আমার মা রানী চন্দ্রাবতী - অধ্যায় ৫
পর্ব ৫
দুই সপ্তাহ কেটে গিয়েছিল। মেদিনিপুরের আকাশ যেন কালো মেঘে ঢেকে গিয়েছিল। অন্ধকার বাহিনীর নরপিশাচেরা রাজ্যের চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। গ্রামের পর গ্রাম লুট হচ্ছিল। কৃষকের পাকা ধানের খেত থেকে ধান কেটে নিয়ে যাচ্ছিল, জেলেদের নৌকা থেকে মাছ লুট করছিল, পালের ভেড়া-ছাগল কেড়ে নিয়ে যাচ্ছিল।
সবচেয়ে ভয়ংকর ছিল রাতের অন্ধকারে তাদের নারীদের উপর অত্যাচার। গ্রামের মা-বোনেরা আর নিরাপদ ছিল না। অনেক নরপিশাচ বাংলা ভাষা আয়ত্ত করে ফেলেছিল। তারা হাসতে হাসতে বলত, “রানী তো আমাদের সর্দারের শয্যাসঙ্গিনী হয়েছে, এবার তোমরাও আমাদের সেবা করো।”
অন্ধকার বাহিনীর নিয়ম অনুসারে, যে নারীর সঙ্গে তারা রাত কাটায়, তাকেই তারা স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করে। তাই এখন রানী চন্দ্রাবতীকে সবাই মহাশূলের স্ত্রী বলে সম্বোধন করছিল। আর কোনো নিয়ম তাদের ছিল না।
---
প্রাসাদের দরবারে প্রতিদিন প্রজারা আসত। তারা কাঁদতে কাঁদতে মায়ের পায়ের কাছে পড়ে যেত।
“রানী মা, আমাদের রক্ষা করুন।
ওরা আমার জমির ধান কেড়ে নিয়েছে।
ওরা আমার মেয়েকে... আমার মেয়েকে...
আমরা আর খেতে পাচ্ছি না। আমাদের বাঁচান।”
মা চুপ করে শুনতেন। তাঁর চোখে অসহায়তা। তিনি নিজেই বন্দি, নিজেই অত্যাচারের শিকার। প্রথম তিন দিন মহাশূল তাঁকে দিনে-রাতে শুধু যৌনাচারের জন্য ব্যবহার করেছিল। আমি বাইরের কক্ষ থেকে মায়ের কাতর চিৎকার শুনতাম। ভয়ে কাঁপতাম। ভাবতাম, মা কী করছে এতক্ষণ? কেন চিৎকার করছে?
কিন্তু মা চুপ করে সহ্য করেছিলেন। শুধু আমাদের দিকে তাকিয়ে চোখের জল ফেলতেন।
---
তারপর হঠাৎ একদিন আগুন জ্বলে উঠল।
রাজ্যের সাধারণ মানুষ আর সহ্য করতে পারেনি। কয়েকটা গ্রামের যুবকরা একত্রিত হয়ে বিদ্রোহ করল। তারা লাঠি, কুড়াল, কাস্তে নিয়ে অন্ধকার বাহিনীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। সেই বিদ্রোহ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল। এক রাতের মধ্যে সাধারণ মানুষ ১৫ জন বিশালদেহী নরপিশাচকে হত্যা করল। তাদের মাথা কেটে খুঁটিতে গেঁথে প্রাসাদের দিকে মিছিল করে এগিয়ে আসতে লাগল।
প্রাসাদের সামনের প্রাঙ্গণে দুই পক্ষ মুখোমুখি হয়ে দাঁড়াল।
একদিকে মা চন্দ্রাবতী — রানীর পোশাকে, মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে। তাঁর পেছনে শত শত ক্ষুব্ধ প্রজা।
অন্যদিকে মহাশূল — তার বিশাল শরীর নিয়ে, হাতে তলোয়ার, পেছনে বাকি অন্ধকার বাহিনী।
মা গর্জন করে বললেন,
“মহাশূল, আর এগোলে তোমাদের এই বাহিনী আর থাকবে না। তোমরা অনেক শক্তিশালী, কিন্তু আমাদের সংখ্যা অনেক বেশি। তোমরা মারা পড়বে।”
মহাশূল হাসল। তার গলা গমগম করে উঠল,
“আমরা এখানে রাজ্য দখল করতে এসেছি, রানী। চলে যাওয়ার জন্য আসিনি। তোমার লোকেরা কয়েকজনকে মেরেছে, কিন্তু আমরা এখনও অনেক।”
বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল। দুই পক্ষের মাঝে উত্তেজনা চরমে। যেকোনো মুহূর্তে রক্তপাত শুরু হতে পারত।
তখন একজন বৃদ্ধ প্রজা সামনে এগিয়ে এসে বলল,
“রানী মা, মহাশূল... একটা গোল টেবিলে বসে কথা বলুন। রক্ত ঝরিয়ে লাভ নেই। আলোচনা হোক।”
মা কিছুক্ষণ চুপ করে চিন্তা করলেন। তাঁর চোখে ক্লান্তি আর দায়িত্বের ভার। তারপর ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে সম্মতি দিলেন।
মহাশূলও রাজি হয়ে গেল।
প্রাসাদের বড় হলঘরে গোল টেবিল সাজানো হল। মা একপাশে বসলেন, মহাশূল অন্যপাশে। দুই পক্ষের প্রতিনিধিরা উপস্থিত। বাইরে প্রজারা অপেক্ষা করছিল। বাতাসে উত্তেজনা আর ভয়ের গন্ধ।
মা শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বললেন,
“এবার বলো, মহাশূল... তোমাদের শর্ত কী? আর আমরা কী দিতে পারলে তোমরা আমার প্রজাদের উপর অত্যাচার বন্ধ করবে?”