আরেকটি নিষিদ্ধ প্রেমের গপ্পো - অধ্যায় ২৯
৯(ক)—রিক্ত খাঁচা , শূন্যই থাক।
সেদিন আমাদের কলেজের অ্যানুয়াল ফেস্ট ছিল।
শহরের এক নামী ব্যান্ড সেদিন আমাদের কলেজে পারফর্ম করতে এসেছিল। তাই সকাল থেকেই কলেজ জুড়ে সাজসাজ রব। সবাই রঙিন নতুন জামাকাপড় পরে উৎসবের আনন্দে মেতে উঠেছিল।
আমিও সেজে গুজেই কলেজে গেছিলাম সেদিন।
তারপর কলেজে স্টেজ ফাংশন শুরু হতেই আমরা আনন্দ-ফুর্তিতে মেতে উঠলাম।
কলেজ ফেস্টে নেচে-কুঁদে, ঘেমে একাকার হয়ে, বন্ধুদের সঙ্গে সিগারেট টানতে টানতে, আড্ডা আর ইয়ার্কি-ফাজলামিতে মেতে উঠেছিলাম সেদিন।
এরই মাঝে চোখ চলে যাচ্ছিল শর্মিষ্টার দিকে। তবে শুধু আমার নয় ! ওর ও !
সেদিন ও একটা স্বর্ণালী রঙের চুড়িদার পরে এসেছিল। এমনিতেই দেবীর মতো মুখখানি, তার ওপর সোনালি চুড়িদারে ওকে ভারী মিষ্টি দেখতে লাগছিল।
কিন্তু সেদিন ওকে ভীষণ রকম শান্ত দেখাচ্ছিল। অতটাও শান্ত তো ও নয়!
মনে ছিল প্রশ্ন, সাথে ছিল উদ্বেগ!
বিকেলের দিকে আবার কোচিং ক্লাসও ছিল। তাই স্টেজ ফাংশন শেষ হওয়ার আগেই বন্ধুদের ছেড়ে কোচিং ক্লাসে যেতে হয়েছিল সেদিন ।
কোচিং ক্লাস এ ঢোকার আগে মা আমাকে কল করেছিল।
আর বলল ,
—"বুবু , তোর শর্মিষ্ঠার সাথে কোনো কথা হয়েছে কি ?"
—"না ,হয়নি মা। কিন্তু কেন ?
মা ঝাঁঝিয়ে উঠে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলল,
— “তুই কোচিং ক্লাস করে সোজা বাড়ি ফিরবি। আমি তোকে যা বলার, বলব। কারও কোনো কথায় কান দিবি না।”
আমার বুঝতে বাকি ছিল না যে ,মায়ের সঙ্গে শর্মিষ্ঠার আজ সকালে তাহলে কথা হয়েছে।
কিন্তু কি এমন কথা? সেটা আবার শর্মিষ্ঠার থেকে শুনতে মা আমাকে বারণ করছে।
উত্তেজনাটা কয়েকগুন বেড়েই গেছিল সেদিন আমার।
অথচ এটাও ভাবলাম ,শর্মিষ্ঠা তো আমার সাথে কথাই বলে না। আজ নাকি বলবে !
কিন্তু কি বলবে ও আমাকে ?
কোচিং ক্লাসে গিয়ে বিষয়টা আমার নজর কাড়ল।
আর সেটা ছিল শর্মিষ্ঠার আমার প্রতি দৃষ্টি। ও আমার পাশের বেঞ্চেই বসেছিল।
কিন্তু ও বারবার আমার দিকে তাকিয়ে চোখের পলক নামিয়ে ফেলছিল। আমার চোখও স্থির ছিল না। ওর দিকে তাকিয়েই আবার চোখ সরিয়ে নিচ্ছিলাম অন্যদিকে।
আমি ভাবলাম, ও কিছু একটা বলার চেষ্টা করছে আমাকে। আমার সঙ্গে কথা বলতে চাইছে ও। কিন্তু বলতে পারছে না। কোনো একটা বিষয়ে খানিকটা ইতস্তত বোধ করছে যেন।
আমি মনে মনে ভাবলাম, শর্মিষ্ঠার সঙ্গে তো আমার দীর্ঘদিন কোনো কথাবার্তা নেই। ও আমাকে আর কী বলবে আবার!
কোচিং ক্লাসের একটা পিরিয়ড শেষ হতেই মাঝখানে ছোট্ট একটা বিরতি হলো। সেই সময় শর্মিষ্ঠা পাশ থেকে আমাকে ডেকে বলল,
— "তন্ময়, তোর সঙ্গে কথা বলার ছিল । তুই আমার সঙ্গে একটু বাইরে চল !"
আমার মায়ের কথাটা মাথায় ছিল ,ঠিক ই ,কিন্তু আমাকে তো জানতে হবে পুরো বিষয়টা। তাই আমি মায়ের বারণ শুনলাম না সেদিন।
আমার বুকের ভিতরটা তখন ধক করে উঠল। আমি ওর পিছন পিছন কোচিং ক্লাসের বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছিলাম ।
"তু পাস হ্যায়, মেরে পাস হ্যায়, অ্যায়সে…" রিংটোন টা কানে বেজে উঠেছিল আরো একবার। ওর চুড়িদারের পিঠের দিকে খানিকটা এলো পিঠ আর কেশগুচ্ছের দুলুনির ছন্দে,
তালে তাল মিলিয়ে বেজে উঠেছিল ওর জন্য সেট করে রাখা সেই স্পেশাল রিংটোনটা, মনের হৃদস্পন্দনে ।
তার সাথে সাথেই ওর সঙ্গে কাটানো কিছু সুন্দর সুন্দর মুহূর্তের প্রতিচ্ছবিগুলো যেন বেদনা হয়ে চোখের সামনে ভেসে বেড়াচ্ছিল ওর পিছনে পিছনে হাঁটতে হাঁটতে।
আমি আর ও সিঁড়ির নিচে, একটু নিরিবিলি জায়গায় দাঁড়ালাম।
শর্মিষ্টা আমার সামনে হাত গুটিয়ে মাথা নিচু করে ,খুব মৃদু স্বরে বলল ,
— "তোর মা আমাকে কল করেছিল !"
সাথে সাথেই আমার হাতের তালু দুটো মুঠো হয়ে এল। আর চোয়ালটা শক্ত হয়ে এল ,মায়ের প্রতি রাগে, অভিমানে।
আমি সাথে সাথেই ওর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে বললাম ,
—" সরি রে , মায়ের কথায় তুই কিছু মনে করিস না। আমি তোর কাছে ক্ষমা চাইছি! "
আমার শুধু একটা উত্তর জানা খুব দরকার ছিল শর্মিষ্ঠার কাছ থেকে। তাই সেদিন সুযোগ পেয়ে আমি ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম,
— “কেন ছেড়ে চলে গেলি তুই আমাকে?”
মাথা তুলে একদৃষ্টিতে তাকাল আমার দিকে। শর্মিষ্ঠার চোখটা রক্তকরবীর মতো লাল হয়ে ভিজে উঠল।
— “বাবার হার্ট অ্যাটাকের পর প্রায় ছয় মাস বাড়িতে বসে ছিল। কোনো রোজগার ছিল না। বাবার চিকিৎসা, ভাইয়ের পড়াশোনা, আমার কলেজ ,সবকিছু মিলিয়ে সংসারে তখন বড্ড টানাটানি।”
একটু থেমে শর্মিষ্ঠা বলল,
— “অরিন্দম দার বাবা আর আমার বাবা খুব ভালো বন্ধু তুই সেটা জানতিস। বাবার বন্ধুর ছেলে বলেই অরিন্দম দার কাছে মা টাকা ধার নিয়েছিল। ও আমাদের অনেক সাহায্যও করেছিল।
রোজ সন্ধ্যের দিকে আমাদের বাড়িতে আসত, সে কথাও তোকে জানিয়েছিলাম।”
আমি চুপ করে ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম।
— “অরিন্দম দা যে আমাকে বিয়ে করতে চেয়েছিল, সেটা তো তুই জানতিস। "
আমি আর নিজেকে সামলাতে পারলাম না।আমি গলা উঁচু করেই শর্মিষ্ঠাকে বলেছিলাম ,
— “কেন? কিন্তু তুই কেন রাজি হয়েছিলি? আমি তোকে বলেছিলাম, অরিন্দম দার টাকা ফেরত দিয়ে দে।
আমার মাকে বললেই টাকা আমাকে পাঠিয়ে দিত। তা ছাড়া আমার বাবা আছে। টাকাটা তো ফ্যাক্টর ছিল না, শর্মিষ্ঠা!
কিন্তু তুই কী করলি?
আমার কাছ থেকে টাকা নিলি না, অরিন্দম দার কাছ থেকেই নিলি। কিন্তু কেন?”
— “ আস্তে কথা বল তন্ময় !
মা বারণ করেছিল তোর কাছ থেকে টাকা নিতে।”
— “কারণটাই তো জানতে চাইছি আমি! মাথাটা আর গরম করাস না আমার।”
শর্মিষ্ঠা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলল,
— “কারণ শুনবি?”
আমি চুপ করে তাকিয়ে রইলাম শর্মিষ্ঠার দিকেই।
— “আমি মাকে বলেছিলাম, আমি তন্ময়কে ভালোবাসি মা। আমি অরিন্দম দাকে বিয়ে করতে পারব না। প্রথমে মা রাজিও হয়েছিল।
বলেছিল, ‘তন্ময় যখন তোকে ভালোবাসে, তখন তার সঙ্গেই ভবিষ্যতে তোকে বিয়ে দেব।’ সব ঠিকই ছিল।
মা আমাকে বলেও ছিল, অরিন্দমের টাকা ফেরত দিয়ে দেবে। তন্ময় যখন আমাদের সাহায্য করতেই চাইছে, তাতে আপত্তি কোথায়?”
একটু থেমে শর্মিষ্ঠা বলল,
— “কিন্তু পরে মা যখন তোর ফ্যামিলির ব্যাপারে জানতে পারল, তখন সব বদলে গেল।”
আমি চুপ করে ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম।
— “তোর মা-বাবার একসাথে থাকে না। তোর বাবা আমেরিকায় থাকে। তার আবার মেমসাহেব বউ। তোর মা মুম্বাইতে একা থাকে।
দেখ, আমরা নিম্ন মধ্যবিত্ত ফ্যামিলির।তোদের টাকা আছে। আমাদের তো অত টাকা নেই।
মা বলেছিল, এইরকম একটা পরিবারের সঙ্গে আমার মেয়েকে বিয়ে দিতে ভয় হয়।
তোর নিজের সংসারটা ভবিষ্যতে কেমন হবে, তুই কীভাবে বড় হয়েছিস এসব নিয়েও মায়ের অনেক ভয় ছিল। ”
শর্মিষ্ঠার গলাটা আরও নিচু হয়ে এল।
— “আমি মাকে অনেক বুঝিয়েছিলাম। বলেছিলাম, তন্ময় আমাকে ভালোবাসে। তন্ময় খুব ভালো ছেলে মা ।
কিন্তু মা আর রাজি হয়নি।”
আমি কিছু বললাম না।
— “এবার আমি যদি তোকে এসব তোর মা বাবার ব্যাপারে বলতাম, তোর মাথা গরম হয়ে যেত।
আর তোর পরিবার আর আমার পরিবারের মধ্যেও সমস্যা তৈরি হতো। তাই তোকে কিছু না জানিয়ে সরে গেছিলাম আমি ।”
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম।
এতদিন ধরে যে ঘটনাটাকে শুধু একটা বিশ্বাসঘাতকতা বলে ভেবেছিলাম, তার পিছনেও যে এতগুলো মানুষের ভয়, অসহায়তা আর পরিস্থিতি জড়িয়ে ছিল, সেদিন প্রথমবার সেটা বুঝতে পারলাম।
শর্মিষ্ঠা ধীরে ধীরে বলল,
— “আর আজ তোর মা যখন আমাকে ফোন করেছিল,কিছু কথা বলার পর, আমি ফোনটা আমার মায়ের হাতে দিয়ে দিয়েছিলাম। বাকি কী কথা হয়েছে, সে আমি জানি না।”
আমি আর কিছু জিজ্ঞেস করলাম না শর্মিষ্ঠাকে।
শুধু মনে হলো, কিছু মানুষ ইচ্ছে করে আমাদের জীবন থেকে চলে যায় না। কখনও কখনও পরিস্থিতিই তাদের আমাদের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
আর সেই রিক্ত খাঁচা , শূন্যই থেকে যায়।
আর শর্মিষ্ঠার কাছ থেকে সব কথা শোনার পর, তখন আমার এটাই মনে হয়েছিল,
মা-বাবা আমাকে জন্মটাই বা কেন দিতে গেল!
শালা !
ক্রমশ...