আমার মা রানী চন্দ্রাবতী - অধ্যায় ৩

🔗 Original Chapter Link: https://xossipy.com/thread-73543-post-6198960.html#pid6198960

🕰️ Posted on Fri May 01 2026 by ✍️ Mr. X2002 (Profile)

🏷️ Tags:
📖 1149 words / 5 min read

Parent
পর্ব ৩ পরদিন ভোর। সারা রাত মা আমাকে আর লক্ষীবতীকে বুকে নিয়ে শুয়েছিলেন। ঘুমের মধ্যেও তাঁর হাত আমার পিঠে শক্ত হয়ে ছিল। যেন কোনো অদৃশ্য শত্রুর হাত থেকে আগলে রেখেছেন। হঠাৎ দরজায় করাঘাত। দাইমার কণ্ঠে আতঙ্ক। “রানী, রানী! শিগগির উঠুন। রাজ্যে সর্বনাশ ঘনিয়ে এসেছে!” মা বিদ্যুৎবেগে উঠে বসলেন। দ্বার খুলতেই দেখলেন, দাইমার মুখ শুকিয়ে কাঠ। চোখে মৃত্যুভয়। দাইমা হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, “রানী, ওরা এসে গেছে। অন্ধকার বাহিনী আমাদের সীমান্তে হানা দিয়েছে।” মায়ের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। “কী বলছ তুমি?” “সত্যি বলছি, রানীমা। উপকূলের গ্রাম জ্বলছে। আপনি এখনই সন্তানদের নিয়ে মহলের পেছনের সুড়ঙ্গপথে লুকিয়ে পড়ুন। মহারাজ ফিরে এলে আমরা আবার রাজসভায় ফিরব।” মা এক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন। তারপর যে স্বরে কথা বললেন, তাতে ঘরের বাতাস পর্যন্ত জমে গেল। “আমি পালাব না। আমার তলোয়ার দাও। আমি লড়ব।” “কিন্তু রানী…” দাইমা কেঁদে ফেললেন। “ওরা তো মানুষ নয়। ওরা নরপশু।” “আমার আদেশ শেষ।” মায়ের কণ্ঠে বজ্রপাত। “এখনই আমার বর্ম আর খড়্গ নিয়ে এসো।” আমি স্তব্ধ হয়ে শুনছিলাম। অন্ধকার বাহিনী… ছোটবেলা থেকে দাদুর কাছে গল্প শুনেছি ওদের নিয়ে। অন্ধকার বাহিনী — বঙ্গোপসাগরের অতল জল থেকে উঠে আসা অভিশাপ। জেলেরা বলে, ওরা মানুষ নয়। ওরা সমুদ্রের কোনো প্রাচীন পাপের ফসল। ওদের দেহ অস্বাভাবিক লম্বা, হাড়-জিরজিরে। গায়ের রং এমন ঘন কালো যে অমাবস্যার রাতও হার মানে। আলো যেন ওদের গা ছুঁতে ভয় পায়। চোখ দুটো কখনও মরা মাছের মতো সাদা, কখনও আবার জ্বলন্ত কয়লার মতো লাল। রাতের বেলায় ওই চোখই আগে দেখা যায়। শরীরে কোনো বর্ম নেই। কোমরে শুধু সামুদ্রিক লতা বা পশুর চামড়া জড়ানো। সারা গায়ে অদ্ভুত সব উল্কি — কাটা দাগ, পোড়া চিহ্ন। যেন প্রতিটা দাগ একেকটা যুদ্ধের স্মৃতি, অথবা কোনো নিষিদ্ধ যজ্ঞের প্রমাণ। আর ওদের অস্ত্র… ওটা তলোয়ার নয়। বিশাল এক নিরানির মতো, কিন্তু মানুষের সমান লম্বা। দুই ধার ক্ষুরের চেয়েও ধারালো, আগাটা ঈষৎ বাঁকা। এক কোপে হাড়-মাংস আলাদা করে দেয়। ওই অস্ত্র দিয়ে ওরা শুধু কোপায় না — শত্রুকে টেনে আনে, ছিঁড়ে ফেলে। জলের তলায়ও ওটা সমান ভয়ঙ্কর। কারণ জলই ওদের ঘর। আমি মায়ের মুখের দিকে তাকালাম। রানী চন্দ্রাবতী। খুলনার ভুঁইয়া-কন্যা। যিনি বর্গির তলোয়ার রুখে দিয়েছেন। কিন্তু এবার শত্রু তো মানুষ নয়। সমুদ্রের অভিশাপের সাথে মা কীভাবে লড়বেন? মা বর্ম পরে নিলেন। কোমরে বাঁধলেন পিতৃদত্ত খড়্গ। আমাকে আর লক্ষীবতীকে দাইমার জিম্মায় রেখে তিনি একাই রাজসভার দিকে পা বাড়ালেন। পেছন ফিরে তাকালেন না। রানী চন্দ্রাবতী যখন যুদ্ধে যান, তখন তিনি আর কারও মা থাকেন না। তিনি শুধুই রণচণ্ডী। রাজসভার দ্বার ঠেলে মা ভেতরে ঢুকলেন। সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত কোলাহল থেমে গেল। সভা জুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসে আছে ওরা — অন্ধকার বাহিনীর সৈন্যরা। কালো, লম্বা, হাড়-বেরোনো শরীর। চোখগুলো মরা মাছের মতো সাদা। সবাই একসাথে মায়ের দিকে ফিরে তাকাল। এমন নারী ওরা জীবনে দেখেনি। বর্মের উপরেও মায়ের রূপের দীপ্তি ঠেকানো যাচ্ছে না। মা ধীর পায়ে সিংহাসনের দিকে এগোলেন। সেখানে বসে আছে ওদের সেনাপতি। কদাকার চেহারা। স্বাভাবিক মানুষের চেয়ে দেড় গুণ লম্বা। হলদে, শ্বদন্তের মতো দাঁত। হাতে একটা আধখাওয়া মুরগির রান। চর্বি গড়িয়ে পড়ছে আঙুল বেয়ে। মা সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। কণ্ঠে বজ্র। “তুমি কে? এই সিংহাসনে বসার স্পর্ধা কোথায় পেলে? কী চাও তুমি?” লোকটা খাওয়া থামিয়ে মায়ের দিকে তাকাল। অনেকক্ষণ চেয়ে রইল। তার লালচে চোখে লোভ, বিস্ময়, আর এক ধরনের পাশবিক ক্ষুধা খেলা করছে। এমন রূপ, এমন তেজ — সে হয়তো সাত সমুদ্রেও দেখেনি। সে কিছু একটা বলল। ভাষাটা গরগর শব্দের মতো, মানুষের জিভে আসে না। মা বুঝতে পারলেন না। তখনই পাশ থেকে একজন এগিয়ে এল। দেখতে বাঙালির মতো। পরনে বাঙালির পোশাক। সে-ই দোভাষী। কাঁপা গলায় সে অনুবাদ করল, “উনি বলছেন… উনি সাগরদ্বীপের সন্দীপ রাজ্যের সেনাপ্রধান। নাম মহাশূল। ওঁর ভাই সেখানকার রাজা। রাজা কথা দিয়েছেন, যদি উনি মেদিনীপুর জয় করতে পারেন, তবে রাজ্যের সবচেয়ে সুন্দরী নারীর সঙ্গে ওঁর বিবাহ দেবেন।” মায়ের ভ্রু কুঁচকে গেল। ঘৃণায় ঠোঁট বেঁকে গেল। “শুধু একটা নারীর লোভে তুমি আমার রাজ্য রক্তে ভাসিয়ে দিলে? এতগুলো প্রাণ নিলে?” দোভাষী আবার অনুবাদ করতে গিয়ে থমকে গেল। মহাশূল তার দিকে আগুন-চোখে তাকাল। সে ভয়ে ঢোঁক গিলে বলতে বাধ্য হলো, “সেনাপ্রধান বলছেন… কেন করব না? শুধু মেদিনীপুর কেন, তোমার মত নারী হলে ত জন্য আমি সারা দুনিয়া জয় করতে পারি।” কথাটা শুনেই মায়ের চোখে আগুন জ্বলে উঠল। খড়্গের বাঁট শক্ত করে চেপে ধরলেন। গর্জে উঠলেন, “তুই নরকের কীট! বাঙালি নারীর তেজের আগুনে তুই পুড়ে ছাই হবি। আমি তোকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান করছি। যদি হারিস, তবে এই মুহূর্তে তোর নরপশুর দল নিয়ে আমার রাজ্য ছেড়ে চলে যাবি।” মহাশূল হা-হা করে হেসে উঠল। সে হাসিতে রাজসভার দেওয়াল কেঁপে উঠল। “একটা নারীর সঙ্গে যুদ্ধ করা আমার জন্য লজ্জার। কিন্তু এই রাজ্যে যদি কোনো পুরুষ আমার সামনে দাঁড়ানোর সাহস না করে, তবে আর কী করার আছে? বেশ। আমি রাজি। তবে শর্ত একটাই। যদি আমি জিতি, তবে তোমাকে আমার সেবা করতে হবে। চিরকাল।” মায়ের চোয়াল পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেল। পিছিয়ে আসার আর কোনো পথ নেই। সমস্ত রাজসভা, সমস্ত প্রজার সম্মান আজ তাঁর খড়্গের ডগায় ঝুলছে। মা এক পা এগিয়ে এলেন। শান্ত, শীতল স্বরে বললেন, “তুমি কীভাবে এই রাজ্য থেকে বিদায় নেবে, সেই চিন্তা বরং এখন থেকে করো, মহাশূল।” রাজসভার মাঝখান খালি করে দেওয়া হলো। চারপাশে মশালের আলো কাঁপছে। প্রহরীরা, আমাত্যরা, দাসীরা — সবাই দেওয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে। মাঝখানে শুধু দুজন। একদিকে রানী চন্দ্রাবতী। পরনে ইস্পাতের বর্ম, মাথায় লৌহ শিরস্ত্রাণ। হাতে পিতৃদত্ত খড়্গ — যার ফলায় বর্গির রক্তের দাগ এখনও লেগে আছে। চোখে স্থির আগুন। অন্যদিকে মহাশূল। বিশাল দেহ, খালি গা। গায়ে কালো উল্কির জাল। হাতে তার সেই ভয়ংকর অস্ত্র — মানুষ-সমান লম্বা, দুদিকে ধার, আগাটা বাঁকানো নিরানি। ওটা তুলতেই বাতাস কেটে শিস দিয়ে উঠল। দোভাষী কাঁপতে কাঁপতে চিৎকার করল, “যুদ্ধ শুরু হোক!” বিদ্যুৎ চমকের মতো মা আক্রমণ করলেন। খড়্গ ঘুরল চক্রের মতো। মহাশূলের গলার কাছে ঝলসে উঠল ইস্পাত। সেনাপতি পিছিয়ে গেল এক পা। সভায় গুঞ্জন উঠল। মা থামলেন না। ডান, বাঁ, নিচ, উপর — চারদিক থেকে আঘাত হানলেন। তাঁর পায়ের কাজ দেখে বোঝা যায়, তিনি খুলনার ভুঁইয়া-কন্যা। শাস্ত্র আর শস্ত্র দুটোই তাঁর রক্তে। মহাশূল শুধু ঠেকিয়ে যাচ্ছে। তার নিরানির ভারী কোপ মায়ের ক্ষিপ্রতার কাছে পৌঁছাতেই পারছে না। একবার মায়ের খড়্গ মহাশূলের বাহু ছুঁয়ে গেল। কালো চামড়া কেটে ঘন, নীলচে রক্ত গড়িয়ে পড়ল। সভায় উল্লাস। এই প্রথম অন্ধকার বাহিনীর রক্ত দেখল মেদিনীপুর। মনে হলো, জয় শুধু সময়ের অপেক্ষা। রানীর তেজের কাছে সমুদ্রের দানবও হার মানবে। কিন্তু মহাশূল মানুষ নয়। ক্লান্তি তার ধাতে নেই। হঠাৎ সে কৌশল পাল্টাল। মায়ের খড়্গের কোপ সে আর ঠেকাল না। বরং নিজের বুক পেতে দিল। খড়্গ তার পাঁজরে লেগে ঝনঝন করে উঠল — যেন পাথরে আঘাত লেগেছে। সেই ফাঁকে তার বাঁ হাত বিদ্যুতের মতো ছুটে এল। বিশাল থাবায় মায়ের খড়্গ ধরা হাতটা চেপে ধরল। অমানুষিক শক্তি। মায়ের মুখ যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গেল। হাতের হাড় মটমট করে উঠল। তারপর মহাশূল তার নিরানি ঘোরাল। আঘাত করল না। নিরানির বাঁকানো আগা দিয়ে মায়ের বর্মের কাঁধের কাছটা আটকে টান মারল। ছিঁড়ে গেল। বর্মের বন্ধনী ছিঁড়ে মা এক ঝটকায় মাটিতে পড়ে গেলেন। খড়্গ হাত থেকে ছিটকে গেল দূরে। সভা স্তব্ধ। মহাশূল ধীরে ধীরে এগিয়ে এল। নিরানির ডগা মায়ের গলার কাছে নামিয়ে আনল। তার লাল চোখে বিজয়ের উল্লাস। ফিসফিস করে কী একটা বলল, যা কেউ বুঝল না। শুধু তার হলদে দাঁতের হাসিটা মশালের আলোয় চকচক করে উঠল। রানী চন্দ্রাবতী পরাজিত। মেদিনীপুরের সিংহাসনের সামনে, ভাঙা বর্মে, ধুলোয় লুটিয়ে পড়ে আছেন তিনি। চোখে জল নেই। শুধু আগুন। পরাজয়ের আগুন, অপমানের আগুন। আমি দাইমার হাত ছাড়িয়ে চিৎকার করে উঠতে গেলাম। দাইমা আমার মুখ চেপে ধরলেন। ফিসফিস করে বললেন, “চুপ, রাজকুমার। এখন চুপ। রানীমা বেঁচে আছেন, এটাই এখন সবচেয়ে বড় কথা।”
Parent