আমার মা রানী চন্দ্রাবতী - অধ্যায় ৬
পর্ব ৬
প্রাসাদের বড় হলঘরে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল। মশালের আলোয় ছায়া নাচছিল দেওয়ালে। গোল টেবিলের চারপাশে বসা সকলে নিঃশব্দ। বাইরে প্রজাদের ভিড়, তাদের অস্থির পায়ের শব্দ আর ফিসফাস ভেসে আসছিল। কেউ কেউ অস্ত্র শক্ত করে ধরে রেখেছিল। একটা ভুল কথায় যেকোনো মুহূর্তে রক্তগঙ্গা বয়ে যেতে পারত।
মহাশূল তার বিশাল শরীর নিয়ে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসেছিল। তার চোখে লোভ আর অহংকার। হঠাৎ সে গম্ভীর গলায় বলে উঠল:
“আমরা ছয় মাস এই অঞ্চল শাসন করব। যতদিন না তোমাদের রাজা দেবনারায়ণ যুদ্ধ থেকে ফিরে আসেন। এই ছয় মাস ধান আর গম আমরা বিনা মূল্যে নিয়ে যাব আমাদের অঞ্চলে। তার বিনিময়ে তোমাদের মাছ দেব। আর সবচেয়ে বড় কথা — এই ছয় মাস আমিই হব এখানকার রাজা।”
মহাশুল বুঝে যায়, রাজা বাদেই প্রজাদের সংখ্যা অনেক। এ কয়েকদিনে তাদের সৈন্য অনেক মারা গেছে, তাই তারা এমনিই দূর্বল হয়ে গেছে। ৬ মাস পর বাবা আসলে সেও পটল তুলতে পারে।
তাঁর কথা শেষ হতেই বীর কুমার উঠে দাঁড়ালেন। বয়স্ক, শুভ্র শ্মশ্রুবিশিষ্ট এই মানুষটি রাজা দেবনারায়ণের অন্যতম বিশ্বস্ত মন্ত্রী ছিলেন। যুদ্ধে যাওয়ার সময় গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীরা সবাই সঙ্গে গিয়েছিলেন, তাই তাঁকেই এই সভায় রাখা হয়েছিল।
“এটা কখনোই সম্ভব নয়!” বীর কুমারের কণ্ঠস্বর দৃঢ় ও কর্কশ, “তুমি এ অঞ্চলের রাজা হলে প্রজারা কখনো মেনে নেবে না। তারা জীবন দিতে রাজি, কিন্তু রাজা দেবনারায়ণের স্থলে অন্য কাউকে বসাতে দেবে না। তাদের আনুগত্য শুধু রাজা দেবনারায়ণের প্রতি।”
মহাশূল উচ্চস্বরে হেসে উঠল। ব্যঙ্গের সুরে বলল,
“তবে উপায় কী, ভেডা ম্হাতারা?”
ভেডা ম্হাতারা হলো তাদের ভাষা, যার অর্থ পাগল বুড়ো। মহাশুল বীর কুমারকে হেয় করতে এই গালি টা দিল।
হলঘরে একটা থমথমে নীরবতা নেমে এল। বীর কুমার কিছু বললেন না। তিনি শুধু রানী চন্দ্রাবতীর দিকে তাকালেন।
মা শান্ত কণ্ঠে বললেন, “বলুন মহাশয়।”
মা বীর কুমারকে শ্রদ্ধা করে, তিনি যখন এসেছিলেন তখন বীর কুমারের কাছ থেকে রাজ্যের নিয়ম নীতির পাঠ নিয়েছিলেন। মায়ের শ্রদ্ধেয় শিক্ষক।
বীর কুমার ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন,
“রাজকুমার ঈশানচন্দ্র রায়কে যুবরাজ ঘোষণা করা যেতে পারে। ছয় মাসের জন্য তিনিই হবেন রাজ্যের নামমাত্র শাসক। যেহেতু তিনি এখনও অপ্রাপ্তবয়স্ক, রানীমা তাঁর অভিভাবক হিসেবে প্রকৃত ক্ষমতা ধরে রাখবেন। আসল রাজা ফিরে এলে এই ব্যবস্থা স্বাভাবিকভাবেই শেষ হয়ে যাবে।”
মা বীর কুমারের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন। তাঁর চোখে প্রশ্ন ছিল — ‘আপনি কেন এদের বলছেন, এরা ছয়মাস এখানে থাকলে আমরা কেও নিরাপদ না।'
বীর কুমার মায়ের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললেন,
“রানী মা, আমার সংবাদদাতারা খবর এনেছে — ইংরেজদের সঙ্গে যুদ্ধ অন্তত ছয় মাস চলবে। রাজা মহাশয় এর আগে ফিরতে পারবেন না। কিন্তু পশ্চিম থেকে মারাঠারা দ্রুত এগিয়ে আসছে। মেদিনীপুরে তাদের ঠেকাতে এই নরপিশাচ বাহিনীর শক্তি আমাদের দরকার।”
মা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন।
মহাশূল অনেকক্ষণ চিন্তা করল। তার কপালে ভাঁজ পড়ল। যদি ঈশানকে যুবরাজ করা হয়, তাহলে প্রকৃত ক্ষমতা চলে যাবে রানীর হাতে। কিন্তু বাইরের শত্রু মারাঠাদের ভয়ও ছিল। অবশেষে সে বলল,
“আচ্ছা। তবে আমার একটা শর্ত আছে।”
মা শান্ত গলায় জিজ্ঞাসা করলেন, “কী শর্ত?”
মহাশূল একটা খারাপ হাসি হেসে, লোভাতুর চোখে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমার সৈন্যরা আমাকে রাজা হিসেবেই জানবে। তাদের নিয়ন্ত্রণের পূর্ণ ক্ষমতা শুধু আমার। আর তোমাকে... সুন্দরী রানী, তাদের কাছে তুমি আমার রানী হিসেবেই পরিচিত হবে।”
মায়ের মুখ ক্রোধে লাল হয়ে উঠল। তিনি রাগে উঠে দাঁড়াতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু বীর কুমার তাঁর হাত চেপে ধরে কানে কানে কিছু পরামর্শ দিলেন।
মা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে দৃঢ় কণ্ঠে বললেন,
“বেশ। কিন্তু আমার প্রজাদের কাছে তুমি শুধুমাত্র ভাড়া করা প্রহরী ও সৈন্যদলের নেতা। রাজা নয়। আর আমি স্পষ্ট করে বলছি — রাজ্যের কোনো নারী, চাই সে গ্রামের সাধারণ মেয়ে হোক বা প্রাসাদের দাসী, তোমার সৈন্যরা যদি তার গায়ে হাত দেয়, তবে সেই হাত কেটে ফেলা হবে। এটা আমার চূড়ান্ত শর্ত।”
মহাশূলের চেহারায় ক্ষণিকের জন্য চিন্তার ছায়া পড়ল। তার পাশে বসা সহকারী চোখের ইশারায় তাকে সবুজ সংকেত দিল। মহাশূল ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
সেই রাতেই দলিল তৈরি করা হল। দুই পক্ষের সিলমোহর পড়ল। রাজপুরোহিত যুবরাজ ঈশানচন্দ্র রায়ের নামে ঘোষণা পাঠ করলেন।
আমি, ঈশানচন্দ্র রায়, মাত্র দশ বছর বয়সে মেদিনিপুর রাজ্যের যুবরাজ হয়ে গেলাম।
হলঘরের বাইরে প্রজারা অপেক্ষা করছিল। মশালের আলোয় তাদের মুখে আশা আর আশঙ্কার মিশ্রণ। কেউ জানত না, এই সমঝোতা কতদিন টিকবে, আর কত রক্তের দামে।
মা আমার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তাঁর চোখে অসীম ক্লান্তি আর দৃঢ় সংকল্প।