্বের। আর এই খেলায় যে হারবে, সে শুধু জায়গা হারাবে না—সে নিজেকেও হারাবে। অন্যদিকে, শিউলি এখনো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখে একটা হাসি আছে, কিন্তু সেটা যেন বহুদিন ধরে পরা কোনো পোশাক—যেটা গরম লাগলেও খুলে ফেলা যায় না। ভেতর থেকে উঠে আসা কোনো আনন্দ নয়, বরং সমাজের সামনে ঠিক থাকার জন্য শেখা একটা অভ্যাস। আয়নার কাচে নিজের প্রতিফলন দেখে তার মাঝে মাঝে মনে হয়, সে যেন নিজেকেই পুরোপুরি চেনে না। পেছনে সাইফ ব্যস্ত, টেবিলে ছড়ানো কাগজপত্র গুছাচ্ছে, মাঝে মাঝে ফোনে কারও সাথে খুব ছোট, খুব প্রয়োজনীয় কথাবার্তা বলছে। কিন্তু সেই কথাগুলোর ভেতরেও কোথাও একটা দূরত্ব লুকিয়ে আছে—যেন দুজন মানুষ একই ঘরে থাকে, অথচ তাদের চিন্তা দুই আলাদা শহরের রাস্তায় হাঁটে। শিউলি কখনো কখনো চায় কিছু জিজ্ঞেস করতে, কিন্তু শব্দগুলো গলায় আটকে যায়। সে শুধু দাঁড়িয়ে থাকে, নিজের হাসিটাকে আবার ঠিক করে নেয়, যেন সেটাই সবচেয়ে নিরাপদ কাজ। হঠাৎ সাইফের ফোনে একটা মেসেজ আসে। অচেনা নম্বর থেকে। লেখা—“আজকে তুমি আসবে তো? এটা আরিবার জন্মদিন…” সাইফ কয়েক সেকেন্ড থমকে থাকে। আঙুলটা স্ক্রিনের ওপরেই স্থির হয়ে যায়, যেন মস্তিষ্ক বুঝতে পারছে না এই তথ্যটা কোথায় রাখবে। আরিবা—একটা নাম, যেটা তার জীবনের এক পুরনো অধ্যায়ে কোথাও ছিল, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে হারিয়ে গেছে। স্মৃতির ধুলো জমে গেছে সেই নামের ওপর। কিন্তু আজ হঠাৎ সেই নাম আবার আলো জ্বালিয়ে ফিরে এসেছে। সে কিছু না বলে ফোনটা নামিয়ে রাখে, কিন্তু পরের মুহূর্তেই আরেকটা মেসেজ আসে। এবার নাম দেখা যায়—আদিরা। আদিরা আরিবার ছোট বোন। সাইফ তাকে সবসময়ই খুব সাধারণভাবে দেখেছে—একটা শান্ত, ভদ্র, একটু লাজুক মেয়ে, যে বড়দের কথার মাঝখানে খুব একটা আসে না। সে কখনো ভাবেনি, আদিরা আলাদা কোনো উপস্থিতি বহন করতে পারে। কিন্তু মেসেজটা এইবার অন্যরকম। সেখানে কোনো নাটক নেই, কোনো জোর নেই—শুধু একটা নরম অনুরোধ, যেন অনেক কষ্ট করে লেখা—“তুমি কি আসবে? সবাই থাকবে…” এই বাক্যটা পড়তে পড়তে সাইফের বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা চাপ তৈরি হয়, যেটা সে ঠিক বুঝতে পারে না। এটা দুঃখ না, আবার আনন্দও না—একটা অজানা টান, যেটা মানুষকে অস্থির করে তোলে। সে জানে না, আদিরার এই সহজ প্রশ্নের ভেতরে কতটা অনুচ্চারিত অনুভূতি লুকানো আছে। বহুদিন ধরে আদিরা এই মানুষটার দিকে তাকিয়ে আছে, কিন্তু কখনো সরাসরি কিছু বলেনি। সে নিজের অনুভূতিকে শব্দে পরিণত করতে শেখেনি। শুধু ছোট ছোট মুহূর্তে থেকে গেছে—একটা হাসি, একটা দৃষ্টি, একটু বেশি সময় ধরে কথা বলার চেষ্টা, অথবা কোনো অজুহাতে তার সামনে এসে দাঁড়ানো। এগুলোকে সাইফ কখনো গুরুত্ব দেয়নি। তার কাছে আদিরা শুধু আরিবার ছোট বোন, যেটা একটা পরিচয়ের সীমা শেষ করে দেয়। কিন্তু আদিরার কাছে সেই সীমাটা কখনো ছিল না। তার ভেতরে সাইফ অনেক আগেই একটা আলাদা জায়গা দখল করে ফেলেছে, যেখানে সে প্রতিদিন নীরবে অপেক্ষা করে। সাইফ ফোনটা টেবিলে রেখে দেয়। বুকের ভেতর অস্থিরতা বাড়তে থাকে, কিন্তু সে সেটাকে নাম দিতে পারে না। সে উঠে দাঁড়ায়, জানালার দিকে যায়, বাইরে তাকায়। শহরের আলো নিভে আসছে ধীরে ধীরে, কিন্তু তার ভেতরের চিন্তাগুলো আরো জেগে উঠছে। সে নিজেকে প্রশ্ন করে—সে যাবে কি না? কিন্তু এই প্রশ্নের কোনো পরিষ্কার উত্তর আসে না। কারণ এই আমন্ত্রণটা শুধু একটা জন্মদিনের ডাক না, এটা যেন কোনো অদৃশ্য সম্পর্কের দরজা খুলে দেওয়ার চেষ্টা, যেটা সে কখনো খেয়ালই করেনি। রাত গভীর হলে শিউলি ঘুমিয়ে পড়ে। সাইফ তখন আবার ফোনটা হাতে নেয়। স্ক্রিনের আলো অন্ধকার ঘরে একমাত্র জেগে থাকা জিনিস। সে আবার মেসেজটা পড়ে—“আরিবার জন্মদিন…” শব্দগুলো এবার আরো ভারী লাগে, যেন প্রত্যেকটা শব্দে আলাদা করে কিছু স্মৃতি আটকে আছে। সে জানে না, এই জন্মদিনে যাওয়া মানে কী হবে—পুরনো সম্পর্কগুলো আবার জেগে উঠবে কি না, বা নতুন কোনো জটিলতা তৈরি হবে কি না। কিন্তু তার ভেতরে একটা অদ্ভুত কৌতূহল কাজ করে—যেন কিছু অসমাপ্ত কথা আছে, যেগুলো একসময় না একসময় মুখে আসতেই হবে। অন্যদিকে নীলা এখন বসে আছে তার ঘরে। দরজা বন্ধ, জানালার পর্দা অর্ধেক টানা, বাইরে থেকে আসা আলো মেঝেতে কেটে কেটে পড়ছে, যেন কোনো ভাঙা গল্প। তার সামনে খোলা একটা পুরনো ডায়েরি। পাতাগুলো হলদে হয়ে গেছে, তবুও শব্দগুলো এখনো তীক্ষ্ণ। সে অনেকক্ষণ ধরে একটা পাতার দিকে তাকিয়ে আছে, কিন্তু আসলে সে পড়ছে না—সে ভেতর থেকে ভেঙে পড়ছে ধীরে ধীরে, নীরবে। লেখাটা তার বাবার। এতদিন সে বাবাকে শুধু কঠোর, রাগী, নিয়ন্ত্রণপ্রিয় মানুষ হিসেবে চিনেছে। এমন একজন মানুষ, যে সবকিছু নিজের মতো করে চায়, যে আবেগ দেখায় না, যে সবসময় দূরে থাকে। কিন্তু এই ডায়েরিতে সে এক অন্য মানুষকে দেখতে পাচ্ছে—যে ভয় পায়, যে সন্দেহ করে, যে নিজের সিদ্ধান্ত নিয়েও দ্বিধায় থাকে। এই পরিবর্তনটা নীলার জন্য সহজ নয়। কারণ মানুষ যাকে পুরোপুরি একরকম ভেবে বড় হয়, তাকে হঠাৎ অন্যভাবে দেখা গেলে ভিতরের পৃথিবী কেঁপে ওঠে। সে একটা লাইন পড়ে—“রাফি খারাপ ছেলে না… কিন্তু আমি ওকে বিশ্বাস করতে পারি না…” নীলার হাত কেঁপে ওঠে। সে ডায়েরিটা আরও শক্ত করে ধরে, যেন না ধরলে কিছু ভেঙে যাবে। তার বুকের ভেতর একটা চাপা ভয় জন্ম নেয়। সে পড়ে যায় পরের লাইনগুলোতে—“ওই দিন আমি রকি আর রাফিকে একসাথে দেখেছিলাম…” রকি—এই নামটা তার জীবনে শুধু ভয় আর গল্প হিসেবে ছিল। পাড়ার ছায়াময় চরিত্র, যার কথা শুনলেই মানুষ নিচু গলায় কথা বলত। কিন্তু রাফি আর রকি একসাথে—এই সম্পর্কটা নীলার কল্পনার বাইরে ছিল। সে পাতা উল্টায়। আরেকটা বাক্য—“ওদের দেখা ছিল নিয়মিত… আমি নিশ্চিত ছিলাম না, কিন্তু কিছু একটা ঠিক ছিল না…” নীলার শ্বাস একটু ভারী হয়ে আসে। তার মাথায় রাফির মুখ ভেসে ওঠে—তার হাসি, তার শান্ত ব্যবহার, তার স্বাভাবিক কথা বলার ভঙ্গি। সে সবসময় ভেবেছিল রাফি খুব সাধারণ একজন ছেলে, হয়তো একটু শান্ত, একটু আলাদা, কিন্তু খারাপ কিছু নেই। কিন্তু এখন এই লেখাগুলো সেই ধারণার ভিত কাঁপিয়ে দিচ্ছে। আরেকটা লাইন—“আমি ভেবেছিলাম এটা শুধু বন্ধুত্ব… কিন্তু রকি যেভাবে ওকে টেনে নিচ্ছিল, সেটা বন্ধুত্ব না…” এই বাক্যটা পড়ার পর নীলার মাথা একটু ঘুরে যায়। তার বাবার নিষেধ, তার রাগ, তার কঠোরতা—সবকিছুর ভেতর হঠাৎ করে নতুন অর্থ জন্ম নেয়। সে এতদিন ভাবত এগুলো শুধু জেদ, কন্ট্রোল করার চেষ্টা। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, সেখানে ভয় ছিল, অভিজ্ঞতা ছিল, আর এমন কিছু দেখা ছিল যেটা সে কখনো বলেনি। নীলা চুপ করে বসে থাকে। তার চোখে পানি জমে, কিন্তু সে কাঁদে না। সে শুধু স্থির থাকে, যেন তার ভেতরের পৃথিবী একসাথে অনেক জায়গায় ভেঙে যাচ্ছে, আর সে কিছুই করতে পারছে না। সে বুঝতে শুরু করে—রাফির জীবনটা সে যেমন ভেবেছিল, তেমন ছিল না। কোথাও না কোথাও রকি আর রাফির মধ্যে একটা অন্ধকার সংযোগ ছিল, যেটা তার বাবা আগে থেকেই টের পেয়েছিল। আর সেই কারণেই তার বাবা রাফিকে বিশ্বাস করতে পারেনি। বাইরের শহরে শিউলি এখনো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু এবার তার হাসি নেই। শুধু একটা ক্লান্ত মুখ। সাইফ অন্য ঘরে বসে আছে, ফোন হাতে, সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। আর আদিরা—একটা অদৃশ্য অপেক্ষার মধ্যে—তার মেসেজের দিকে তাকিয়ে আছে, উত্তর আসার অপেক্ষায়। আর নীলা ধীরে ধীরে ডায়েরিটা বন্ধ করে দেয়। কিন্তু সত্য কি বন্ধ হয়? না। সেটা শুধু আরও গভীরে ঢুকে যায় মানুষের ভেতরে, নীরবে, ধীরে, এবং স্থায়ীভাবে। (চলবে...)
Parent