জুলাই আন্দোলন - অধ্যায় ২৮
পর্ব ২৮
বিকেলের আলোটা একটু একটু করে মরে আসছিল। কুদ্দুস মিয়া আজ বাসায় ফিরলেন অনেক ক্লান্ত শরীর নিয়ে। গায়ের পাঞ্জাবিটা ঘামে ভিজে আটকে ছিল। মিটিংয়ে অনেকক্ষণ ধরে চিৎকার-চেঁচামেচি হয়েছে বলে চোখে-মুখে এখনো ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট।
বাসায় ঢুকতেই রেহানা বেগম ছুটে এলেন।
“আসছেন? হাত-মুখ ধুয়ে নিন, খাবার বেড়ে দিচ্ছি।”
কুদ্দুস কথা না বলে শুধু মাথা নাড়লেন। হাত-মুখ ধুয়ে খাবার টেবিলে বসতেই চারপাশটা একবার দেখে নিলেন। তারপর গলা উঁচু করে বললেন,
“বউ মা-কে ডাকো।”
রেহানা বেগম রান্নাঘর থেকে জোরে চিৎকার করে উঠলেন,
“চৈতি! চৈতি কই তুমি? তোমার বাবা ডাকছে! শুনছো?”
চৈতি তখন বারান্দায় ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করছিল। ঘামে তার কপাল ভিজে গিয়েছে। ওড়নাটা কোমরে গুঁজে রেখেছিল। শাশুড়ির ডাকে চমকে উঠে দ্রুত ওড়নাটা টেনে মাথায় তুলে দিল।
“জ্বি মা, আসছি!”
চৈতি দ্রুত হেঁটে ডাইনিংয়ে এসে দাঁড়াল। মাথায় কাপড়, চোখ নিচু করে নম্র গলায় বলল,
“জ্বি বাবা, আমাকে ডাকছেন?”
কুদ্দুস মুঠোয় ভাত নিয়ে মুখে তুললেন। চোখে একটা নম্র হাসি। চৈতিকে কুদ্দুস বৌমা নয়, বরং নিজের মেয়ে ভাবে।
“হ্যাঁ মা। খাবার খাইছো তুমি?”
“জ্বি বাবা, খেয়েছি।”
“বসো। তোমার সাথে একটা জরুরি কথা ছিল।”
চৈতি একটু ইতস্তত করে টেবিলের একপাশে চেয়ার টেনে বসল। তার মনে সামান্য অস্বস্তি। বাবা সাধারণত এভাবে ডাকেন না।
কুদ্দুস এক চুমুক পানি খেয়ে গলা পরিষ্কার করলেন।
“তুমি তো জানো মা, সামনে পৌরসভা নির্বাচন। আমি চাইছিলাম জাতীয় নির্বাচন আগে হোক। কিন্তু জনগণ আগে ওয়ার্ড ও পৌরসভার নির্বাচন চায়। জনগণের কথায় সরকার তাই করল।”
চৈতি মাথা নিচু করে শুনছিল। তার চোখে-মুখে সম্মান আর বিশ্বাস। মনে মনে ভাবছিল — **বাবা সারাদিন এলাকার জন্যই চিন্তা করেন। কত কষ্ট করে মানুষের কথা শোনেন।**
মুখে নরম গলায় বলল,
“জ্বি বাবা। জনগণের দাবির মূল্য দেওয়া উচিত। গণতন্ত্র তো সেটাই।”
কুদ্দুস খুশি হয়ে মাথা নাড়লেন।
“ঠিক বলেছো মা। কিন্তু এলাকায় আমার বিপক্ষে কেউ দাঁড়াতে চায় না। সবাই আমাকে সম্মান করে। এতে আমি খুব কষ্ট পাই। একটা শক্তিশালী প্রতিপক্ষ না থাকলে নির্বাচনটা তো একতরফা হয়ে যায়। লোকে বলবে কুদ্দুস মিয়া ভয় দেখিয়ে সবাইকে চুপ করিয়ে রেখেছে।”
চৈতি মনে মনে ভাবল — **বাবা সত্যিই কত বড় মনের মানুষ। নিজের জয় চান না, চান ভালো লড়াই হোক।**
সে শ্রদ্ধার সাথে বলল,
“বাবা, আপনি এলাকার জন্য যা করছেন তা সত্যিই অনেক বড়। অনেক নেতা তো জুলাইয়ের পর পালিয়ে গেছে, আর আপনি এখনো এখানে থেকে সবার জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। এটা আপনার যোগ্যতা।”
কুদ্দুস বুক ফুলিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“আজ মিটিংয়ে রবিউল মাস্টার বলল, তোমার নামটা নিল, শিক্ষিত মার্জিত। তুমি যদি আমার বিপক্ষে দাঁড়াও, তাহলে একটা ভালো লড়াই হবে। আমি নিজেই খুশি হব মা।”
চৈতি একদম হতবাক হয়ে গেল। চোখ বড় বড় করে তাকাল। তার নিষ্পাপ মুখে বিস্ময় আর অস্বস্তি ফুটে উঠল।
“কী বলেন বাবা! আমি? আমি কীভাবে আপনার বিপক্ষে দাঁড়াবো? এটা তো সম্পূর্ণ অসম্ভব। আমি আপনাকে কত সম্মান করি… আপনি আমার বাবার মতো। আমি কখনো আপনার বিরুদ্ধে যাব না।”
কুদ্দুস হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিলেন। তার মুখে একটা চালাক হাসি।
“আরে মা, অত উত্তেজিত হইও না। আমি চাই শক্তিশালী কেউ আমার বিপক্ষে লড়ুক। সবাই যদি আমাকে একতরফা সমর্থন করে, তাহলে নতুনত্ব আসবে কীভাবে? গণতন্ত্র কোথায় থাকবে?”
চৈতি অসহায় চোখে তাকিয়ে রইল। তার গলা শুকিয়ে গিয়েছে।
“কিন্তু… কীভাবে বাবা? আমি তো কোনো রাজনীতি বুঝি না। আমি একজন সাধারণ গৃহবধূ… দুইটা ছোট মেয়ে নিয়ে সংসার সামলাই। এসব আমার দ্বারা হবে না।”
কুদ্দুস মুখভর্তি হাসি নিয়ে ঝুঁকে বললেন,
“চিন্তা করো না মা। তুমি শুধু NCP-তে যোগ দাও। আমি ঢাকায় কথা বলে রেখেছি। তুমি একদিন গিয়ে কাগজপত্রে সই করে দিয়ে আসবে। বাকিটা আমি দেখব। তোমার নামে প্রার্থী করব। তুমি তো আমার বউমা—লোকে বলবে কুদ্দুস মিয়া নিজের পরিবারের মধ্যেও গণতন্ত্র চর্চা করেন।”
চৈতি চুপ করে বসে রইল। তার মাথার ভিতর ঘূর্ণি চলছে।
সে তার শ্বশুরকে খুব শ্রদ্ধা করে। তাই এই প্রস্তাবটা তার কাছে একদম অপ্রত্যাশিত এবং অস্বস্তিকর লাগছে। কিন্তু বাবার কথা ফেলতেও পারছে না।
সে শুধু ফ্যাকাসে, নরম গলায় বলতে পারল,
“বাবা… আমি একটু ভেবে দেখি… আপনি যা বলবেন তাই করব।”
কুদ্দুস খাবার মুখে দিতে দিতে সন্তুষ্ট হাসি দিয়ে বললেন,
“ভাবো মা, ভাবো। কিন্তু বেশি দেরি করো না। সময় চলে যাচ্ছে।”
চৈতি কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল। তার নিষ্পাপ মনে অনেকগুলো প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল। একটু ইতস্তত করে সে নরম গলায় বলল,
“বাবা, সবাই তো নির্বাচনে ব্যস্ত থাকবে। আমি যদি দাঁড়াই, তাহলে রাজীব যদি আমার হয়ে কাজ করে… তাহলে আপনার নির্বাচনের ক্যাম্পিং কে দেখবে? আপনার তো অসুবিধা হবে?”
চৈতি ভেবেছিল, রাজীব হয়তো তার হয়ে এজেন্টের কাজ করবে। এতে অন্তত স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে একটা সমন্বয় থাকবে। আর চৈতি রাজীব বাদে আর কাকেই বা ভাববে। রাজীবের সাথেই ত সে শুধু ফ্রি।
কুদ্দুস মিয়া একটু হেসে বললেন,
“রাজীব তো আমার হয়েই ক্যাম্পিং করবে মা। তুমি চিন্তা করো না।”
চৈতি অবাক হয়ে বলল,
“তাহলে বাবা… আমি নির্বাচনে দাঁড়ালে এত কিছু কীভাবে সামলাবো? আমার তো দুইটা ছোট মেয়ে, সংসার…”
কুদ্দুস মনে মনে হাসলেন। তার চোখে একটা চতুর দৃষ্টি খেলে গেল।
*(তোমার কিছুই সামলাতে হবে না প্রিয় মা আমার। তুমি তো শুধু একটা ডেমো। হা হা…)*
তিনি বাইরে মিষ্টি করে বললেন,
“সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে মা। তুমি শুধু নামটা দাও।”
চৈতি লজ্জা পেয়ে বলল,
“বাবা, আমি তো এসব কিছুই বুঝি না। রাজনীতি, ক্যাম্পেইন, এজেন্ট… কিছুই না।”
কুদ্দুস মাথা নেড়ে বললেন,
“হ্যাঁ, সেটাও একটা বিষয়। রাজীব তো আবার মোটরসাইকেল শো-তে ব্যস্ত থাকে…”
বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতির এক অসুস্থ চিত্র হলো এই ‘মোটরসাইকেল শো’। শত শত মোটরসাইকেল নিয়ে লাইন করে ঘুরে বেড়ানো, হর্ন বাজিয়ে এলাকায় আতঙ্ক ছড়ানো, বিরোধীদের ভয় দেখানো, পোস্টার লাগানো, চাঁদা আদায় করা—এটাই এখন প্রভাব দেখানোর সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। কিছু বেকার যুবক, যাদের কোনো কাজ নেই, তারা নেতাদের পায়ে তেল মেখে এই শো করে। তারা নিজেদের দেশপ্রেমিক ভাবে, আসলে তারা শুধু নেতার চাটুকারিতা করে। রাস্তায় মোটরসাইকেলের বহর দেখলেই সাধারণ মানুষ ভয়ে ঘরের ভিতর ঢুকে যায়। এই অসুস্থ প্রতিযোগিতায় কে কত বড় বহর নিয়ে ঘুরতে পারে, সেটাই নেতার ক্ষমতার মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজীব ছাত্রলীগের সময় থেকেই এই মোটরসাইকেল ওয়ালাদের সর্দার। তার নাম শুনলে অনেকেই এখনো ভয় পায়। এখন ছাত্রদলে যোগ দিয়েছে।
ঠিক তখনই লোকনাথ ঘরে ঢুকল। তার হাতে একটা বড় খাম। মেইন রাস্তার মোড়ে চাঁদা তোলার দায়িত্বে ছিল সে। দোকানদার, ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অনেক টাকা তুলেছে। কিন্তু কুদ্দুসকে দেখাচ্ছে অর্ধেক। বাকি টাকা লোকনাথ নিজের দুইটা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা করছে। একজন অশিক্ষিত কাজের লোক হয়েও সে এখন বেশ চালাক হয়ে উঠেছে।
কুদ্দুস লোকনাথকে দেখে খুশি হয়ে বললেন,
“আরে লোকনাথ! ঠিক সময়ে এসে গেছিস।”
তারপর চৈতির দিকে তাকিয়ে বললেন,
“হ্যাঁ বউ মা, তোমার যত কিছু লাগবে লোকনাথ সব দেখবে। কোনো চিন্তা নেই।”
লোকনাথের সাথে চৈতির চোখাচোখি হতেই চৈতির শরীরটা কেঁপে উঠল। সেই রাতের কথা মুহূর্তে মনে পড়ে গেল—দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় লোকনাথের শরীরের স্পর্শ, তার নিঃশ্বাস, সেই কয়েকটা জোরালো ধাক্কা… চৈতির গলায় ঘৃণা আর অস্বস্তি উঠে এল। তার চোখ নিচু হয়ে গেল।
সে দ্রুত বলে উঠল,
“না বাবা… লাগবে না। আমি ঠিক আছি।”
কুদ্দুস কথা শুনলেন না।
“লোকনাথের অনেক অভিজ্ঞতা আছে। আগের নির্বাচনে ও আমার জন্য একটা পুরো ক্যাম্প সামলেছিল। ও-ই তোমার সব দেখবে।”
চৈতিকে আর কথা বলার সুযোগই দেওয়া হলো না। কুদ্দুস লোকনাথকে ডেকে পাশের রুমে নিয়ে গিয়ে বিস্তারিত সব বুঝিয়ে দিলেন—কী কী করতে হবে, কোথায় কোথায় যেতে হবে, কাদের সাথে যোগাযোগ রাখতে হবে।
চৈতি আর বসতে পারল না। উঠে দাঁড়িয়ে নম্র গলায় বলল,
“বাবা, আমি আসি। আমার কাজ আছে।”
সে আসলে লোকনাথের সামনে থেকে যত দ্রুত সম্ভব দূরে সরে যেতে চাইছিল। তার শরীর এখনো কাঁপছিল। চৈতি দ্রুত তার রুমের দিকে চলে গেল।
লোকনাথ পিছন থেকে তার চলে যাওয়া দেখছিল। তার ঠোঁটের কোণে একটা অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠেছিল।