আমার মা রানী চন্দ্রাবতী - অধ্যায় ৭
পর্ব ৭
প্রায় এক মাস কেটে গিয়েছিল সেই রক্তাক্ত সমঝোতার পর।
মেদিনিপুর রাজ্যে এই এক মাস সত্যিই অপ্রত্যাশিত শান্তি নেমে এসেছিল। গ্রামে গ্রামে লুটপাট বন্ধ হয়েছিল। নরপিশাচদের অত্যাচার অনেকটাই কমে গিয়েছিল। কৃষকেরা আবার মাঠে নেমেছিল, জেলেরা নদীতে নৌকা ভাসিয়েছিল। প্রজাদের মুখে আশার আলো ফুটতে শুরু করেছিল। অন্যদিকে অন্ধকার বাহিনীর নরপিশাচরা ছিল ব্যবসায় আর রাজ্যের রক্ষী হিসেবে। যদিও সবাই জানত, এই শান্তি ক্ষণস্থায়ী এবং ভয়ংকর এক চুক্তির উপর দাঁড়িয়ে আছে।
একদিন প্রাসাদে বাবার চিঠি এল।
রাজদূত চিঠিটি মায়ের হাতে তুলে দিতেই আমি কৌতূহলী হয়ে পাশে দাঁড়ালাম। মা আমাকে চিঠিটি পড়তে দিলেন। বাবার পরিচিত দৃঢ় হস্তাক্ষরে লেখা ছিল:
“প্রিয় চন্দ্রাবতী,
উত্তরের দুর্গ এখনও অটুট আছে। ইংরেজদের আমরা প্রবেশ করতে দিইনি। তারা এখন চুক্তির প্রস্তাব দিয়েছে, কিন্তু সেই চুক্তিতে তারা আমাদের প্রজাদের নীল চাষে বাধ্য করবে। আমি তা মেনে নিতে পারছি না। এখানকার অবস্থা এখনও ভালো নয়।
আমি আরও কিছুদিন এখানে থাকতে বাধ্য। যদি আমি এখন ফিরে আসি, তাহলে যোদ্ধাদের মনোবল ভেঙে পড়বে। তাই আমার ফিরতে আরও সময় লাগবে।
শুনেছি অন্ধকার বাহিনী হানা দিয়েছিল। তুমি নাকি তাদের সামাল দিয়েছ। তোমার সাহসে আমি গর্বিত। ঈশানকে সাবধানে রেখো।”
চিঠিটি পড়তে পড়তে আমার বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল। বাবা জানতেন যে অন্ধকার বাহিনী আক্রমণ করেছিল এবং মা সেই সংকট সামাল দিয়েছেন। কিন্তু তিনি জানতেন না — মায়ের উপর কী জঘন্য জবরদস্তি হয়েছে। মহাশূলের সেই পাশবিক অত্যাচারের কথা তাঁর কাছে সম্পূর্ণ অজানা ছিল।
আরও একটা বিষয় আমাকে ভয় পাইয়ে দিল।
বাবা এখনও জানেন না যে, তাঁর অনুপস্থিতিতে আমাকে যুবরাজ ঘোষণা করা হয়েছে। রাজার অনুপস্থিতিতে এমন ঘোষণা রাজাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করার সমান। যদি বাবা এ খবর পান, তাহলে হয়তো তিনি ক্রোধে আমার বিরুদ্ধেও যুদ্ধ ঘোষণা করতে পারেন।
মা চিঠিটি হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন। তাঁর চোখে গভীর ক্লান্তি ও উদ্বেগ। আমি মায়ের কাছে সরে গিয়ে ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করলাম,
“মা, বাবা কবে আসবে?”
মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে আস্তে করে বললেন,
“এই তো খুব জলদি, ঈশান।”
আমি আবার জিজ্ঞাসা করলাম,
“বাবা যখন আসবে, তখন এই নরপিশাচরা কি চলে যাবে?”
মা একটু থেমে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বললেন,
“হ্যাঁ, বাবা এসে এদের তাড়িয়ে দেবেন। সবকিছু আবার আগের মতো হয়ে যাবে।”
আমি চুপ করে মায়ের কোলে মাথা রাখলাম। কিন্তু মনের ভিতর একটা অস্বস্তি রয়েই গেল। বাবা সব সত্যি জানেন না। আর আমি যে যুবরাজ হয়ে গেছি, সেটাও তিনি জানেন না।
বাইরে সূর্যাস্তের আলোয় প্রাসাদের প্রাঙ্গণ লাল হয়ে উঠছিল। কিন্তু প্রাসাদের ভিতরে, আমাদের জীবনে, এক গভীর অন্ধকার ছায়া এখনও ঘনিয়ে ছিল। মহাশূল এখনও রাজপ্রাসাদেই অবস্থান করছিল। আর তার লোভাতুর দৃষ্টি এখনও মায়ের দিকে নিবদ্ধ ছিল।
শান্তির এই এক মাস যেন শুধু ঝড়ের আগের নীরবতা।
সেদিন সকালে প্রাসাদে বেশ জাঁকজমকপূর্ণ পরিবেশ ছিল। বাইরের প্রাঙ্গণ থেকে ভেসে আসছিল অদ্ভুত ডঙ্কা ও চিৎকারের শব্দ। আমি, আমার ছোট বোন লক্ষ্মীবতীকে কোলে নিয়ে দাইমার পাশে বসেছিলাম। মা জানালার কাছে একটা উঁচু আসনে বসে বই পড়ছিলেন।
দাইমা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে হঠাৎ বলে উঠলেন,
“ছি ছি! রানী মা, নরপিশাচগুলোকে দেখেছেন? আজ কেমন নাচছে! কোনো জামাকাপড় নেই বললেই চলে। শুধু পশুর চামড়া আর লতাপাতা জড়িয়ে রেখেছে। পুরুষগুলো তো মানা যায়, কিন্তু যে মেয়েগুলো নৌকা করে এসেছে আজ সকালে, তাদের পোশাক দেখেছেন?”
মা বই থেকে চোখ না সরিয়েই শান্ত গলায় বললেন,
“হ্যাঁ, দেখেছি। গতকাল রাতেই এসেছে তারা।”
দাইমা মুখ বেঁকিয়ে বললেন,
“আপনি কিছু বলছেন না কেন? এরা এভাবে থাকে কী করে? ছি ছি! আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের সম্মান সব নষ্ট করে দেবে এই বর্বরেরা।”
মা একটু হেসে বললেন,
“কাল রাতে মহাশূল এসেছিল। আজ নাকি তাদের মহা উৎসব — পানির দেবতা নেপচুনের জন্মদিন। তাই আমি অনুমতি দিয়েছি।”
দাইমা চোখ সরু করে মায়ের দিকে তাকালেন। তাঁর গলায় সন্দেহের সুর,
“কাল রাতে... আপনার ঘরে? একা ছিলেন?”
মা বই থেকে চোখ তুলে চোখ রাঙিয়ে তাকালেন,
“না। আমার সৈন্যরা ছিল।”
দাইমা ফিসফিস করে বললেন,
“তবু বলা তো যায় না। নরপিশাচরা তো শুধু একটাই জিনিস ভাবে সবসময়। তাই না রানী মা?”
মা বইয়ের পাতা উল্টে দিয়ে বললেন,
“উহু... আমি এত কিছু জানি না।”
দাইমা আরেকটু কাছে সরে এসে খোঁচা দিয়ে বললেন,
“আচ্ছা, আমার সুবিধার মনে হয় না একটাকেও। আর তার ওপর এই নরপিশাচরা আপনাকে তাদের রানী বলে মনে করে।”
মায়ের মুখটা একটু শক্ত হয়ে গেল। তিনি শান্ত অথচ দৃঢ় গলায় বললেন,
“তারা যা খুশি ভাবুক। আমি রাজ্যে শান্তি চাই। এই সৈন্যদের এখন আমার প্রয়োজন।”
দাইমা চাপা স্বরে, খোঁচা দিয়ে বললেন,
“সেনাপতিকেও বড্ড প্রয়োজন ?”
মা এবার মজা করে হেসে বললেন,
“আমি এই কথাগুলো রাজাকে পাঠিয়ে দিচ্ছি। জবাবটা আপনিই দেবেন।”
দাইমা ভয়ে হাত জোড় করে বললেন,
“না না রানী মা, আমায় মাফ করুন। আমি ভুল করে ফেলেছি!”
দুজনেই হঠাৎ অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন।
আমি কিন্তু কিছুই বুঝতে পারলাম না। কী এমন হাসির কথা বললেন দাইমা? মা হাসছেন কেন? আমি শুধু অবাক হয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে রইলাম। ছোট বোনটা আমার কোলে ঘুমিয়ে ছিল, আর বাইরে নরপিশাচদের উদ্দাম নাচ আর চিৎকার চলছিল।
শান্তির এই এক মাসেও প্রাসাদের ভিতরে এক অদ্ভুত অস্বস্তি যেন লুকিয়ে ছিল।