আরেকটি নিষিদ্ধ প্রেমের গপ্পো - অধ্যায় ৬
(৩)—মুখোমুখি।
মা আমাকে হাত ধরে ছাদে নিয়ে যাচ্ছিলো , মার পরনে সুতির পাতলা নাইটিটা বেশ কিছুটা চেপে ধরেছিলো মায়ের বক্ষদেশ।
তাই মায়ের সুউন্নত ভরাট স্তনের গোলগাল গড়নটির দিকে ,আমার অবাধ্য নজর চলে যাচ্ছিলো ক্ষনে ক্ষনে।
বাড়িতে ঢুকে লক্ষ্য করেছিলাম আগেই ,মায়ের নাইটি টার বুকের দিকটা কেমন টান টান হয়ে গোলাকার পিন্ডের উঁচু স্তূপাকার মতো হয়েছিল।
যখন মা মাতৃত্বের স্নেহোমাখা আদুরে ভঙ্গিতে, "চল দুজনে ছাদে যাই, বুবু" বলে আমাকে খাট থেকে হাত ধরে টেনে তোলার চেষ্টা করছিলো ,
ঠিক সেই সময়ে আমার নজরে এসেছিলো, মায়ের ভারী স্তনগুলো কেমন দুলে উঠছিলো। যদিও মায়ের নাইটির ভিতরে পরনে ছিল ব্রা ।
নারীর বক্ষ সৌন্দর্যের প্রতি আকর্ষিত হওয়াটা, একজন পুরুষের জন্যে, অস্বাভাবিক কিছুই নয়। কিন্তু ,সেটা একজন সন্তান হয়ে, তারই মায়ের প্রতি এরূপ দুর্বলতা কতটা স্বাভাবিক ?
এসব প্রশ্নের উত্তর ছিলনা তখন আমার কাছে।
মা আমার হাত ধরে বারান্দা দিয়ে ছাদে নিয়ে যাবার সময়,দিদুন ওমনি মাকে পিছন থেকে ডেকে বললো,
— "অনা, ছাদে যখন যাচ্ছিস বুকের উপরে কিছু একটা জড়িয়ে নিয়ে ,তারপরে ছাদে যাবি । লোডশেডিং ,তাই ফ্ল্যাটের লোকজন ছাদে থাকতে পারে কিন্তু। "
দিদুনের কথা শুনে মা কিছুটা থমকে দাঁড়ালো।
তারপর মা, আমার হাতটা ছেড়ে, দিদুনের ঘরের দিকে গেল ।
আমি বারান্দায় কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে রইলাম মায়ের অপেক্ষায়।
দাদু ও দিদুনের একমাত্র সাধের বাধ্য মেয়েকে যে ,তাঁরা তাদের কড়া অনুশাসনে রেখেই মানুষ করেছিলেন , সেদিন তার প্রমান পেলাম আরো একবার ।
মা কে কোনোদিন দাদু দিদুনের কথা অমান্য করতে দেখিনি। সে ধৃষ্টতা মায়ের ছিল না। আর মা ,দিদুনকে যেমন ভালোবাসতো আবার দিদুনের মায়ের প্রতি ছিল অগাধ বিশ্বাসও ।
তাই দাদুর অবর্তমানেও মা কে চিরকাল দেখেছি দিদুনকে সমীহ করেই চলতে। আর আমিও দাদু দিদুনের কড়া শাসন, শিষ্টাচারেই মানুষ হয়েছি সেই ছোট্ট থেকেই।
কিছুক্ষণ পরেই মা কে দেখলাম দিদুনের ঘরথেকে বেরোলো। দিদুনের কথা মতো, মা পাতলা নাইটিটার বুকের উপর একটা ওড়না জড়িয়ে নিয়েছিল ।
মা আর আমি দুজনে সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠছিলাম। ফ্ল্যাটের সুদীর্ঘ খোলা বড় ছাদ । জ্যোৎস্না রাত! চারদিকে নীলাভ আলো ছড়িয়ে আছে।
চাঁদের আলো যেন মাটিতে নেমে এসে ছাদের উপর নরম চাদর বিছিয়ে দিয়েছে। আকাশটা পরিষ্কার,দূরে দূরে অসংখ্য তারা ঝিকমিক করছে,
যেন আকাশজুড়ে অগণিত ক্ষুদ্র প্রদীপ জ্বলছে। চারদিক ফাঁকা। কোনো মানুষের শব্দ নেই, কোনো কোলাহল নেই। শুধু নিঃশব্দ চারিপাশ ।
একটা তীরতিরে, পাতলা বাতাস বইছিল। সেই বাতাস ছাদের ওপর দিয়ে বয়ে গিয়ে ঘামে ভেজা দেহটা খানিকটা প্রশান্তি পেলো বটে।
মনে হচ্ছিলো যেন বাতাসও যেন খুব আস্তে কথা বলছিল সেদিন, যাতে এই নিস্তব্ধতা ভেঙে না যায়। এই বিশাল ছাদে শুধু দুজন মানুষ ,মা আর আমি।
মা একটু এগিয়ে গিয়ে ছাদের রেলিং ধরে দাঁড়ালো। চাঁদের আলোয় মার মুখটা শান্ত দেখাচ্ছিল।
রাতের আকাশের মায়াময় নীলাভ আলোর দ্যুতি যেন মায়ের শুভ্র নির্মল মুখাবয়ের উপর ঠিকরে পরেছে।
আমি ধীরে ধীরে গিয়ে মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে পড়লাম। দুজনেই কিছুক্ষণ কোনো কথা বললাম না।
আমি বেশিক্ষন এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে পারছিলাম না মায়ের মুখের দিকে চেয়ে । আর অনুভব করছিলাম মায়ের শরীরের সেই চেনা, কোমল গন্ধটিকেই ।
শৈশব থেকে মাতৃ দেহের সে ঘ্রাণ আমাকে দিয়ে এসেছিলো নিরাপত্তার আশ্রয় ।
হালকা বাতাসে মায়ের ঘন এলোমেলো চুলগুলো যখন বারবার উড়ে এসে আমার গাল ছুঁয়ে যাচ্ছিলো , সেই চুলের রেশমি সৌরভে মিশে ছিল মৃদু, মাতোয়ারা মেয়েলি সুরভি ।
মা যে আমার সংস্পর্শের হাতের নাগালেই রয়েছে , চোখ বন্ধ করেও অনুভূতিটা তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করেছিলাম সেদিন। সে এক আলাদা প্রশান্তি আর বাকিটা অপ্রকাশ্য অনুভূতি !
হঠাৎ অনুভব করলাম মা নড়েছে।
ঘাড় একটু ঘুরিয়ে তাকালাম। দেখলাম মা আমার ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে, কিন্তু তার মুখটা তখন আমার দিকেই ফেরানো। মা একদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছিল।
চাঁদের নরম আলোয় মায়ের চোখদুটো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। সেই চোখে যেন এক রহস্যময় খোঁজ , আমার মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা বোঝার চেষ্টা করছিলো মা ।
যেন কোনো এক মা , তার নিজের ছেলেকে, সামনে পেয়েও হারিয়ে ফেলেছে। সে যে কি ভয়ানক অনুভূতি, এ ত্রিভুবনে একমাত্র মা রাই বোঝে বোধয়!
আমি একটু অস্বস্তি অনুভব করলাম। মা কি এমন পর্যবেক্ষণ করছে ?
আসলে ,সেদিন আমার মুখের ভেতর লুকিয়ে থাকা বদলে যাওয়া অভিব্যক্তি থেকে নিজের ছেলেকে খুঁজে বেরকরে আনতে চাইছিলো মা ও যে !
কিছুটা মুহূর্ত, আমরা দুজনেই চুপ। শুধু দুজন -দুজনের দিকে তাকিয়ে।
হালকা বাতাসে মায়ের এলোমেলো হয়ে যাওয়া চুলগুলো আছড়ে পড়ছিলো মায়ের গালের উপর। কিন্তু উড়ে আসা চুলগুলো মা সরাচ্ছিলো না। এক দৃষ্টিতে তাকিয়েই ছিল আমার দিকেই।
মায়ের সেই চোখের চাহনিতে আমি এক অসহায় মা কে দেখেছিলাম সেদিন । মনে মনে হাসলাম। কিন্তু চোয়াল ছিল শক্ত। আর নিজেই নিজেকেই দুষলাম।
আমার এ মৌনতা এক মা কে যে এত্তটা ভাবিয়ে তুলবে, সে আমার কল্পনার বাইরে ছিল। নিজেকে পাষান মনে হচ্ছিলো। কিন্তু আমিও নিরুপায় ছিলাম সেদিন ।
তারপর মা ধীরে ধীরে একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলল। সেই নিঃশ্বাসে যেন একটু ক্লান্তি, একটু দুশ্চিন্তা মিশে রয়েছে ।
মা আমাকে আলতো করে নরম সুরে ,
— "এই , কী হয়েছে রে তোর বুবু?"
মায়ের কণ্ঠস্বরে মায়া ছিল , কিন্তু তার ভেতরে মায়ের সেই চেনা কর্তৃত্বের সুরও যেন মিশে ছিল ।
আমি চুপ!
মা এবার চোখদুটো আমার ওপর স্থির রেখেই, দুই হাত মুড়ে দাঁড়িয়ে আবার বলল,
— "আমার সাথে এরকম করছিস কেন বলতো তুই? আমি কি দোষ করে ফেলেছি!"
আমি মায়ের পাশে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে কাঁপা গলায় মৃদু স্বরে,
— "না। ...কিছু না। " কথাটা বলেই থেমে গেলাম।
মা ধীরে ধীরে বলল,
— "আমি তোর মা… বুঝেছিস?"
মায়ের কন্ঠস্বরে একটা দৃঢ়তা অনুভব করলাম ।
মা আবার বলল,
— "আমাকে কেন তুই এড়িয়ে যাচ্ছিস বলতো বুবু?"
আমি কোনো উত্তর দিলাম না। শুধু চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম।
তারপর মা ধীরে ধীরে আবার বলল,
—আমার উপর অভিমান হয়েছে তোর?
মা একটু নিঃশ্বাস ফেলল। কণ্ঠটা এবার অনেক নরম হয়ে এল।
— "দু-বছর তোর সাথে দেখা করতে আসতে পারিনি বলে?"
আমি তখনও মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে। কিন্তু বুকের ভেতরে জমে থাকা এতদিনের স্মৃতি আর অনুভূতিগুলো যেন ধীরে ধীরে কড়া নাড়তে থাকলো।
আমি চুপ করেই রইলাম। মাথা তুললাম না। যেন মাটির দিকেই তাকিয়ে থাকাটা আমার জন্য সবচেয়ে নিরাপদ। কারণ আমি জানি একবার চোখ তুলে মায়ের দিকে তাকালে হয়তো সবকিছু অভিমান ভেঙে জল হয়ে বেরিয়ে আসবে। আমি কী করে বলব মাকে আমার সমস্যাটা অনেক বড়। আর সেই সমস্যার কেন্দ্রেই তুমি । কথাগুলো গলার কাছে এসে আটকে রইল। ঠোঁট নড়ল না।
কিন্তু ভেতরে ভেতরে আমি যেন নিজেকেই বলতে লাগলাম মা ,এই দুটো বছর তুমি নিজেকে নিয়ে এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলে ,যে নিজের ছেলের সাথে দেখা করতেও আসতে পারলে না?
বুকের ভেতরটা একটু কেঁপে উঠল। মা, তোমার মনটা একবারও চাইলো না যে নিজের ছেলের কাছে একবার ছুটে যাই?
হঠাৎ মনে হলো, মা তোমার সময়ের মূল্য কি এতটাই বেশি ছিল যে তার ভেতরে আমার জন্য কোনো জায়গাই ছিল না?
আমি আবার মনে মনে ভাবতে থাকলাম,
এই দুই বছরে তুমি ছিলে… শুধু , ফোনে , ভিডিও কলে ,মোবাইল স্ক্রিনের ওপারে তোমার মুখও দেখতাম।
আর সেই একই কথা “বুবু… ঠিকমতো পড়ছিস তো?”
ছাদের সিমেন্টের রেলিংটা ধরে বালির দানা গুলো খুঁটে চলেছি চোখ নামিয়ে । কথা না বলে ! আর আমি মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে কাঁপছি।
মায়ের নরম বাহুর সাথে আমার বাহুটা ঘষা খাচ্ছিল। মা কে বহুদিন পর কাছে পাবার তৃপ্তি পাচ্ছিল আমার ভাঙাচোরা মন টা ।
নিঃশব্দ সময়টাকে উপভোগ করেছিলাম প্রতিটা নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের ছন্দেই ।
মায়ের তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বর ভেসে এল।
মা একটু গলা শক্ত করে,
— "তোর কি কোনো সমস্যা হয়েছে, বুবু?"
আমি চুপ!
মা আবার বলল, এবার কথাগুলো একটু একটু করে স্পষ্ট করে,
— “তোর সমস্যাটা কী?
আমি কি সেটা জানতে পারি…”
মা এত প্রশ্ন করছে… কিন্তু আমার নিজের একটা প্রশ্নর উত্তর কি মা কখনো দিয়েছে।
“মা… তুমি আমাকে কেন নিজের গর্ভে ধারণ করেছিলে?”
আমি এই প্রশ্নের উত্তর পেয়েছি কী ?
মায়ের সাথে কাটানো ছোটবেলার স্মৃতিগুলো চোখের সামনে ভেসে বেড়াচ্ছিলো । ছোট ছোট মুহূর্তগুলো,
মা কখনো আমাকে মারধোর করেনি। শাস্তি, থাপ্পড়, চড় কোনোটাই আমার জীবনে কখনো ঘটেনি। কিন্তু মায়ের চোখ, ওই চোখকে আমি ছোটবেলায় যমের মতো ভয় পেতাম।
মা যদি অফিস থেকে ছুটি নিয়ে কলকাতার ফ্ল্যাটে আমার সাথে দেখা করতে আসতো , আর আমি যখন দুষ্টুমিও করতাম বা পড়াশোনায় অনীহা দেখাতাম, মা এক নজরেই আমাকে থামিয়ে দিত।
মায়ের চোখ গরম হয়ে স্থির হয়ে আমার দিকে তাকাতো। চোখের সেই গভীর স্থির দৃষ্টিতে আমি মুহূর্তের মধ্যেই বুঝে যেতাম ,মা কি বলার চেষ্টা করছে।
মায়ের চিৎকারের দরকার ছিল না। চড় বা থাপ্পড়ের কোনো প্রয়োজন ছিল না। মা শুধু চোখের মাধ্যমে আমাকে সব বুঝিয়ে দিত, শান্ত, গম্ভীর, কিন্তু শক্তিশালী মায়ের সেই চাহনি।
আর তখন মা কেবল একবার গুরু গম্ভীর সুরে ডাক দিত “বুবু!”
আমার চোখে জল জমে আসলো ।
মায়ের কণ্ঠটাও বেশ খানিকটা ভিজে গেল
—“একবারও আমাকে মা বলে ডাকবি না তুই?” মায়ের গলায় সেই মমতার আভা।
আমি চুপ। কোনো শব্দ বের করতে পারছিলাম না।
মা হালকা হেসে বলল,
—“কি শাস্তি দিবি ভেবেছিস তুই আমাকে? দিয়ে ফেল!”
মা পাশে দাঁড়িয়ে, কাঁপা কাঁপা গলায়
—“তোকে জন্ম দিয়ে আমি কি ভুল করেছি বলতো বুবু! তোর কোনো অভাব, কোনো খামতি আমি রেখেছি কোনোদিন ? তুই আমার কাছে যা যা আবদার করেছিস এতকাল,
কোনটা আমি পূরণ করতে পারিনি ,সেটা আগে বল ?”
মা একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিল।,
— “বুবু শুধু দুটো বছর আমি তোর কাছে আসতে পারিনি। তাই বলে তুই আমাকে মা বলে ডাকবি না এক বারের জন্যেও?”
মায়ের চোখে মমতা, কণ্ঠে সেই কাঁপা কাঁপা অনুভূতি।
মা হঠাৎ দু’হাত তুলে আমার দুই কাঁধ শক্ত করে ধরে ফেলল।মায়ের আঙুলের চাপ যেন হঠাৎ করেই ভারী হয়ে উঠল।
এক ঝটকায় আমাকে নিজের দিকে টেনে নিয়ে, কাঁধ দুটো ধরে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলে উঠলো,
— “উত্তর দে… বুবু! উত্তর দে… বুবু! মুখটা খোল!” মায়ের কণ্ঠে তখন আর আগের সেই নরম সুর ছিল না ।
তারপর আমি খুব শান্ত স্বরে, মা কে জিজ্ঞেস করলাম —
“ভাস্কর কে?”
মা খুব ধীর, নরম, কিন্তু নিঃশব্দে ভারী হয়ে থাকা কণ্ঠে,
— "এটা জানার জন্যেই কি…
তুই আমার সাথে ভালো করে কথা বলছিলিস না?"
তারপর প্রায় ভাঙা গলায় নরম স্বরে বলল,
— “আমাকে মা বলে ডাকছিসও না ”
কয়েক মুহূর্ত মা আর আমি মুখোমুখি চুপকরে দাঁড়িয়ে রইলাম।
মা ধীরে ধীরে,
— "ঠিক আছে ,তোর যখন এত্তটা আপত্তি , আমি আর ভাস্করের সাথে এগোবো না।
আর , ভাস্করের সাথে আমার এমন কিছু সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি যে, আমি সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারবো না!"
তারপর বলল,
— "ভাস্কর আমার অফিস কলিগ।"
মায়ের চোখ তখন সরাসরি আমার দিকে নয়।
মনে হলো ,মা যেন দূরে কোথাও তাকিয়ে আছে,
—"আর তোর বাবার সঙ্গে আমার ডিভোর্সের পর, যখন আমি মুম্বাইয়ে নতুন অফিসে যোগ দিই, তখন ওর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়।
ধীরে ধীরে আমাদের মধ্যে একটা বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ও ডিভোর্সি। ওর কোনো সন্তান নেই।"
তারপর একটু থেমে, খুব নিচু স্বরে,
— " ভাস্কর আমি প্রায় সমবয়সী। ও বাঙালি, নর্থ কলকাতারই ছেলে।"
মা ধীরে ধীরে বলল,
— "বললাম তো ,
তোর আপত্তি যখন আছে, আমি এগোবো না ভাস্করের সাথে। ”
আমি কিছুক্ষণ মায়ের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
আমি ধীরে ধীরে মাকে বললাম,
— "আমার তোমার ব্যাপারে কোনো কিছুতেই কোনো আপত্তি নেই।"
মা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল আমার দিকে।
আমি আবার বললাম,
— "তুমি স্বাধীনভাবেই নিজের জীবন কাটাতে পারো। সে অধিকার আমার কাছ থেকে নেবার প্রয়োজন নেই তোমার।"
তারপর মায়ের চোখে হালকা জল চিকচিক করে উঠল।
দমকা শোঁ শোঁ করে বাতাসে চুলগুলো মায়ের মুখের উপর ঝাপ্টা মারতে থাকলো । মায়ের চোখের পলক যেন পড়ছে না আর । এক পাশের চোখের উপর চুলগুলো মা সরাচ্ছে না ।
তাই ,আমি কিছুটা মায়ের দিকে এগিয়ে গেলাম। মায়ের চোখের উপর আমার চোখ। একদম কাছ থেকে !
তারপর আলতো করে আঙুল দিয়ে মায়ের চোখের উপর থেকে চুলগুলো সরাচ্ছি ,মায়ের একপাশের গালের উপর আঙুল দিয়ে চুল গুলো সরাতে সরাতে মায়ের মলিন পবিত্র মুখটা ভালোকরে দেখতে দেখতে ভাবছি মা, আমি তো তোমার সান্নিধ্যের প্রতীক্ষাই করেছিলাম এতকাল ! জীবনের মুহূর্তগুলো তোমার সাথেই কাটাতে চেয়েছিলাম শুধু । সে সুযোগটুকু তুমি আমাকে দিতে পারলে না?
মায়ের গাল বেয়ে নেমে আসা চুলগুলো সরিয়ে, কানের একপাশে গুঁজে দিলাম। আর আমি চেয়ে রইলাম মায়ের সেই নিষ্পাপ শুভ্র মুখটার দিকে।
পলক না ফেলে। মা ,তুমি আমার মা বলেই কি আমার চোখে তুমি এতো সুন্দরী ? তোমার প্রতি আমার এত্ত আবদার ,অভিযোগ।
সে উত্তর আমার জানা ছিল না !
মায়ের গালের কাছে রাখা, আমার আঙুল টা , মা একহাতে চেপে ধরে থামিয়ে , মা আমাকে জিজ্ঞেস করল ,
— “তাহলে কিসের সমস্যা তোর, বুবু?”
মায়ের কণ্ঠ এবার নরম হয়ে এল , প্রায় কাঁপা কাঁপা।
মা খুব আস্তে বলল,
— "আমি তোকে না জানিয়ে কিছু করবো না এটা জেনে রাখিস কিন্তু বুবু ।"
তারপর মা একটু থেমে,
— "তোর মতামত আমার কাছে সবচেয়ে বেশি দামি।"
কথাগুলো বলার সময় মায়ের চোখ আমার চোখেই স্থির ছিল।দূরে কোথাও কোনো অজানা পাখির ডানা ঝাপটানোর শব্দ শোনা গেল।
মা হঠাৎ ধীরে ধীরে বলল,
— "কিন্তু তুই কীভাবে জানতে পারলি এসব ?”
মায়ের কণ্ঠে বিস্ময় ছিল, কিন্তু তার ভেতরে একটুখানি আশঙ্কাও মিশে ছিল।
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম।
তারপর শান্ত গলায় বললাম,
— "আজকাল ইন্টারনেট ,সোশ্যাল মিডিয়া আর এই ডিজিটাল যুগে কোনো কিছুই আর খুব বেশি দিন গোপন থাকে না।"
আমি মায়ের দিকে তাকিয়ে বললাম,
— "তুমি নিশ্চয়ই সেটা ভালো করেই বুঝতে পারছো ।"
মা নিচু স্বরে—
"আসলে, তোর বাবার সাথে ডিভোর্সের পর ,আমি অনেকটা একা হয়ে গেছিলাম, জানিস বুবু।"
মা একটু থামল।
তারপর মা খুব ধীরে ধীরে বলতে লাগল—
"সারাদিন অফিস… কাজ…আর বাড়ি ফিরে সেই একা ঘর…
একাকিত্ব… হতাশা…ধীরে ধীরে আমাকে গ্রাস করে ফেলেছিল।”
আমি চুপ করে শুনছিলাম মায়ের কথা গুলো।
মা আবার বলল,
— "তোর বাবার সাথে আমার ডিভোর্সের প্রায় এক বছর পর আমি যখন চাকরি বদলালাম , নতুন অফিসে ভাস্করের সাথে আমার আলাপ পরিচয় হয় ।
কিছুদিন পর থেকেই কাজের সূত্রে ভাস্করের সাথে আমার কথা বলা বাড়তে থাকে। ধীরে ধীরে একটা সম্পর্ক এগোতে থাকে ভাস্করের সাথে ।"
মা খুব নিচু স্বরে,
— "বিশেষ করে… আমার সেই একাকিত্বের জায়গাটা আমাকে গ্রাস করছিলো তখন ।
আমি তোর মা , তুই এখন ছোট।
এর বেশি তোকে আমি মা হয়ে আর কি বলবো বল !"
আর আমি মায়ের চোখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে , আমার চোখ দিয়েই যেন মাকে বলছি, মা ,কিভাবে আমি তোমাকে বলবো,
আমি তোমার ছেলে হয়েও তোমার নিঃসঙ্গতা ,তোমার একাকিত্বের অংশীদার কেন "আমি" হতে পারলাম না মা !
বাবার সাথে ডিভোর্সের পর, তুমি কেন কলকাতায় আমার কাছে চলে এলে না ?
তারপর মা আমাকে প্রায় অনুনয়ের সুরে বলল
— "কিন্তু বিশ্বাস কর বুবু…
আমি ভাস্করের সাথে কোনো দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কে জড়িয়ে যাইনি এখনো।"
আমি ঠিক সেই মুহূর্তটাতে, এটাই বুঝে উঠতে পারছিলাম না ,মায়ের দোষটা কোথায় ছিল যে ,মা কে আমি শাস্তি দেব !
আর আমি যে নিজেই কি চাইছি ,সেটাই নিজেই বুঝতে পারছিলাম না !
তারপর মা আবেগভেজা কণ্ঠে,
— "আর ঠিক সেই কারণেই ,তোর মতামত নিতে এসেছি আমি।"
মা খুব শান্ত স্বরে,
— "কারণ তোর গুরুত্ব, আমার কাছে সবচেয়ে আগে।" কথাগুলো বলার সময় মায়ের কণ্ঠ কেঁপে উঠেছিল ।
মা কাঁপা গলায়,
— " জানিস তো বুবু ,আমি পৃথিবীতে সব কিছু ছেড়ে দিতে পারবো রে । কিন্তু তোকে হারাতে পারবো না আমি । কোনোদিনের জন্যে না। কারণ আমি তোর মা !”
মা কথাটা বলেই কান্নায় ভেঙে পড়লো। আর বারে বারে বলেছিলো সেদিন ,
— "আমি তোকে হারাতে পারবো না বুবু…কোনোদিনের জন্য নয়।"
এরপর আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না মা। হঠাৎ এগিয়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল।
মা দু’হাত শক্ত করে আমার শরীরকে আঁকড়ে ধরল, যেন আমি কোথাও হারিয়ে যেতে পারি,আর মা আমাকে ধরে রাখতে চাইছে।
মা মুখটা এসে লুকিয়ে ফেলল আমার বুকের ছাতির, ঠিক ভিতরেই । মা আমাকে আঁকড়ে ধরলো নিজের বাহুডোরের মাঝে শক্ত করে ।
আমি অনুভব করেছিলাম সেদিন ,মায়ের কাঁধ দুটো যেন কেঁপে কেঁপে উঠতে থাকলো আমার বুকের খাঁচার মধ্যেখানে ।
মা কাঁদছিলো অঝোর ধারায় । নিঃশব্দে গভীরভাবে। মায়ের চোখের জল আমার টি শার্ট ভিজিয়ে দিতে থাকলো। আমার বুকের ভেতরেও তখন এক শীতল ঢেউ উঠেছিল ।
আর আমার নিজের নিজেকেই তখন অপরাধী বলেই মনে হয়েছিল তখন ।
এতদিনের জমে থাকা মায়ের প্রতি মান ,অভিমান, দূরত্ব, অভাব ,অভিযোগ সব যেন এক মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে মলিন হয়ে যেতে থাকলো এক লহমায় ।
আমি চেষ্টা করছিলাম নিজেকে সামলে রাখতে। কিন্তু পারলাম না।
ধীরে ধীরে আমিও দুইহাত তুলে জড়িয়ে ধরলাম মাকে ।
জ্যোৎস্নাভেজা সেই নিঃশব্দ ছাদের উপর আমরা দুজন, একজন নতুন নীড়ের অনুমতি সন্ধানী মা আর আমি তাঁর নিঃসঙ্গ অসহায় ছেলে ,দুজনেই দাঁড়িয়ে আছি একে অপরকে আঁকড়ে ধরে।
আর সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল দূরত্ব, অভিমান, না-বলা কথা ,সবকিছু যেন নিঃশব্দে গলে যাচ্ছে।
আমার মাথা আশ্রয় পেলো মায়ের কাঁধের উপর। আমার হৃদয় যেন তৃপ্তি পেল , মায়ের মমত্ব ও মাতৃত্বের নিবিড় নিগূঢ় আলিঙ্গনে।
মার শরীরের স্পর্শ পেলাম আমি বহুদিন পর,সাথে বহুদিনের চেনা অথচ মৃদু অনন্যসুলভ মাতৃ শরীরের সুবাস ।
আর যে মলিন সুগন্ধ যেটা আমার কাছে অতীব পরিচিত। মায়ের পৃষ্ঠদেশের উপর রেশম তুল্য নরম ঘন চুলের সুরভিতে আমি মোহিত হয়ে যাচ্ছিলাম সেদিন ।
মায়ের হৃদপিণ্ডের কম্পনে কম্পিত হলাম আমি নিজেও । আমার বুকের পিঞ্জরে জমে থাকা অভিমানের বরফের স্তূপ ধীরে ধীরে গলে জল হয়ে যাচ্ছিলো ।
দীর্ঘ বছর ধরে একটু একটু করে জমে ওঠা সেই অভিমানের হিমশীতল তুষারআবৃত পর্বতের চূড়া,যা হিমাঙ্কের কাছাকাছি ঠাণ্ডা ও বরফ কঠিন হয়ে আমার হৃদয়ের মধ্যেখানে জমে ছিল ,
মাকে বুকে জড়িয়ে ধরার তাপে অল্প অল্প বাষ্পীভূত হয়ে নদীর ধারার মতো বেয়ে এলো আমার চোখ থেকে। আর সেই বাষ্প-জল, অশ্রুর আকারে, আমার দুই গাল বেয়ে নেমে ঝরে পড়তে থাকল,
মায়ের কাঁধ বেয়ে ।
টপ টপ করে…
মায়ের বাহু জোড়া ধরে ,আমার বুকের মাঝে লুকিয়ে থাকা মায়ের মুখটা সরিয়ে আনলাম। মলিন আলতো হাতের ছোঁয়ায় মায়ের গালে হাত দিয়ে মুছিয়ে দিলাম মায়ের চোখের জল।
আর আমি আস্তে আস্তে আমার থ্রী কোয়াটার প্যান্টের পকেটে হাত ঢোকালাম। ডান পাশের পকেটে লুকিয়ে রেখেছিলাম একটা ছোট্ট গিফট বক্স। সেটা ছিল মায়ের জন্মদিনের জন্য কেনা উপহার।
যদিও খুব দামি কিছু না। গিফট বক্স টা মায়ের হাতের দিকে এগিয়ে দিলাম।
আর মা কে হাসি মুখে বললাম,
— "বিলেটেড হ্যাপি বার্থডে..."
সাথে সাথে মায়ের মুখটা খুশিতে ভরে উঠল ঠিকই। যা ছিল অশ্রু মিশ্রিত আনন্দের অনুভূতি! কিন্তু সাথে সাথেই মা মুখ ফিরিয়ে নিলো আমার দিক থেকে।
মা হাত দিয়ে আমার গিফট বক্স টা নিলো না।
মুখফিরিয়ে মা আমাকে বললো—
"আগে আমাকে "মা" বলে ডাক তুই । তারপর আমি তোর গিফ্ট টা নেবো। "
আমি অশ্রুসিক্ত নয়নে ,মায়ের দিকে তাকিয়ে মা কে বললাম,
— "মা..সরি..... মা ,তুমি তো কোনো ভুল কাজ করোনি মা ।
তোমার নিঃসঙ্গ একাকিত্বের জীবনে , নতুন জীবন সঙ্গী তুমি খুঁজে নিতেই পারো। আর সেই সঙ্গীকে আঁকড়ে ধরে ,বাকি জীবনটা কাটাতেই পারো তুমি।
এতে আমার অনুমতি নেবার প্রয়োজন নেই তোমার। "
তারপর একটু থেমে ,
— "আমি শুধু এটাই চাই , তুমি ভালো থেকো মা । মা, তুমি কখনো ভুল করতেই পারো না! আমিই ভুল ভেবেছিলাম তোমাকে ।"
সাথে সাথে মা আমার মাথাটা নিজের দিকে টেনে এনে , আমার কপালে চুমু দিলো।
আর আমাকে জড়িয়ে ধরে বললো ,
— “আই হ্যাভ মিসড ইউ টু, বুবু। এভরি সিঙ্গেল ডে…”
গিফট বক্স টা আমার হাত থেকে নিয়ে , মা আমাকে জড়িয়ে ধরে রয়েছে। আর আমি মনে মনে ভাবছি, মা কে কি সবার অগোচরে লুকিয়ে রাখা যায় না?
বুকের মাঝে ,পিঞ্জরের খাঁচার আড়ালে ,হৃদয়ের ঠিক মধ্যেখানে ...যত্ন করে ! অনেক অনেক যত্ন করে!
বড্ড অবুঝ এ মন ! জানিনা কেন এমন চায় এ অবাধ্য হৃদস্পন্দন কেন যে প্রশ্রয় দেয়, এ নিষিদ্ধ চাওয়াকেই !
হঠাৎ চারিদিক যেন ঝলমল করে উঠলো।
আলোকিত হয়ে গেলো চারিপাশ । ইলেকট্রিক চলে এলো ।
মা আর আমি ধীরে ধীরে ছাদ থেকে নিচে নেমে এলাম।
ক্রমশ...