আরেকটি নিষিদ্ধ প্রেমের গপ্পো - অধ্যায় ৩০

🔗 Original Chapter Link: https://xossipy.com/thread-74876-post-6293977.html#pid6293977

🕰️ Posted on Sat Aug 22 2026 by ✍️ রিও_৭ (Profile)

🏷️ Tags: None
📖 2595 words / 12 min read

Parent
(৯)খ—পিঞ্জিরায় শুধুই ছটফটায়! সেদিনের কোচিং ক্লাস টা শেষ করে বাড়ির দিকেই যাচ্ছিলাম।  বাম হাতের আঙুলের ফাঁকে সিগারেটটা গুঁজে, বাইক চালাতে চালাতে ভাবছিলাম, এ জীবন বৃথা ! বেকার শালা ! বালের জীবন রাখার চেয়ে না রাখাই ভালো। চোখটা জ্বলছিল ছলছল করেই। শর্মিষ্ঠা চলে গেল।  মা ও চলে যাবে কিছুদিন পর।  আর বাপ তো শালা আগের থেকেই পগার পার।   কে আর রইলো আমার জীবনে!  না , আজ আর বাড়ি ফিরবো না। ক্লাবে যাব।  আড্ডা মারবো।  ওই ,বাইনচোদ বন্ধু গুলো তো আর আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে না ! তাই ক্লাবেই যাব আজ।  ক্লাবে গিয়ে দেখি, আদভিক আর বনি দাঁড়িয়ে ক্যারাম খেলছিল। আমির সেদিন বাইরে কোথাও গেছিল বোধ হয়। বেঁচে গেছিল বলাই ভালো। ক্লাবে ঢুকতেই আদভিক আমাকে বলল , —“কী রে, এক যুগ পর ক্লাবের কথা মনে পড়ল তোর, হারামি!” বনি , —“ আরে ,স্যার যে ! আসুন আসুন ! ওনাকে মেঝেতে বাবু মেলে বসতে দে রে তোরা ! কি সৌভাগ্য আমাদের !" ওদের সাথেই ক্যারাম খেলছিলাম সেদিন। সাথে সাথেই মোবাইল টা বেজে উঠলো।  মায়ের নাকিসুরে কণ্ঠটা কানে এসে ধাক্কা মারল। — "বুবু , কোথায় রে তুই?" — "ক্লাবে আছি ! এখন ফিরবো না ! ফোন রাখো তুমি!" আমার মাথা সেদিন গরম ছিল ,মায়ের উপর, শর্মিষ্ঠার জন্যেই।  আর আমি বাড়ি ঢুকলেই যে মায়ের সাথে কুরুক্ষেত্র শুরু হয়ে যাবে আমার , সেটা আমি না করলেও আমার তপ্ত মস্তিস্ক আমাকে দিয়ে করিয়েই ছাড়বে । তাই বাড়ি যেতে ইচ্ছে করছিল না আমার সেদিন।  — "আমি যে তোকে পই পই করে বললাম , কোচিং ক্লাস থেকে সোজা বাড়ি ঢুকবি তুই ,সে কথা কানে গেলনা তোর ? " মায়ের ঝাঁঝালো কণ্ঠস্বরটা শুধু আমার কানেই ঢুকলো না , আদভিক আর বনি শুনতে পেয়ে মাথা ঝুকিয়ে  ক্যারাম বোর্ড খেলতে খেলতে চোখ তুলে আমার দিকে তাকাল।  ওরা কিছু বলল না ,আমাকে ! মা গলা কিছুটা নরম করে, কাতর সুরে বলল, — “বুবু, বাড়িতে আয় তাড়াতাড়ি। খাবার বানিয়ে রেখেছি তোর জন্যে , সোনা! আমি কিন্তু তোর জন্যে খাবার গরম করে রাখছি !” — " আহ ,মা, আমার খিদে নেই ! তুমি গেলো ওই খাবার ! ফোন রাখো। আমি এখন বাড়ি যাব না !" মোবাইলের ওপাশ থেকে মায়ের কণ্ঠস্বরটা পাতলা হয়ে ভেসে এলো, — “বুবু, ফোন কাটবি না। শর্মিষ্ঠা তোকে কিছু বলেছে কি?.....” আমি মায়ের ফোনটা কেটে দিলাম।  আর তারই সাথে মোবাইল টা সুইচ অফ ও করে দিলাম।   মায়ের খ্যাঁন-খ্যাঁনে নাকি গলা শুনে বনি ,আদভিক আমাকে বলল , —" কি রে ভাই ,বাড়িতে কিছু হয়েছে নাকি রে। " — "এমন খিচ খেয়ে আছিস কেন বে তুই ?” আমার মাথাটা সেদিন কেমন আজব ঘোরে ঝিমঝিম করছিল, আর মনজুড়ে যেন হঠাৎই অস্থিরতার বান ডেকেছিল। বুকের ভেতর দাউদাউ করে জ্বলছিল আগুন,আর অন্তরটা নিঃশব্দ কান্নায় ভেসে যাচ্ছিল। শর্মিষ্ঠা ,আমার হাত টা তুই ধরতে পারলি না ! একটু বিশ্বাস করতে পারলি না তুই আমাকে ! কেন রে ? আমি হাত মুঠো করে ক্যারাম বোর্ডের কিনারায় সজোরে গুঁতো মারলাম। সঙ্গে সঙ্গে বোর্ডের গুটিগুলো লাফিয়ে উঠে ছিটকে পড়ল ক্লাবের মেঝেজুড়ে, টক্, টুক্, টাক্ শব্দ তুলে। — " এই শালা বানচোদের দল , চল সবকটা মিলে ,বারে বসে মাল খাবো !" দেখলাম, বনি আর আদভিক ঘাবড়ে গিয়ে ঘাড় নিচু করে চোখ পিটপিট করতে করতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আদভিক আড়ষ্ট স্বরে বলল , — “কী হল রে ভাই তোর? তোর চোখ দুটো এমন লাল কেন হয়ে উঠল রে? বাড়িতে আন্টির সঙ্গে কিছু ক্যাচাল পাকিয়েছিস নাকি? হারামি ছেলে!” আমি আদভিকের কলার চেপে ধরলাম। — “এই শালা, তোকে বললাম না বারে যাব, মাল খেতে! চুপ চাপ চল ! বেশি চুদুর বুদুর করতে বলেছি কি তোকে ?” আর বনিকে বললাম, — “ক্যাব বুক কর, বনি। জলদি ! ফটাফট !” বনি, — “ক্যাব তো না হয় আমি বুক করছি। কিন্তু তোর শালা হলটা কী, বল তো মাইরি! আদভিকের কলার ছাড়।  — “ওয়েটার তো তোকে দেখে ভয়ে পালিয়ে যাবে রে!” আমি চিৎকার করে ওদের বললাম , — “আজ কী সাম, ব্রেকআপ কী নাম, চল শালা, সবকটা মিলে !” বনি, — “ও, এতক্ষণে বুঝলাম রে আদভিক! কেসটা কী? ” আদভিক জামার কলারটা ঠিক করতে করতে বলল, — “ আমিও বুঝলাম ...বুঝলি বনি !" আদভিক আমার ঘাড়ের কাছে এসে পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে বলল , — “ আচ্ছা বাবা টামানন্দ , কোচিং ক্লাসে পারো বুঝি তোমায় আচ্ছা রকম গাদন দিয়েছে বলে মনে হচ্ছে যেন ?  একদম আছোলা পিছনে ঢুকিয়ে দিয়েছে ভগাৎ করে বোধয় ! তাই তোমার এত্ত ঝাঁঝ !" তারপর বনি ক্যাব বুক করে আমার পিঠে ঠাপ্পি মেরে বলল, — “চলো, বারেই চলো, দেবদাস বাবা জীবন!  আমরা তো তোমার সাথেই রয়েছি  , এক জোড়া চুনীলাল!” মদের পেগের গ্লাসটা ঠক্ করে একটা শব্দ তুলে টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখলাম। বনির দিকে তাকিয়ে বললাম, — “আজ আরও চাই! আরও চাই! যা আছে সব ঢাল। হুইস্কি, ব্র্যান্ডি, টেকিলা, রাম, ভদকা, তোদের মন যা চায়, তাই দে। টাকা দেবে তো আমার বাপ- মা !” মৃদু নীলাভ আলোয় ডুবে ছিল বারটা।  ধীর সুরে গান বাজছিল, তার সঙ্গে মিশে ছিল গ্লাসে বরফের টুংটাং শব্দ আর চাপা কথাবার্তার গুঞ্জন।  আলো-আঁধারির ফাঁকে ধোঁয়ায় ভারী হয়ে থাকা বাতাসে ছড়িয়ে ছিল মদের গন্ধ। চারপাশে মানুষে ভরা, অথচ আমার বুকে ছিল নিঃসঙ্গতা। একটু থেমে দাঁত কিড়মিড় করে হেসে উঠলাম। — “বাপ... মা ... ই তো দেবে!” আদভিক আমার দিকে তাকিয়ে ভয়ে ভয়ে বলল, — “না রে ভাই, আমি আর খাব না। চার পেগ হুইস্কি গিলে ফেলেছি। আমার তো মাথাই ঘুরছে রে! তুইও এবার থাম।” আমি চোখ রাঙিয়ে উঠলাম, — “চুপ শালা, বাইনচোদ! একদম চুপ! চার পেগ খেয়েই প্যান্ট হলুদ করে ফেললি! দেখ বনিকে দেখ! দেখে কিছু শেখ!” বনি তখন ঢুলুঢুলু চোখে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। মুখে একটা ক্লান্ত হাসি এনে বলল, — “না রে ভাই, আমিও আর লোড নিতে পারছি না। শালা, বাড়ি ফিরতে হবে রে! বেশি বাড়াবাড়ি করলে বাপ তো ক্যালিয়ে বৃন্দাবন দেখিয়ে দেবে!” ওদের কথা আমার কানে ঢুকছিল, কিন্তু মাথায় যেন কিছুই ঢুকছিল না। বুকের ভেতরটা তখনও শর্মিষ্ঠার একটা কথায়, একটা মুখভঙ্গিতে, একটা প্রত্যাখ্যানে জ্বলছিল। আমি নাকি রিজেক্ট ! রিজেক্ট করে দিল আমাকে ও ! হঠাৎ বললাম, — “এই বনি, আমার ভীষণ খিদে পেয়েছে রে! বাড়ি থেকে কিছু খেয়েই আসিনি। মা-টা বাড়িতে খাবার টেবিলে বসে আছে বোধহয়, খাবার নিয়ে।” এক মুহূর্তের জন্য মায়ের মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে মুখ ঘুরিয়ে নিলাম। — “তুই শালা অর্ডার দে—সিক কাবাব, চিকেন ললিপপ আর ফিশ ফ্রাই। আর তার সঙ্গে আরও ছয় পেগ হুইস্কি! আজ সব উড়িয়ে দেব শালা!” বনি মাথা নেড়ে ওয়েটারের দিকে এগিয়ে গেল। আমি আবার গ্লাসটার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বললাম, — “আমাকে রিজেক্ট করবে! এতদূর সাহস! আমার নাকি ফ্যামিলিটাই ঠিক নয়। ” পাশ থেকে আদভিক সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, — “এর একটা প্রোটেস্ট হওয়া দরকার, বুঝলি টম !  তোর মা বাবা এক সাথে থাকে না তো কি হয়েছে।  তুই কি খারাপ ছেলে নাকি। আর তোর মা ,বাবা তোকে বানের জলে ভাসিয়ে দিয়েছে নাকি !” মনের ভেতর অন্য একটা শূন্যতা ছিল। পেগভর্তি গ্লাসটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম। বনি তখন ওয়েটারের সঙ্গে খাবারের অর্ডার নিয়ে কথা বলছিল। আদভিকের কথা শুনে ঘুরে তাকাল। তারপর আমার সুরে সুর মিলিয়ে বলল, — “কেন, রিজেক্ট কেন করবে আমাদের টমকে? টম আমাদের ট্রাইসেপ সালমান খান! গায়ের রং একটু কালো ,সে হতেই পারে। তাই বলে রিজেক্ট!  আর, মা বাবারা একসাথে না থাকলে কি তাদের ছেলে মেয়েদের কেও বিয়ে করে না নাকি। ফালতু কথা বললেই হলো। আমরা তো মেনে নেব না !” আদভিকও সুর চড়াল, — “টমের বাবা-মায়ের কম টাকা আছে নাকি? শর্মিষ্ঠা কিন্তু এটা ঠিক করল না টমের সঙ্গে। চল, সবাই মিলে শর্মিষ্ঠাদের বাড়ি যাই। ওর বাপ-মায়ের সঙ্গেই কথা বলব আমরা!” বনি টেবিলে হাত ঠুকে বলে উঠল, — “কনডেম! আমি শর্মিষ্ঠার পরিবারের এই সিদ্ধান্তকে কনডেম করছি!” আমি হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেলাম। — “না। তোরা কেউ কোথাও যাবি না।” ওরা দু’জনেই চুপ করে গেল। কিছুক্ষণ পর আবার আমি নিজেই ঢুলুঢুলু চোখে চারপাশে তাকিয়ে বললাম, — “যেতে দে, যেতে দে,যেতে দে।  যে যাওয়ার, সে যাবেই...” — “কোনো শালা কেও কারুর জন্যে দাঁড়াবে না।" কথাটা বলেই যেন নিজেই নিজেকে হারিয়ে ফেললাম। মাথাটা ঝিম ঝিম করছিল বড্ড।  ওয়েটার টেবিলের সামনে ছয় পেগ হুইস্কি নামিয়ে দিয়ে গেল। আদভিক  , — "শর্মিষ্ঠার যদি টম কে এই কথাই শোনানোরই  ছিল ,তাহলে প্রেম করতে গেলি কেন তুই  ? টম কে দেখে দুদু দুলিয়ে দুলিয়ে প্রেম তো তুই ও করেছিস মাগী  ! " বনি, — একশো বার !  হাজার বার ! টম তো আর তোর ঘাড়ের উপর উঠে প্রেম করতে যায় নি রে ঢেমনি মাগী ! দুই পেগ হুইস্কি গলায় ঢালার পর , খালি গ্লাসটা সশব্দে ঠাস করে টেবিলের ওপর রাখলাম। — "আহঃ, তোরা থামবি ! " টেবিলে থাপ্পড় দিয়ে আমি ওদের থামালাম!  — "আমার এক্স এর ব্যাপারে তোরা স্ল্যাং ওয়ার্ড ব্যবহার করবি না ,শালা শুয়োরের দল টুটি চিপে মেরে ফেলবো তোদের। চুপ কর শালা !যা যা বলার আমি বলবো ,তোরা বলবি না !" আঙুল নাচিয়ে চুপ করিয়ে দিয়েছিলাম ওদের সেদিন ।  — "তাছাড়া ওর সাথে আমার মেলামেশা ছিল ঠিকই, আমি প্রপোজও করেছিলাম সেটাও ঠিক ছিল ,কিন্তু সে সময়ে আবার শর্মিষ্ঠার বাবার হার্ট অ্যাটাক হয়ে বসল।   ও তো রাজি ছিলই আমার হাত ধরতেই  ,কিন্তু প্রেমের ব্যাপারটা ও বাড়িতে বলতে পারছিল না সেই সময়ে ।"  — "প্রেম তো শালা দুজনেই করেছিলাম, ওসব সাত-পাঁচ ভেবে নয়!” — "প্রেম তো হয় চোখে চোখেই।   শর্মিষ্ঠা আমাকে বলেছিল  রে ,  বলেছিল আমাকে ও , খুব ভদ্র মেয়ে ছিল তো ,ও বাড়ির অমতে কোনো কাজ করতে পারবে না ! ভুল তো আমার জন্মটার , মেয়েটা আমাকে সব জানিয়েই ছিল।   কিন্তু আমার ভাগ্যটাই খারাপ শালা  ,শর্মিষ্ঠার একার আর দোষ দিয়ে লাভ কি !" — "শুধু বিচ্ছেদের কারণটা আজ বলল ও আমাকে ।  আমার খারাপ লাগবে বলে এতদিন চুপ ছিল ও !" বনি, — "কোথাও কোনো পার্কে বা গলির খুপচিতে নিয়ে গিয়ে গুপচি করে দিতিস ! শর্মিষ্ঠা তোর ছিল রে ভাই !" — "ওকে আমি ছুঁয়ে পর্যন্ত দেখিনি !"  বনির কলার ধরে কথাটা বলেছিলাম সেদিন।  — "অফ-স্টাম্পের বাইরে আউটসুইং ডেলিভারি টা কে ডিপ ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টের ওপর দিয়ে আপার কাট মেরে  ছক্কা মারতে আমিও পারতাম রে।  কিন্তু মারিনি ! ইচ্ছে করেই মারিনি ! ছেড়ে দিয়েছিলাম মাথাটা ঝুঁকিয়েই!" তারপর হঠাৎ চিৎকার করে উঠলাম, — “ওই... কোথায় গেল খাবার-দাবার সব? খাবারগুলো তো আগে দে শালা! খুব জোর খিদে পেয়েছে।” সাথে সাথেই কথাটা বলার সময় গলাটা কেমন যেন আটকে গেল। আমি সঙ্গে সঙ্গেই গ্লাসে ঠোঁট ছুঁইয়ে আরেক পেগ ঢকঢক করে গলায় ঢেলে দিলাম। তারপর সোফাটা ঠেলে টলতে টলতে দাঁড়িয়ে উঠলাম। — “চল, ওয়াশরুমে গিয়ে হিসু করে আসি। তারপর স্মোকিং জোনে গিয়ে সিগারেট টানতে হবে । ততক্ষণে খাবারও এসে যাবে।” স্মোকিং জোনে গিয়ে তিনজনে গোলকরে দাঁড়ালাম। সিগারেটের ধোঁয়া ধীরে ধীরে ওপরে উঠছিল। বারের ভেতরের আলো, মানুষের কথাবার্তা, গ্লাসের টুং টাং  শব্দ সবকিছু কেমন মিলিয়ে যেতে থাকল।  ঠিক তখনই আদভিক বলল, — “এই... মা ফোন করছে!” ও ফোনটা কানে নিয়ে একটু দূরে সরে গেল। দু’এক মিনিট পর ফিরে এসে আমার দিকে তাকাল। — “এই টম, তোর মা তো আমাদের বাড়িতে রে! তোকে খুঁজছে। তোর ফোন সুইচ অফ।  — “তুই কী বলেছিস, সেটা আগে বল শালা!” আদভিক  , — “আমি বলেছি, আমরা ক্লাবে আছি, টমও আমাদের সঙ্গেই আছে। তোর মা তোর সঙ্গে কথা বলতে চাইছে। ফোনটা ধর ,কথা বল।” আমি ওর দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বললাম, — “ফোন কেটে দে! আমি কারও সঙ্গেই কথা বলব না। ফোন কাট, শালা!” — “তা না হলে তোকে-ই কেটে দেব! সুইচ অফ কর ফোন!” আদভিক আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আর কিছু বলল না। ভয়ে ভয়ে ফোনটা সুইচ অফ করে পকেটে ঢুকিয়ে ফেলল। আমরা আবার টেবিলে ফিরে এলাম। কিছুক্ষণ পর টেবিলে একে একে খাবার এসে জমল। সিক কাবাব, চিকেন ললিপপ, ফিশ ফ্রাই। আরও হুইস্কি! আমরা তিনজনে ঝাঁপিয়ে পড়লাম সেগুলোর ওপর। বনি গ্লাস তুলছে, আদভিক কাবাব ছিঁড়ে মুখে পুরছে, আমি  আবার অকারণে হেসে উঠলাম । টেবিলের ওপর খাবার ছড়িয়ে রয়েছে , গ্লাসের ঠোকাঠুকিতে কানে কেমন বেসুরো শব্দ বাজতে শুরু করল । আমিও গোগ্রাসে খেয়ে চলেছিলাম। খিদে তো ছিলই, কিন্তু খাবারের স্বাদ যেন জিভে লাগছিল না। বারবার মনে পড়ে যাচ্ছিল মায়ের হাতের সেই খাবারের স্বাদটির আস্বাদন টি কেই।  মা তো আমাকে খুঁজছে! খুঁজুক মা আমাকে! খুঁজে যাক নিজের ছেলেকে হন্যে হয়ে! বনি আরও দু’পেগ হুইস্কি খেয়ে আদভিকের দিকে তাকিয়ে বলল, — “আজ মনে হচ্ছে বাড়ি ফিরতে দেবে না! এই শালার পাল্লায় এমন পড়েছি যে, আজকে আমাদের কপালেই আর ঘরে ফেরা নেই!” একটু ঢুলে উঠে আবার বলল, — “আদভিক, তুই ফোনটা সুইচ অফ করেই রাখ ভাই। আর তিনটে শতরঞ্চি জোগাড় কর। রাস্তার ফুটপাথেই ঘুমিয়ে যাব। নিজের ঘরটাই খুঁজে পাব না শালা! উল্টে লোকের বাড়িতে ঢুকে যেতে পারি!” আদভিক কাতর গলায় বলল, — “আমি আর খাব না ভাই! আমার চোখ, নাক, কান সব দিক দিয়েই যেন ধোঁয়া বেরোচ্ছে। পোঁদটাও মনে হচ্ছে জ্বলছে শালা! এই শালার পাল্লায় এমন পড়েছি যে আজ আর রক্ষে নেই ভাই!” একটু থেমে বুক চাপড়ে আদভিক বলল, — “একদিনেই মনে হচ্ছে কিডনি-লিভার সব খুলে হাতে চলে আসবে শালা!” আমি ওদের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বললাম, — “কেউ কোত্থাও নড়বি না! টেনে যা, খালি! টেনে যা! নয়তো চিরে রেখে দেব শালাদের!” বনি হেসে ফেলল। ঠিক তখনই ওর ফোনটা আবার বেজে উঠল। আদভিক তো আগেই আমার ধমকের চোটে ফোন সুইচ অফ করে দিয়েছিল। বনি ফোনের স্ক্রিনের দিকে একবার তাকাল, তারপর এক মুহূর্তও দেরি না করে ফোনটা সুইচ অফ করে টেবিলের ওপর রেখে দিল। আমার দিকে তাকিয়ে ঢুলুঢুলু চোখে বলল, — “আজ আর রক্ষে নেই ! কার পাল্লায় পড়েছি রে ভাই! আমি তো রিস্ক নিতেই চাইছি না। ” আমি হেসে উঠলাম। কেন যেন সেই হাসির মধ্যেও একটা কান্না মিশে ছিল। টেবিলের অর্ধেক খাবার তখন টুকরো টুকরো হয়ে প্লেটে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে ছিল। সবার মদের গ্লাসও খালি। আমি হাত তুলে ওয়েটারকে ডাকলাম। — “ওয়েটার! থ্রি ককটেল অন দ্য রকস আর থ্রি শট টেকিলা, জলদি, জলদি, কুইক ! ” কথাটা শেষ করার আগেই জিভটা যেন জড়িয়ে গেল। ককটেল আর টেকিলা খাওয়ার পর কী হয়েছিল, তারপর কিছুই আর মনে নেই। সবকিছুই কেমন ঝাপসা হয়ে গেছিল সেদিন।  তিনজনেই বারের সোফায় হেলান দিয়ে ঝিমোচ্ছিলাম। হঠাৎ কেমন যেন শিউরে উঠে ঘড়িটার দিকে তাকালাম। দেখলাম, তখন রাত প্রায় সাড়ে ন’টা। বারের আলোটা চোখের সামনে কেমন দুলছিল। চারপাশের শব্দগুলোও যেন ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছিল। কখন যে চোখ লেগে গিয়েছিল, টেরই পাইনি।  সেদিন আমার শ্বাস-প্রশ্বাস ক্রমশ তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠেছিল। টেবিলের উপর মাথা রেখে ঝিমোতে ঝিমোতে হাঁপাচ্ছিলাম, বুকটা যেন দমবন্ধ হয়ে আসছিল। একটা চেনা গন্ধের সুবাস নাকের ভিতরে ঢুকল।  মাথাটা ধীরে ধীরে উপরের দিকে তুলতেই দেখলাম মমতাময়ী, স্নেহশীলা মাতৃ রূপে চন্দ্রমুখীকেই। আমার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে সে । আর মায়ের দুপাশে দাঁড়িয়ে বনির মা আর আদভিকের মা নিজেদের কোমরে হাত রেখে গোল গোল চোখে আমাদের তিনজনকেই যেন গিলে খাচ্ছিলেন। মা সেদিন আকাশি-নীল রঙের চুড়িদারটাই পরেই এসেছিল। অথচ বড্ড অগোছালো লাগছিল মাকে।  প্রথম যেদিন মাকে এই সালোয়ার-কামিজে এয়ারপোর্টে দেখেছিলাম, কী পরিপাটি আর সুসজ্জিতই না লেগেছিল! সেদিনের সেই মাকে আর বারের টেবিলের সামনের মায়ের মধ্যে যেন আকাশ-পাতাল তফাত। এলোমেলো চুলে, চোখে-মুখে চিন্তা আর ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল । বিষণ্ণ, মনমরা চোখে মা একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল আমার মাতাল, বিশৃঙ্খল চেহারাটার দিকে। কোনো কথা না বলে। মায়ের মুখাবয়বে চিন্তা আর ক্লান্তির গভীর ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। আর এটাও তো আমার প্রত্যাশিত প্রাপ্তিই ছিল। মা শুধু শান্ত, গম্ভীর দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। বনির মা এক ঝটকায় বনির কান মুলে ধরে বলল, — “বেরিয়ে আয়! বেরিয়ে আয় বলছি! বাড়ি চল,আজ তোকে মজা দেখাচ্ছি!” ওদিকে আদভিকের মা আদভিকের চুলের মুঠি ধরে টানতে টানতে বলল, — “চল! এক্ষুনি বেরো! বাবা আজ বাড়িতেই রয়েছে। চল বাড়ি তুই আজ। ” দাঁত কিড়মিড় করতে করতে দু’জনের মা ওদের সোফা থেকে টেনে-হিঁচড়ে বাইরে বের করে নিয়ে গেল। আমি শুধু চুপ করে বসে রইলাম। আমার মা আমার দিকে তাকিয়ে ছিল এক দৃষ্টিতে ।  আমিও ঢুলু ঢুলু চোখে মায়ের দিকেই তাকিয়ে ছিলাম।  মা কিছুই আমাকে বলছিল না। একটা কথাও না। শুধু তাকিয়ে ছিল একদৃষ্টিতে।  মায়ের সেদিনের সেই নীরব চাহুনি আমার সমস্ত মাতলামিকে হার মানিয়েছিল।  বার থেকে বেরোনোর সময় মা-ই বিলটা মেটাচ্ছিল । আমি তখনও টাল মাটাল হয়ে বিলের দিকে ঢুলু ঢুলু চোখে তাকিয়ে দেখলাম , বিল হয়েছিল মোটামুটি পনেরো হাজার টাকার কাছাকাছি।  মাথার ভেতর টা  ঝিমঝিম করছিল। কিন্তু মায়ের চোখের সেই নীরব দৃষ্টি আমাকে স্তব্ধ করে ফেলেছিল সেদিন।  ক্যাব বুক করে বাড়ি ফিরছিলাম। পিছনের সিটে  মায়ের কোলে মাথা পেতে শুয়ে ছিলাম। মদের ঘোরে ঝিমিয়ে পড়া মাথাটা বারবার দুলে গিয়ে মায়ের বুকের সাথে ঠেকছিল। মা একটাও কথা বলছিল না। শুধু নিঃশব্দে চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছিল। হঠাৎ এসি ক্যাবের ভেতরে আর সামলাতে পারলাম না নিজেকে । কিছুক্ষণ পর পর হেঁচকি উঠে বুকটা কেঁপে উঠতে লাগল। হরহর করে বমি করে দিলাম মায়ের সারা গা ভাসিয়ে । মা আমার মাথাটা নিজের বুকের মাঝে চেপে ধরে অঝোর ধারায় কাঁদতে থাকল। শুধু আমার এলোমেলো চুল ভরা মাথাটা নিজের বুকের মধ্যে আরও শক্ত করে চেপে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল। আর আমি তখনও আধো-অচেতন ঘোরে লেপ্টে  ছিলাম মায়ের বুকের সাথেই । ক্রমশ...
Parent